সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতন্ত্র শব্দ দুটো বাদ দেওয়ার দাবি আবার তুলল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। জরুরি অবস্থার ৫০ বছর উপলক্ষে এক আলোচনাসভায় আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে এই দাবি তুলেছেন। আরএসএস তাদের শতবর্ষ পালনের পাশাপাশি জরুরি অবস্থার ৫০ বছর উপলক্ষেও নানা কর্মসূচি নিয়েছে। কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনকালের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় হল জরুরি অবস্থা। স্বাভাবিকভাবেই সংঘ পরিবার এ সুযোগ ছাড়বে না। ইতিহাসের পরিহাস – সেই জরুরি অবস্থার সময়েই কংগ্রেস সরকার ওই শব্দ দুটো সংবিধানের প্রস্তাবনায় যোগ করে। আর আজ যারা দেশজুড়ে অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি করেছে, তারা ৫০ বছর আগের সেই কালো অধ্যায়ের বিরোধিতা করার নামে আক্রমণের নিশানা করেছে ওই দুটো শব্দকে।

আরও বড় পরিহাস হল, আজকে হিন্দুত্ববাদীদের রমরমার জন্য অনেকে সেদিনকার ইন্দিরা গান্ধী সরকারবিরোধী আন্দোলনকে দায়ী করেন। তাঁরা ঘুরিয়ে এটাই প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেন, যে সেদিন জরুরি অবস্থার বিরোধিতা না করলে আজ এমন অঘোষিত জরুরি অবস্থার সামনে দেশকে পড়তে হত না। পাশাপাশি কংগ্রেস এখন বিজেপি সরকার ও সার্বিকভাবে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিরোধিতা করতে গিয়ে জরুরি অবস্থাকেও গৌরবাম্বিত করছে। এমনকি সেদিনের ইন্দিরাবিরোধী আন্দোলন বিদেশি মদতপুষ্ট ছিল – এই অভিযোগকে আবার প্রচারে আনছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৯৭৬ সালে জরুরি অবস্থা চলাকালীন ইন্দিরা সরকারের আনা সংবিধানের ৪২তম সংশোধনী বিচারব্যবস্থার এক্তিয়ার ও ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। মৌলিক অধিকারগুলোর উপরে আঘাত হানা হয়। পাশাপাশি এইসব কুকীর্তি ঢাকতে ওই সংশোধনীতে সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দ দুটো যোগ করা হয়। জরুরি অবস্থার বিরোধিতা ও সংবিধানের প্রস্তাবনায় এই শব্দগুলোর অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতাকে এক করে দিলে তৎকালীন ইন্দিরা সরকারকে সমাজতন্ত্রী বলে মেনে নিতে হয়, যা আদৌ সত্যি নয়। বিজেপি তথা আরএসএস আসলে জরুরি অবস্থার বিরোধিতার নামে ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক ভাবনাবিরোধী উগ্র দক্ষিণপন্থাকে আরও শক্তিশালী করতে চায়। অন্যদিকে উগ্র দক্ষিণপন্থার বিরোধিতা করতে গিয়ে সেদিনের জরুরি অবস্থাকে প্রত্যক্ষ বা প্রচ্ছন্নভাবেও সমর্থন করলে, বা সেদিনের ইন্দিরাবিরোধী আন্দোলনকে খাটো করলে, আজকের অঘোষিত জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে লড়া যায় না।

আরএসএস তথা বিজেপির সংবিধানবিরোধিতা নতুন নয়। হিন্দুরাষ্ট্র গড়া যাদের লক্ষ্য, তারা সমাজতন্ত্র তো বটেই এমনকি ধর্মনিরপেক্ষতা, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো – এসবেরও বিরোধিতা করবে, এটাই স্বাভাবিক। স্বাধীনতা আন্দোলনে যারা ব্রিটিশদের সহযোগী ছিল, তারা মতাদর্শগতভাবেই সংবিধানের চরিত্রের বিরোধী। সদ্যস্বাধীন দেশে মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করার মাধ্যমে তারা কোন ভারত চায় তা স্পষ্ট করে দিয়েছিল। আজ তারাই বলছে – ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র ভারতের সংবিধানের চরিত্রবিরোধী। অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের আমলে সংবিধান পরিবর্তনের ধুয়ো তোলা হয়েছিল। নরেন্দ্র মোদীর সরকার মসনদে বসার পর থেকেই সংবিধানের চরিত্র বদলাতে এই শব্দ দুটোকে নিশানা করেছে। বিজেপির মন্ত্রী, নেতারা বহুবার বহুরূপে সংবিধান থেকে এই শব্দ দুটোকে বাদ দেওয়ার কথা বলেছে। আরএসএসের অন্যতম শীর্ষনেতা সে দাবি আরও একবার তুলে আলোচনা উস্কে দিলেন।

