এ রাজ্যে যখন পালাবদল হল, তখন আমরা স্কুলের বেড়া ডিঙিয়ে কলেজে ঢুকব ঢুকব করছি। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে যেমনটা হয়ে থাকে, তেমন আমাদেরও কমবেশি সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল – কলেজে গিয়ে বেশি ইউনিয়নবাজির দিকে ঝুঁকবে না। পড়াশোনা করবে, তেমন হলে সকলের সঙ্গে সদ্ভাব রেখে চলবে। যে বিষয় নিয়ে পড়ব বলে ঠিক করে রেখেছিলাম, ‘জনমানসে ব্রাত্য’ সেই জিওলজির ঠিকানা কলকাতার মাত্র তিনখানা কলেজে। তার মধ্যে আশুতোষ কলেজকে শেষ বিকল্প হিসাবে ভেবে রাখতে হয়েছিল, কারণ ‘ওখানে পড়াশোনার চেয়ে রাজনীতি বেশি হয়।’
নম্বরের ফেরে শেষে কিনা ওই কলেজেই গিয়ে পড়া – বামফ্রন্ট জমানার পতনে সেখানে তখন এসএফআইয়ের প্রভাব ম্রিয়মান, নতুন শাসক দলের ছাত্র সংগঠন সবে জাল বিস্তার করতে শুরু করেছে। এমন শান্ত সন্ধিক্ষণে কমন রুম বা ক্যান্টিনের আকর্ষণ কমে গিয়েছিল আমাদের কাছে। বরং অনেক বেশি সময় কাটত, খানিক দূরের হরিশ মুখার্জি রোডের কোনো গলিতে, আড্ডায় বা নিভৃত প্রেমে। কিম্বা রাস্তা-লাগোয়া হরিশ পার্কে, মিত্র ইন্সটিটিউশনের ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল ম্যাচের চ্যালেঞ্জ নিয়ে। তখনো হরিশ পার্কের সবকটা গ্রিলের রঙ নীল-সাদা হয়ে যায়নি, রাস্তার ধারের পুরনো নকশার বাড়িগুলো ধপাধপ ভেঙে ফেলে ফ্ল্যাট গজিয়ে ওঠেনি।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ঝুটঝামেলাহীন কলেজজীবনের ওই তিন বছরে আমি বা আমরা যেখানে আদৌ ভাবিত ছিলাম না আশপাশের রাজনীতি নিয়ে, গোছা গোছা নোটস আর নম্বরের হিসাবেই কেটে যেত একদিন প্রতিদিন (কলেজের তৎকালীন পরিবেশই আমাদের অমন সুপুত্তুর বা সুকন্যা হতে অনুঘটকের কাজ করেছিল), সেখানে যাঁর নামে রাস্তা, সেকেলে সে লোকটার কথাই বা অত ভাবব কী করে? যতই ওই রাস্তা আমাদের যৌবনের উপবন হয়ে উঠুক না কেন।
আশ্চর্যের ব্যাপার এই – এক যুগ পার হয়ে এসে কলকাতার নামকরা সরকারি হাসপাতালে এক মহিলা জুনিয়র ডাক্তারের নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যা নিয়ে কর্তৃত্ববাদের বাড়াবাড়িতে যেরকম স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে উঠল মানুষের আন্দোলন, ওদিকে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের স্ট্রিপটিজও যখন সম্পূর্ণ, সেই মুহূর্তে হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে মনে পড়ছে বারবার – মধুকবির মতই এবছরটা তাঁরও জন্মের দ্বিশতবর্ষ যে।
মাত্র পাঁচ-ছয় বছরের সম্পাদক জীবনে এদেশে রাজনৈতিক সাংবাদিকতার বলিষ্ঠ মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়ে যাওয়া অস্থির, অশান্ত লোকটা, প্রশাসনিক মদতে সংঘটিত একটা ধর্ষণের ঘটনা লাইন কে লাইন তাঁর কাগজে ছাপিয়ে দিয়ে যেভাবে অকালমৃত্যুর আগে সর্বস্বান্ত হলেন, তাতে তাঁকে আজ স্মরণে আসা স্বাভাবিক বলেই মনে করি। যদিও তাঁরই সমকালীন কলকাত্তাইয়া এলিট সমাজের কাছে ‘আপদ বিদেয় হয়েছে’ মার্কা বিস্মরণই ছিল স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। আজ এতবছর পরে, ইতিহাস বিকৃতির কালে সে নিয়তি থেকে হরিশ মুখুজ্জে সসম্মানে মুক্তি পাবেন, এমনটা আশা করাও এক অর্থে বোকা বোকা স্বপ্ন।
