এইবার একটু নজর দেওয়া যাক পশ্চিমবঙ্গের জনস্বাস্থ্যের পরিকাঠামো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার পরিবর্তন এবং ভারতের সামগ্রিক ছবির প্রেক্ষিতে এই রাজ্যের গতিপ্রকৃতির দিকে। এখানে উল্লেখ করা ভাল, যে সমস্ত তথ্যসূত্র ব্যবহার করব এই আলোচনায়, তা অনেক ক্ষেত্রেই খণ্ডিত। অর্থাৎ কিছু তথ্য হয়ত বিশেষ কোনো বছরের জন্য পাওয়া গেলেও, খুব সাম্প্রতিক ছবি পাওয়া যাচ্ছে না। অথবা জাতীয় স্তরে সাম্প্রতিক তথ্য পেলেও, রাজ্য বিশেষে কী পরিস্থিতি তা জানা যাচ্ছে না। তথ্যের গুণগত মান, তা কতটা সঠিক – সেই বাছবিচারে যাচ্ছি না, কারণ সেই আশঙ্কা সমস্ত রাজ্যের ক্ষেত্রেই কমবেশি প্রযোজ্য। আসলে নিম্ন বা মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণের পরিকাঠামো অপেক্ষাকৃত অনুন্নত হওয়ায় তথ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার আলোচনা করার আগেই এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নেওয়া ভাল।
২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সম্প্রদায় বা কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছিল যথাক্রমে ১,৩৭৪ এবং ৪০৬। এছাড়া আধা জেলা বা সাব-ডিস্ট্রিক্ট বা ডিভিশনাল হাসপাতালের সংখ্যা ৭০ এবং জেলা হাসপাতালের সংখ্যা ছিল ৫৫। সর্বসাকুল্যে ১,৯০৫ খানা ‘পাবলিক ফেসিলিটি’, বা গড়ে প্রতি ৪৮,০০০ মানুষ পিছু একটা জনস্বাস্থ্য পরিষেবা কেন্দ্র। একই বছরে গোটা দেশে ২৯,৮৯৯ খানা প্রাথমিক ও ৫,৫৬৮ খানা কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র ছিল। অর্থাৎ প্রতি ৩৬,০০০ মানুষের জন্যে একটা কেন্দ্র। সরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগীদের জন্য শয্যার হিসাব দেখলে দেখা যাবে ভারতে ২০১৮ সালে প্রতি ২,০০০ জনের জন্য একটা শয্যা ছিল। এই হার পশ্চিমবঙ্গের কাছাকাছি। আবার ২০২১ সালের ডিসেম্বরে লোকসভার অধিবেশনে ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর দেওয়া এক প্রশ্নের উত্তর থেকে দেখা যাচ্ছে যে বাংলায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র ১,৩৬৯ আর কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ৩৪৮। এই তথ্য সঠিক হলে মানতে হবে যে ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংখ্যা কমে গেছে। অথচ সারা দেশ মিলিয়ে ২০২১ সালে ছিল ৩০,৮১৩ খানা প্রাথমিক ও ৫,৬৪৯ খানা কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। অর্থাৎ দেশে যেখানে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যা নিম্নগামী। সময়ের চাকা উলটো দিকে ঘুরিয়ে ২০০৪-০৫ সালে পৌঁছে গেলে দেখা যাবে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে জানানো হচ্ছে, অর্থনৈতিক দিক থেকে মাঝামাঝি হলেও এবং স্বাস্থ্য বাবদ সরকারি খরচের দিক থেকে দেশের মতই এই রাজ্য মিতব্যয়ী হওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সূচকগুলো এই রাজ্যে তুলনামূলকভাবে ভাল ছিল। ২০০৯, ২০১০, ২০১১ সালে মহিলা এবং শিশু স্বাস্থ্যের নিরিখে বাংলা দেশের প্রথম চার-পাঁচখানা রাজ্যের মধ্যে ছিল। এমনকি এখনো সেই ধারা কিছু ক্ষেত্রে অব্যাহত। কিন্তু তার কৃতিত্ব কি শুধুই সরকার বাহাদুরের?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
