সন্তোষ সেন
শিল্প বিপ্লবের পর পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। এর মূল কারণ অস্বাভাবিক হারে কয়লা, পেট্রোলিয়ামের মত জ্বালানির ব্যবহার, অযুত-নিযুত-কোটি গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়া, ‘গ্লোবাল ভ্যালু অ্যাডেড চেন’-এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের কোণে কোণে উৎপাদন এবং ভোগ্যপণ্য বিশ্বের বাজারে ছড়িয়ে দিতে পরিবহন শিল্পের গাড়ির ধোঁয়া। সঙ্গে অবশ্যই নির্বিচারে সবুজ ধ্বংস করে, জলাশয় বুজিয়ে, নদী চুরি করে গড়ে তোলা কংক্রিটের জঙ্গল। সমস্ত গবেষণালব্ধ তথ্য, সমীক্ষা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি – এই গতিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়তে থাকলে ২০২৫ সালের মধ্যেই বিশ্বে কার্বন নির্গমন নির্ধারিত মাত্রা পেরিয়ে শীর্ষে পৌঁছে যাবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রির ভয়ঙ্কর সীমারেখাও ছাড়িয়ে যাবে। ২০২৩ সালে এবং এবছরের প্রথম কয়েক মাস জুড়ে বিশ্বের এক প্রান্ত সাক্ষী থাকল অসময়ে প্রবল বৃষ্টি-বন্যা-প্লাবন-ধস, চাষের বিপর্যয়, বসতবাটী জলের তলায় চলে যাওয়ার। অন্যদিকে তীব্র তাপপ্রবাহ, দুর্বিষহ গরম, আর্দ্রতা, খরা ও দাবানলের প্রকোপে নাজেহাল হলেন পৃথিবীর এক বড় অংশের জনগণ। এসবের ফলস্বরূপ মৃত্যু এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত উদ্বাস্তুর সংখ্যাও বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। মেরুপ্রদেশ ও পাহাড়ের শিখরে জমে থাকা পুরু বরফের আস্তরণ পাতলা হচ্ছে অতি দ্রুত, সমুদ্রের জলস্তর বেড়ে চলেছে, জলতলের উষ্ণতাও বাড়ছে, জল ও স্থলভাগের সাথে তাপমাত্রার তফাত কমছে। উপকূলবর্তী অঞ্চলের মানুষ ও মৎস্যজীবীদের জীবন জীবিকা ভয়ানক ধাক্কা খাচ্ছে। চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের দৌলতে মানুষের শরীরে জীবাণু সংক্রমণ এবং রোগভোগ বেড়েছে দুর্বার গতিতে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সম্প্রতি মার্কিন গবেষণা সংস্থা নাসা, বার্কলে আর্থ, NOAA (ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) এবং ইংল্যান্ড ও জাপানের আবহাওয়া দফতরের সম্মিলিত উদ্যোগে বিজ্ঞানীরা ১৮৫০ সাল থেকে আগামী ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্ব উষ্ণায়নের ইতিহাস ও রেকর্ড খুব গভীরে বিশ্লেষণ করেছেন এবং কয়েকটি লেখচিত্রের মাধ্যমে তথ্যগুলিকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই লেখচিত্রগুলিকে সামনে রেখে আমরা আলোচনা করব, কীভাবে রাষ্ট্র ও ব্যাঙ্কের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও মদতে লগ্নিপুঁজির ফুলে ফেঁপে ওঠা কাল্পনিক অর্থকে (money) বাস্তবের জমিতে বিনিয়োগ করে বাস্তব করে তোলার প্রচেষ্টা চলছে বিশ্ব জুড়ে। ফলে পুঁজির নতুন নতুন বিনিয়োগ, উৎপাদন ব্যবস্থা, পুঁজির সঞ্চলন ও অতি মুনাফার হাত ধরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ছে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রাণিকুল এক ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে।
পরিবেশ বিপর্যয়ের ভয়াবহতা কোন পথ ধরে