নেহাত উনিশ শতকে দূর বোম্বাইয়ের এলফিনস্টোন কলেজের জনৈক পার্সি অধ্যাপক ফ্রামজী বোমানজীর লেখা ইংরিজি জীবনী (Lights And Shades Of The East: Or A Study Of The Life Of Baboo Harrischander; And Passing Thoughts On India And Its People: Their Present And Future, ১৮৬৩) এবং হরিশের চলে যাওয়ার ২৬ বছর পর অজ্ঞাতকুলশীল স্কুলশিক্ষক-সাংবাদিক রামগোপাল সান্যালের লেখা বাংলা জীবনী (হিন্দু পেট্রিয়টের ভূতপূর্ব্ব সম্পাদক হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের জীবনী, ১৮৮৭) এবং বিশ শতকের শুরুতে নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত সম্পাদিত একখানি শ্রমসাধ্য সংকলন (Selections from the Writings of Hurrish Chunder Mukerji Compiled from The Hindoo Patriot, ১৯১০) ছিল বলে পরবর্তী প্রজন্মের কতিপয় হরিশ-উৎসাহী ভরসা করার মত কিছু মালমশলা পেয়েছিলেন। নরেশ সেনগুপ্তের কাজটির কিছু আগে প্রকাশিত শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখা বহুপঠিত আকরগ্রন্থ রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ-এও নীলের হাঙ্গামার প্রসঙ্গে এসে পড়েছেন হরিশ মুখার্জি। গৌরাঙ্গগোপাল সেনগুপ্ত (সাংবাদিক-কেশরী হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, ১৯৬০) ও দিলীপ মজুমদারের গবেষণা (হরিশ মুখার্জি: জীবন ও ভাবনা, ১৯৮৩; হরিশ মুখার্জি: যুগ ও জীবন, ২০০৮ এবং হিন্দু প্যাট্রিয়টের হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়: ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব, ২০২৪), অন্যদিকে অনিলকুমার সেনগুপ্ত ওরফে অগ্নিমিত্রের লেখা হরিশের জীবনোপন্যাস (আপোষ করিনি, ১৯৯৪), এবং সর্বোপরি, এখনো বেস্টসেলার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেইসময় উপন্যাসের আনুকূল্যে হরিশ সম্পর্কে কিছু কিছু ধারণা তৈরি হয়েছে বাংলার পাঠকের – রাস্তা বা পার্কের নামেই তাঁর অস্তিত্ব আটকে থাকেনি।
বর্ধমানের শ্রীধরপুর গ্রামের রামধন মুখোপাধ্যায়ের তৃতীয়া স্ত্রী রুক্মিণী দেবীর গর্ভজাত দুই পুত্রের বড়জন হারাণ, ছোটজন হরিশ। হরিশের ছমাস বয়সেই রামধন গত হন, জীবদ্দশায় শ্রীধরপুরের ভিটেতে কখনো হরিশ পা রেখেছেন বলে জানা যায়নি। জন্ম-কম্ম সবই কলকাতার, অর্থাৎ ভবানীপুরের মামাবাড়িতে। দাদামশাইয়ের নাম ছিল ঠাকুরদাস চট্টোপাধ্যায়। ভবানীপুর তখন ‘মারাঠা খাল’-এর সীমানার বাইরে। অতএব লাটসাহেবদের সাধের ‘ক্যালকাটা’-র আওতায় পড়ে না। সেখানে খানা খন্দ, মশা-মাছির আড়ত। মিশনারিরা অবশ্য সেসবের তোয়াক্কা না করেই স্কুল খুলেছিলেন। সেরকমই এক স্কুল হল ভবানীপুর ইউনিয়ন স্কুল। সেই স্কুলেই ভর্তি হয়েছিলেন হরিশ। মেধাবী ও পরিশ্রমী ছাত্র ছিলেন বলেই জানা গিয়েছে, তবে বিশেষ সঙ্গতি না থাকায় ছ-সাত বছরের বেশি যে পড়তে পারেননি, সেকথাও জীবনীকাররা জানিয়েছেন।
