সন্তোষ সেন
বাজিকে আমরা চিনি পরিবেশ দূষণকারী ও স্বাস্থ্যহানিকর জিনিস হিসাবেই। এই নিয়ে কারোর কোন দ্বিমত আছে বলে মনে হয় না, এমনকি যারা বাজি ফাটায়, বোধহয় তাদেরও নেই। এই বাজির বিরুদ্ধে বিজ্ঞান ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীদের প্রচার, প্রতিবাদ জারি আছে দীর্ঘদিন ধরেই। বাজি নিষিদ্ধ করার দাবিতে মামলা মোকদ্দমাও কম হয়নি। এই প্রেক্ষিতকে সামনে রেখেই সবুজ বাজি কী, কেন ও তা আসলে কতটা পরিবেশবান্ধব, তা বিচার করা দরকার। দেখা দরকার – সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং কাউন্সিল অফ সাইন্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের (সিএসআইআর) নজরদারি সত্ত্বেও বাস্তবে ঠিক কী ঘটছে। আলোচনায় উঠে আসবে আজ প্রকৃতি ও পরিবেশ বাঁচাতে, মানবজাতিকে এই নীল গ্রহে টিকিয়ে রাখতে আমাদের ভাবনাচিন্তার জগতে কোন পরিবর্তন সাধন অত্যন্ত জরুরি – সেকথাও।
সবুজ বাজির ইতিহাস
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বাজির দূষণ এবং স্বাস্থ্যের উপর তার ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টে একটি পিটিশন জমা পড়ে। সেই মামলায় মহামান্য আদালত শব্দদানব ও বিষাক্ত বাজি তৈরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং কম দূষণ সৃষ্টিকারী ও কম ক্ষতিকারক বাজি, তথা গ্রীন ক্র্যাকার্স তৈরি ও বিপণনের পক্ষে রায় দেন। বিচারপতি এম আর শা মন্তব্য করেন ‘প্রতিদিন এই সমাজে কোনো না কোনো অনুষ্ঠান/দিবস উদযাপিত হয়। কিন্তু বাজি পোড়ানোর আগে চারপাশের পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্য সম্পর্কে মনোযোগী হওয়া দরকার।’ এই রায়কে কেন্দ্র করে গঙ্গা, যমুনা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে যাওয়ার পর ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ আদালত শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে আসেন। প্রয়োজনমাফিক যথেষ্ট পরিমাণে সবুজ বাজি উৎপাদনে সম্মতি দেন মহামান্য আদালত। এই সবুজ বাজি যাতে বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পাওয়া যায় তা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেন সিএসআইআর নামক সংস্থাকে। এরপরই সিএসআইআর সবুজ বাজির উৎপাদন, মজুত ও বিক্রির জন্য ২৩০টি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিপত্রে সই করে। এই ইতিহাসকে সাক্ষী রেখে এবার দেখা যাক এই নতুন ধরনের বাজিকে কেন ‘গ্রীন’ বলা হয়, এই বাজি উৎপাদনে মালমশলার কী কী পরিবর্তন করা হল এবং সর্বোপরি সবুজ বাজি বাস্তবে কতটা পরিবেশবান্ধব।
‘সবুজ’ কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে বাজির রাসায়নিক গঠনের দিকে নজর দিতে হবে। সাধারণ বাজির রাসায়নিক চরিত্রে কিছুটা পরিবর্তন ঘটানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের রায়ে। বলা হয়েছিল, দূষণ এবং শব্দের তীব্রতা কমানোর লক্ষ্যে এই নতুন ধরনের বাজিতে বেরিয়াম, আর্সেনিক, সালফার ইত্যাদি ক্ষতিকর ও বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা যাবে না। তাতে লাভ কী? সিএসআইআরের দাবি – এর ফলে বাজি পোড়ালে বায়ুদূষণ ৩০%-৩৫% কম হবে। তাদের আরও দাবি, প্রচলিত বাজির শব্দের প্রাবল্য থাকে ১৬০ ডেসিবেলের মত। কিন্তু সবুজ বাজির ক্ষেত্রে তা কমে ১১০-১২৫ ডেসিবেল হয়ে যায়। তাহলে বুঝে নিতে অসুবিধা নেই যে, সিএসআইআরের দাবি যথার্থ বলে ধরে নিলেও আলোচিত সবুজ বাজি কিন্তু কোনোভাবেই দূষণহীন নয়। দূষণ ঘটবেই, বড়জোর তা ৩০ শতাংশের মত কম হবে, এই যা। বাজি পোড়ানোর পর দূষিত বায়ু মানুষের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলবে ঠিক আগের মতই, অর্থাৎ গুণগত কোনো পরিবর্তন সাধিত হল না। যা হল তা কেবল মাত্রা বা পরিমাণের কিছুটা হেরফের এবং সমাধান খোঁজার চেষ্টা হল বাজারের আধিপত্য মেনে নিয়েই।
বাস্তবে কতটুকু কী হল?