আলোচনাটিকে আমরা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করব। প্রথম পর্যায়: পুঁজির অবাধ বাণিজ্যের যুগ থেকে বিশ শতক, অর্থাৎ লগ্নিপুঁজির আগমন পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্যায়: বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে আটের দশক পর্যন্ত। তৃতীয় পর্যায়: উদারনৈতিক অর্থনীতির সময়কাল থেকে আজকের দিন পর্যন্ত।

এই লেখচিত্র পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট দেখা যায়, শিল্পবিপ্লবের যুগ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ছিল খুব কম এবং কোনো এক সময়ে তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে গেলেও পরের বছর তা আবার নেমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসত এবং এই সময়কালে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল মাত্র দশ বিলিয়ন টনের মত।
এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা চিত্তাকর্ষক। উৎপাদন ব্যবস্থা তখনো তরুণ এবং পুঁজি বৃদ্ধির শৈশবকালে পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি লক্ষ করা গেলেও তা খুব সংকটজনক হয়ে ওঠেনি। কারখানা ও শিল্প সংস্থা থেকে পণ্য উৎপাদন ছিল মূলত ইউরোপকেন্দ্রিক। অন্যদিকে শীতপ্রধান ইউরোপের দেশগুলোতে তাপমাত্রা কম থাকায় চাষ-আবাদ এবং ফসলের উৎপাদন হত না ঠিকমত। শিল্পবিপ্লবের পর গ্রীনহাউস গ্যাস বেড়ে যাওয়ায় এইসব দেশে চাষের কাজে গতি আসে। পাশাপাশি কৃষিকার্য বেড়ে যাওয়ায় সবুজ গাছ বাতাসের বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নিত অনেক বেশি করে। উল্টোদিকে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে শিল্পপণ্য উৎপাদন অত্যন্ত কম থাকায় এবং মানুষের জীবন মূলত কৃষিনির্ভর ও অনেক বেশি প্রকৃতিকেন্দ্রিক হওয়ায় পরিবেশ দূষণ ছিল অনেক কম। কৃষিকার্যও হত দেশিয় পদ্ধতিতে। খাদ্যবৈচিত্র্যে ভরপুর হাজার হাজার প্রজাতির খাদ্যশস্যের বীজ ছিল এবং কৃষকের বংশানুক্রমিক অভিজ্ঞতা ও পরম্পরা ব্যবহার করে সেই বীজ সংরক্ষিতও হত। এই চাষের পদ্ধতি ছিল স্থানীয় প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফসল উৎপাদনের জন্য রাসায়নিক সার বা কীটনাশকের ব্যবহার ছিল না এবং নানা প্রজাতির খাদ্যশস্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলা করেও চলনসই ফসল উৎপাদন করতে সক্ষম ছিল। ফলত এইসব অঞ্চলের বনজঙ্গল ও গাছপালা বাতাসে কার্বনের পরিমাণ কমিয়ে রাখত।সারা বিশ্বের পরিবেশ দূষণ সহনশীল মাত্রায় ছিল।অবশ্য শিল্পপণ্য ও কৃষিপণ্য উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে পুঁজির পরিমাণ ও লোভ লালসাও বাড়তে থাকল, যার হাত ধরে আমরা প্রবেশ করব দ্বিতীয় পর্যায়ে।
দ্বিতীয় পর্যায়
দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ। এই সময়কালে বাতাসে কার্বনের পরিমাণ ও পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়েছে চড় চড় করে। কারণ পুঁজির সঞ্চয় বেড়েছে অনেক বেশি করে, এখন সে চায় অন্য দেশের বাজার ধরতে এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সস্তা শ্রম ও কাঁচামাল তথা প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে উৎপাদন ও মুনাফা আরও বাড়িয়ে নিতে। শুরু হল পুঁজির নতুন বাজার দখলের দুর্দমনীয় বাসনা। ঘটে গেল দুটো বিশ্বযুদ্ধ, পারমাণবিক বোমা আবিষ্কার এবং তার ব্যবহার। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য গড়ে উঠতে থাকল একের পর এক পারমাণবিক চুল্লি। বিশ্বকে ছেয়ে ফেলা হল তেজস্ক্রিয় বিকিরণের চাদরে। নতুন নতুন শিল্প-কারখানার দূষণ ও বর্জ্য পদার্থ বাড়তে থাকল। কৃষিতে রাসায়নিকের ব্যবহার শুরু হল, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অধিকাংশ রাসায়নিক শিল্প ও অস্ত্র কারখানাগুলোকে বদলে ফেলা হল রাসায়নিক সার ও নানারকমের কীটনাশক তৈরির কারখানায়। কৃষিতে যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে থাকল। উচ্চ ফলনশীল চাষের জন্য সংকর বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং ভূগর্ভস্থ জলের অপরিমিত ব্যবহার বয়ে নিয়ে এল খাদ্যশৃঙ্খলে দূষণ, জলের দূষণ এবং জলের সংকট। মাটির উর্বরতা কমতে থাকল। শুধুমাত্র বাজারের স্বার্থে অবৈজ্ঞানিক নগরায়নের ফলে গ্রাম থেকে শহরে খাদ্যদ্রব্য রফতানি বাড়ায় মাটির জন্য প্রয়োজনীয় অনুখাদ্য নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম কমতে থাকল।
উচ্চবিত্তের জন্য বেলাগাম অপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য উৎপাদনের কারণে শহরের প্রাকৃতিক দূষণ এবং জৈব ও অজৈব আবর্জনা ক্রমেই বাড়তে থাকল। অথচ শহরের জৈব বর্জ্য চাষের জমিতে ফিরে এল না। গ্রাম ও শহরের মধ্যে বিপাকীয় ফাটল বা মেটাবলিক রিফ্ট বাড়তে থাকল। অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছে গেল যে, মাটির উর্বরতা ফিরে পেতে ইংরেজদের আমদানি করতে হল পেরুর উপকূলের দ্বীপসমূহ থেকে গুয়ানো, অর্থাৎ পাখির মল। ব্রিটেনের মাটিতে সার দেওয়ার জন্য তারা হানা দিল নেপোলিয়নের যুদ্ধভূমিতে, ইউরোপের কবরক্ষেত্রে হাড়গোড় সংগ্রহ করতে। আমেরিকা দুনিয়ার সবকটি মহাসাগরে জাহাজ পাঠিয়ে গুয়ানোর খোঁজে নামে, একশোটি দ্বীপ তারা দখলও করে নেয়।
এর মধ্য দিয়ে কৃষি বাস্তুতন্ত্রের এক চরম সংকটের চিত্র ফুটে ওঠে। পরবর্তীকালে সার আবিষ্কারের ফলে এর আংশিক সমাধান সম্ভব হলেও তা ডেকে নিয়ে আসে কৃষি বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের স্বাস্থ্যের দীর্ঘকালীন সংকট। তথাকথিত সবুজ বিপ্লবের নামে সমস্ত দেশিয় বীজের সংরক্ষণ পদ্ধতি ও কৃষকের চিরাচরিত অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে, খাদ্য বৈচিত্র্য ধ্বংস করে উচ্চ ফলনশীল একফসলি শস্য – মূলত ধান ও গম – উৎপাদন বাড়িয়ে তোলা হল সীমাহীনভাবে। ভেবে দেখা হল না বিশ্ববাসীর এত চাল, গম আদৌ দরকার কিনা। আসলে নতুন করে কর্পোরেটের নজর পড়ল কৃষিক্ষেত্রে। উচ্চ ফলনশীল চাষে প্রচুর রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে পড়ল বিষ। নতুন নতুন রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরিমাণ বেড়েই চলল। শাকসবজি, ফলমূল সহ সব খাবারের সঙ্গে বিষপান করে মানুষ নীলকণ্ঠ হয়ে পড়ল। ভারতের সবুজ বিপ্লবের আঁতুড়ঘর পাঞ্জাব, হরিয়ানায় ক্যান্সারের প্রকোপ বেড়ে চলল দ্রুত গতিতে। চালু করতে হল ‘ক্যান্সার এক্সপ্রেস’ ট্রেন। পুঁজির নয়া বিনিয়োগের জন্য তথাকথিত সবুজ বিপ্লব চিরাচরিত কৃষিব্যবস্থা ও কৃষকদের জীবনে এক ভয়াবহ বিপর্যয় নামিয়ে এনেছে। জমির উর্বরতা শক্তি তলানিতে নামায় আমেরিকা, ইউরোপের অনেক অঞ্চলে একবছর অন্তর চাষবাস করতে হয় এবং একই পরিমাণ ফসল পেতে পরের বছর আরও বেশি সার এবং ওষুধ প্রয়োগ করতে হয়।