তেরো-চোদ্দ বছর বয়সে যখন পোস্ট অফিসের সামনে দোয়াত কলম নিয়ে বসতে হচ্ছে হরিশকে, ইংরিজিতে চিঠিপত্র বা মানি অর্ডার ফর্ম পূরণ করে দু-এক পয়সা উপার্জনের আশায়, ততদিনে কোম্পানির শাসনকাল, যদি পলাশীর যুদ্ধের সময় থেকে ধরা হয়, আট দশক পার করে ফেলেছে। বুদ্ধিতে শ্রেষ্ঠ জাতি মাথায় বসেছে বলে কথা, ‘উপহার’-এর তাই অন্ত নেই। দেশীয় শিল্পের অমন সরেস বাজারটি স্রেফ ভ্যানিশ, কৃষি ব্যবস্থার বারোটা বেজে গিয়েছে, শিল্পবিপ্লবের অজুহাতে প্রাকৃতিক সম্পদ চালান হয়ে যাচ্ছে বাইরে, গ্রামে গ্রামে অনাহার-দুর্ভিক্ষ। এর সঙ্গেই কালে কালে এল আরও এক মহার্ঘ দান – বেকারত্ব। গরীব বামুনের ঘরে জন্মানো হরিশ হাড়ে হাড়ে অনুভব করলেন এই শেষ উপহারটি। ইংরিজির পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই, একটা পাস অবধি দিতে পারেননি। পাস করা ছেলেপিলেরাই চাকরি পাচ্ছে না, তিনি কোন ছার। কয়েকবছর নীলাম সংস্থা টলা অ্যান্ড কোং-য়ে মাসিক দশ টাকা বেতনে বিল লেখকের কাজ করলেন, সে কাজও গেল কর্তৃপক্ষ বেতন বাড়াতে রাজি না হওয়ায়। ১৮৪৮ সালে মিলিটারি অডিটর জেনারেলের অফিসে মাসিক ২৫ টাকা বেতনের আপাত নিরাপদ কেরানির চাকরিটি পাওয়ার আগে অবধি একেকদিন একবেলা খেয়েও কাটাতে হয়েছে তাঁকে।
অডিটর জেনারেল কর্নেল চ্যাম্পনিজ ও তাঁর ডেপুটি, কর্নেল গোল্ডি, হরিশের কর্তব্যনিষ্ঠায় খুশি হয়েছিলেন। ফলে মাস মাইনে ক্রমশ দ্বিগুণ হতে হতে একসময় ৪০০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছিল। হতদরিদ্র অবস্থা থেকে এমন ঈর্ষণীয় উত্থান তাঁর চেয়ে বছর চারেকের বড় ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে, কিন্তু সে তুলনায় অমিলই থাকবে বেশি। বিদ্যাসাগরের মত শিক্ষালাভ বা উপাধি লাভের সুযোগ, কোনোটাই তাঁর ছিল না। যেটুকু ইংরিজি শিক্ষা, পাশ্চাত্য সভ্যতার দোষগুণ সম্পর্কে জ্ঞান হরিশের হয়েছিল, সবটাই নিজস্ব উদ্যোগে। অফিস ছুটির পর তিনি মেটকাফ হলের পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়ে বসছেন, পাতার পর পাতা এডিনবরা রিভিউ গোগ্রাসে গিলছেন, পাশ্চাত্যের গ্ল্যামার সরে গিয়ে তাঁর চোখের সামনে একটু একটু করে খুলে যাচ্ছে শোষণের অন্ধকার জগত, নিজের অজান্তেই সমকালীন ইংরিজি-শিক্ষিত বাবুদের চেয়ে সমাজভাবনায় কয়েক কদম এগিয়ে যাচ্ছেন অজ পাড়া গাঁ ভবানীপুরের হরিশ। এ সমস্ত পরিশ্রমের সার্থকতা তিনি পেলেন দ্য হিন্দু প্যাট্রিয়ট কাগজের দায়িত্ব পাওয়ার পর।
আরো পড়ুন বাংলা সাংবাদিকতা: সততা ও নিরপেক্ষতার মূর্ত প্রতীক