বাস্তব বড় নির্মম। চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী – এই আপ্তবাক্যকে সঠিক প্রমাণ করে সবুজ বাজিতেও বেরিয়াম পাওয়া গেছে। ২০২২ সালের ২৩ অক্টোবর হিন্দুস্তান টাইমস এক প্রতিবেদনে জানায়, বাজি বাজার থেকে ১৭ রকমের জনপ্রিয় বাজির নমুনা সংগ্রহ করে আওয়াজ ফাউন্ডেশন নামে একটি বেসরকারি সংগঠন। এই বাজিগুলোর রাসায়নিক বিশ্লেষণের জন্য তারা এক স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থার গবেষণাগারে পাঠায়। বিশ্লেষণের পর যা জানা গেল তা পিলে চমকে দেওয়ার মত। সতেরোটির মধ্যে ১২টি নমুনাতেই বিষাক্ত ধাতু বেরিয়ামের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। আসলে বেরিয়াম দহনের পর সবুজ রং তৈরি করে এবং বাজির স্থায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। কী মজা! সবুজ রং দেখলেই আপনি সবুজ বাজি বলে আনন্দে মেতে উঠবেন। এদিকে আপনার চারপাশের শিশু ও বয়স্কদের শরীর বিষাক্ত ধোঁয়ায় আক্রান্ত হবে। আরও উদ্বেগের বিষয় – রাসায়নিক বিশ্লেষণ থেকে জানা গেছে, বাজির বেশ কয়েকটি নমুনাতেই আর্সেনিক, সালফার এবং ক্লোরিন পাওয়া গেছে। যদিও সবুজ বাজিতে এইসব বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার না করারই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের রায়ে। কা কস্য পরিবেদনা! একেই বলে ‘গ্রীন ওয়াশিং’। বাজারের স্বার্থে মানুষকে বোকা বানানোর গল্প শুনবেন?