২০১৭-২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে জন প্রতি স্বাস্থ্য বাবদ সরকারি খরচ ছিল ১,০৮৮ টাকা, যা ভারতের গড়ের (১,৭৫৩ টাকা) চাইতে অনেকটা কম। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, স্বাস্থ্য বাবদ এখানকার সামগ্রিক খরচের অনেকটাই, প্রায় ৭০%, বাসিন্দাদের নিজস্ব খরচ। অথচ নিজস্ব খরচের জাতীয় গড় ৫০ শতাংশের কম। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্য পরিষেবা গোটা দেশের চেয়েও বেশি ফেলো কড়ি মাখো তেল আদর্শে চলে।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে লোকসভার অধিবেশনে ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর দেওয়া এক প্রশ্নের উত্তর থেকে দেখা যাচ্ছে যে বাংলায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র ১,৩৬৯ আর কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ৩৪৮। এই তথ্য সঠিক হলে মানতে হবে যে ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংখ্যা কমে গেছে। অথচ সারা দেশ মিলিয়ে ২০২১ সালে ছিল ৩০,৮১৩ খানা প্রাথমিক ও ৫,৬৪৯ খানা কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। অর্থাৎ দেশে যেখানে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যা নিম্নগামী।
ডাক্তারি পড়ুয়া এবং তারপর হাউস স্টাফ থাকাকালীন আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা একটু আলোচনা করা যাক। প্রথমেই যা না বললে নয় তা হল, আমার পুরো ডাক্তারি ছাত্রাবস্থা, তারপর জুনিয়র ডাক্তার হিসাবে সরকারি হাসপাতালে কাজ তথা হাউস স্টাফশিপ এবং পরবর্তী জনস্বাস্থ্য নিয়ে ডিপ্লোমা – সবই হয়েছিল ২০০১-২০১০, অর্থাৎ কিনা ২০১১ সালের ‘পরিবর্তন’ ঘটার আগে। চৌত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতা তো হয়নি, তবে ওই বছর দশেকও মোটেই স্বাস্থ্যের শিক্ষাব্যবস্থা এবং কাজকর্মের পরিবেশ অনিন্দনীয় বলে মনে হয়নি। সরকারের সুনজরে থাকলে পদোন্নতি অথবা কাঙ্ক্ষিত স্থানে ট্রান্সফার, না থাকলে উল্টো পরিণতির গল্পগুজব কানে আসত মাঝেমধ্যেই এবং বলা বাহুল্য, তার মধ্যে পুরোটা না হলেও কিছুটা সত্যি তো ছিলই। তার থেকেও বেশি যা মনে হয়েছিল, তা হল নানা স্তরে চূড়ান্ত অব্যবস্থা চলছে। একটা উদাহরণ দিই।