১৮৫৩ সালে বড়বাজারের মধুসূদন রায় দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই কাগজের প্রথম সম্পাদক ছিলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ (নাট্যব্যক্তিত্ব নন)। হরিশ্চন্দ্র কোন সময়ে যোগ দিয়েছিলেন তা জানা যায় না, তবে বিভিন্ন সূত্র বলছে গ্রাহক-বঞ্চিত এ কাগজের স্বত্ব তিনি কিনে নেন ১৮৫৫ সালে। সরকারি কর্মচারী হওয়ার দরুন অবশ্য স্বত্ব কিনতে হয় দাদা হারাণচন্দ্রের নামে। হরিশের সম্পাদনা পর্বের সময়টা লক্ষ করার মত। যে বছর হরিশ প্যাট্রিয়টের দায়ভার বুঝে নিচ্ছেন, সেবছরই বিদ্রোহ ঘোষণা করছেন সাঁওতালরা। তার পরের বছরই ফেব্রুয়ারি মাসে স্বত্ববিলোপ নীতি কায়েম হচ্ছে অযোধ্যার উপর। প্রবল বিরোধিতা, খেউড় সত্ত্বেও বড়লাট ডালহৌসির বদান্যতায় আইনসভায় পাস হয়ে যাচ্ছে বিধবা বিবাহ আইন। ১৮৫৭ সালে বেধে যাচ্ছে মহাবিদ্রোহ, তার জেরে পরের বছর ভারতের শাসনক্ষমতা চলে যাচ্ছে রানি ভিক্টোরিয়ার হাতে। সবশেষে নীলবিদ্রোহের মত এক অভূতপূর্ব কৃষক সংগ্রাম।
হরিশ সম্পাদিত প্যাট্রিয়টের যে কয়েকটি সংখ্যা এখনও জাতীয় গ্রন্থাগারে নেড়েচেড়ে দেখা যায়, সবই মাইক্রোফিল্মে সংরক্ষিত। আট পাতার সাপ্তাহিক কাগজ, ১২ মে ১৮৫৯ অবধি প্রকাশিত হত প্রতি বৃহস্পতিবার, ২১ মে থেকে পত্রিকা প্রকাশের দিন বদলে যায় শনিবারে। হরিশের মৃত্যুর তিন দশক পরে দৈনিক কাগজে উত্তরণ ঘটে। সরকারি বিজ্ঞপ্তি, নিবন্ধ, সম্পাদকীয় কলাম, হরেক কিসিমের খবর, বইয়ের আলোচনা, সরকারি ও বেসরকারি বিজ্ঞাপন, আট পাতার মধ্যে জায়গা পেত সবই। লেখার নিচে লেখকদের নাম থাকত না। নরেশ সেনগুপ্তের করা হরিশের রচনার যে সংকলনটির কথা ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি, সেই সংকলনে সম্পাদক স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে এ কাজ অনেকটাই লিখনশৈলীর উপর নির্ভর করে করতে হয়েছে তাঁকে। কারণ প্যাট্রিয়টে নিবন্ধকারের নাম দেওয়া থাকত না। তাঁর নির্বাচনকে মোটামুটি সঠিক বলে ধরে নিলে হরিশের ক্ষেত্রে ‘সাংবাদিক-কেশরী’ অভিধাটি বেশ মানানসই মনে হতে পারে।
সমকালীন ইংরিজি-শিক্ষিত সমাজের সুরে সুর মিলিয়ে প্যাট্রিয়ট স্বাগত জানিয়েছে বিধবা বিবাহ আইন বা স্ত্রীশিক্ষার প্রসারকে। কিন্তু বিরোধিতা করেছে সাঁওতাল বিদ্রোহের। সে যুগটা গ্রাম কেটে শহর বাড়ানোর যুগ, বন-মাঠ ধ্বংস করে শিল্প গড়ার যুগ। তখন পাশ্চাত্যের রোশনাইতে ঝলমল করে কলকাতা শহর, সাহেবদের তোষামোদ করে ক্ষীরটুকু দিব্যি উদরস্থ করেন বাবুসমাজের কেউকেটারা। তাঁদের কাছে জঙ্গলবাসী উপজাতিদের জীবন সংগ্রাম স্রেফ ফালতু হ্যাঙ্গাম ছাড়া কিছুই নয়। সম্পাদকজীবনের শুরুতে এ দোষ থেকে মুক্ত ছিলেন না হরিশও। ইংরেজরা বিদ্রোহ দমনে বিশেষ সুবিধা করতে পারছে না – এ বিষয়ে তিনি ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।
এই হরিশকেই আবার দেখছি, অন্যায়ভাবে অযোধ্যার শাসনভার কেড়ে নেওয়ায় লর্ড ডালহাউসির সমালোচনায় খড়্গহস্ত। যে অপশাসনের ধুয়ো তুলে ব্রিটিশ সিংহ কেড়ে নিল ওয়াজেদ আলি শাহের রাজ্যপাট, সেই অপশাসন সম্পর্কে প্যাট্রিয়ট সরাসরি ঘোষণা করছে ‘It is barely just, nevertheless, to note that Oude misgovernment was, in a great measure, the result of British policy.’ (Oude Misgovernment, July 31, 1856)
