প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার, মানে আমাদের সংবিধানের, ৭৫ বছর হয়ে গেল। আমার এসবে আর কিছুই মনে হয় না। সংবিধান এখন গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকার মত। এখন ভগবান আদালতে আসেন, হাজিরা দেন। ভগবানের জ্যান্ত প্রতিনিধি দেশনায়করা বিচারপতিদের বাড়িতে চলে যান, বিচারপতিরা তাঁদের বাড়িতে পুজোআচ্চা করেন, জনসাধারণ দেখে। আজ রবিবার। অন্য রবিবারে পরাণবাবু যেমন ফুলকপি কেনেন, তেমনই কিনবেন। যাদের মুরগি বা মুরুব্বি – কিছুই নেই, তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে খবরের কাগজ পড়বে বা পরোটা আলুর দম খাবে। সংবিধান বলতে এইটুকুই – ছাব্বিশে জানুয়ারি। একটা বিবর্ণ ন্যাকড়া পতাকা হয়ে ঝুলে থাকবে পাড়ার মোড়ে। হয়ত তাও থাকবে না। এবারে তো দেখলাম নেতাজির জন্মদিনে ডিজে বক্স বাজছে। নেতাজির জন্মদিবসের মিছিল আর তারকেশ্বর যাত্রা যদি সমপর্যায়ে এসে পড়ে, তাহলে প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী?
একদা কলকাতা শহরে চারুলতার স্বামী ভূপতি ভাবত ‘truth survives’। সে দ্য সেন্টিনেল নামে কাগজ বার করত। চারুলতা (১৯৬৪) ছবিতে ভূপতি একদিন স্ত্রীকে সুরেন বাঁড়ুজ্জের বক্তৃতা বুঝিয়ে দেবে বলে আর চারুলতা সেসব না বুঝে স্বর্ণলতা পড়ে, শৈশবস্মৃতি লিপিবদ্ধ করে। যে ঔপনিবেশিক বুদ্ধিজীবী তার মুখপত্রে ‘সত্য জয়ী হবেই’ ঘোষণায় অবিচল থাকে, সে বুঝতে পারে না অন্দরমহলের জলবায়ু অন্যরকম। সদরে ও অন্দরে, ইংরেজি ও ভার্নাকুলারে, প্রকাশ্যে ও নিভৃতে একটি দ্বন্দ্ব ও স্ববিরোধ যে শেষপর্যন্ত আমাদের আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ার একটি প্রাথমিক স্তর – এই সত্য এখন উপলব্ধি করা তো গেছেই; বোঝা গেছে যে আমাদের সেই আলো কত মলিন ছিল। আমাদের ন্যাকা নস্ট্যালজিয়ার অতীত আছে, খানিকটা নির্বুদ্ধিতার সফটওয়্যার হিসাবে ভবিষ্যৎও আছে। কিন্তু যা প্রকৃতই অনুপস্থিত তা হল বর্তমান। আমাদের বলতে মধ্যবিত্তদের কথা বলছি, চাষি-মজুরদের কথা জানি না। তারা দেশের কোথাও আছে বলে মনেও হয় না। তাদের সম্পূর্ণ পর্দার আড়ালে ঠেলে দেওয়া এই ৭৫ বছরে সম্ভব হয়েছে। খবরের কাগজের তৃতীয় পাতায় কঙ্কালের অনির্বচনীয় হাসি, মধ্যবিত্তের উচ্চাশা নিজেকে আর কোথাও চিহ্নিত করতে পারে না। কিন্তু এই নিয়ে সে ছবির পর ছবিতে আলোচনা করে বিয়ার মাগ হাতে, স্তনভারে শ্রান্ত প্রৌঢ়া নায়িকার সঙ্গে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আসলে বলতে চাইছি, এখন আমরা ডেকাডেন্সের আভিজাত্যটুকুও হারিয়েছি। চাঁদ উঠলে বাঙালি ফেসবুক করে, তার অশনে পথখাদ্য, ব্যসনে হাফপ্যান্ট, উচ্চারণে টেলি সিরিয়ালের ইংরিজি। উত্থান বাদ দিলে উনিশ শতকের যে খঞ্জ চেহারাটা পাওয়া যায় উত্তর কলকাতার গলিতে উপগলিতে, আজ কলকাতা প্রায় তাই। প্রতিমা নেই তবু মণ্ডপ পড়ে আছে। আর এ চেহারা সারা দেশেরই। মেট্রোপলিটান সভ্যতার আড়ালে যে হাসছে সে এক জীর্ণ রূপসী।
আমরা কার শরণ নেব? ‘জড়’ বুদ্ধিজীবীদের? মৃত রবীন্দ্রনাথের? নাকি জ্যান্ত খবরের কাগজের? কেউ সঙ্গে নেই। বাঙালি বুদ্ধিবণিকরা আজ সকলেই নীরব আর প্রত্যেকেই ভাবছেন আর কথা বলার দরকার নেই। আজকের পৃথিবী অনুদানমুগ্ধ; নীরবতাই শ্রেষ্ঠ পন্থা। যিশুখ্রিস্টের বিচার শেষে পাইলেট মন্তব্য করেছিলেন ‘সত্য কী তা আমি জানি না’। নিটশে বলেছিলেন, সমগ্র নিউ টেস্টামেন্টে এই কথাটাই একমাত্র সত্য। আমরা তাও জানি না এবং জানবার চেষ্টাও করি না। একদিন আমরা সামনে বিভাজনরেখা দেখে ‘দোহাই আলি’ বলেছিলাম। ঈশ্বর ও আল্লা কোনো আকাশবাণী করেননি। আমাদের