সৌরভ গোস্বামী

অনুমান অনুযায়ীই লোকসভা ভোটের আগে মমতা ব্যানার্জির সরকারের পূর্ণাঙ্গ বাজেটে আবার বাজার থেকে ঋণ নেওয়ার কথাই স্পষ্ট হল। যার অর্থ, পশ্চিমবঙ্গ তার দৈনন্দিন খরচ মেটাতে ক্রমাগত আরও বেশি করে ঋণ নেওয়ার পথেই হাঁটবে। কেন্দ্রের মতো রাজ্যেও বিপুল দেনার ওপরই ভরসা করছে তৃণমূল। চাকরির কথা বলা হচ্ছে, অথচ একগুচ্ছ প্রকল্প এবং সেই খাতে ভাতা বৃদ্ধি বাদে এবং চুক্তিভিত্তিক চাকরি ছাড়া কোনো স্থায়ী সম্পদ ও চাকরি তৈরির পথে হাঁটল না তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। সামাজিক খাতে বরাদ্দের তুলনায় আসলে কম খরচ করেছে রাজ্য। প্রকৃত খরচের হিসাব তাঁর দাবির সঙ্গে মিলছে না।

চলতি খাতে ব্যয়ের মধ্যে সামাজিক পরিষেবায় ২০২৩ সালের বাজেটে ১,১৯,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল রাজ্য। সংশোধিত বাজেটের হিসাব দেখাচ্ছে, চলতি অর্থবর্ষে রাজ্য খরচ করে উঠতে পারবে ১,০৯,০০০ কোটি টাকা। তবে আগামী অর্থবর্ষ, ২০২৪-২৫ সালের জন্য চলতি খাতে সামাজিক পরিষেবায় ব্যয়ের জন্য ১,৩২,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। মূলধনী খাতে খরচের হিসাবে সামাজিক পরিষেবার দিকটি দেখলে একই ছবি স্পষ্ট হচ্ছে। স্থায়ী সম্পদ তৈরিতে খরচের হিসাব এই খাত থেকে পাওয়া যায়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

রাজ্য বাজেটে ঘোষণা হয়েছে যে মূলধনী খাতে খরচের সামাজিক পরিষেবা বাবদ ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে বরাদ্দ হয়েছিল ১৩,৫৬৬ কোটি টাকা। কিন্তু ১০,৬৮৬ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে মার্চ ২০২৪ পর্যন্ত। প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা খরচই করতে পারছে না রাজ্য। যার পরিমাণ গতবারের বরাদ্দের প্রায় ২৫%। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের জন্য যদিও মূলধনী খাতে সামাজিক পরিষেবা বাবদ ১৩,৮১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটের প্রতিটি ঘোষণাকে বাস্তবায়িত করার জন্য যে আর্থিক সংস্থান রাখতে হয় এবং রাজস্ব আদায়ে তার সংস্থান রাখতে হয়, সেরকম কোনো ভারসাম্যই রাখা হয়নি। এমনকি বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়িত করতে কত অর্থ বরাদ্দ করা হবে তারও উল্লেখ নেই। ফলে এই বাজেট আগামী লোকসভা ভোটের একপ্রকার দলীয় ইশতেহার। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিবছর রাজ্যের ঋণভার বাড়িয়ে চলেছে তৃণমূল সরকার। এমনকি বাজেটে পূর্ব ঘোষণার থেকেও বছর শেষে বেশি ঋণ নিয়েছে। এবার বাজেটেই ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে, প্রায় ৯২,০০০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হবে। পুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬,৯৩,২৩১.৬৬ কোটি টাকা।

এর মধ্যে ১,২৭,০০০ কোটি টাকা আসবে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে করের ভাগ এবং অনুদান বাবদ। রাজ্য সরকারের নিজস্ব কর সংগ্রহ ধরা হয়েছে ১,০২,০০০ কোটি টাকা (এর মধ্যে ২২,০০০ কোটি টাকা মদের উপর রাজস্ব বাবদ), আর ঋণ হিসাবে আসবে প্রায় ৯২,০০০ কোটি টাকা। এই হল বাজেটের ভারসাম্যের চিত্র। উল্লেখ্য, পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে স্বাধীনতার পর থেকে জমা মোট ঋণ বা পুঞ্জীভূত ঋণ ছিল ২,০০,০০০ কোটি টাকার কম। সেই ঋণ জমেছিল ৬০ বছরের কিছু বেশি সময়ে। আর মাত্র ১৩ বছরে অতিরিক্ত ৫,০০,০০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেলেছে তৃণমূল সরকার। এর বেশিরভাগই বাজার থেকে নেওয়া ঋণ, বামফ্রন্টের মত ডাকঘরে স্বল্প সঞ্চয়কে উৎসাহিত করে নেওয়া ঋণ নয়।

