সন্তোষ সেন

দেওয়ালির পর থেকেই হচ্ছিল দেশের রাজধানী দিল্লির বুকে বায়ুদূষণ মাত্রা ছাড়াচ্ছিল। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) ৪০০ থেকে ৫০০-র দিকে পাড়ি দিয়েছিল, ৫০০ ছাড়িয়ে ৬০০-৭০০। উর্ধ্বগামী বায়ুদূষণের সূচক সমস্ত বিপদসীমা অতিক্রম করে ১৮ নভেম্বর। দিল্লির বেশকিছু এলাকায় দূষণ সূচক ছুঁয়ে ফেলে ১,৫০০-র ঘর। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভয়াবহ দূষণের অর্থ – দিল্লির বাতাস একদিন ফুসফুস প্রবেশ করা মানে দিনে ৭৫ খানা সিগারেট খাওয়ার সমতুল্য ক্ষতি। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো আগেই বন্ধ করা হয়েছিল। ধাপে ধাপে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত সমস্ত ক্লাসের পঠনপাঠন অনলাইনে করার ব্যবস্থা হল। অফিসের কাজের সময়ও বদল করেছে দিল্লি সরকার, যাতে ওই সময়ে একইসঙ্গে প্রচুর গাড়ি রাস্তায় না বেরোয়। অনেক অফিসেই ৫০% কর্মচারী নিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। এমনকি ভাল করে কিছু দেখা যাচ্ছে না বলে বিমান ওঠানামায় অস্বাভাবিক দেরি হচ্ছে।

এর কোনোটাই অপ্রত্যাশিত নয়, এমনটাই হওয়ার ছিল। প্রকৃতির উপর অত্যাচার ক্রমশ বাড়িয়ে চললে তার কুফল মানুষকেই ভোগ করতে হয়। এই চরম সত্য আর কবে বুঝবে মান, হুঁশ থাকা মানুষ? নাকি অর্থের বলে বলীয়ান মানুষ প্রকৃতির নিষ্পেষণ বাড়িয়েই চলবে? অত্যন্ত সঙ্গতভাবেই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা মন্তব্য করেছেন ‘নাগরিকের দূষণমুক্ত পরিবেশে বাস করার অধিকার নিশ্চিত করা রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সাংবিধানিক দায়িত্ব।’

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অন্যদিকে ১৫ নভেম্বর পাকিস্তানের লাহোরে বাতাসের গুণমান ছিল প্রায় ১,৬০০। মুলতান সহ অধিকাংশ শহরের সূচক ছিল হাজারের উপর। ফলে মাত্র একদিনে লাহোরে শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বা ক্লিনিকে গেছেন কম করে ১৫,০০০ মানুষ। ঘরে ঘরে শুকনো কাশি, নিউমোনিয়া, ফুসফুসে সংক্রমণে মানুষের নাজেহাল অবস্থা। দিল্লির অবস্থাও তথৈবচ। ধোঁয়াশার ঘন চাদরে ঢাকা পড়েছে পুরো শহর। সর্দিকাশি, নাক দিয়ে জল পড়া, চোখ জ্বালা করা, ফুসফুসের অসুখ বাড়ছে। মানুষ দৌড়চ্ছেন ডাক্তারের কাছে। কার্যত গ্যাস চেম্বারে পরিণত পুরো দিল্লি শহর।

দিল্লির সীমান্তবর্তী রাজ্য পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশে ফসলের গোড়া পোড়ানো বা ‘স্টাবল বার্নিং’-কে দিল্লির বায়ুদূষণের অন্যতম খলনায়ক হিসাবে হাজির করা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে। ফসলের গোড়া জ্বালিয়ে দেওয়ার ফলে বাতাসে দূষণের মাত্রা বাড়ে ঠিকই। কিন্তু এ জিনিস তো বছরে একবারই হয়, নভেম্বরের মাঝামাঝি। তাহলে প্রতিবছর একটা বড় সময় জুড়ে বায়ুদূষণের জ্বালায় কেন নাজেহাল হন দিল্লিবাসী? কারণ অনেক।