এরপর দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড় বললেন, সংবিধানের প্রস্তাবনায় হস্তক্ষেপ বিশ্বাসঘাতকতার সামিল। কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাও একই দাবি করেছেন। সবাই মিলে এখন প্রতিপন্ন করতে চাইছেন – এই দুটো শব্দ ভারতের মূল সংবিধানের বিরোধী। সংবিধানের প্রধান ভাবনাকেই হিন্দুত্ববাদীরা নস্যাৎ করে দিতে চায়। আসলে এরা জানে যে, এই শব্দ দুটো বাদ দিতে পারলে সংবিধানের মূল চরিত্র বদলে দেওয়ার কাজ সহজ হবে।

গত বছরই নভেম্বর মাসে এই সংক্রান্ত একখানা মামলা খারিজ করে দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না ও বিচারপতি পিভি সঞ্জয় কুমারকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ বলেছিল, শব্দ দুটো সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। পশ্চিমী নয়, ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে একে বিচার করতে হবে। অর্থাৎ ভারতের সংবিধান, সংস্কৃতির সঙ্গে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

দেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় ১৯৫০ সাল থেকেই শব্দ দুটো না থাকলেও, সংবিধান স্পষ্টতই সমানাধিকারের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকারের ব্যবস্থা করেছে। সব নাগরিককে নিজের ধর্মাচরণের অধিকার দেওয়ার পাশাপাশি কোনো ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থেকে রাষ্ট্র যে বিরত থাকবে, তা প্রথম থেকেই স্পষ্ট করে দিয়েছে (অনুচ্ছেদ ২৫-২৮)। অন্যদিকে আর্থিক ও সামাজিক সমানাধিকারের কথা বলেছে। প্রত্যেক নাগরিকের সসম্মানে বাঁচার অধিকারকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। বিজেপি সংবিধানের এই মৌলিক চরিত্রই বদলে দিতে চায়।

সংবিধানস্বীকৃত সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে অবশ্য প্রথম থেকেই এদেশের শাসকরা আগ্রহী ছিল না। ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে তারা রাষ্ট্রের থেকে ধর্মের বিচ্ছিন্নতা নয়, সব ধর্মের সঙ্গেই সংশ্রবকে বুঝিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা কাজের বেলায় বিকৃত হয়েছে। যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি – আজ ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য সখ্য। ধর্মীয় কাজে সরকারের উদারহস্তে অর্থ ব্যয় এবং তাকে ব্যবহার করে ভোটব্যাংক গড়ার নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা চলছে। অযোধ্যার রামমন্দির থেকে দিঘার জগন্নাথ মন্দির সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা লঙ্ঘন করার নিদর্শন। সংবিধান কার্যকরী হওয়ার পর থেকেই যদি এর মূল চরিত্রকে সম্মান দিয়ে রাষ্ট্রকে ধর্ম, যে কোনো ধর্মীয় রীতিনীতি পালন থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হত তাহলে আজ এই পরিস্থিতি হত না। ইন্দিরার আমলেও সেই বিচ্যুতি দেখা গেছে। জরুরি অবস্থার সময়ে যাঁদের দাপটে ভারত সন্ত্রস্ত ছিল, তাঁদের অনেকের সঙ্গে আরএসএসের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ উঠেছিল।

আরো পড়ুন জরুরি অবস্থায় আমার ভূমিকার জন্য আমি গর্বিত

তাহলে জরুরি অবস্থার সময়ে ওই দুটো শব্দ প্রস্তাবনায় যুক্ত করা হয়েছিল কেন? ‘এশিয়ার মুক্তিসূর্য’ অভিধায় ভূষিতা ইন্দিরা বা তাঁর দল কংগ্রেস কি সত্যিই ওসবে বিশ্বাস করত?

