ত্রিয়াশা লাহিড়ী

আমরা যারা রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হই, মফস্বলি গন্ধ গায়ে মেখে মায়ের হাত ধরে কলকাতার স্কুলে পড়াশোনা করতে যাই, তাদের কাছে স্কুল-পরবর্তী জীবন অনেকটা সিনেমার মত বা চন্দ্রবিন্দুর গানের মত। কল্পনার ঘোর কাটে স্কুল চত্বর ছেড়ে কলেজে যাওয়ার পর। আমরা বাম জমানার কলেজ ক্যাম্পাস দেখিনি। ফলত ছাত্র ইউনিয়ন বলতে বুঝেছি তৃণমূল ছাত্র পরিষদের ছেলেদের গা-জোয়ারি, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, দাদাগিরি ইত্যাদি প্রভৃতি।

গতবছর অগাস্ট মাসে আর জি কর মেডিকাল কলেজে জুনিয়র ডাক্তারের গণধর্ষণ এবং খুনের ঘটনা বাংলা সহ গোটা দেশকে উত্তাল করেছিল। আন্দোলনে নেমে এসেছিল দল-মত-লিঙ্গ নির্বিশেষে সমস্ত বয়সের প্রতিবাদী জনতা। একটা বছরও ঘুরতে পারেনি, রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র কলকাতা শহরের বুকে আরও একটা ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে গেল ২৫ জুন। তৃণমূল ছাত্র পরিষদের নেতা মনোজিৎ মিশ্র সহ, জাইব আহমেদ আর প্রমিত মুখোপাধ্যায় নামে দুই স্যাঙাতকে নিয়ে সাউথ কলকাতা ল কলেজের এক ছাত্রীকে গণধর্ষণ করেছে বলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে। পুলিস এদের তিনজনকে তো বটেই, গ্রেফতার করেছে কলেজের এক নিরাপত্তারক্ষীকেও। মনোজিৎ ওই কলেজেরই প্রাক্তন ছাত্র, তৃণমূল ছাত্র পরিষদের ইউনিট সভাপতির দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। সে আবার পেশায় আইনজীবী, বর্তমানে কলেজের অস্থায়ী কর্মচারী। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ঘটনার সময়ে উপাধ্যক্ষ কলেজেই ছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি নাকি ৪৮ ঘন্টা পরে খবরটা জানতে পেরেছেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই ধর্ষণকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখা উচিত বলে মনে হয় না। আমরা জানি, তৃণমূলের ইউনিয়নের ছেলেদের চোখে মেয়েরা ‘মাল’। ফলে প্রতি সেশনে নতুন ব্যাচ এলে নতুন ‘মাল’ তুলতে দাদারা যে কোনো পন্থা অবলম্বন করতে তৈরি থাকে। নিজেদের মধ্যে অলিখিত প্রতিযোগিতাও চলে। এসব কথা বহু পুরনো, প্রাচীন প্রবাদের মত। তৃণমূল ক্ষমতায় থাকাকালীন রাজ্যজুড়ে যে ধর্ষণ সংস্কৃতি চালু হয়েছে, কসবায় ঘটে যাওয়া ঘটনা তারই অন্যতম প্রমাণ।

কী এই ধর্ষণ সংস্কৃতি? সংক্ষেপে বললে বলতে হয়, এ এমন এক সামাজিক সংস্কৃতি, যেখানে ধর্ষণকে অতি সামান্য ঘটনা হিসাবে দেখা হয় এবং যৌন সহিংসতাকে গণমাধ্যম ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে গ্রহণযোগ্য ও স্বাভাবিক করে তোলা হয়। এই সংস্কৃতি নারীবিদ্বেষী ভাষার ব্যবহার, নারীশরীরকে পণ্য হিসাবে উপস্থাপন এবং যৌন সহিংসতাকে রোমাঞ্চকর বা আকর্ষণীয় করে তোলার মাধ্যমে টিকে থাকে।

আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, আর জি করের ঘটনায় কলেজের অধ্যক্ষ জানতে চেয়েছিলেন, কর্মরত নির্যাতিতা অত রাতে সেমিনার রুমে কী করছিলেন? এবারও সাউথ কলকাতা ল কলেজের উপাধ্যক্ষ নয়না চট্টোপাধ্যায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, বর্তমানে কলেজে পরীক্ষা চলছে, কোনো ছাত্রছাত্রী আসছে না। তাহলে ঘটনার দিন কেন ওই ছাত্রী কলেজে উপস্থিত ছিল? তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আবার সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, একজন বন্ধু যদি বান্ধবীকে ধর্ষণ করে, তাহলে সেখানে প্রশাসন কী করবে? কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র বলেছেন, ওই ছাত্রী ওখানে না গেলে এই ঘটনা ঘটত না। অর্থাৎ তৃণমূলের রাঘব বোয়ালদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাকিদের কোনো দোষই ছিল না, ছাত্রীটি কলেজে গিয়েই অন্যায় করেছে।

হাঁসখালির ঘটনায় খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি জব্বর কথা বলেছিলেন। নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে। না থাকলে আরেকবার দেখে নিন।

আর জি কর আন্দোলন চলাকালীন জনৈক অভিনেত্রীকে নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় নানা কুরুচিকর কথাবার্তা লেখেন তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ এবং বীর ছাত্র নেতা দেবাংশু ভট্টাচার্য। ওই তুমুল আন্দোলনের মরশুমেও এঁরা চুপ থাকেননি, নিজেদের স্বরূপ অবলীলায় সামনে এনেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের এইসব প্রবাদপ্রতিম নেতাদের থেকেই যোগ্য উত্তরসূরি মনোজিৎরা শিখেছে কীভাবে মহিলাদের দমিয়ে রাখতে হয়, কোন অস্ত্র ব্যবহার করলে তাদের সবটুকু গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। একেই বলে ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, অনুশাসন’।

নির্যাতিতাকে দোষারোপ করা, যৌন নিপীড়নকে তুচ্ছ জ্ঞান করা, নির্যাতিতার পোশাক, মানসিক অবস্থা, উদ্দেশ্য বা অতীত নিয়ে জনসমক্ষে প্রশ্ন তোলা, সিনেমা ও টেলিভিশনে অপ্রয়োজনীয় লিঙ্গভিত্তিক হিংসা প্রদর্শন, যৌনতা নিয়ে কুরুচিপূর্ণ রসিকতা করা, ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো, পৌরুষকে কর্তৃত্ববাদ এবং যৌন আগ্রাসন হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা, পুরুষের সাফল্যের মাপকাঠি হিসাবে মেয়েদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকে তুলে ধরা – এসবই ধর্ষণ সংস্কৃতির ফসল। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে মনে করা হয়, উন্মুক্ত জীবনযাপনই মেয়েদের ধর্ষিত হওয়ার কারণ। পুলিশ প্রশাসনও অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ, গার্হস্থ্য হিংসার অভিযোগকে গুরুত্ব দেয় না। ছোট থেকে মেয়েদের শেখানো হয়, তারা কীভাবে ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচতে পারে, অথচ ধর্ষণ না করার শিক্ষা পুরুষদের দেওয়া হয় না। এই কারণেই বীর সিং (২০১৯), অ্যানিমাল (২০২৩) ইত্যাদি ছবিতে বিষাক্ত পিতৃতান্ত্রিকতার নগ্ন প্রতিফলন বক্স অফিসে ঝড় তোলে, নির্মাতারা কোটি কোটি টাকা কামান।

শুধুমাত্র পশ্চিমবাংলা নয়, দেশজুড়ে ছবিটা এমনই। ২০১২ সালের দিল্লির নির্ভয়া ধর্ষণকাণ্ড যখন দেশজুড়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দেয়, তখনও ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) হিসাব অনুযায়ী, ভারতে প্রতিবছর গড়ে ২৫,০০০ ধর্ষণের মামলা নথিভুক্ত হচ্ছিল। সেইসময় থেকে ধর্ষণের সংখ্যা কমেনি, বরং প্রতিবছরই ৩০,০০০-এর বেশি ধর্ষণের অভিযোগ জমা পড়েছে। ২০২০ সালে, কোভিড-১৯ অতিমারীর বছরটা ব্যতিক্রম ছিল। ২০১৬ সালে কিন্তু পরিস্থিতি ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছিল। সেবছর ৩৯,০০০-এর কাছাকাছি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। ২০১৮ সালের এক সরকারি রিপোর্টে প্রকাশ পায়, এদেশে গড়ে প্রতি ১৫ মিনিটে একজন করে মহিলা ধর্ষিত হন। আরও হতাশাজনক ব্যাপার হল, অপরাধীদের শাস্তি পাওয়ার হার অত্যন্ত কম। ২০১৮-২০২২ ধর্ষণের ক্ষেত্রে শাস্তির হার ছিল মাত্র ২৭-২৮%। এহেন তথ্য ভুক্তভোগীদের আইনের প্রতি আস্থা হারাতে বাধ্য করে। স্পষ্ট হয় যে অপরাধীদের ধরার বদলে রাষ্ট্র তাদের রক্ষা করে। আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই নিপীড়ন আরও নৃশংস হয়ে ওঠে। প্রান্তিক এলাকায় দলিত, আদিবাসী মহিলারা যেভাবে যৌন হিংসার শিকার হন তা অকল্পনীয়।