২০২২ সালে বাজারে প্রাপ্ত বাজির কোনো প্যাকেটেই বেরিয়ামের উপস্থিতির কোনো উল্লেখ ছিল না (২০১১ সালে কিন্তু বাজির প্যাকেটে বেরিয়ামের উল্লেখ থাকত)। সুপ্রিম কোর্ট, পরিবেশ কর্মী, বিজ্ঞানী সহ আপামর জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার কী নির্লজ্জ প্রচেষ্টা! বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বিষাক্ত বেরিয়াম খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে পেটে ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে hypokalaemia (অর্থাৎ শরীরে পটাশিয়ামের ঘাটতি) রোগের কারণ হয়ে মানুষকে ধীর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে।
২০২২ ও ২০২৩ সালে তথাকথিত সবুজ বাজির ক্ষেত্রে বায়ুদূষণের পাশাপাশি শব্দদূষণও সহ্যের সীমার চেয়ে উপরেই ছিল। বিজ্ঞানের অতি সাধারণ তত্ত্ব থেকে আমরা জানি, খুব বেশি হলে ৮০ ডেসিবেল (বাইরে থাকাকালীন) প্রাবল্যের শব্দ মানুষ সহ্য করতে পারে, তাও ৬-৮ ঘন্টা পর্যন্ত তা মোটামুটি সইতে পারে মানুষ। কিন্তু লক্ষ করুন, সবুজ বাজির শব্দের প্রাবল্য ১২৫ ডেসিবেল ধার্য করা হয়েছে অন্যান্য রাজ্য সহ আমাদের রাজ্যেও। এসব আসলে বাজি কারখানার মালিকদের চাপে সরকার বাহাদুরের কীর্তি। পালিয়ে যাবেন? কোথায় যাবেন? অবশ্য দিল্লি এবং পাটনা শহরে ২০২৪ সালেও সবুজ, লাল, নীল সব বাজির ব্যবহারই নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বাজি বাবাজির কেরামতি
বিজ্ঞানীদের দাবি – অনেকখানি সময় ধরে ওই তীব্রতার শব্দের সংস্পর্শে এলে মানুষের কান স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কে, বাড়ে উচ্চ রক্তচাপ ও হাইপারটেনশনের সমস্যা, যা শেষ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয় হৃদযন্ত্রের সমস্যা। সাম্প্রতিক গবেষণা ও সমীক্ষা থেকে জানা যাচ্ছে – দীর্ঘক্ষণ উচ্চ তীব্রতার শব্দ আমাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করলে তা মস্তিষ্কের ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক অবসাদ ও হতাশার জন্ম দেয়।
এক্ষেত্রে দুটো জলজ্যান্ত উদাহরণ সামনে আনা যাক। ২০২৩ সালের নভেম্বরে কলকাতায় পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তির রক্তচাপ আচমকা প্রচণ্ড বেড়ে গিয়ে ব্রেন স্টোকের উপক্রম হয়। একই সময়ে মাঝবয়সী এক ভদ্রমহিলার বুক ধড়ফড়ানি, সঙ্গে অসম্ভব মানসিক অস্বস্তি শুরু হয়। উল্লেখ্য, অনেক ঘটনার মধ্যে এই দুটি ঘটনাও ঘটেছিল দীপাবলির ঠিক দু-তিন দিন পরেই। বাজি বাবাজিকে খলনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করে দুজন চিকিৎসকই রক্তচাপ কমানোর ওষুধের পাশাপাশি প্যানিক ডিসঅর্ডার এবং প্যালপিটেশনের চিকিৎসা শুরু করে দেন। ফল হয় হাতেনাতে। আসলে বাজির বিকট আওয়াজে বারবার পিলে চমকে ওঠা বা চোখ ঝলসানো আলোর রোশনাই কিম্বা বারবার শব্দের দাপটে ঘুম ভেঙে যাওয়ার জেরেই মানসিক স্বাস্থ্য ও হৃদযন্ত্রের কার্যকলাপে প্রবল ব্যাঘাত ঘটতে পারে। তাই এবারের কালীপুজোয় শুক্রবার থেকে সোমবার বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের জন্য চিকিৎসকদের বার্তা – নিজের কানকে শব্দদানবের হাত থেকে যথাসম্ভব বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করুন এবং পুজোর পর কোনোরকম শারীরিক বা মানসিক অস্থিরতা তৈরি হলে যত শীঘ্র সম্ভব চিকিৎসকদের পরামর্শ নিন। দীর্ঘ সময় ধরে প্রবল বাজির তাণ্ডবে কানের ক্ষতি তো হয় বটেই, অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক সমস্যাও অবধারিত। অনিদ্রা থেকে স্মৃতিভ্রংশ, এমনকি মনঃসংযোগ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ষোল আনা বলেই চিকিৎসক মহলের অভিমত। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে ৩০ অক্টোবর (বুধবার) থেকেই একদল অসচেতন, নিজের আনন্দে মশগুল, অপরের কথা ভাবতে না পারা মানুষ বাজি ফাটানোর প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। শব্দের মাত্রা ১২৫ ডেসিবেল ধার্য হয়েছে সারা দেশের সঙ্গে এই রাজ্যেও। এই তীব্রতার শব্দ সহ্য করা বেশ শক্ত। এমনকি এই তীব্রতার মাইকের আওয়াজের চেয়ে শব্দবাজির কুপ্রভাব মনের উপর ঢের বেশি পড়ে। এবার একটু বাজির বাজার নিয়ে আলোচনা করা যাক।
সবুজ বাজির বাজার
বর্তমানে সিএসআইআরের অনুমতি সাপেক্ষে নির্দিষ্ট ২৩০টি কোম্পানি সবুজ বাজি তৈরি করতে পারে। আমাদের রাজ্যে এইরকম সংস্থার সংখ্যা সবেধন নীলমণি একটি। পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভস সেফটি অর্গানাইজেশনকে (পিইএসও) বাজির গুণমান যাচাই করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আর্সেনিক, পারদ, বেরিয়াম ইত্যাদি বাদ দিয়ে বাজি তৈরি হয়েছে কিনা এবং উৎপাদিত বাজি নির্ধারিত শব্দসীমার (১১০-১২৫ ডেসিবেল) মধ্যে থাকছে কিনা তা যাচাই করে সার্টিফিকেট দেওয়া। নতুন কিসিমের এই সবুজ বাজির প্যাকেটে একটি ‘গ্রীন লোগো’ ও কুইক রেসপন্স কোডিং সিস্টেম (QR কোড) দাগিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ক্রেতা চাইলে এই কোড স্ক্যান করে বাজিটি সত্যি সবুজ কিনা তা যাচাই করে নিতে পারেন। যদিও বাস্তবে এই কোড স্ক্যান করে বাজির গুণমান নির্ণয় করা যায় না বললেই চলে। বাজারের চাপে এবছর সবুজ বাজিতে QR কোড তুলেই দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ যাচাই করার যেটুকু পথ ছিল তাও বন্ধ করা হল।
সিএসআইআর কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে যেহেতু হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানিই সবুজ বাজি তৈরি করতে পারে, সেহেতু স্বভাবতই শহরের অলিতে গলিতে, এমনকি মফস্বলের আনাচে কানাচে এতদিন ধরে চালু থাকা বাজি কারখানাগুলোর নাভিশ্বাস উঠে গেছে। কিন্তু দেশে বিপুল বেকার সমস্যা রয়েছে। তার উপর এই মাগ্যিগণ্ডার বাজারে স্বল্প আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া মানুষজন তো চাইবেনই এতদিনের রোজগারের উৎস সচল রাখতে। তাই আইনের কড়াকড়ি (?) থাকলেও লুকিয়ে চুরিয়ে পুরনো ধরনের বাজি তৈরি এবং তার ব্যবসা চলছে রমরমিয়েই। সেই নিষিদ্ধ বাজির দাম সবুজ বাজির তুলনায় কিছুটা কম হওয়ার কারণে তার বিক্রিবাটা চলছে সমস্ত নজরদারি বা প্রশাসনিক তৎপরতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। পুলিস