মহাবিদ্রোহের সময় থেকে প্যাট্রিয়টের বয়ানের এক ধীর কিন্তু আমূল রূপান্তর চোখে পড়ে। সাংবাদিকের আদর্শ মেনে হরিশ্চন্দ্র খুঁজতে যাচ্ছেন বিদ্রোহের কারণ। যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরাট অংশের মানুষ ধর্মে মুসলমান, সেই বাহিনীকে আফগান যুদ্ধে পাঠানো যে সরকারের তরফে কত বড় মূর্খামি, হরিশের পক্ষে এ সত্য বোঝা অসম্ভব হয়নি। কার্তুজের খোলে গরু ও শুয়োরের চর্বি মাখানোর ঘটনা, তাঁর মতে, একখানি উপলক্ষ মাত্র। বরং বিদ্রোহের কারণ হিসাবে তাঁর কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে অন্য কিছু: ‘The sepoys began to fear not only for their caste and their pay, but likewise for their lands.’ (The Causes of Mutiny, June 1858) বক্তব্যের ধার থেকে অন্তত একথা স্বীকার্য, এই বক্তব্য নিছক একজন মাছিমারা কেরানি গোছের কোনো প্রতিবেদকের নয়। বরং ইতিহাস ও রাজনীতি সচেতন এক বিশ্লেষকের বলিষ্ঠ ভাষণ। বশংবদ গণমাধ্যম ও জনতার হুজুগকে তিনি বিশ্বাস করেন না, তাঁর লেখনী দাঁড়িয়ে থাকে বস্তুনিষ্ঠ পড়াশোনা আর যুক্তিবাদের উপর। সে কারণেই হয়ত মহাবিদ্রোহের সর্বভারতীয় চরিত্রকে এককথায় স্বীকার করে নিতে এই মানুষটির অসুবিধা হয় না। বিদ্রোহ যখন দানা বাঁধছে, সেইসময় তো তিনিই লিখলেন: ‘There is not a single native of India who does not feel the full weight of the grievances imposed upon him for the very existence of the British rule in India – grievances inseparable from subjection to a foreign rule.’ (The Country and the Government, May 21, 1857)
হ্যাঁ, বিদ্রোহ চলাকালীন বড়লাট ক্যানিংকে তিনি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন। লর্ড অকল্যান্ড বা লর্ড ডালহাউসির তুলনায় ‘ক্লেমেন্সি ক্যানিং’-কে সেই মুহূর্তে তাঁর হিতকর বলে মনে হয়েছিল (এখনকার ভাষায় ‘লেসার ইভিল’ বলা যায়)। সাম্রাজ্যবাদী কূটনীতি অমন অগ্নিগর্ভ সময়ে তিনি বুঝতে পারেননি। বিদ্রোহী সেনার ইংরেজ হত্যাকেও তিনি নিন্দার চোখে দেখেছেন। ফলে সমালোচনার উর্ধ্বে নন হরিশ। কিন্তু একই সময়ে দ্য ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া, ঢাকা নিউজ, বেঙ্গল হরকরা বা দি ইংলিশম্যান-এর মত কাগজ যখন নেটিভ দমনে ক্রমাগত উস্কানিমূলক লেখা ছেপে চলেছে, ‘ক্যানিং যথেষ্ট কড়া প্রশাসক নন’ – এই মর্মে তাঁর পদত্যাগ দাবি করছে লুটেরা শ্বেতাঙ্গ সমাজ, সেপাইদের অপরাধে রং চড়িয়ে যথাসম্ভব মিথ্যাচার চলছে, সেই মুহূর্তে একমাত্র হিন্দু প্যাট্রিয়টই এই সবকটি অপকর্মের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রেখেছিল। আর সমকালীন সীমাবদ্ধতার প্রশ্নই যদি ওঠে, হরিশ নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন তাঁর ‘The Atrocities and Retribution’ নিবন্ধে ‘History will, we conceive, take a very different view of the facts of the Great Indian Revolt of 1857 from what contemporaries have taken of them.’ উপলব্ধির অক্ষমতাকে এমনভাবে অনুভব করতে সমসাময়িক আর কজনই বা পেরেছেন?