ভারতের মত দেশগুলোর কৃষি বাস্তুতন্ত্রও চরম সংকটের কবলে পড়ে গেল, বিপর্যয় নেমে এল সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রেও। চাষের কাজে ব্যবহৃত রাসায়নিকের খুব কম অংশই গাছ ও মাটি শুষে নিতে পারে। বাকিটা নদীনালা খালবিল বেয়ে শেষপর্যন্ত সমুদ্রগর্ভে গিয়ে পড়ে। ফলে সমুদ্রে অ্যালগাল ব্লুম বা শ্যাওলার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটছে, সূর্যের আলো ঢুকতে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় জলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমছে, বাড়ছে মৃত্যুর এলাকা (ডেড জোন)। এখন পর্যন্ত বিশাল মাপের ৪৫০টি ডেড জোন তৈরি হয়েছে। এই কারণে কার্বন ডাই অক্সাইড আর অক্সিজেনে পরিবর্তিত হতে না পারায় সমুদ্রে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে, যার হাত ধরে বাড়ছে সমুদ্রের জলের উষ্ণতা। অন্যদিকে ডেড জোনে মাছ, তিমি, সিল, ডলফিন দলে দলে মারা পড়ছে। সমুদ্র দূষণের কারণে লক্ষ লক্ষ উপকারী ও বন্ধু অনুজীবের দল চিরতরে হারিয়ে গেছে। উপকারী ব্যাকটেরিয়া মারা যাওয়ায় ক্যান্সার প্রতিরোধী পি-৫৩ নামক অভিভাবক জিন ঠিকমত কাজ করতে পারছে না, ফলে বাড়ছে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা। ক্যান্সার আজ প্রায় ঘরে ঘরে। এমন এক ভয়ংকর ভবিষ্যতের সম্মুখীন হয়ত হতে হবে আমাদের, যখন একই পরিবারের তিন প্রজন্ম একসঙ্গে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনবেন।

এই পর্যায়কালে বুর্জোয়া শ্রেণি আগের সব প্রজন্মের সম্মিলিত উৎপাদন শক্তির চেয়ে অনেক বিশাল ও বিপুল উৎপাদন শক্তির জন্ম দিয়েছে। তাই বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলেও পণ্য রফতানি আরও বাড়ানোর জন্যই বিভিন্ন দেশের সন্ত্রাসবাদীদের কাজে লাগিয়ে দেশের মধ্যে গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করল পুঁজির মালিকরা। সে যুদ্ধের দামামা এখনো বেজে চলেছে একইভাবে। যুদ্ধাস্ত্র তৈরি এবং রফতানির ব্যবসা বিলিয়ন, ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গেল। এই বিপুল যুদ্ধাস্ত্র ও ভোগ্যপণ্যের উৎপাদনের জন্য লাগবে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ। তাই হেক্টরের পর হেক্টর বনভূমি ধ্বংস করে, জনজাতিদের উচ্ছেদ করে তুলে আনা হল কয়লা, লোহা, অ্যালুমিনিয়াম, বক্সাইটের মতো আকরিক। গড়ে উঠল বিশালকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, ইস্পাত কারখানা। নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে বাড়তে থাকল অন্যান্য নির্মাণশিল্পের সংখ্যাও। এসবের হাত ধরে পরিবেশ দূষণ, বাতাসে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ এবং পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা হল ঊর্ধ্বগামী। দ্বিতীয় লেখচিত্রে দেখা যাচ্ছে এই পর্যায়ে বাতাসে কার্বনের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ২৫ বিলিয়ন টনে পৌঁছে গেল। পাঠকদের এবার নিশ্চয়ই বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে বিপর্যস্ত প্রকৃতি, পরিবেশের পিছনে প্রধান কারণগুলি কী কী। তথ্য বলছে, ৭৩% পরিবেশ দূষণের মূল খলনায়ক মাত্র ১০০ বৃহৎ বহুজাতিক কোম্পানি।