বাংলার প্রধান বিরোধী শক্তি বিজেপি প্রতিবারের মত এবারেও ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে পড়েছে। শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদার, সজল ঘোষ থেকে শুরু করে অগ্নিমিত্রা পাল – সকলেই কসবার গণধর্ষণের ঘটনা নিয়ে প্রতিবাদে সরব হয়েছেন। মনোজিতের চেয়ে জাইব আহমেদকে নিয়ে বিজেপির মাথাব্যথা বেশি থাকারই কথা, রয়েছেও তাই। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি একমাত্র ধর্মীয় মেরুকরণের রাস্তা ছাড়া অন্য কোনো পথেই পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে পারছে না। আর জি কর আন্দোলনেও তারা জায়গা পায়নি। কারণ বাংলার মানুষ জানে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে মহিলাদের দুর্দশার কথা; কাঠুয়া, উন্নাও, হাথরাস, মণিপুর, বিলকিস বানো, সাক্ষী মালিকদের করুণ ইতিহাস। যে বিজেপি ধর্ষকদের মালা পরিয়ে, মিষ্টি খাইয়ে ঘরে তোলে, তাদের মুখে তৃণমূল বিরোধিতার খই যতই ফুটুক, পশ্চিমবঙ্গের মহিলারা কখনোই এখানে তাদের এক ইঞ্চিও জমি দেবেন না।

ইতিমধ্যে বিজেপির পোস্টার বয় পদ্মশ্রী কার্তিক মহারাজের নামে চাকরি দেওয়ার নাম করে এক মহিলার সঙ্গে সহবাস, তারপর জবরদস্তি গর্ভপাত করানোর মত ভয়ানক অভিযোগ উঠে এসেছে। স্বভাবতই বিজেপির, থুড়ি হিন্দুত্বের, প্রচারক সন্ন্যাসীর পাশে দাঁড়িয়েছে বঙ্গ বিজেপি। যাঁরা ভাবছেন, ২০২৬ নির্বাচনে তৃণমূলের বিকল্প হিসাবে বিজেপিকে বেছে নেবেন, তাঁরা সময় থাকতে সতর্ক হোন। সংবিধানকে তছনছ করে যারা মনুবাদের শাসন চায়, তারা মহিলাদের সর্বদা পুরুষের অধীনে রাখতে চাইবে – এটাই স্বাভাবিক। এরা করবে বাংলার নারীদের ক্ষমতায়ন?

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকার ধর্ষণের মত অপরাধ রুখতে বিধানসভায় অপরাজিতা বিল পাস করিয়েছে। ধর্ষকদের ফাঁসি চেয়ে মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে তৃণমূল এর আগে মিছিলও করেছে। তবে কি সত্যিই মৃত্যুদণ্ড অপরাধের হার কমায়? নারীর অধিকারের পথকে সুগম করে তোলে? নারীবাদী সংগঠন ও নারী অধিকার কর্মীরা কিন্তু মনে করেন, মৃত্যুদণ্ড ধর্ষণ প্রতিরোধ করে না। বরং আমাদের সমাজ ও সরকারকে ধর্ষণ সংস্কৃতি সংক্রান্ত আসল প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া থেকে বাঁচায়। ওসবে মনে হয় – ধর্ষণ বিরল ঘটনা এবং অপরাধীরা অজানা কেউ। বাস্তব হল, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষক ধর্ষিত মেয়েটির পরিচিত ব্যক্তি।