দিল্লি, গুরগাঁও, কলকাতা, হাওড়ার মত শহরগুলোতে চলাচল করে অসংখ্য ব্যক্তিগত গাড়ি। সেইসব গাড়ি থেকে নির্গত হয় কালো ধোঁয়া। নির্মাণকাজের ধূলো এবং দূষিত কণা হল পিএম ২.৫। শিল্প কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়াও পরিশোধন না করেই নির্বিবাদে বাতাসে মিশিয়ে দেওয়া হয়। মুনাফা বাড়ানোর তাগিদে অধিকাংশ কারখানার মালিক বিষ ধোঁয়া শোধন করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র বসানো থেকে বিরত থাকেন। সরকার, পুলিস প্রশাসন সব দেখেশুনেও নির্বিকার। শহরের জঞ্জালের পাহাড়, এমনকি প্লাস্টিক পোড়ানোও চলে নির্বিচারে। সব মিলিয়ে বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় আকাশ বাতাস। ‘উন্নত’ শহরগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ হল না একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছেও। শহরতলির অসংখ্য জায়গায় শীতের সময়ে চালু হয় ইটভাটার কাজ। অসংখ্য ট্রাকের আনাগোনা বাড়ে, বাতাসে মেশে ধুলো, ধোঁয়া আর দূষিত কণা। তার উপর এ পুজো সে পুজো, বিয়েবাড়ি, ক্রিকেট ম্যাচ জেতার আনন্দ ইত্যাদিতে বাজির ভোজবাজি তো আছেই। এতসব মিলেই দিল্লিকে কার্যত গ্যাস চেম্বারে পরিণত করেছে। দিল্লি সহ উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে ধোঁয়াশায় ঢেকে গেছে আকাশ। দূষণ নিয়ন্ত্রণে দিল্লি সরকার কৃত্রিম বৃষ্টি নামানোর আবেদন জানিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে।

আরো পড়ুন সবুজ বাজির ভাঁওতা বাড়িয়ে তুলেছে বাজির বিপদ

বায়ুমণ্ডলে সিলভার আয়োডাইড, পটাশিয়াম অক্সাইড এবং ড্রাই আইসের মতো পদার্থ ছড়িয়ে নকল বৃষ্টি তৈরি করা হয়। তাতে দূষণের মাত্রা কিছুটা কমে ঠিকই। হায় রে অবুঝ মানুষ-সরকার-প্রশাসন! দূষণের উৎসগুলোকে বন্ধ করতে পারলেই তো এত কাণ্ড করতে হয় না। দিল্লির পরিবেশ মন্ত্রী গোপাল রাই এই পরিস্থিতিকে মেডিকাল এমার্জেন্সি আখ্যা দিয়েছেন

শুধু দিল্লি নয়। কলকাতা, হাওড়া, ব্যারাকপুরের মত শিল্পাঞ্চলগুলোতে দূষণের মাত্রা, দূষণ কণা পিএম ২.৫ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। কারণ সর্বত্র একই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শহরতলির যেখানে সেখানে অপরিকল্পিতভাবে গজিয়ে ওঠা ইটভাটা। বেআইনি এইসব কর্মকাণ্ডের কারণে বাতাস ভারি হয় বিষাক্ত ধূলো, ধোঁয়ায়। তবুও দূষণ নিয়ন্ত্রণে সারা বছর ধরে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় না সরকার পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে। জনগণও সব দেখেশুনে নিশ্চুপ নির্বিকার। কারোর কোনো হেলদোল নেই। ধরা রসাতলে যাক, আমি আমার টাকার থলি নিয়ে সুখে আছি। নাগরিকদের এই মনস্তত্ত্বের বদল না ঘটলে দূষণ এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় বাড়বে বই কমবে না।

দূষণের সবচেয়ে বড় বলি হচ্ছেন শহরগুলোর একেবারে নিচুতলার মানুষ। তাঁরা বাইরে বেরোতে বাধ্য হন পেটের জ্বালায়, কাজের তাগিদে। কেউ নির্মাণশিল্পে কাজ করেন, কেউ ইটভাটার শস্তা মজুর। কেউ বাইক নিয়ে রাতদিন দৌড়ন। বাইকে আরোহী তুলে বা আমাদের অর্ডার করা গরমাগরম খাবার পিঠে নিয়ে দিনরাত ছুটে বেড়ান। দূষণের হাত থেকে এঁদের নিস্তার নেই।

শহরের বাবু বিবি তো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়ি চেপে যান শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অফিসে বা শপিং মলে বা রেস্তোঁরায় যান। ছেলেমেয়েদের পৌঁছে দেন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্কুলে। তাঁদের আর ভাবনা কী? তাঁরাই আবার মহা সমারোহে তুমুল বাজি ফাটান। কালো বিষাক্ত ধোঁয়ায়, ধূলিকণায় অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষকে ছুটতে হয় হাসপাতালে।

মানুষের অন্তরাত্মা তবুও কেঁপে ওঠে না। বাজার সভ্যতার অন্ধগলিতে ছুটে চলা ব্যক্তিমানুষ সমাজবিচ্ছিন্ন। প্রকৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আটকে গেছে তাদের মানবিকতা। নিজেদের স্বার্থেই প্রকৃতিকে সুস্থ রাখার, বিপর্যস্ত প্রকৃতিকে আরও বিপন্ন না করে তার মেরামতির কথা আত্মস্থ করতে না পারলে এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসনকে বাধ্য করতে হবে প্রকৃতি রক্ষার কাজে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে। আপৎকালীন ব্যবস্থায় আর কিছু হওয়ার নয়, চাই দীর্ঘমেয়াদি বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা। এই ভাবনায় জারিত হওয়া, দাবিগুলো তোলার কি সময় আসেনি এখনো? আর কবে সে সময় আসবে?

নিবন্ধকার বিজ্ঞান শিক্ষক, বিজ্ঞান ও পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.