তৃতীয় পর্যায়
এই পর্যায় নয়া উদারনীতির যুগ, যার শুরুয়াত আটের দশকের শেষ নাগাদ। মাত্র ৩০ বছরে আগের সব হিসাবনিকাশ এবং আশঙ্কাকে হেলায় হারিয়ে পরিবেশ বিপর্যয় পৌঁছে গেল এক ভয়ঙ্কর পর্যায়ে, যেখান থেকে আগের অবস্থায় ফিরে আসাও বোধহয় সম্ভব নয়। এই সময় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লবের সময়কালের তুলনায় বেড়েছে ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আশঙ্কা করা হচ্ছে, বর্তমান হারে জীবাশ্ম জ্বালানির অত্যধিক ব্যবহার ও নির্বিচারে বন ধ্বংস, বনানী ধ্বংস করে এবং জলাশয় বুজিয়ে নগরায়ন ও উন্নয়নের রথের চাকা চলতে থাকলে আগামী ২০৩০-৪০ সালের মধ্যে বিশ্ব উষ্ণায়ন দুই ডিগ্রির সীমারেখাও ছাড়িয়ে যাবে (লেখচিত্র ১)। বিপন্ন হবে মানবসভ্যতা। দূষণের এই উর্ধ্বগামী হারের কারণ বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে উৎপাদন ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়ার আমূল পরিবর্তনের ইতিহাসের পর্যালোচনায়। শিল্পপুঁজির সাথে ব্যাঙ্কের গাঁটছড়া বাঁধার মধ্য দিয়ে বিংশ শতকের গোড়ার দিকে শুরু হওয়া লগ্নিপুঁজির জগতে প্রথম কাঠামোগত পরিবর্তন এল ১৯৪৪ সালে ব্রেটনউডসে পুঁজির মালিকদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে। গঠিত হল আইএমএফ, বিশ্বব্যাঙ্ক, হু, গ্যাট এবং পরবর্তীকালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। উপনিবেশবিহীন লগ্নিপুঁজির আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরি হল। অন্যদিকে ১৯৪৩ সালে তৃতীয় আন্তর্জাতিক ভেঙে দিয়ে কমিউনিস্টরা জাতীয় স্তরে নেমে গেলেন। ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস! একদিকে পুঁজি আন্তর্জাতিক হল, সারা বিশ্বের বাজার দখল করল। অন্যদিকে কমিউনিস্টরা আন্তর্জাতিকতা থেকে বেরিয়ে জাতীয় স্তরের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে ঢুকে পড়লেন। ফলে বিশ্বজুড়ে পুঁজির অবাধ গতিকে রোখার মতো কোনো আন্তর্জাতিক বাম শক্তি মাঠে থাকল না। আন্তর্জাতিক বাম আন্দোলনের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক পতন। বাম শক্তির দুর্বলতা ও নব্য উদারনীতিবাদী অর্থনীতি তথা মুক্ত বাণিজ্যের সুযোগ নিয়ে লগ্নিপুঁজির চরিত্রগত বদল ঘটে গেল প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে।
এক, সোনা থেকে ডলারকে বিচ্ছিন্ন করে যুক্ত করা হল তেল অর্থনীতির সঙ্গে, ডলার দুর্বল হলেই অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তারপর মুক্ত বাণিজ্যের সুযোগ নিয়ে ডলার বেগবান হওয়ায় তেল অর্থনীতির বিকাশ ঘটল বিশ্বজুড়ে। ডলার সাম্রাজ্যের আধিপত্য পাকা হল। অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম কেনাবেচা করতে হবে শুধুমাত্র ডলার দিয়ে। সাদ্দাম হোসেন এর বাইরে বেরোতে চাইলে