ইতিহাসযান চুরমার হয়ে গেল রেলপথের পাড়ে। সেই থেকে আমরা ভ্রাম্যমাণ, পথচ্যুত। আমাদের কোনো মোজেস নেই, যিনি সমুদ্র বিভক্ত করে আমাদের প্রার্থিত ভূমিতে পৌঁছে দেবেন। আমরা যে নেতাজির কথা ভাবি, তাঁর কথা ভাবার ভূমিটুকু পর্যন্ত আজ আমাদের করতলধৃত আমলকি নয়। আমরা সম্পূর্ণ স্থানচ্যুত। আমরা ভেবেছিলাম যে যার মত আস্তানা গড়ে নেব। সল্টলেকে না হোক, পূর্ব কলকাতার অন্য কোনো উপনিবেশে। কিন্তু আজ শুনছি আমাদের জন্ম পরিচয়ের প্রমাণ দিতে হবে। আমাদের মা যন্ত্রণায় নীল, রুধিরাক্ত এই শস্যশ্যামলা আসমুদ্রহিমাচল গড়ে তুলেছেন, সেখানে আমাদের কান্না কোথায় লিপিবদ্ধ আছে, তার নথিপত্র পেশ করতে হবে। সে তো আমাদের জানা নেই। আমরা শুধু জানছি হিন্দু আর মুসলমান, মুসলমান আর হিন্দু। আমরা শুধু এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত, এক রাত্রি থেকে আরেক রাত্রির কাছে ছুটে গেছি। এ এক অসমাপ্ত শিশুতীর্থে দীর্ঘ যাত্রা। আমরা কার শরণ নেব? কেউ সঙ্গে নেই।
আরো পড়ুন প্রজাতন্ত্র দিবসের যাবতীয় আলোকিত বোধ নির্বাপিত হয়ে গিয়েছে
আমার মনে হয় আমরা বেঁচে আছি বলেই কখনো কখনো কথা বলতে হবে। কেবল মৌনতা তো অস্তিত্বরক্ষার একমাত্র অবলম্বন হতে পারে না। আমাদের বলতে হবে ‘জীবন এত ছোট কেনে?’ উনিশ ও বিশ শতকে যাঁদের আমরা দেখেছিলাম – রামমোহন, বিদ্যাসাগর থেকে হয়ত সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত, তাঁরা কোথায় গেলেন? এই তো সেদিন পর্যন্ত কলকাতার রাস্তায় আলি আকবর খাঁকে দেখতাম। কোনো এক গৃহবধূ আশাপূর্ণা দেবী হয়ে লিখতেন। তাঁরা কোথায় গেলেন? দেবব্রত বিশ্বাস কেন আর বাইকে চড়েন না? ঋত্বিক ঘটক কেন রাস্তার মোড়ে পড়ে থাকেন না? আমাদের হাতে কোনো উত্তর নেই। আমি ভাবি একটা দীর্ঘ ডিটেনশন ক্যাম্পে আমাদের অনন্ত অবস্থানের কথা। কার জন্য আমরা ‘disposable mass’ হয়ে গেলাম, এই উদ্বৃত্ত জনপুঞ্জ? কার জন্যে আমরা নিজেদের ‘permanent liability’ ভাবছি? কিসের স্থায়ী দায়িত্ব? আসলে যে যার জন্মের জড়ুল বহন করে যাবে, যে যার জন্মের জন্য শাস্তি পাবে। আজ আমার আর কোনো জবানবন্দি দেবার নেই। তার কারণ আমি একা বা আমার মত কয়েকজন যারা দুনিয়ার হতভাগ্য, তাদেরই নোয়ম চমস্কি উদ্বৃত্ত জনপুঞ্জ বলেছিলেন। আমাদের দেশ পরিচয় নেই, ভূমি পরিচয় নেই, কবচকুণ্ডল নেই। আমাদের ইচ্ছায় আমাদের বাসস্থান নিয়ন্ত্রিত হয় না। আমরা পুতুলের কুচকাওয়াজে অংশ নিই, কার হুকুমে তা জানি না। বা জানি বলেই ইচ্ছে করে না জানার ভান করি। আমরা শুধু দেখতে পাই যেসব ডিটেনশন ক্যাম্প আস্তে আস্তে দেশে তৈরি হবে – নানারকম তাঁবু। কোনোটা দেবতার, কোনোটা অর্থশাস্ত্রের, কোনোটা অর্থনৈতিক বিধিবিধানের। এইসব তাঁবু কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের চেয়ে কম কোথায়?
আমার ভাবতে ইচ্ছে হয়, তার মধ্যে দাঁড়িয়েই কোনো শিশুকে টাটকা আখের রস খাওয়াচ্ছেন চে গুয়েভারা অথবা রবীন্দ্রনাথের গোরা। কত ছোটবেলায়, ছয়ের দশকের শেষে অথবা সাতের দশকের শুরুতে, এসব স্বপ্ন দেখেছিলাম। সেই চে, যিনি নিজেই রাষ্ট্রপরিচয়হীন, রাষ্ট্রপরিচয়কে যিনি জীর্ণ বস্ত্রবৎ ত্যাগ করেছেন। সেই চে এই মুহূর্তে বলিভিয়ার খেত থেকে আখের রস এনে আজকের শিশুকে খাইয়ে দিলে হয়ত আমার বুকের মরুভূমিতে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টিপাত হবে। আর কোনো স্বপ্ন আমার নেই, কোনো আশাও নেই অথবা তা এত কম যে কোনো নিরাশা নেই। বিদায় প্রজাতন্ত্র! বিদায়! অলীক স্বপ্নের প্রজাপুঞ্জ! বিদায়!
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