৩,৬৬,০০০ কোটি টাকার বাজেট সত্ত্বেও বাংলার রাজস্ব ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে, দৈনন্দিন খরচ মেটাতে ঋণের উপর অনেকটাই নির্ভর করছে রাজ্য। দুর্ভাগ্যবশত, রাজ্যের নগদ হস্তান্তর প্রকল্পগুলির ক্রমবর্ধমান তালিকার ফলে প্রয়োজনীয় স্থায়ী পরিকাঠামো এবং জনসাধারণের পরিষেবার জন্য তহবিলের অভাব দেখা দিয়েছে। এতে মানুষের জন্য আয় সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার কর্মসূচি, যার বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকা, রাজ্যের ইতিমধ্যে ভয়াবহ আর্থিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এই নগদ হস্তান্তরগুলি স্বল্প মেয়াদে মমতার দুর্দান্ত নির্বাচনী সাফল্য নিশ্চিত করে। তিনি বাংলার রাজনৈতিক অর্থনীতিকে নিম্ন আয়ের, উচ্চ বেকারত্বের ফাঁদে ফেলে দিয়েছেন যা থেকে আগামী দুই দশকেও হয়ত বেরিয়ে আসা যাবে না। আগের বাজেটেও তিনি দাবি করেছিলেন যে বাংলার ঋণ ও জিএসডিপি অনুপাত ২০১১ সালের প্রায় ৪২% থেকে কমে এখন প্রায় ৩৩% হয়েছে এবং অতিমারীর আগে এটি ৩২ শতাংশে নেমে এসেছিল। অথচ সত্য হল, দুবছর ছাড়া আর কখনো এই অনুপাত ৩৭ শতাংশের নীচে নামেনি, যা ২০১৮-১৯ সালে সর্বনিম্ন ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। ঋণ-জিএসডিপি অনুপাতের নিরিখে বাংলা দেশের সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত রাজ্যগুলির অন্যতম। এই শতকের প্রথম দশকের গোড়ার দিকে ঋণ-জিএসডিপি অনুপাত প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছিল। কিন্তু পরের দশকে প্রকৃতপক্ষে ক্রমাগত হ্রাস পেয়ে ২০১৩-১৪ সালের মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশে নেমে আসে। আর্থিক ঘাটতির অনুপাত হিসাবে মূলধন ব্যয়, প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ সৃষ্টিতে ব্যয় করা ঋণের অনুপাত, গত কয়েক বছরে গত দশকের গোড়ার দিকের তুলনায় সামান্য বেশি ছিল।

কর্মসংস্থানের প্রশ্নে মমতা সরকারের অভিমুখ স্পষ্ট অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এমএসএমই)। বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিটে মমতা যা দাবি করেছেন, তা খুব সমৃদ্ধির ছবি তুলে ধরে না। বাংলায় এই ধরনের ৯৬,০০,০০০ এমএসএমই আছে। এমএসএমই পিছু গড়ে ৩-৪ জন কর্মী ধরলেও সংখ্যাটা দু কোটি পেরোবে না। এমএসএমই যদি সত্যিই কর্মসংস্থানের অভাবের উত্তর হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি এমএসএমই থাকা উত্তরপ্রদেশে অর্থনীতিতে দেশের সবচেয়ে এগিয়ে থাকা রাজ্য হত। টেকসই, স্থিতিশীল কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য বাংলার একাধিক মেগা প্রকল্প প্রয়োজন। ছোট-বড় আপস্ট্রিম এবং ডাউনস্ট্রিম শিল্প তৈরি করতে বিশাল বিনিয়োগকারী প্রয়োজন। অথচ মমতার সিলেবাসে সেসব নেই। তাঁর অযৌক্তিক জমি নীতি, শিল্প পরিকাঠামোয় বিনিয়োগে অনীহা, অপশাসন, অর্থনৈতিক নিরক্ষরতা এবং তাঁর অনুচরদের আর্থিক লুঠের উপরই তাঁকে নির্ভর করতে হবে।

এই বাজেট থেকে তৃণমূল সরকারের অর্থনৈতিক নীতির অভিমুখ স্পষ্ট। মূলধন ব্যয় করবে না, পরিকাঠামোগত উন্নয়ন বা সামাজিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করবে না। শিল্পায়ন এবং সাধারণ স্থায়ী কর্মসংস্থান কম রাখবে এবং এর বিনিময়ে বিভিন্ন নগদ হস্তান্তর প্রকল্প চালু করবে, যার ফলে নগদ হস্তান্তরের দাবি আরও বাড়বে মানুষের মধ্যে। ফলে তাঁরা শাসক দলের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবেন। এ এক প্রাতিষ্ঠানিক দাতা-গ্রহীতা রাজনীতির মডেল। যার ফলাফল দ্বিবিধ।