নিয়মমাফিক টহলদারি ও ধরপাকড় চালায় ঠিকই। কিন্তু গতবছর থেকে শব্দসীমা বাড়িয়ে ১২৫ ডেসিবেল করা হয়েছে। সবরকম বাজিই তাতে পাস হয়ে যাবে – এমনটাই দাবি বিশেষজ্ঞদের। এই পরিস্থিতিতে এবারের কালীপুজোর এক সপ্তাহ আগে বাজেয়াপ্ত হয়েছে প্রায় ২,০০০ কেজি নিষিদ্ধ বাজি এবং গ্রেফতারও করা হয়েছে বেশ কিছু মানুষকে। এটি হিমশৈলের চূড়ামাত্র। বাস্তবে অগাস্টের শেষ থেকেই কলকাতায় নিষিদ্ধ শব্দবাজি ঢুকতে শুরু করে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, তামিলনাড়ুর শিবকাশী সহ বেশকিছু অঞ্চল থেকে। আসলে গলদ থেকে গেছে বিসমিল্লায়। বাজির মালিক এবং বাজারের স্বার্থে নিয়মকানুনই বদলে ফেলা হয়েছে। সত্য সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ! একদিকে চলে আইন ভাঙার খেলা, অন্যদিকে দারিদ্র্যে ডুবে থাকে দেশের অধিকাংশ মানুষ।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ – কালীপুজো তথা দিওয়ালিতে সন্ধে আটটা-রাত দশটা, ছটপুজোয় সকাল ছটা-আটটা এবং ইংরিজি বর্ষবরণের রাতে ১১:৫৫-১২.৩০ কেবলমাত্র সবুজ বাজি ব্যবহার করা যাবে। কোনোরকম বেশি আওয়াজের বাজি ব্যবহার নিষিদ্ধ। আইনি রক্ষাকবচ যা-ই থাক, ব্যবহার বন্ধ না হলে আইনি, বেআইনি সবরকম বাজি তৈরি ও বাজির দৌরাত্ম্য চলতেই থাকবে। চালু থাকবে এই প্রাণঘাতী ‘শিল্প’। বাজি কারখানায় বিস্ফোরণও রাজ্যে নতুন নয়, গত দশবছরে প্রায় ১০০ জন মানুষ এইসব বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের দাবি, দিল্লির মত এই রাজ্যেও বাজি পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ না করলে অচিরেই আমরা ভয়ানক বায়ুদূষণজনিত অসুস্থতার কবলে পড়ব।
দূষণের জট কতটা কাটল?
কালীপুজো, দীপাবলি এবং তার আগের দুই রাত থেকেই দরজা, জানলায় খিল এঁটেও প্রতিবছরই অসংখ্য বয়স্ক মানুষের হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় চারপাশে শব্দদানবের তাণ্ডবে। শুধু দীপাবলি নয়, দেশে অকাল দিওয়ালি ঘটে যায় ক্রিকেটে পাকিস্তানকে হারিয়ে অপার স্বর্গীয় আনন্দ উদযাপনের ঠেলায়। এর সঙ্গে ইংরিজি বর্ষবরণে সারারাত ধরে চলে গাঁটের কড়ি খসিয়ে এবং পরিবেশের সাড়ে বারোটা বাজিয়ে বাজি ফাটানোর ধুন্ধুমার প্রতিযোগিতা। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের দাবি – প্রতিবছরের মত এবারও ‘দিওয়ালি ধামাকা’ শেষে বাতাসে ভাসমান ধূলিকণার পরিমাণ বেড়ে যাবে কয়েক গুণ, যা বায়ুদূষণ ও মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যাকে ত্বরান্বিত করবে। আনন্দে গা ভাসাতে বাজির বাজারে প্রচুর মানুষ ভিড় করছেন, বিক্রিবাটার পরিমাণও ঊর্ধ্বগামী। আকাশ বাতাস ফাটিয়ে পিলে চমকানো দুড়ুম দাড়ুম চলছে, চলবে বছরের বেশ কয়েকটা রাত ধরে। মন্ত্রী, সান্ত্রী, বিধায়ক, নেতা, নেত্রী সবাই বোধহয় মায়ের আরাধনায় ব্যস্ত থাকেন। ওঁদের তো আবার ভোট বৈতরণী পার হতে হয়। তাই দিল্লিতে সব ধরনের বাজি বিক্রি নিষিদ্ধ হলে মড়াকান্না জুড়ে দেন বিজেপির নেতা, নেত্রীরা। যদিও গতবছরও দিল্লিতে বাজি ফেটেছে দেদার, আগের বছরগুলোর তুলনায় কোনো অংশেই তা কম ছিল না।
আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও অত্যুৎসাহী বাজিপ্রেমীরা না মানেন শব্দমাত্রা, না মানেন সময়সীমা। বাস্তবে রাত দশটার পরই তাণ্ডব বাড়ে। এই তাণ্ডব কলকাতা, হাওড়া ছাড়িয়ে শহরতলি এবং মফস্বলেও সমান তালে চলে। এবারেও যে চলবে তা হলফ করেই বলা যায়। বাজিপ্রেমীদের নিশানা থেকে বাদ যায় না খাতায় কলমে হাসপাতাল, শিক্ষাঙ্গনের মত নিঃশব্দ এলাকাও। কয়েকটা দিন সন্ধে থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সশব্দ আইন ভাঙা চলে শহর, শহরতলি থেকে মফস্বলে। প্রশ্ন উঠছে – সবুজ বাজি, QR কোড, সচেনতামূলক প্রচার, পুলিসের নজরদারি – এতকিছুর পরেও শব্দ জব্দ হচ্ছে না কেন? আসলে সরষের মধ্যে ভূত থাকলে, এমনই ঘটবে বারবার। বাজির দোসর হয়ে ওঠে উচ্চস্বরে মাইক ও ডিজে বক্সের তাণ্ডব। এসবের ফলে বাতাসের দূষণ সূচক কোথাও ২০০, কোথাও বা ৩০০ পেরিয়ে যায় প্রতিবছর। রাজধানী দিল্লিতেও সমস্ত বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য করে বাজিপাগলদের তাণ্ডবে গত বছর দূষণ সূচক ছিল ৩০০-র বেশি। কয়েক বছর ধরেই বায়ুদূষণের নিরিখে দিল্লির সাথে সমানে টক্কর দিচ্ছে কলকাতা।
মানুষ ও প্রকৃতির ভালর স্বার্থে বাজি কারখানাগুলো চিরতরে বন্ধ করে দিলে প্রচুর মানুষের পেটে টান পড়বে – এই যুক্তিও কিন্তু ধোপে টেকে না। সরকার ও নীতি নির্ধারকরা সত্যিই যদি পরিবেশ বাঁচাতে চান, মানুষের হাতে কাজ ও পেটে ভাতের বন্দোবস্ত করতে চান, তাহলে এই সব ঠুনকো সমস্যার সমাধান করা সহজেই সম্ভব। কর্মসংস্থান ও জীবিকা নির্বাহের অনেক ক্ষেত্র আছে। তার জন্য মানুষ ও প্রকৃতিধ্বংসী বাজি কারখানা চালু রাখার প্রয়োজন হয় না। বিনষ্ট করে দেওয়া প্রকৃতি, পরিবেশকে মেরামত করার লক্ষ্যে সঠিক, যুক্তিযুক্ত ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপের সার্বিক কর্মসূচি গ্রহণ করলে বাস্তবে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হওয়া সম্ভব। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশকেও কাজে লাগাতে হবে এক্ষেত্রে।
আরো পড়ুন কর্পোরেট লুণ্ঠনে আজ বিপন্ন প্রকৃতি ও মানুষ
তাই নিজের, প্রিয়জনের, প্রতিবেশীর ও না-মানুষদের কথা ভেবে সবরকম বাজি পোড়ানো থেকে দূরে থাকা এবং অন্যদের এ কাজে বিরত করা দরকার সবচেয়ে আগে।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার ব্যাপারে নাগরিকদের সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকাই বাজির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, ডিজে নামক শব্দদানবের নাশ, মাইক্রোফোনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধ, খাবারে ভেজাল ও অবৈধ রংয়ের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা ইত্যাদি ব্যাপারে ন্যায়বিচার করতে প্রশাসনকে বাধ্য করতে পারে। তাই শব্দবাজি ও ডিজে বক্সের দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে চলেন বিজ্ঞান ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী সহ সমাজের নানা অংশের মানুষজন। উদ্বেগের কথা, প্রতিবাদ করতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গে এখন পর্যন্ত ১৪ জন মানুষ শব্দশহিদ হয়েছেন।