সেই অনুভব সঞ্জাত প্রায়শ্চিত্তই বুঝি আমরা দেখলাম স্বল্পায়ু জীবনের শেষ কয়েক বছরে। নীলচাষ নিয়ে তার আগে থেকেই হিন্দু প্যাট্রিয়টের পাতায় রায়তদের পাঠানো চিঠি ছাপছেন হরিশ। শহরের পাঠকের কাছে একটু একটু করে ফুটে উঠছিল ঔপনিবেশিক শোষণের বীভৎস মজা। পাঁচের দশকের শেষ থেকে প্যাট্রিয়ট সম্পাদক উঠে পড়ে লাগলেন। নদীয়া, যশোর, পাবনার গ্রামে গ্রামে গিয়ে দেখে এলেন তাঁদের মদ-মেয়েছেলে সমৃদ্ধ বিলাসী জীবন থেকে খানিক দূরেই কী সুষ্ঠু নিপীড়নের অভেদ্য পরিকাঠামো বানানো হয়েছে এত দশক ধরে।
সেই কবে, ১৭৭৭ সালে এক ফরাসি সাহেব এদেশে নীলের বীজ এনে পুঁতেছিল। সে বীজ ততদিনে ডালপালা মেলে নতুন প্রবাদের জন্ম দিয়েছে ‘নীলকর সাহেব হয় ভারী খুশি/বছর শেষে ঘরে জেতার হাসি/নীলের বাক্স, লাখ টাকার রাশি।’ তা জেতার হাসিই বটে। বেঙ্গল ইন্ডিগো কোম্পানির অধীনে পঞ্চাশের বেশি গ্রাম, বছরে প্রায় চার লক্ষ টাকা মুনাফা করছে (পার্থসারথি ভৌমিক অনুদিত ও সম্পাদিত নীলকর টমাস ম্যাচেলের দিনলিপি (১৮৪০-১৮৫২) থেকে সংগৃহীত তথ্য)। পাথুরেঘাটা আর জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের মত দেশীয় ধনীরাও সেই কোম্পানির অংশীদার। বিলেত থেকে ছেলেছোকরারা অশেষ কষ্ট করে জাহাজের খালাসির দলে ভিড়ে যায়। একবার ভারতের বাংলা প্রদেশে পৌঁছতে পারলে আর চিন্তা নেই। লাভই লাভ। জাহাজযাত্রায় ভগ্নস্বাস্থ্য বিলিতি ছোকরা তখন দাপুটে সাহেব বনে যায়, দাদুর বয়সী দেশি লোক তার ভয়ে কাঁপে। মদ, দেদার শিকার, নৌকাবিহার, মাঝেমধ্যে দু-একজন করে মেয়েমানুষ – ব্যাপারই আলাদা।
ওদিকে ধান, পাট, সবজি ফলানো চাষাভুষো মানুষ নিরুপায় হয়ে দাদন নিয়ে নীল ফলাতে বাধ্য হয়। সেই নীল দিয়ে তৈরি হয় ব্লু ডাই, সেই ডাই চলে যায় দূর বিলেতে। রাজার দেশে শিল্প হচ্ছে বলে কথা, প্রজার এতটুকু আত্মত্যাগ না করলে চলে? নীলচাষে বা দাদন নিতে অসম্মত হলেই আছে চাবুক। আরও বেগড়বাই করলে পোষা লেঠেল দিয়ে ঘর জ্বালানো, ক্ষেত পোড়ানো, গুমখুন আর খেয়ালখুশি মতো গ্রামের মেয়ে-বউদের তুলে নিয়ে গিয়ে শ্লীলতাহানি, ধর্ষণের মত শাস্তি। প্রশাসন সব জেনেও ঠুঁটো জগন্নাথ, ঘুষ খেয়ে খেয়ে ম্যাজিস্ট্রেটদের কোটিপতি হওয়ার জোগাড়, দু পয়সার সুবিধে নিতে কিছু জমিদার-মহাজনও ছিল। রাজভক্তি দেখাতে তাদের অত্যাচারের মাত্রাটা মাঝেমধ্যে বেশিই হত। প্ল্যান্টারদের দাপাদাপিতে মানুষ তো বটেই, দেশের শেয়াল, কুমির অবধি রাতারাতি উধাও হয়ে যেতে লাগল।
ভবানীপুরের প্রেসে তখন হরিশের নাওয়া খাওয়ার সময় নেই। মিলিটারি অডিটর জেনারেলের অফিসে সারাদিন কাজ, তারপর ফিরে এসে ঘাড় গুঁজে নীলকরদের অপকীর্তি ফাঁস। গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে তাঁর খবর-সংগ্রাহকরা। নিত্যনতুন অত্যাচার আর প্রতিরোধের খবর আসে, হরিশের কাছে পরামর্শ চাইতে আসেন দূর-দূরান্তের কৃষকরা, থেকে খেয়েও যান। অমন সাবলীল ইংরিজি ভাষার একখানা কাগজ কিনা হয়ে উঠছে গরীবগুর্বো, লেখাপড়া-না-জানা চাষিদের মুখপত্র। এবার আর রাখঢাক নয়, নীলকরদের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ প্রশাসনিক ব্যবস্থাকেও তুলোধোনা করে ছাড়লেন হরিশ: ‘We have said that the system of indigo planting as it now exists in Bengal is a system of organized fraud and oppression. This fact, though well-known throughout the country, has not been admitted in those quarters from which relief is to be expected. The legislations has not admitted it. The officials ignore it. The British public did not know it. Parliament does not know it. The civilized world has not an idea of it.’ (Indigo Planting)