আমরা মোটামুটি ১৫০ জন এমবিবিএসের অন্তিম পরীক্ষায় পাস করে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ সমাপ্ত করি। তাদের মধ্যে অনেকেই হাউস স্টাফশিপের (বাধ্যতামূলক নয়) সন্ধান করত। মেডিকাল কলেজে এই হাউস স্টাফশিপের জন্যে প্রথম দফায় যতজন আগ্রহী ছিলাম, স্থান তার থেকে কম থাকত। এমবিবিএস পরীক্ষাগুলোয় নম্বরের ভিত্তিতে সবার জন্যে একটা স্কোর বা ‘পয়েন্টস’ গাণিতিকভাবে নির্ধারিত হত আর সেই পয়েন্টস অনুযায়ী পছন্দের বিষয় বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থাকত। অর্থাৎ জয়েন্ট এন্ট্রান্সে স্থানভিত্তিক কাউন্সেলিংয়ের মতই যার সবথেকে বেশি পয়েন্টস, তার যে কোনো বিষয়ে হাউস স্টাফশিপ করার স্বাধীনতা থাকত। অন্যদিকে আমার পয়েন্টস অপেক্ষাকৃত কম থাকায় সার্জারি এবং অন্য দু-একটা বিষয়ে আসন খালি পড়ে ছিল। কিন্তু আমার মেডিসিনের দিকে ঝোঁক থাকায় সেই স্থান ছেড়ে দিই। যা বলার জন্য এত কথা বলা, তা হল এর পরের হাউস স্টাফশিপ খোঁজার অভিজ্ঞতা।
তখন শেঠ সুখলাল কারনানি মেমোরিয়াল হাসপাতাল, শম্ভুনাথ পণ্ডিত প্রভৃতি হাসপাতালের জন্য একটা উন্মুক্ত কাউন্সেলিং হত। এই সমস্ত জায়গার নিজস্ব এমবিবিএস ছিল না (এসএসকেএমে চালু হলেও, যতদূর মনে পড়ে, তখনো তাদের প্রথম ব্যাচ পাস করে বেরোয়নি), তাই অন্যান্য কলেজ থেকে পাস করা ডাক্তারদের একটা সুযোগ ছিল। এহেন ‘ওপেন কাউন্সেলিং’-এর খোঁজখবর নিতে গিয়ে বোঝা গেল, সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও কিসের ভিত্তিতে যে নেওয়া হবে স্বাস্থ্য অধিকর্তারা সে ব্যাপারে নিশ্চিত নন। অথবা অত খুঁটিনাটি বিষয়ে মাথা ঘামানোর সময় বা ইচ্ছা বা দুটোরই অভাব। আমরা কয়েকজন কলে সাড়া দিয়ে দরখাস্ত তো করলাম, জরুরি কাগজপত্রের প্রতিলিপিও পাঠানো হল। কিন্তু তারপর আর কোনো খবর নেই। আমরা দু-তিনজন স্বাস্থ্য ভবনে খোঁজ নিতে গেলাম। সেখানকার এক উচ্চপদস্থ কর্তা তাঁদের অসহায়তার কথা জানিয়ে বললেন যে সমস্ত আবেদনকারীর পয়েন্টস নির্ণয় এবং তাদের ক্রমান্বয়ে সাজানোর সময় তাঁদের নেই, বা কারোর কাজের আওতার মধ্যেই নাকি সেটা পড়ে না। একটু দুঃসাহস করেই আমরা বলে ফেললাম, সেরকম হলে আমরা সাহায্য করতে পারি। আমাদের অবাক করে তিনি রাজি হলেন (ভ্দ্রলোকের নাম মনে নেই, থাকলেও প্রকাশ্যে লিখতাম না)। আমরা তখনো ভাবছি পণ্ডশ্রম করছি। যা-ই হোক, বলে যখন ফেলেছি, বসে পড়লাম আমরা কয়েক তাড়া কাগজপত্র নিয়ে। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে সন্ধে হয়ে গেল সব মিটতে। একটা তালিকা বানিয়ে সব নথিভুক্ত করে রেখে আমরা বেরোলাম। খুবই অবাক লেগেছিল এহেন অগোছালো ব্যাবস্থা (বা তার অভাব) দেখে, বিরক্তও লেগেছিল। তবে সেই তালিকা ধরেই কিছুদিন পরে কাউন্সেলিং হল, আমরা হাউস স্টাফশিপ পেলাম এসএসকেএম, শম্ভুনাথ ইত্যাদিতে। সে আর এক প্রসঙ্গ।
সময়ের চাকা উলটো দিকে ঘুরিয়ে ২০০৪-০৫ সালে পৌঁছে গেলে দেখা যাবে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে জানানো হচ্ছে, অর্থনৈতিক দিক থেকে মাঝামাঝি হলেও এবং স্বাস্থ্য বাবদ সরকারি খরচের দিক থেকে দেশের মতই এই রাজ্য মিতব্যয়ী হওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সূচকগুলো এই রাজ্যে তুলনামূলকভাবে ভাল ছিল। ২০০৯, ২০১০, ২০১১ সালে মহিলা এবং শিশু স্বাস্থ্যের নিরিখে বাংলা দেশের প্রথম চার-পাঁচখানা রাজ্যের মধ্যে ছিল।
