ভবতারণ কুমার
হেমন্তের হিমেল বাতাস থেকে বসন্তের রাঙা পলাশ পর্যন্ত পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে দেখা যায় ঝাঁকে ঝাঁকে পর্যটক। পশ্চিমবাংলার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র অযোধ্যা, দলমা পাহাড়শ্রেণির ১০,০০০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে এই পাহাড়ের অবস্থান। আহাড়রার আখ বাদা থেকে ১৭ কিলোমিটার ঝাঁ চকচকে পাকা রাস্তার দুপাশে পাহাড় এবং তার খাতের নৈসর্গিক সৌন্দর্য পর্যটকদের বারবার টানে। কাঁচামাটির বাড়ির গায়ে সাঁওতালদের রং বেরংয়ের শিল্পকর্মেরও আলাদা টান আছে। বামনি জলপ্রপাত, পাখি পাহাড়, মার্বেল লেক, ময়ূর পাহাড়, মাঠাবুরু গোর্গাবুরু, আপার ও লোয়ার ড্যামের বুনো স্নিগ্ধতা নাগরিক জীবনের ক্লান্তি থেকে খনিক স্বস্তি দেয়। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সারি সারি শাল, মহুল, পিয়াল গাছ, পাহাড়ে বিভিন্ন বুনো লতাপাতা গুল্ম জাতীয় গাছ চোখ জুড়িয়ে দেয়। এসব দেখার লোভে শীতের মরশুমে এখানে পর্যটকদের ভিড় চোখে পড়ার মত। এবছরও তার অন্যথা হয়নি।
বিভিন্ন ধরনের নামি দামি গাড়ির আওয়াজে, রিসর্ট আর হোটেলগুলোর উপচে পড়া ভিড়ে পাহাড়ের নীরবতা উধাও। নাগরিক জীবনের কোলাহল, গাড়ির বিকট হর্ন, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্লাস্টিকের বোতল, থার্মোকলের থালা, বিভিন্ন বিদেশি মদের বোতল আর দামি তাঁবুর পাশে মাংসের হাড় ও এঁটোকাঁটায় ভরে গেছে এই এলাকা। জাঁকিয়ে বসা পুরুলিয়ার কনকনে শীতে রিসর্ট আর হোটেলগুলোতে দেহব্যবসাও চলছে। চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে যুঝতে থাকা মহিলা বিক্রি করে নিজেকে, কেনে বিলাসে মত্ত পুরুষ। দিন দিন পলাশের রং ফিকে হচ্ছে, বামনির স্বচ্ছ জলকে নোংরা করছে নাগরিক আবর্জনা। শাল, মহুল, পিয়ালের ঋজু মেরুদণ্ড বেঁকে যাচ্ছে শহুরে বিলাসের চাপে। অযোধ্যা পাহাড়ের সগর্বে উঁচু মাথা হেঁট হচ্ছে সব মিলিয়ে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
পুরুলিয়ায় মূলত অযোধ্যা পাহাড়কে ঘিরে ছিল বৃষ্টি ডেকে আনা জঙ্গল। বাঘমুন্ডি, আড়ষা, ঝালদা, কোটশিলা ও বলরাম জুড়ে গভীর জঙ্গল। বড় বড় শাল, মহুল, পিয়াল, অশ্বত্থ, অর্জুন, আম, জাম, কাঁঠাল, কুসুম, ভেলা, নিম, বট, কুচড়ি, সাতসর, গামার, পলাশ, শিরীষ, মেহগনি সহ আরও বিভিন্ন ধরনের গাছ। বছরের বিভিন্ন সময়ে আলাদা আলাদা ধরনের ফল ফলে গোটা পাহাড় জুড়ে। যেমন ডহু, কেন্দু, ভেলা, পিয়াল, কচড়া, আম জাম কাঁঠাল, পেয়ারা, বেল, কুল, কুসুম, শুয়াকুল, ডুমুর, পড়ো, রোল, ভুড়কূল ইত্যাদি। সারা বছর ধরে ফোটে বিভিন্ন ধরনের ফুল – পলাশ, পুটুস, মহুল, বেররা, আকন্দ, ধুতরা, কল্কা, কুচড়া ফুল, দুধফুল, শাল ফুল ইত্যাদি।
ওষুধ হিসাবে ব্যবহার হয় সার্জমের বাঁদা, কুড়চি গাছের ছাল, সাপারম গাছের পাতা, ভুড়কুম গাছের ছাল, বড় পাড়, ছোট পাড়, রহিন ছাল, বঙা সারজম ছাল, বীরকান্টাড়, দুধলাউ শ্বেতমূলী, চিরচিটি, বাড়িহর, শ্বেত পলাশ।
বন জিরা, ভুঁই কম্বল, নীলকণ্ঠ (এই তিনটে ওষধি মূলত কাঁঠালজল জঙ্গলে পাওয়া যায়), সিন্দুয়ার বাঁধা, শাল আটা ইত্যাদি গাছের পাতা, শিকড়, ছাল বিভিন্ন ধরনের ওষুধ তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়। এখনো এই এলাকার মানুষ রোগের বিরুদ্ধে গাছগাছড়ার শিকড়বাড়কেই সম্বল করে লড়াই করে।