জওহরলাল নেহরুর আমল থেকেই সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের ভারতের কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প দেখিয়ে শাসক জনমানসে নিজেদের সমাজতন্ত্রী বলে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর্থিক মন্দা কাটাতে জন মেনার্ড কেইনসের অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করতে শুরু করে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী শিবির। চাহিদা বাড়াতে ক্রেতার কেনার ক্ষমতা বাড়াতে হবে। তার জন্য রাষ্ট্রের ভূমিকা বাড়ানো দরকার। এই মডেলকে বলা হল – কল্যাণমূলক অর্থনীতি। জনকল্যাণকর রাষ্ট্রের ধারণা আর সমাজতন্ত্র এক নয়। ভারতের মত সদ্যস্বাধীন দুর্বল পুঁজিবাদী দেশে কেইনসিয় মডেলের প্রয়োজন ছিল আরও বেশি। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ভারি শিল্প গড়ে তোলা, জাতীয়করণের আসল লক্ষ্য ছিল পুঁজিবাদের ভিত শক্ত করা। রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের সেই মডেলকেই সমাজতন্ত্র বলে প্রচার করা হয়েছিল।

রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদকে সমাজতন্ত্র বলে চালানো হলেও সংবিধানে উল্লিখিত সমানাধিকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কোনো তাগিদ শাসকের ছিল না, অন্য রাজনৈতিক তাগিদ ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সখ্য বজায় রাখার পাশাপাশি সমাজতন্ত্রের তৎকালীন জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করার তাগিদ। তখন সমাজতন্ত্রের প্রতি সারা বিশ্বের মানুষেরই দুর্বলতা ছিল। ভারতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল শব্দটা ব্যবহার করত। ১৯৫৫ সালে তদানীন্তন মাদ্রাজের আবাদীতে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে বলা হয়, সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজ গড়া তাদের লক্ষ্য হবে। বর্ষীয়ান মার্কসবাদী, বিপ্লবী ত্রিদিব চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন ‘আজকাল এদেশের রাজনীতিতে সমাজতন্ত্র বা সোশ্যালিজম কথাটা খুব চলতি হইয়া গিয়াছে। এ দেশে সকল রাজনৈতিক দলই এখন ‘সোশ্যালিজম’ চান।…বিভিন্ন দল ও মতাবলম্বী লোকেরা সকলে মিলিয়া একইসঙ্গে সমাজতন্ত্রের কথা বলায় জনসাধারণের মনেও কিছুটা ধাঁধা লাগিয়া যাইতেছে।’ কেবল সাধারণ মানুষ নয়, কমিউনিস্টদের একাংশের মনেও ধাঁধা লেগেছিল। তার অবশেষ ইন্দিরা জমানাতেও থেকে গিয়েছিল।

ইন্দিরার ব্যাংক, খনি জাতীয়করণ উল্লেখযোগ্য ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ হলেও সমাজতন্ত্রের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না। আর্থিক ক্ষেত্রকে না বাঁচালে, বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত না করলে পুঁজিবাদের সংকট আরও বাড়ত। শিল্পের পরিকাঠামো গড়ে তুলতে খনি জাতীয়করণও প্রয়োজন ছিল। জাতীয়করণ করলে আর সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুললেই তাকে সমাজতন্ত্র বলা যায় না। বামপন্থীদের উপর সন্ত্রাস, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস সরকারের ১৯৭২-৭৭ সালের কালো অধ্যায় তারই প্রমাণ।

সাতের দশকে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদ ফাঁপরে পড়ায় দেশে দেশে রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়। ভারতেও তার ঢেউ আছড়ে পড়ে। আর্থিক সংকটের ফলে ইন্দিরা সরকারের উপর মানুষের ক্ষোভ বাড়তে থাকে। জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে সরকারবিরোধী আন্দোলন গণআন্দোলনের রূপ নেয়। তার মোকাবিলায় চূড়ান্ত স্বৈরাচারের পথ নেয় কংগ্রেস। ১৯৭৫ সালের ১২ জুন এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে ইন্দিরার সাংসদ পদই বাতিল হয়ে যায়। রাজনৈতিক সংকট সামলাতে কিছুদিন পরে, ২৫ জুন, জরুরি অবস্থা জারি করা হয়।

চূড়ান্ত স্বৈরাচারের পথ নেয় ইন্দিরা সরকার। বামেদের পাশাপাশি জয়প্রকাশের মোকাবিলা করতে সেই সময়েই ৪২তম সংবিধান সংশোধনীতে প্রস্তাবনায় সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ শব্দ দুটো যোগ করা হয়। ব্রিটিশ আমলে কংগ্রেস সোশালিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জয়প্রকাশ এদেশে সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রচারক ছিলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবী দলগুলোর সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। স্বাধীনতার পর প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে সরে থাকা সেই স্বাধীনতা সংগ্রামীই ইন্দিরা সরকারবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে রাজনীতিতে ফিরে আসেন। এর মোকাবিলায় ইন্দিরাকে সমাজতন্ত্রের মুখোশ পরতে হয়েছিল। নেহরুর মত ইন্দিরাও সমাজতন্ত্র সম্পর্কে জনমানসে ধাঁধা তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