সবুজ বাজি বনাম প্রকৃতি ভাবনা
বাজি পোড়ানোকে কেন্দ্র করে বায়ুদূষণ, ভাসমান ধূলিকণা এবং ভারি মৌলের বাড়বাড়ন্তে মানুষের শরীর ও মনের অপরিসীম ক্ষতি নিয়ে অনেক আলোচনা বিভিন্ন পরিসরে বিভিন্ন মানুষ করে চলেছেন দীর্ঘদিন ধরেই। পুলিশ, প্রশাসন, কঠোর আইন, ধরপাকড়ের বজ্র আঁটুনি গলে নিষিদ্ধ বাজির কান ঝালাপালা করে দেওয়া আওয়াজে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয় সাধারণ মানুষের। দুর্গাপুজো, বিশেষ করে মহালয়ার ভোরে এবং ঠাকুর ভাসানের সময়ে, দীপাবলি, ছটপুজো, এমনকি বিয়েবাড়ি বা জন্মদিনের পার্টিতেও আলোর রোশনাই আর উচ্চ কম্পাঙ্ক ও তীব্র প্রাবল্যের পিলে চমকানো চকলেট বোম বা ডিজে নামক অসুরের শব্দের তাণ্ডবে মানুষ সহ প্রাণিজগৎ আজ অতিষ্ঠ। আমরা মনে রাখি না যে, বায়ুদূষণের পর দ্বিতীয় সর্বাধিক অসুস্থতা ও মৃত্যুর কারণ শব্দদূষণ।
একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে এবার তাকানো যাক। বিজ্ঞান ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী ও বিজ্ঞানীদের লাগাতার প্রচার ও হুঁশিয়ারির ফলে সমাজের একটি অংশের মানুষ অন্তত নিজেদের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে আস্তে আস্তে বাজির বিপদ সম্পর্কে সচেতন হচ্ছিলেন। সেই অংশটির মুখের সামনে সবুজ বাজির গাজর ঝুলিয়ে বিভ্রান্ত করা হল এবং হচ্ছে। বাজির উৎপাদন বা তার বাজার বন্ধ করার কোনো প্রয়াস দেখা গেল না, অথচ বলা হল সবুজ বাজি দূষণমুক্ত এবং পরিবেশবান্ধব। অতএব আর চিন্তা কী? আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই – উচ্চবিত্ত ও সম্পন্ন মধ্যবিত্তের এক বড় অংশের বাজারকে সুরক্ষিত রাখতেই তাদের ভাবনাচিন্তাকে অযৌক্তিক, অস্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে। এই বাজারমুখী সংস্কৃতি আজ শহর ছাড়িয়ে মফস্বল ও গ্রামেও হানা দিয়েছে অবাধ গতিতে। সেই ভাবনার ধারা না বদলালে এই ধরনের দূষণ ও পরিবেশ বিপর্যয় থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। রক্তমাংসের শরীরের আমোদ আহ্লাদ পূরণ করতে গিয়ে মানুষ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। প্রকৃতির রূপ রস গন্ধ, চারপাশে ছড়িয়ে থাকা পাহাড়, নদী, সমুদ্র, গাছের থেকে মানুষ আজ কয়েক আলোকবর্ষ দূরে। মগজে কারফিউ। তাই সে ভাবতে পারে না নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ এবং নিজের শরীরের কী ভয়ানক ক্ষতি সে করে চলেছে। রাতে নিশ্চিন্তে নিদ্রা যাওয়া পাখির দল বা কুকুর, বেড়াল সহ অন্য প্রাণির কী ভয়ানক অবস্থা হয় কৃত্রিম আলো ও বাজির তাণ্ডবে – সে তো অনেক দূরের ভাবনা। ভোগবাদী মানুষ এমনকি তার প্রিয় সন্তানসন্ততি আর নাতিপুতিদের জন্য কী ভয়ানক পরিবেশ রেখে যাচ্ছে সেদিকেও ভ্রূক্ষেপ নেই। এখন বাঁচতে হলে প্রচলিত বাজি তো নয়ই, এমনকি বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণের নিরিখে খুব একটা পিছিয়ে না থাকা তথাকথিত সবুজ বাজির উৎপাদন আর ব্যবহারও বন্ধ করা দরকার।
নিবন্ধকার বিজ্ঞান শিক্ষক, বিজ্ঞান ও পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