মার্কিন সামরিক বাহিনী আধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ইরাকের উপর, যার মর্মান্তিক পরিণতি আমাদের সকলের জানা। পেট্রোল, ডিজেল এবং পেট্রোলিয়ামের সমস্ত উপজাত পণ্যের ব্যবসা ছড়িয়ে দেওয়া হল বিশ্বজুড়ে। প্রত্যেকটি দেশের প্রত্যেক প্রান্তে প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্যের কারখানা গড়ে উঠল অবাধ গতিতে। তেল অর্থনীতির বাড়বাড়ন্তের সঙ্গে পুরো পৃথিবী জড়িয়ে পড়ল কার্বনের জালে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ল বিশ্ব উষ্ণায়ন, বায়ুদূষণ, জলদূষণ। অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল স্থলভাগ এবং সমুদ্রের মধ্যে বায়ু চলাচলের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তাপ বিকিরণ করতে না পেরে অনেক রাত পর্যন্তও সমুদ্রের জল ঠান্ডা হতে পারল না। এর আগে আমাদের মত দেশগুলির স্থলভাগ ও সমুদ্রের জল তাপ বিকিরণ করে পৃথিবীর তাপমাত্রায় ভারসাম্য রক্ষা করত, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটল।
দুই, উদার অর্থনীতির সুযোগে লগ্নিপুঁজির বাড়বাড়ন্ত এই ধারাকে কতদূর ত্বরান্বিত করল তা দেখা যাক। বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কারখানাগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে উৎপাদন সামগ্রী ও প্রক্রিয়া ছড়িয়ে দেওয়া হল তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এর ফলে পুঁজির মূল শত্রু শ্রমিকশ্রেণির যূথবদ্ধতা ভেঙে দেওয়া গেল। পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলির শস্তা শ্রম এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে আরও নিংড়ে নিয়ে কর্পোরেটের মুনাফা বৃদ্ধির হার কয়েক গুণ বেড়ে গেল।অটোমোবাইল শিল্প ও গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা ছড়িয়ে দেওয়া হল বিশ্বের কোণে কোণে। ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন ব্যবস্থা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ায় পরিবেশ দূষণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি সূচকীয় গতিতে বাড়তে থাকল। বেড়ে গেল বাতাসে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ। ২০২০ সালে যা গিয়ে দাঁড়াল ৪০ বিলিয়ন টনে (লেখচিত্র ১ ও ২ দেখুন)। কারখানাগুলিকে টুকরো করে ‘ভার্টিকাল ডিভিশন অফ লেবার’-এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গাড়ি ও অন্যান্য পণ্যের যন্ত্রাংশ তৈরি ও অন্য কোন প্রান্তে অ্যাসেম্বল করার পদ্ধতি নিয়ে আসা হল। আগে একটি পণ্য উৎপাদন হত একই শেডের নীচে একই কারখানার বিভিন্ন বিভাগে, যাকে বলে আনুভূমিক শ্রম বিভাজন। উদার অর্থনীতির যুগে বড় কারখানা ভেঙে উৎপাদন ছড়িয়ে দেওয়া হল তৃতীয় বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক।
আরো পড়ুন যথেচ্ছ পরিবেশ ধ্বংসের ফলে আজ আগুনে নববর্ষ