আরও একখানি প্রবন্ধে (‘Planters’ Portraits’) দেখতে পাচ্ছি, বর্ণনা দিচ্ছেন নীলকুঠির ভেতরকার ফাটক ব্যবস্থার। পরপর মানুষের নাম। পাশে পাশে লিখে রাখা তাঁদের গ্রামের নাম, চাবুকের ঘায়ের হিসাব। বিদ্রোহ ঘোষণা করলে গ্রামছাড়া হতে হয়, জঙ্গলে গিয়ে লুকিয়ে থেকে দল গড়েন তাঁরা। তাঁদের মাথার উপর তখন ধার্য হয় মোটা অঙ্কের দাম। সাম্রাজ্যবাদী সরকারের নাকের ডগায় দিব্যি চলছে আরেকটি সমান্তরাল পুলিসি সরকার। দুই পক্ষই একে অন্যের সুবিধা দেখে। কারোর কিছু বলার নেই, করার নেই। একমাত্র বন্ধু ভবানীপুরের হরিশ মুখুজ্জে। অশান্তি-জর্জর তিনিও যে শান্তি খুঁজতে ডুবে যাচ্ছেন মদে, রাতে ছুটি মিললেই ছুটছেন বাইজিবাড়ি।
ওরই মধ্যে নীলদর্পণ লেখা হয়ে গেল, সরকারি টাকাতেই তার অনুবাদও ছাপা হয়ে গেল। আজব ব্যাপার! কে লিখল, কে-ই বা অনুবাদ করল, কেউ জানতে পারল না। শুধু সরকারের টনক নড়ার ফলে অনুবাদের প্রকাশক মহানুভব আইরিশ পাদরি রেভারেন্ড জেমস লংয়ের কারাদণ্ড আর জরিমানা হল। ‘অসাবধানতা’-র জন্য বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর জন পিটার গ্রান্ট বা ইন্ডিগো কমিশনের প্রেসিডেন্ট সেটন-কার – কেউই অবশ্য কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর হাত থেকে রেহাই পাননি। হরিশ ওদিকে দিনকে দিন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছেন।
কোণঠাসা নীলকর গোষ্ঠী মরণকামড় দিতে চাইছিল। নদিয়ার কাচিকাটা নীলকুঠির ম্যানেজার আর্চিবল্ড হিলস গ্রামের হরমণি দাসীকে জোর করে তুলে এনে ধর্ষণ করে। হরিশ এ খবর পত্রপাঠ ছেপে দেন প্যাট্রিয়টের পাতায়। সটান হরিশের নামে মানহানির মামলা উঠল নিম্ন আদালতে। ততদিনে অযত্নের শরীরে বাসা বাঁধছে ক্ষয়রোগ, আসুরিক পরিশ্রমে শক্তি ফুরিয়ে আসছে, মাস মাইনের টাকাও পুরোটাই খরচ হয়ে যায় কাগজ চালাতে, নীলকরদের সাহায্য করার তহবিলে। ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থাকে হরিশ ভালই জানতেন। হয়ত বুঝতে পেরেছিলেন যে এ লড়াইয়ে তাঁর পরাজয় নিশ্চিত। হলও তাই। যদিও মামলার ফলাফল দেখে যেতে পারেননি। যে বছর জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে দেবেন ঠাকুরের ঘরে জন্ম নিল চতুর্দশ সন্তানটি, বইয়ের আকারে প্রকাশিত হল মেঘনাদবধ কাব্য, বাংলা সাহিত্যজগতের অমন আশ্চর্য এক বছরেই চোখ বুজলেন বছর সাঁইত্রিশের সাংবাদিকটি – একা, সর্বস্বান্ত।
কবিয়াল বিদ্যা ভুনীর বাঁধা গানে বেজে উঠল নীলচাষীর কান্না ‘নীল বানরে সোনার বাংলা/করলে এবার ছারখার/অসময়ে হরিশ ম’ল/লঙের হল কারাগার/প্রজার আর প্রাণ বাঁচানো ভার।’ মেঘনাদবধের কবি স্বয়ং বন্ধুবর রাজনারায়ণ বসুকে চিঠি লিখতে লিখতে বিলাপ করে উঠলেন ‘His death would be a real loss, not to our literature, for he writes Feringishly, but, to the progress of independence of mind and thought.’