আজ পশ্চিমবঙ্গে ডাক্তারি পেশা এবং তার পারিপার্শ্বিক যে অন্ধকারময় পরিবেশ, সেই নিরিখে আমার ১৭ বছর আগের যে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলাম, তাকে কীভাবে বিচার করব ভাবছি। অব্যবস্থা, গাফিলতি – এ সমস্ত সমর্থনযোগ্য তো নয়ই। তবু একথা সত্যি যে সেই স্বাস্থ্য আধিকারিক আমাদের অনুরোধ নস্যাৎ করে দিতেই পারতেন। তার বদলে নিজেদের পছন্দের কিছু প্রার্থীকে হাউস স্টাফের খালি পদগুলো দিয়ে দিলে কে-ই বা আপত্তি করতে যেত? তা না করে পয়েন্টস অনুযায়ী নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন বলেই আমার এসএসকেএম হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে হাউস স্টাফ হিসাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা খুব সুখকর ছিল না। কাজ শেখার সুযোগ ছিল প্রচুর এবং যাঁর তত্ত্বাবধানে (ইউনিটে) ছিলাম, তিনি তাঁর অধীনস্থ বা শিক্ষার্থী ডাক্তারদের উপর রোগীর খারাপ পরিণতির সমস্ত দায় ছেড়ে দিতেন না। এমনকি রাজনৈতিক যোগসাজশ আছে এমন কিছু রোগী আমাদের কিঞ্চিৎ চোখ-টোখ রাঙালে, আমাদের বস/স্যার আমাদের পাশেই থেকেছেন। কিছু ক্ষেত্রে তো আমাদের সামনেই ক্ষমতাশালীদের দাবড়ে দিয়েছেন। পরিবর্তন-পরবর্তী যুগের একজন রংচঙে মন্ত্রী মশাই বাম আমলেও ওই চত্বরে বেশ দাপুটে নেতা ছিলেন। আমাদের নিজের চোখে দেখা: নেতাজি চকচকে সিল্কের পাঞ্জাবি আর জবজবে তৈলাক্ত পেতে আঁচড়ানো চুল নিয়ে যেন বাংলা সিনেমার পর্দা ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে হঠাৎ আমাদের দর্শন দিলেন হাসপাতাল চত্বরে। মখমলে গলায় বললেন ‘আমার লোক ভর্তি আছে, যত্ন নেবেন’, ইত্যাদি। উত্তরে স্যারও খুবই মোলায়েম গলায় প্রতিনমস্কার করে জানালেন যে অন্যান্য রোগীদের মতোই যত্নআত্তি পাবেন নেতার লোক, তার থেকে কম বা বেশি কোনোটাই নয় (‘বেশী’ শব্দটায় কি একটু বেশি জোর দিয়েছিলেন? নাকি আমার শুনতে ভুল হয়েছিল?)। তারপর নেতাজি আর দুর্মুখ হিসাবে দুর্নাম থাকা আমাদের বস একে অপরের দিকে কয়েক পলক প্রেমপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে এবং অমায়িক নমস্কার বিনিময় করে যে যার পথে হাঁটা দিলেন।
ঝামেলা এড়াতে সেই ডাক্তারবাবু বা সেই নেতা – কারোর নামই নেব না। যা-ই হোক, অনেকেই বলতে পারেন ‘হুঁ হুঁ বাওয়া, ওসব হিরোগিরি তখনকার ক্ষমতাসীন দলের নেতা নেত্রীদের সঙ্গে করলে বুঝতাম তোমার ওই স্যার কত বীরপুরুষ।’ সত্যি বলতে কী, এই সন্দেহ যে আমারও নেই তা নয়। কিন্তু এটা স্যারের বীরগাথা লিখব বলে লিখলাম না। পরিস্থিতি কেমন ছিল তার এক টুকরো উদাহরণ দেওয়ার জন্যেই এসব কথা বলা।