ধরুন, টেসলা কোম্পানির গাড়ির টায়ার তৈরি হচ্ছে বেলঘরিয়ায়, স্ক্রু-নাট তৈরি হচ্ছে চেন্নাইয়ের কোনো কুটির শিল্পে, অন্যান্য যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে চীনের কোনো এক ছোট শহরে। এইসব যন্ত্রাংশের সম্মিলন ঘটিয়ে গাড়ি নামক পণ্যটির সম্পূর্ণ রূপ তৈরি হচ্ছে নিউইয়র্কে। এখন প্রায় প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রেই এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। সমস্ত শ্রমনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তৃতীয় বিশ্বের শস্তা শ্রম ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদনের মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের বাধ্য করা হচ্ছে বেশি শ্রম-সময় ব্যয় করতে। এইভাবে উল্লম্ব শ্রম বিভাজনের মধ্য দিয়ে গোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন করে শ্রমিকদের ব্যক্তিমানুষে পরিণত করা হল, দুর্বল হল শ্রমিকদের সংগঠিত শক্তি। বড় বড় কলকারখানায় বিদ্যুৎ, জল, আবাসন, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য স্কুল থেকে শ্রমিকরা যেসব সুযোগ পেতেন তা থেকেও বঞ্চিত হলেন, কিন্তু পুঁজির ‘ভেলোসিটি অফ টার্নওভার’ বেড়ে গেল কয়েক গুণ। অন্যদিকে শ্রমিকরা অপর থেকে, সমাজ থেকে ও প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন অনেক বেশি করে। আলাদা আলাদা জায়গায় উৎপাদিত পণ্যকে অন্য কোনো জায়গায় অ্যাসেম্বল করার জন্য বাড়ল পরিবহনজনিত শক্তির খরচ, যার জন্য পেট্রোল ডিজেলের ব্যবহার বেড়ে গেল অনেকখানি। ফলত গ্রীনহাউস গ্যাসের উৎপাদন বেড়ে গেছে বিপুল পরিমাণে। এতে ডলার শক্তিশালী হয়েছে অনেক বেশি, কারণ পেট্রোলিয়ামের ব্যবহার বেড়ে গেছে। আগে অনেক শ্রমিক একই কারখানায় কাজ করার সুযোগ পেতেন। সেখানে বড় বড় ইউনিয়নের মাধ্যমে শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন গড়ে তুলে সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হতেন। এই ঐক্যকে ভাঙতে প্রত্যেকটি শেডের কাজকে আউটসোর্সিং করতে গিয়ে শ্রম ও শক্তির খরচ এমনভাবে বেড়েছে, যে ১৯৯০ সালের পর থেকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা অত্যন্ত দ্রুত হারে বাড়ছে।
কর্পোরেটের আরও আরও মুনাফার স্বার্থেই বড় কারখানা ভেঙে আউটসোর্সিংয়ের বন্দোবস্ত। তা ঠিকঠাক সম্পন্ন করার প্রয়োজনে নিয়ে আসা হল নানারকম প্রযুক্তি এবং জ্ঞান-অর্থনীতির ব্যবহার। পুঁজির আউটসোর্সিংয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী ফুলে ফেঁপে ওঠা এক পণ্যের বাজার তৈরি হল। নব্য মধ্যবিত্তকে টেনে আনা হল কর্পোরেটের স্বার্থে ওদেরই তৈরি করা অপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের বাজারে। ভোগবাদী জীবনধারায় অভ্যস্ত মানুষ প্রকৃতি থেকে, এমনকি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পণ্যসর্বস্ব এক ব্যক্তিমানুষে রূপান্তরিত হলে। ভোগ্যপণ্যের বাজার ফুলে ফেঁপে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের জলস্তরও ফুলে ফেঁপে উঠল।
বর্তমানে আমাদের দেশের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলি দেশের শস্তা শ্রম ও অঢেল প্রাকৃতিক সম্পদ দেশি, বিদেশি বহুজাতিক কর্পোরেটদের হাতে তুলে দিতে দরাজ। ‘এসো, বিনিয়োগ করো। দেশের জল, জঙ্গল, জমি, পাহাড়, পর্বত, নদী, নালা, জলাশয় – সব লুটেপুটে তোমাদের মুনাফার পাহাড়কে আরও সুউচ্চ করো’। বলো কর্পোরেট, ভজ কর্পোরেট। প্রয়োজনে পালটে দাও চালু পরিবেশ আইন, নিয়মকানুন আরও সহজ করে দাও অবাধে প্রকৃতি ধ্বংসের ছাড়পত্র দিতে, পার করো ভোট বৈতরণী – এই সুমহান রাজনীতির কারবার চলছে আমাদের দেশ সহ বিশ্বজুড়েই।