জঙ্গলের কেন্দুপাতা সংগ্রহ করে শুকিয়ে বিক্রি করা ছিল বহু মানুষের রুটিরুজি, যা আজ প্রায় ধ্বংসের মুখে। ফলে ধ্বংস হতে চলেছে বিড়ি শিল্প। কারণ বাইরে থেকে বিড়ির পাতা, অর্থাৎ কেন্দুপাতা, নিয়ে আসা খরচসাপেক্ষ। এই অঞ্চলের বড় অংশের মানুষ বিড়ি বেঁধেই পেট চালান। সেই পেশা আজ বিপন্ন। শালপাতা থেকে থালা তৈরি করে বিক্রিও বন্ধ হতে চলেছে। একদিকে সরকারের নতুন বন আইনের নিষেধ, অন্যদিকে গাছের অভাব। উপরন্তু থার্মোকল ইত্যাদি দিয়ে তৈরি থালার ব্যবহার বিবাহ, শ্রাদ্ধ, অন্নপ্রাশন, পৈতে ইত্যাদিতে বাড়ার ফলে শালপাতার থালার চাহিদাও কমে গেছে। কাঠ কেটে বিক্রিও বন্ধ। কারণ গাছের অভাব এবং বন আইনের বিধিনিষেধ। ফলে বহু মানুষের রুটিরুজি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। লাক্ষা চাষের উপরও এই অঞ্চলের অনেক মানুষ নির্ভরশীল। কিন্তু তার জন্য উপযোগী হল কুসুম, কুল, শিরীষ, সোমিয়া লত, পলাশ, পাকড় গাছ। কিন্তু তার জন্যে বড় ও অনেক বেশি ডালপালাওলা গাছ প্রয়োজন। অথচ বড় গাছের সংখ্যা প্রতিদিন কমছে। ফলে লাক্ষা চাষ, লাক্ষা শিল্পও আজ ধুঁকছে। কিন্তু মজার কথা হল, এলাকার সন্তানরা বনের কাঠ, পাতা, জল থেকে বঞ্চিত হলেও গাছ কাটা কিন্তু প্রতিদিনই চলছে। কোথাও সরকারি মদতে, কোথাও কাঠের চোরা চালানকারীদের হাতে।
২০০৮ সালে পুরুলিয়া পাম্পড স্টোরেজ প্রোজেক্ট চালু হয়। সেই প্রকল্পের স্বার্থে ৩,৫০,০০০ গাছ কাটার সরকারি হিসাব মেলে। এই হিসাব তৎকালীন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু তার বাইরেও হাজার হাজার গাছ কাটা হয়েছে, যা হিসাবের খাতায় নেই। যেমন নেই জঙ্গলে নানা দিকে অহেতুক পিচের রাস্তা তৈরি করার জন্য যত গাছ কাটা হচ্ছে তার হিসাব।
তুর্গা পাম্পড স্টোরেজ প্রোজেক্টের জন্য ২৯২ হেক্টর বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। তাছাড়া কাঁঠালজল পাম্পড স্টোরেজ প্রোজেক্ট ও বাঁদু পাম্পড স্টোরেজ প্রোজেক্টের জন্য ১,২০০হেক্টর বনভূমি আর ১২,০০,০০০ গাছ কাটা পড়তে চলেছে। ফলে একদিকে নষ্ট হবে জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক ভারসাম্য, জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন জীবিকা। অন্যদিকে তৈরি হবে পানীয় জলের গভীর সংকট, বিপন্ন হবে চাষবাস, বিলুপ্ত হবে জানা অজানা বহু ছোটবড় প্রাণি। জঙ্গলে পানীয় জলের অভাবে বন্য পশুদের গ্রামের দিকে আসা বেড়ে চলেছে এই এলাকায়। হাতির তাণ্ডবে নিয়মিত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসল, বিপন্ন হচ্ছে মানুষের জীবন।
আরো পড়ুন কর্পোরেট স্বার্থে পরিবেশ ধ্বংসের অঙ্গ মণিপুর, কাশ্মীরের অশান্তি
বামনি গ্রামের শিক্ষিত যুবক ভুদেব সিং মুড়া বললেন, পাহাড় কেটে বন ধ্বংস করে আসলে অযোধ্যাকেই ধ্বংস করা হচ্ছে। পাহাড় ও তার সাথে যুক্ত মানুষের জীবন বিপন্ন করা হচ্ছে। শুধু মানুষের জীবন বললেও অবশ্য ভুল হবে। হাজার হাজার ছোটবড় জীবজন্তুর অস্তিত্বও সংকটে।
পাহাড়ের কোলে বাস করা উচ্চশিক্ষিত যুবক লক্ষ্মীরাম মান্ডি বললেন, সরকার দেখাতে চাইছে এলাকার উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা অন্য কথা বলে। পুরুলিয়া পাম্পড স্টোরেজ প্রকল্পের সময়ে সরকার বলেছিল অন্যত্র ৩,০০,০০০ গাছ লাগানো হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সে কাজ হয়নি। সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এলাকার যুবকদের চাকরি দেওয়া হবে এবং বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে, কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হয়নি। পাঁচ হাজার কর্মসংস্থান হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এলাকার মানুষ কাজ পায়নি। আমরা হারিয়েছি মাতৃসম জঙ্গলকে, বিপন্ন হয়েছে আমাদের জীবন জীবিকা, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, নষ্ট হয়েছে চাষবাস। পাহাড়গুলো কেমোথেরাপি করানো ক্যানসার রোগীর মত ন্যাড়া হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।
এভাবে চলতে থাকলে দ্রুত ফুরিয়ে যাবে অযোধ্যা, নিঃসম্বল হয়ে যাবে এখানকার ভূমিপুত্র, ভূমিকন্যারা। তখন আর পর্যটকদের টানতে পারবে কি এই এলাকা?
নিবন্ধকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।









Ajodhya paharer protibedonti pore vablam etodine ai lekha! Jokhon sob sesh hote choleche! Ki
এই নাগরিক আগ্রাসন রোখার উপায় কী?