কড়া শাস্তির জুজু দেখিয়ে অপরাধের হার কমানো যায় না। অপরাধ হলে সঠিক তদন্তের পর অপরাধীদের দ্রুত দোষী প্রমাণ করা এবং অভিযোগকারীর ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করার ব্যাপারেই রাষ্ট্রের তৎপর হওয়া প্রয়োজন। ২০১৩ সালের ৭ জুনের ঘটনা মনে আছে? উত্তর ২৪ পরগণার বারাসাত থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের গ্রাম কামদুনি। সেখানেও এক কলেজফেরত ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে দুই পা চিরে নৃশংসভাবে হত্যা করে নজন মদ্যপ যুবক। পরদিন সকালে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার হয়। কামদুনির ঘটনাতেও তদন্তকারীদের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, আর জি কর কাণ্ডেও প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ উঠেছিল।

ধর্ষকের শাস্তি কী হবে তার দিকে নজর দেওয়ার পাশাপাশি সরকারের উচিত মানুষের মধ্যে ধর্ষকাম মানসিকতার পরিবর্তন করার জন্য উপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করা। তার জন্য প্রত্যেক স্কুলে যৌনশিক্ষাকে পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। পুরুষ, মহিলা, প্রান্তিক যৌনতার মানুষ – সকলের নির্দিষ্ট বয়সের পর যৌনতা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা দরকার।

ধর্ষণ সংস্কৃতি নির্মূল করতে সরকারকে আগাম প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হয়, যা কখনোই কোনো ডানপন্থী দল করবে না। যদি করত তাহলে তাদের দলের অধিকাংশ নেতাকেই রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে নিতে হত অথবা লিঙ্গ সংবেদনশীলতার প্রাথমিক শিক্ষা নিতে হত। মনে রাখবেন, মনোজিৎ নিজেও অপরাজিতা বিলের সমর্থক। সেও সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিল যে ধর্ষকদের সাজা হওয়া উচিত ফাঁসি। অথচ সে এমন কাণ্ড ঘটিয়েছে, মৃত্যুভয় তাকে নিরস্ত করতে পারেনি। আমাদের আশেপাশে, ট্রেনে বাসে অহরহ যে হাতগুলো যৌনাঙ্গ ছুঁয়ে যায়, তারা প্রত্যেকে একেকজন মনোজিৎ। যাদের অভিধানে মহিলাদের সম্মতি বলে কোনো কথা নেই।

আসুন, ফেরা যাক মূল কথায়। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকে এক এক করে প্রায় সমস্ত কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় তৃণমূলের তোলাবাজি আর সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে। তাদের ছাত্র সংগঠন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কলেজগুলোতে হুমকি সংস্কৃতির সঙ্গে বিনামূল্যে প্রাপ্য হিসাবে পুরোদস্তুর ধর্ষণ সংস্কৃতির চাষ করে চলেছে। ক্যাম্পাস গণতন্ত্র বিপন্ন। খুন, ধর্ষণ, অ্যাসিড আক্রমণের হুমকি আকছার ইউনিয়ন থেকে মিলছে। অন্য কোন রাজনৈতিক সংগঠন না করলেও রক্ষা নেই। ইউনিয়নের দাদাদের আত্মসম্মানে আঘাত করার ‘অপরাধে’ এর আগেও বহু ছাত্রীর কলেজজীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। আগেই বলেছি, ল কলেজের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অথবা আচমকা ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়। তৃণমূলের দাদাগিরি-লুম্পেনরাজ-ক্রাইম সিন্ডিকেট – কোনোটাই নতুন নয়। ছাত্রী নিগ্রহের পর কর্তৃপক্ষের উদাসীন, নির্বিকার ভূমিকাও আমাদের অদেখা নয়।