কিন্তু তারপরেই, অপ্রত্যাশিত বিস্মরণ। বাড়ির উপর ডিক্রি জারি হল, বিধবা বউ আর পুত্রহারা মাকেও হেনস্থা করতে ছাড়ল না নীলকররা, কালীপ্রসন্ন সিংহ আর গিরিশ ঘোষের দৌলতে বাড়িখানা কোনোমতে বাঁচল, স্মৃতি মন্দির স্থাপনের টাকার কিছুটা দিয়ে তৈরি হল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের নতুন ভবন। বাকি টাকার হিসাব নেই। ভারতে রাজনৈতিক সাংবাদিকতার সংজ্ঞা নির্মাণ করে যাওয়া সাংবাদিকের স্মৃতি বলতে নীল-সাদা হরিশ পার্কের একপাশে একখানা মার্বেলের স্মৃতিস্তম্ভ, যার সাদা রঙে কালোর ছোপ, লেখাও অস্পষ্ট। এমনকি স্মৃতিফলক লাগানো তাঁর বসতবাড়িটাও বামফ্রন্ট জমানাতেই ভেঙে ফেলা হয়েছিল, আমরা খবর রাখিনি।
হরিশ্চন্দ্র দেবতুল্য নায়ক ছিলেন না, সাম্রাজ্যবাদকে বুঝতে সময়ে সময়ে তাঁরও ভুল হয়েছে। বাবুসমাজকে দূরে রাখতে চেয়েও সেই সমাজের বদগুণগুলোর উর্ধ্বে নিজেকে নিয়ে যেতে পারেননি, লেখার মধ্যে স্ববিরোধিতাও সুস্পষ্ট। কিন্তু তিনি ১৮৫৮ সালের ক্ষমতা হস্তান্তরের চার্টারকে স্বাগত জানিয়েও স্বচ্ছন্দে বলতে পারতেন ‘The time is nearly to come when all Indian questions must be solved by Indians.’ (‘The Future of Indian Government’) বা লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে যখন ভারতীয় রাজনীতিকরা আসন বাগাতে উদগ্রীব, সেই প্রবণতাকে অসম্পূর্ণ আখ্যা দিয়ে যিনি সোজাসুজি ঘোষণা করতে পারতেন ‘What we want is not the introduction of a small independent element in the existing Council, but an Indian Parliament.’ (‘An Indian Parliament’)। এই লোকের দুঃসাহস নিয়ে অন্তত সন্দেহ থাকা উচিত নয়।
যাঁদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে ধনে প্রাণে শেষ হয়ে গেলেন হরিশ মুখুজ্জে, ইতিহাস সেই নীলকরদের পক্ষে থাকেনি। নীলচাষ বন্ধ হয়েছিল। হরিশ নিজে জেতেননি, জিতে গিয়েছিল তাঁর লড়াই। দীনবন্ধু মিত্রের মত, রেভারেন্ড জেমস লংয়ের মতো, বিশে ডাকাতের মত।
তাঁকে ভুলে থাকার অজুহাত আমাদের থাকতে পারে, অবমূল্যায়নের অধিকার নেই।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