অব্যবস্থা, গাফিলতি – এ সমস্ত সমর্থনযোগ্য তো নয়ই। তবু একথা সত্যি যে সেই স্বাস্থ্য আধিকারিক আমাদের অনুরোধ নস্যাৎ করে দিতেই পারতেন। তার বদলে নিজেদের পছন্দের কিছু প্রার্থীকে হাউস স্টাফের খালি পদগুলো দিয়ে দিলে কে-ই বা আপত্তি করতে যেত? তা না করে পয়েন্টস অনুযায়ী নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন বলেই আমার এসএসকেএম হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে হাউস স্টাফ হিসাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছিল।
তবে এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যাচ্ছে একটা খবর। পরিবর্তনের কয়েকদিন পরেই অকস্মাৎ পরিদর্শনে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সদলবলে হাজির হন বাঙ্গুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোলজিতে। সেখানকার ডিরেক্টর ডাঃ শ্যামাপদ গড়াই নাকি মাননীয়া আসায় সাংবাদিক ইত্যাদি মিলিয়ে হাসপাতাল চত্বরে অতিরিক্ত ভিড় হয়ে যাচ্ছে – এই কথা বলে আপত্তি জানান। পরিণামে তাঁর অপসারণ ঘটে। পরের এক দশকের বেশি সময় ধরে যে চলচ্চিত্র গোটা রাজ্যে রমরমিয়ে চলছে, তার টিজার বা ট্রেলার বুঝি সেদিনই দেখা গিয়েছিল। পরে অবশ্য নেত্রীর সরকার ডাঃ গড়াইয়ের বিরুদ্ধে অসহযোগিতা এবং অভব্য আচরণের অভিযোগ এনেছিল।
এবার এসএসকেএমে হাউস স্টাফদের অন কলের দিনে, বিশেষত রাতে, থাকার ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা একটু বলি। আমাদের জন্য বরাদ্দ যে ঘর, তার এমন অসাধারণ পরিবেশ ছিল যে সেখানে অসম্ভব ক্লান্ত না হলে শোয়া বা ঘুমানো প্রায় অসম্ভব। বাথরুমের কথা না-ই বা বললাম। ওসব বাছবিচার না করে ঘুমিয়ে পড়ার মত ক্লান্ত হতে আমাদের অসুবিধা হত না, কারণ ততক্ষণে ১৪ -১৫ ঘন্টা কাজ করা হয়ে গেছে। নতুন রোগী ভর্তি হলেই ডাক আসবে আবার। সেসবের মাঝে একটু গড়িয়ে নিতে গিয়ে ঘরের দুর্গন্ধ, গরম, নোংরা চাদর – কিছুই ঘুম আটকাতে পারত না। আলো জ্বালিয়ে ঘুমনো হত, যাতে ইঁদুর, আরশোলা এবং মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চলতে পারে। ঘুম থেকে উঠে হয়ত দেখা গেল দু-একজন আরশোলা আদুরে সুড়সুড়ি দিচ্ছে গায়ে। কেন যে ইঁদুর কখনো ওঠেনি – এ এক আজব রহস্য। অবশ্য আমি ছিলাম মাত্র ছমাস, না হলে এক আধটা নিশ্চয় দংশন করত। যা-ই হোক, আমরাও ধান্দায় থাকতাম। রোগীদের প্রাইভেট রুম, বিশেষত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর লটারির মত ফাঁকা পেয়ে গেলে আমাদের আর পায় কে? তখন আক্ষরিক অর্থেই নজরুলের ‘দু’কানে চশমা আঁটিয়া ঘুমানু, দিব্যি হতেছে নিদ্ বেশী’। কখনো আবার কোনো ঘর ফাঁকা নেই, আমাদের ঘরের অবস্থা এতটাই খারাপ যে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিলেই ঘুম আসবে সে ভরসাও হচ্ছে না। তখন ইকোকার্ডিওর ঘরে একটু ফাঁকা জায়গা পেয়ে গড়িয়ে নিলাম – এসবও হয়েছে।
আলো জ্বালিয়ে ঘুমনো হত, যাতে ইঁদুর, আরশোলা এবং মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চলতে পারে। ঘুম থেকে উঠে হয়ত দেখা গেল দু-একজন
আরশোলা আদুরে সুড়সুড়ি দিচ্ছে গায়ে। কেন যে ইঁদুর কখনো ওঠেনি –
এ এক আজব রহস্য।