আরো পড়ুন কলকাতা সত্যিই নিরাপদ? ‘পরিচিতি’ রিপোর্টে উঠছে প্রশ্ন

প্রেমে প্রত্যাখ্যাত নেতা তাই এবারেও নির্ভয়ে কলেজের ছাত্রীকে ইউনিয়ন রুমে নির্যাতন করেছে, পরে গার্ড রুমে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছে। নেতাকে সাহায্য করেছে তার দুই চ্যালা। হিম্মতের বাড়বাড়ন্ত চরমে পৌঁছেছে। নির্যাতিতা ছাত্রী সাহস করে অভিযোগ দায়ের করেছে বলে এতদিন পরে এমন খবর আমাদের চোখে পড়েছে। সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, মনোজিতের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিকবার শ্লীলতাহানি, যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উলটে মনোজিতের মত বহু তৃণমূলাশ্রিত সমাজবিরোধীকে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন দায়িত্বে বসিয়ে রাখা হয়েছে।

নির্যাতিতা নিজেকে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের কর্মী হিসাবে পরিচয় দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের মহিলা কর্মীদের জন্য এই ঘটনা অত্যন্ত ভয়ের। ইউনিয়নের দাদাদের নির্দেশে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের মহিলা কর্মীরা অনেক সময় কলেজের ভিতর যেসব মেয়ে তাদের ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে, সক্রিয় রাজনীতি করে, সরাসরি বলতে গেলে লাল ঝান্ডা ধরে – তাদের মারধর করে, হুমকি দেয়। আজ যে ঘটনা কসবায় ঘটেছে, সেই ঘটনা অন্য কোথাও যে ঘটবে না, তার নিশ্চয়তা দিতে পারবে তৃণমূল সরকার? এই ভয়ানক সময়ে তৃণমূলের মহিলা কর্মীদের ভেবে দেখা দরকার, দলটা তাদের জন্য কতখানি সুরক্ষিত?

রাজ্যজুড়ে কদিন ধরে পাড়ায় পাড়ায়, ক্লাবে ক্লাবে জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধনের পর প্রসাদ বিতরণ করেছে তৃণমূল। বিজেপির উগ্র হিন্দুত্বের রাজনীতিকে রুখতে তৃণমূল বিকল্প হিসাবে নরম হিন্দুত্বের মূর্তি জগন্নাথকে তুলে ধরেছে। উৎসবের মেজাজে সাধারণ মানুষকে মাতিয়ে রাখতে পারলেই যেন শাসক দল সফল। মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর মুখ আর ভোট কুড়োতে ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’-এর মত গালভরা নারীকেন্দ্রিক স্লোগানকে সামনে রেখে, আপামর বাংলার জনগণকে আর জি কর থেকে কসবার ঘটনা ভুলিয়ে দেওয়া যাবে না। কদিন আগে কালীগঞ্জে ভোট-পরবর্তী সন্ত্রাসের বলি হয়েছে ছোট্ট মেয়ে তমন্না খাতুন। সেই রক্ত হাত থেকে না উঠতেই আরও একটা সাংঘাতিক অপরাধ। কার কাছে বিচার চাইবেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী?

ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় না, অথচ ইউনিয়ন রুমগুলো খোলা কেন – সে জবাব কর্তৃপক্ষ দেবে না? কলেজে মহিলাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ, তবু কোনো হেলদোল নেই। পুলিশ কলেজের মাথাদের না ধরে কেনই বা শুধু নিরাপত্তারক্ষীকে গ্রেপ্তার করল? তার রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই বলে? জেন্ডার সেন্সিটাইজেশন কমিটি এগেইনস্ট সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট (GSCASH) সেলের দাবিতে পড়ুয়ারা বছরের পর বছর আন্দোলন করে গেলেও, ক্যাম্পাসগুলোতে এই সেল চালু করা যাচ্ছে না কেন? কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় আভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি নেই কেন? আর জি করের মেয়েটার জন্য ন্যায়বিচারের আন্দোলনে যে সামাজিক কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবিগুলো উঠে এসেছিল – সেগুলো এখন আরও একবার আমাদের ঝালিয়ে নিতে হবে। আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কেবলমাত্র কলকাতা আর শহরতলির মেয়েদের কানে নয়, দাবিগুলো পৌঁছে দিতে হবে জেলায় জেলায়, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।

দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে সাহসী হয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। নইলে স্থান-কাল-পাত্র বদলাবে মাত্র, কারণ-ফলাফল-পরিণতির চেহারাগুলো অবিকল এক থেকে যাবে। অন্যায় অপরাধ যখন সংগঠিত, তখন সংগঠিত ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ছাড়া আর কী বিকল্প আছে বলুন?

নিবন্ধকার বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.