বিগত শতকের সাতের দশকের সেই আর্থিক সংকটের জন্য আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদও ভোল বদলাতে শুরু করে। বিভিন্ন দেশে কেইনসিয় মডেল থেকে সরে গিয়ে বাজার অর্থনীতিতে ভরসা রাখার পর্ব আবার চালু হয়। বিশ্বে নয়া উদারনীতির সেই সূচনাপর্বে ভারত আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার (আইএমএফ) থেকে শর্তাধীন ঋণ নিয়েছিল। ১৯৮০ সালে সেই ঋণ গ্রহণ করা হয়েছিল ইন্দিরা সরকারের আমলেই। তারপর ১৯৯১ সালে নয়া উদারনীতির পথে ভারতের আনুষ্ঠানিক চলার শুরুও কংগ্রেস সরকারের মাধ্যমে। বলা যায়, নেহরু ঘরানার অর্থনীতি থেকে কংগ্রেস আমলেই ভারত সরে আসতে শুরু করে। ততদিনে কংগ্রেসবিরোধী রাজনীতিকে মূলধন করে হিন্দুত্ববাদীদের পায়ের তলার মাটি অনেকখানি শক্ত হয়েছে। কংগ্রেসবিরোধী আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে বামেদের ব্যর্থতা অবশ্যই সেজন্য দায়ী। তার সঙ্গে ভুললে চলবে না, নয়া উদারনীতির অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করার তাগিদ থেকে পুঁজিবাদী শিবির এ ব্যাপারে বড় ভূমিকা পালন করেছে।

নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতি চরিত্রগতভাবেই স্বৈরাচার চায়। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর আঘাত না হানলে পুঁজি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে পারে না। সেই কারণেই উগ্র দক্ষিণপন্থা তার সহায়ক হয়ে ওঠে। বিশ্বজুড়েই তাই আন্তর্জাতিক পুঁজির মদতে উগ্র দক্ষিণপন্থা শক্তিশালী হচ্ছে। জাতীয়করণের বদলে দেশগুলোর সম্পদের অবাধ বেসরকারিকরণ চলছে। সমাজতন্ত্র তো বটেই, ধর্মনিরপেক্ষতা আর সামাজিক সাম্যের ধারণাকেও আজ নিশানা করা হচ্ছে। নেহরু, ইন্দিরার সমাজতন্ত্র আসলে ছিল তৎকালীন আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অনুসারী। কংগ্রেসের হাত ধরে দেশে নয়া উদারনীতি এলেও কংগ্রেসের উদার গণতন্ত্র এখন পুঁজিবাদের কাছে বেমানান। বিজেপির মত উগ্র দক্ষিণপন্থী দলই নয়া উদারনীতির যথার্থ সঙ্গী। তাই কৌশলে উদারবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ এবং বামেদের এক পংক্তিতে বসিয়ে আক্রমণ করা হচ্ছে।

আরএসএস ও বিজেপি সংবিধানের প্রস্তাবনায় সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দ দুটোর উপস্থিতির বিরোধিতা করছে বটে, কিন্তু ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে যেভাবে বিচারব্যবস্থায় সরকারি হস্তক্ষেপ বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছিল, বিজেপি আজ সরাসরি সে কাজ করছে। ধনখড় নিজেই বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়েছেন। বিচারপতিদের নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও সরকার নাক গলাতে চাইছে। অবসরগ্রহণের পর বিচারপতিদের উঁচু সরকারি পদে বসিয়ে বা রাজনীতিতে যোগদানের সুযোগ করে দিয়ে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করা হচ্ছে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বি আর গাওয়াই তাই এক আলোচনায় অবসরের পর বিচারপতিদের রাজনীতিতে অংশ নেওয়া বা কোনো সরকারি পদে বসা অনৈতিক বলে মন্তব্য করেছেন।

সংবাদমাধ্যমের সরাসরি কণ্ঠরোধ করার দরকারও আজ হচ্ছে না। মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যমগুলো কর্পোরেট মালিকানাধীন। জরুরি অবস্থা জারি না করেই তাদের অধিকাংশকে গোদি মিডিয়ায় পরিণত করা হয়েছে। বিকল্প ধারার সংবাদমাধ্যম আর সোশাল মিডিয়ার উপর চলছে নজরদারি, জারি হচ্ছে নানাবিধ নিষেধাজ্ঞা।