এসব অভিজ্ঞতাকে আজকের প্রেক্ষিতে দুইভাবে দেখা যেতে পারে। ১) ‘দেখেছেন, তখনো (সেটা ২০০৭) কী অবস্থা ছিল! কে বলেছে এখন অবনতি হয়েছে? আসলে ৩৪ বছর ধরে সব পচিয়ে দিয়ে দিদির হাতে দিয়েছে’ ইত্যাদি, ২) দীর্ঘ ডিউটির পর একটু ঘুমোতে পারলে সাত রাজার ধন এক মানিকও তুচ্ছ মনে হতে পারে। কাজেই শোওয়ার জায়গা নিয়ে বেশি ভাবার মত অবস্থা যে অনেকেরই থাকে না তা উপলব্ধি করা।
অন কল ডিউটি না থাকলেও ঘন্টার পর ঘন্টা ডিউটি করলে চরম ক্লান্তিতে ব্যাপারটা একইরকম হয়। অতএব আর জি করের ঘটনার প্রসঙ্গে ‘ওটা কি শোবার জায়গা? কেন সেমিনার রুমে ঘুমোতে গেল’ গোছের জ্ঞানগর্ভ মতামত ব্যক্ত করার আগে একটু ভাবনাচিন্তা করা ভাল। এই ঘটনার পর থেকে অজান্তেই মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, ভাগ্যিস আমাদের সময়ে কার্ডিওলজিতে কোনো ইউনিটে মহিলা হাউস স্টাফ বা পিজিটি ছিলেন না।
তবে ডাক্তাররা নিষ্কলঙ্ক সেবক – এরকম গদগদ ধ্যানধারণা আমার বিশেষ পছন্দের নয়। এই সূত্রে বলে নেওয়া ভাল যে ওষুধ কোম্পানি বা ল্যাব থেকে কমিশন বা অন্যান্য সুযোগসুবিধা নেওয়ার চক্রে অল্পবিস্তর আমিও সেইসময় জড়িয়েছিলাম। তা নিয়ে ‘আসলে আমি তো বুঝতে পারিনি, আমার অজান্তে আমার পদ্মপাতার মত চরিত্রে দাগ লেগেছিল’ গোছের হাবভাব করলে মিথ্যাচার হবে। বরং বলতে পারি, কিছুদিন পরে নিজের চোর চোর ভাব আর মায়ের ধমক খেয়ে সরাসরি নগদ নেওয়া থেকে বিরত হয়ে সেই পাপের টাকা এক ত্রাণ তহবিলে দিয়ে দিয়েছিলাম। তারপরও, বিয়েতে নগদ টাকা পণ না নিয়ে জিনিসপত্র নেওয়ার নাটকের মত মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের দেওয়া বইপত্র যে নিইনি তা নয় (ডাক্তারির বই যে মহার্ঘ তা অনেকেই জানেন)।
যা ভারি মজার ছিল তা হল কমিশন না নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর আমার সহকর্মীদের কারোর কারোর গভীর সহমর্মিতা। ‘দ্যাখ, তুই না নিলেই কি রোগীদের বা তাদের পরিবারের কোনো লাভ হবে? বরং কোম্পানির লাভ বাড়বে। তাই তোর ভালর জন্যেই বলছি, আরেকবার ভেবে দেখতে পারিস।’ দু-একজন তো হলফ করে জানাল যে তাদেরও বক্ষ বিদীর্ণ হয় এইসব নিতে। কিন্তু ওষুধ কোম্পানিকে বেশি লাভ করতে না দিতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাই এই কমিশনের গরল পান করে সেই দুঃখ ভুলতে অনেক সময় তাদের আবার তরল পান করতে হয়। একথা সত্যি যে আমার নেওয়া না নেওয়ায় রোগীদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি, বরং আমার ইউনিটের অন্য হাউস স্টাফদের ‘প্রাপ্য’ বেড়েছিল। এখানে বলে রাখা উচিত, এই ধরনের ডাক্তার-কোম্পানি যোগসাজশের ব্যাপকতার মধ্যেও কেউ কেউ ছিলেন যাঁরা একেবারেই এসবের বাইরে থাকতে পারতেন। কিন্তু অন্তত কার্ডিওলজিতে সেরকম ইউনিট হাতে গোনা বলেই তখন মনে হয়েছিল।