প্রথমত, রাজনৈতিক হিংসার তীব্রতা ও চরিত্রগত পরিবর্তন। কীভাবে? চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের রাজনৈতিক হিংসায়, রিগিংয়ের কাজে, বিরোধীদের ভয় দেখানোর কাজে ব্যবহার করা। অন্যথায় স্থানীয় নেতা তাদের চুক্তির পুনর্নবীকরণ করবে না। দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ রাজনীতিতে এক ধরনের নব্য ধনীর উদ্ভব। উদাহরণ শেখ শাহজাহান। এরাই স্থানীয় অর্থনীতি ও রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

এটা এখন একেবারে স্পষ্ট যে মমতার ক্রমবর্ধমান নগদ হস্তান্তর প্রকল্পের ক্রমবর্ধমান আর্থিক বোঝা বিপজ্জনকভাবে সরকারের টাকা দেওয়ার ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। কয়েকশো কোটি টাকার বকেয়া বিল জমে উঠছে। এমনকি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সরকারি পরিকাঠামো খাতে প্রকৃত ব্যয় থমকে যাচ্ছে, এমনকি সংকুচিতও হচ্ছে। আশ্চর্যের কথা, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজকে এই নগদ হস্তান্তর প্রকল্পের ন্যায্যতা প্রমাণে তুলে ধরা হচ্ছে, অথচ তিনি সরকারি ব্যয় বাড়ানোর সুপারিশ করেন। মমতার নগদ হস্তান্তর প্রকল্প কিন্তু স্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণ বনাম সামাজিক প্রকল্পের বাইনারি সৃষ্টি করে, একইসঙ্গে বিদ্যমান পরিকাঠামোর অবনতি এবং গুরুত্বপূর্ণ গণপরিষেবা ধ্বংস হয়।

আরো পড়ুন নারীর ক্ষমতায়নের পথে সদর্থক পদক্ষেপ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার

তাহলে কি এই নগদ হস্তান্তর প্রকল্পের কোনো গুরুত্বই নেই? আছে। বিশেষ করে লকডাউনের সময়ে যখন রাজ্যের কোটি কোটি মানুষ কাজ হারিয়েছেন, তখন সীমিত সময়ের জন্য সরাসরি নগদ হস্তান্তর স্বাগত জানানোর মত পদক্ষেপ। তা সাময়িক স্বস্তিদায়ক, কিন্তু সেটিই কোনো সরকারের স্থায়ী নীতি হয়ে গেলে তা নিছক জনমোহিনী এবং অনুৎপাদনশীল। এতে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক মূল্যবোধ তৈরি হয়, সামাজিক অবক্ষয় ঘটে। মানুষ নিজের অধিকার সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়। একজন ব্যক্তির এমন এক পরিচিতি সত্তা তৈরি হয় যা তার নিজস্ব পরিচিতি নয়, অথচ সে তাতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ঠিক এই ধরণের মানুষ তৈরিই প্রয়োজন তৃণমূলের। এই কারণেই রাজ্যে পুজো পার্বণের পরিমাণ বাড়ছে।

দুর্গাপুজো বাংলার একমাত্র শিল্পে পরিণত হয়েছে। রাজ্যে কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই, ক্ষুদ্রশিল্পের বাজারও সীমিত। পাড়ায় পাড়ায় একটু নজর রাখলেই বোঝা যাবে, প্রতিদিন ব্যাঙের ছাতার মত স্টার্ট আপের নাম করে ক্যাফে বা রেস্তোঁরা বা চপ, কাবাবের দোকান খুলছে এবং বন্ধ হচ্ছে (তোলা দিতে হয় শাসক দলকে)। এই পরিস্থিতিতে দুর্গাপুজোই একমাত্র সময়, যখন রাজ্যের অসংগঠিত ক্ষেত্রের এক বড় অংশের মানুষ অর্থোপার্জন করেন। মমতার রাজনৈতিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু এটিই। তাই তিনি দুর্গাপুজোকে মহালয়া থেকে কালীপুজো পর্যন্ত টানার চেষ্টা করেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতেই পারে এটি তাঁর অসংখ্য স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের একটি। আসলে এটিই তাঁর রাজনৈতিক অর্থনীতি। স্বল্প আয়ের অসংগঠিত ক্ষেত্র দিয়ে রাজ্য চালাচ্ছেন মমতা। এই অসংগঠিত ক্ষেত্রকে চাঙ্গা করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চলা উৎসবের আয়োজন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তাই তিনি দীর্ঘমেয়াদি পথে হাঁটবেন না। রাজ্যের অর্থনীতির অবনতি হতে থাকায় উৎসবের সংখ্যা বাড়বে। এককথায় তাঁর রাজনৈতিক অর্থনীতি একান্তই অবশিল্পায়ন ও বিলগ্নিকরণের উপর নির্ভরশীল।

নিবন্ধকার সাংবাদিক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.