তিন, বিশ্ব বাজারের পণ্যসামগ্রী ক্রেতাদের কাছে মোহময়ী করে হাজির করার জন্য বিজ্ঞাপনে নারীদের পণ্য করা হল, নারীর মনন থেকে শরীর বিচ্ছিন্ন হল। ইকো-ট্যুরিজমের সাথে সাথে সেক্স ট্যুরিজম, ম্যাসাজ পার্লার, স্পা ইত্যাদি গড়ে উঠল পৃথিবীজুড়ে। সাংসারিক জীবনেও নারীকে ক্রীতদাসে পরিণত করা হল। যৌথ পরিবারগুলি ভেঙে ছোট পরিবার গড়ে উঠল। পুঁজিবাদী সংস্কৃতি এখন আবার ছোট পরিবারকেও ভেঙে স্বামী-স্ত্রীকে আলাদা করে একটির পরিবর্তে দুটি ফ্ল্যাট, দুটি টিভি, দুটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র সমেত দুই সেট সাংসারিক দ্রব্য বিক্রির দারুণ ব্যবস্থা করে ফেলেছে। ফলে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা ও ব্যবহার অনেক গুণ বেড়ে গেছে। নারী-পুরুষের মধ্যে সহযোগিতা, সহমর্মিতা, প্রেম-প্রীতি, ভালবাসার মত স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক সম্পর্ক হয়ে পড়েছে অস্বাভাবিক। এই উর্বর জমিতে ফসল ফলাতে সব ধরনের মৌলবাদী দল মাঠে নেমে পড়েছে। অনেক বেড়ে গেছে নারীবিদ্বেষ, নারী নির্যাতন, হিংসা, এমনকি খুনোখুনি। বেড়েছে অবিজ্ঞান, অপবিজ্ঞান ও কুসংস্কারের চাষ। এককথায় পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশকে তছনছ করে দেওয়া হয়েছে কতিপয় দেশি-বিদেশি কর্পোরেটের পাহাড়প্রমাণ মুনাফা বাড়ানোর স্বার্থে। তার হাতে গরম প্রমাণ আমরা বর্তমানে পেয়ে চলেছি। পরিবেশ বিপর্যয়, জলবায়ুর পরিবর্তন, সারা বিশ্বে উষ্ণতা বৃদ্ধি, মেরুর বরফ গলে যাওয়া, সমুদ্রের জলস্তর ফুলে ফেঁপে ওঠা, তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরা, সামুদ্রিক ঝড়ঝঞ্ঝা, বন্যা-প্লাবন-ধ্স, জঙ্গলে আগুন, বন্যপ্রাণের বিলুপ্তি, মানুষের অসুখবিসুখ বেড়ে যাওয়া – সবকিছু আজ বিশ্বজুড়ে নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে উঠেছে। এসবের পিছনে মূলত দায়ী নির্বিচারে সবুজ বনানী ও বন সংহার, জীবাশ্ম জ্বালানির অপরিমিত ব্যবহার, অপরিকল্পিত অবৈজ্ঞানিক উন্নয়ন এবং ভোগ্যপণ্য উৎপাদনের রমরমা।
মার্কস-এঙ্গেলসদের দেখানো পথে হেঁটে সব ধরণের শ্রম বিভাজন, এমনকি কায়িক শ্রমের সঙ্গে মানসিক শ্রমের বিভেদও ঘোচাতে হবে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণমাত্রায় বিকশিত করে সমাজের প্রগতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থে। তাতে করে বাঁচবে প্রকৃতি, টিকে যাবে মানবসভ্যতা। শ্রমিক আন্দোলনের আত্মা হল আন্তর্জাতিকতা। এর মধ্যে দিয়েই সমস্ত মানুষ শুধু সমন্বিত হবে তাই নয়, সাংস্কৃতিক জগতেও ছন্দোবদ্ধতা ফিরে আসবে। বিশ্বমানবতার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে শিল্পকলা ও বিজ্ঞানের মিলনে, যেখানে সমস্ত ধরণের শ্রম বিভাজনের পরিসমাপ্তি ঘটবে। মানুষকে তার চামড়ার মধ্যে আবদ্ধ এক ছোট জীবের বদ্ধ ভাবনা থেকে বার করে প্রাকৃতিক করবে সেই ব্যবস্থা।
নিবন্ধকার বিজ্ঞান শিক্ষক, বিজ্ঞান ও পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