উপরে যেটাকে মজার অভিজ্ঞতা হিসাবে বর্ণনা করলাম, সেটা আর যা-ই হোক প্রাণঘাতী হয়নি আমার ক্ষেত্রে। জানিনা আর জি কর কাণ্ডের পিছনে আসল অভিপ্রায় কী ছিল। কিন্তু মৃতা যে কিছু পাঁকের ব্যাপারে বেশি জেনে ফেলেছিলেন, সে আশঙ্কা তো অনেকেই করছে। তদুপরি বোধহয় তিনি নিজের হাতটা কেবল ধুয়ে ফেললেন, নোংরা যা আছে তার দিকে দৃকপাত করলেন না – এরকম মেরুদণ্ডহীন ছিলেন না।
আরো পড়ুন যত কাণ্ড ওষুধের দামে: যেভাবে সরকার মানুষকে ঠকাল
ডাক্তারি পড়ুয়াদের বাছাই পদ্ধতির পরিবর্তনের করে দেশব্যাপী নিট পরীক্ষা শুরু হয়েছে প্রায় এক দশক হল। তারপর থেকেই এই পদ্ধতির নানা খামতির কথা অনেকেই বলেছেন (এটাও দেখতে পারেন)। এমনকি স্নাতকোত্তর স্তরেও এমডি/এমএস বা ডিপ্লোমার এখনকার নির্বাচন পদ্ধতি সন্দেহাতীত নয় একেবারেই। এমনকি মহামান্য আদালতও প্রশ্ন তুলেছেন। আগে রাজ্যের জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষা যে একেবারে নির্ভুল বা অমোঘ ছিল তা একেবারেই নয়। আসলে মেধাভিত্তিক হোক আর যাই হোক, শুধুমাত্র একটা পরীক্ষার ভিত্তিতে যোগ্যতা নির্ণয় করা বোধহয় অসম্ভব। হয়ত তার চেয়েও দুরূহ এই পূর্বাভাস পাওয়া, যে সেই রাস্তায় চলতে শুরু করে একজন কতখানি সাফল্য পাবে। সময়ই বলতে পারবে আমাদের সময় আর এখনকার যে তফাত তার গতিপ্রকৃতি কোন দিকে। তবে এটুকু বলতে দ্বিধা নেই যে লক্ষণ খুব একটা আশাপ্রদ নয়। এসবের মধ্যে আবার পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষার্থী বাছাই থেকে ডাক্তারদের সরকারি নিয়োগ সংক্রান্ত নানা কেলেঙ্কারির অভিযোগ মাঝেমাঝেই কানে আসে। বিরোধীদের কুপ্রচার হতেই পারে, কিন্তু যা রটে তার কিছুটা বটে কিনা কে খতিয়ে দেখবে? কানাঘুষো বা ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা থেকে তো পরিবর্তনের পরে স্বাস্থ্য পরিষেবা সংক্রান্ত চক্রান্ত কমেছে এমনটা একেবারেই মনে হয় না। বরং আধিকারিকদের স্তরে, কলেজ এবং হাসপাতালগুলোর উচ্চপদে যোগ্য ব্যক্তিদের সংখ্যা বোধহয় কমেছে। এসবই অবশ্য অন্যদের কাছ থেকে শোনা টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতা অতিসরলীকরণ হয়ত, কারণ তথ্য পাওয়া কঠিন। পশ্চিমবঙ্গের মেডিকেল কাউন্সিলের যে মাঝেমধ্যেই নানা আপডেট করার অজুহাতে টাকা (ফি) নেওয়ার প্রবণতা গত ১০-১২ বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে, তা আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা।
তাহলে সব মিলিয়ে কী দাঁড়াচ্ছে? ভারতের প্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্য পরিষেবায় পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান কীরকম? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি ঊর্ধ্বগামী, নিম্নগামী, নাকি মোটামুটি সাম্যাবস্থায়? কোনো প্রশ্নেরই সদুত্তর পেলাম না। তবে এটুকু নিশ্চিত যে অবস্থা আহ্লাদিত হবার মত তো নয়ই, বরং সঙ্গিন। অনেক দেশে বহিরাগত বিশেষজ্ঞ সংস্থা দ্বারা অডিট করার ব্যবস্থা থাকে। হয়ত সেরকম কিছু হলে কিছুটা পরিষ্কার ছবি পাওয়া যাবে। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