দেশে গণতন্ত্র বজায় রাখার জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত শাসকের নির্দেশে চলছে। আইন বদলে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের চূড়ান্ত ক্ষমতা হাতে নিয়ে নিয়েছে শাসক দল। নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্যাবলী নাগরিকের কাছে প্রকাশ করার যে দায় কমিশনের আছে, তাকে অস্বীকার করে সরকার আইন বদলে বুথের সিসিটিভি, ওয়েবকাস্টিং ভিডিওর মত তথ্যে সাধারণ মানুষের নাগাল বাতিল করেছে। মহারাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হলেও কমিশন কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি, দেওয়ার সদিচ্ছাও দেখা যাচ্ছে না। এমনকি এনআরসি করতে না পেরে সরকার এখন নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে তা করাবে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতাই আজ বিরাট প্রশ্নের মুখে। সিবিআই, ইডির মত তদন্তকারী সংস্থাকে ঘৃণ্য রাজনীতির হাতিয়ার করে তোলা হয়েছে।

সংসদে বিরোধীদের আলোচনার সুযোগ নানা কৌশলে কমানো হচ্ছে। সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা না করেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইন পাশ করানো হচ্ছে। করোনা অতিমারির সুযোগ নিয়ে এমন একাধিকবার হয়েছে। গতবছর লোকসভা নির্বাচনের আগে বিদায়ী সংসদের দুই কক্ষের অধিকাংশ বিরোধী সাংসদকে তো সাসপেন্ডই করে দেওয়া হয়েছিল। সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকেও সুপরিকল্পিতভাবে দুর্বল করার চেষ্টা হচ্ছে। বিরোধী দল শাসিত রাজ্যগুলোতে রাজ্যপালদের দিয়ে ক্রমাগত রাজ্য সরকারকে দুর্বল করার চেষ্টা হচ্ছে। তামিলনাড়ু সরকারকে এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা পর্যন্ত করতে হয়েছিল, যার পরিণতিতে সুপ্রিম কোর্ট বিধানসভায় পাস হওয়া বিল নিয়ে রাজ্যপাল ও রাষ্ট্রপতির যা খুশি তাই করার অধিকারে রাশ টেনেছেন। সেটাই ছিল ধনখড়ের বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেওয়ার কারণ।

বিরোধী মতকে কোণঠাসা করতে ইউএপিএ-র মত অগণতান্ত্রিক আইনগুলোকেও যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারবিরোধিতাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে কারারুদ্ধ করা, হত্যা করা আজ স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অন্যের প্রতি বিদ্বেষের রাষ্ট্রনীতিকে প্রশ্ন করাও আজ দেশদ্রোহিতা।

এদিকে প্রাকৃতিক সম্ভারে পুঁজির আগ্রাসন নিশ্চিত করতে জল জমি জঙ্গল পাহাড় লুঠ করতে, আদিবাসী-বনবাসীদের উচ্ছেদ, এমনকি রাষ্ট্রদ্রোহী বলে হত্যা করাও চলছে। দেশের মানুষের বিরুদ্ধেই রাষ্ট্র চালাচ্ছে অঘোষিত যুদ্ধ।

ইদানীং ‘রাষ্ট্রবাদী’ শব্দটা খুব পরিকল্পিতভাবে চালু করার চেষ্টা চলছে। রাষ্ট্রের কোনো নীতিকে প্রশ্ন করা যাবে না, করলেই তার উপর আঘাত হানা হবে। নাগরিকরা যদি রাষ্ট্রের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য প্রকাশে বাধ্য হয়, তাহলে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকারও থাকে না। নয়া উদারনীতির ধর্ম মেনেই দেশজুড়ে জারি হয়েছে এই অঘোষিত জরুরি অবস্থা।

আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের তালে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের পথ নিতে বাধ্য হয়েছিল সদ্যস্বাধীন ভারত। তাকে লোক ভোলাতেই সমাজতন্ত্র বলে প্রচার করা হয়েছিল। জাতীয়করণের সেই পর্ব থেকে আজ নয়া উদারনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে পুঁজিবাদ। আজকের উপযুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে দরকার বিজেপির মত উগ্র দক্ষিণপন্থী দলকেই। রাষ্ট্রবাদের কথা বলে যারা শুধু অঘোষিত জরুরি অবস্থাই জারি করবে না, তাকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার চেষ্টা করবে। ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার বিরোধিতা যেমন ভুল ছিল না, তেমন আজ অঘোষিত জরুরি অবস্থারও বিরোধিতা আবশ্যক। পুঁজিবাদ টিকে থাকতে রূপ বদলে চলবে। তার মধ্যে কোনটা ভাল বা প্রগতিশীল, আর কোনটাই বা মন্দ, প্রতিক্রিয়াশীল – তা বাছতে গেলে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.