মানতাশা আহমেদ

গত ১৬ জুন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক খুব বেশি সাড়াশব্দ না করে একখানা গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে যে ভারতের পরবর্তী জাতীয় জনগণনা ১ মার্চ, ২০২৭ তারিখকে রেফারেন্সের তারিখ হিসাবে ধরবে। লাদাখ, জম্মু ও কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ডের ক্ষেত্রে তারিখটা ১ অক্টোবর, ২০২৬। এই ঘোষণা থেকে আমাদের অনেকের আশঙ্কা সত্যি হল, যে এদেশ যতদিনে আদমশুমারি হবে, ততদিনে শেষ আদমশুমারির ১৬ বছর পেরিয়ে যাবে। এত দেরি হওয়ার পদ্ধতিগত ও রাজনৈতিক কারণগুলো নিয়ে প্রচুর বিতর্ক চলেছে, কিন্তু ওসবের চেয়ে জরুরি এবং কম আলোচিত প্রশ্নটা হল – একটা দেশ জনগণনা না করলে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়?

উত্তরটার মধ্যে একেবারেই কোনো চমক নেই। সেইসব জনগোষ্ঠীই ক্ষতিগ্রস্ত হয় যারা চিরকাল প্রান্তিক ছিল। ভারতে জনগণনায় সামিল হওয়া স্রেফ একটা আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। এটা রাষ্ট্রের নজরে পড়ার এবং তার থেকে পরিষেবা পাওয়ার প্রথম ধাপ। জনগণনা ছাড়া কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার থাকে না আর তথ্য ছাড়া শাসন চালানো মানে হল আন্দাজে ঢিল মেরে কাজ করে যাওয়া।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

প্রথমদিকে সরকার জনগণনা করতে দেরির ব্যাখ্যা হিসাবে তুলে ধরেছিল কোভিড-১৯ অতিমারীকে। কথাটার মধ্যে ২০২১ সালে যুক্তি ছিল। কিন্তু ২০২২ সালের মাঝামাঝি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস কাছারি খুলে গিয়েছিল এবং জনসমাবেশও স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। তাহলে ২০২৩ বা ২০২৪ সালে জনগণনা চালু করা হল না কেন? এখন বোধ হচ্ছে যে এই দীর্ঘ বিলম্ব আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতা বা সুচিন্তিত রাজনৈতিক সময় নির্বাচনের ফল।

বিভিন্ন ঘটনায় মৃতের সংখ্যা, দারিদ্র্য এবং কর্মসংস্থানহীনতা ইত্যাদির তথ্য প্রকাশ করতে ভারতের ধারাবাহিক বিলম্ব সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অস্বস্তিকর চিত্র উঠে আসতে পারে এমন তথ্য চেপে রাখার যে বৃহত্তর নকশা, জনগণনা বারবার পিছিয়ে দেওয়া তারই অংশ বলে মনে হচ্ছে। এই প্রবণতার লক্ষণ প্রথম দেখা যায় ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকাল অফিসের করা ২০১৭-১৮ কনজিউমার এক্সপেন্ডিচার সার্ভেতে। দেশের দারিদ্র্য পরিমাপ করার জন্যে জরুরি এই সমীক্ষা সরকার বাতিল করে দেয় তথ্যের গুণমানে গোলমাল থাকার অজুহাতে। তবে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে যে চার দশকে প্রথমবার ভোগের মাত্রা কমে গেছে বলে ওই সমীক্ষায় পাওয়া গিয়েছিল, অর্থাৎ দারিদ্র্য তরতরিয়ে বেড়েছে। সেই সমীক্ষার সম্পূর্ণ রিপোর্ট প্রকাশ করার বদলে বা আবার সমীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়ার বদলে সরকার ওই তথ্য ধামাচাপা দিয়ে দেয়।

বেকারত্বের পরিসংখ্যানেও একই ধাঁচের পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। ২০১৭-১৮ সালের পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে (PLFS) নোটবন্দির কিছুদিন পরেই করা হয়েছিল। তাতে দেখা যায়, বেকারত্ব ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে – ৬.১%। তবুও সরকার ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে এই রিপোর্ট প্রকাশ করেনি। জাতীয় পরিসংখ্যান কমিশনের দুই সদস্য প্রতিবাদস্বরূপ পদত্যাগ করেন, সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কারণে তথ্য গোপন করার অভিযোগ তোলেন।

কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। সরকারিভাবে ভারত প্রায় ৪.৮ লক্ষ মৃত্যুর কথা জানায়। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) সহ একাধিক স্বাধীন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা আসলে প্রায় দশ গুণ বেশি হতে পারে, অর্থাৎ প্রায় ৪৭ লক্ষ মানুষ মারা গিয়ে থাকতে পারেন। সরকার হু-র হিসাব খারিজ করে দিলেও কোনো বিকল্প তথ্য দেয়নি, ফলে ভারতের সরকারি তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও কমে যায়। এই ঘাটতি শুধু মৃত্যুর পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নারী অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, দেশব্যাপী লকডাউনের সময়ে গার্হস্থ্য হিংসার ঘটনা ভীষণ বেড়ে গিয়েছিল, কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যানে যে হিসাব দেওয়া হয়েছিল তা আশ্চর্য রকমের কম। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, পুলিশের উপর অপরাধের পরিমাণ, বিশেষ করে যৌন অপরাধ ও গার্হস্থ্য নির্যাতনের পরিমাণ, কম করে দেখানোর চাপ থাকায় প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নথিভুক্ত হয়নি।

মৃত্যুর হিসাবের প্রসঙ্গে কুম্ভমেলার কথা না বললে চলবে না। নিউজলন্ড্রি ও বিবিসি দাবি করেছে, পদপিষ্ট হয়ে কুম্ভমেলায় মারা গিয়েছিলেন আসলে ৮২ জন, অথচ সরকারিভাবে বলা হয়েছে ৩৭ জন।

ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোকেও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। ২০১৭ সালে তারা তাদের বার্ষিক রিপোর্ট থেকে গণপিটুনি, ‘অনার কিলিং’ ও দলিতবিরোধী সহিংসতার মত বিভাগ বাদ দিয়ে দেয়, যদিও আগের খসড়ায় সেগুলো ছিল। সমালোচকদের মতে, এ ছিল তথ্য ধুয়ে মুছে সাফ করার চেষ্টা, যাতে এসবের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এড়ানো যায়। তাছাড়া যত দিন যাচ্ছে, এনসিআরবি ক্রমশ রিপোর্ট প্রকাশে দেরি করছে, পরিসংখ্যানের বিশ্লেষণ কমিয়ে ফেলছে এবং ধর্মভিত্তিক বা জাতিভিত্তিক হিসাব চুপিসারে বাদ দিয়ে দিচ্ছে।

আরও একটা উদ্বেগের ব্যাপার হল, জাতিভিত্তিক তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা, বিশেষ করে অনগ্রসর শ্রেণিগুলোর (ওবিসি) ক্ষেত্রে। ১৯৫১ সাল থেকে তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের সংখ্যার হিসাব করা হলেও, ওবিসিদের সংখ্যা ১৯৩১ সালের পর আর গোনা হয়নি। ২০১১ সালের আর্থসামাজিক ও জাতিভিত্তিক আদমশুমারি (এসইসিসি) এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু প্রাপ্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। সরকার দাবি করেছিল যে সেই তথ্যে অসঙ্গতি ছিল। ছেচল্লিশ লক্ষের বেশি কাস্টের নাম ছিল, যার অনেকগুলোই আসলে একাধিকবার উল্লিখিত বা ভুল বানানে বারবার নথিভুক্ত। অনেকের মতে, ওই বক্তব্য আসলে ওবিসিদের প্রকৃত সংখ্যা স্বীকার না করার অজুহাত। কারণ সংখ্যাটা ভারতের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি। তা প্রকাশ্যে এসে গেলে সংরক্ষণ এবং সম্পদ বণ্টনের কাঠামোর পুনর্বিন্যাস করতে হতে পারে, যা রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ব্যাপার। ফলে সরকার তা এড়িয়ে যেতে চায়। আসন্ন জনগণনার বিজ্ঞপ্তিতেও কিন্তু জাতিভিত্তিক গণনার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। পরে বলা হয় ওটা পরিকল্পনার অংশ, কিন্তু বাস্তবায়ন কীভাবে হবে তা এখনো বলা হয়নি।

এতগুলো উদাহরণ থেকে স্পষ্ট – ভারতের সরকারি তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা ক্রমশ তলানিতে ঠেকছে। ভারত এমন একটা দেশ, যেখানকার জনবিন্যাসে দ্রুত নানারকম পরিবর্তন ঘটছে। ২০১১ সালের পর থেকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া, নগরায়ন, জন্মহারের পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে বা বদলে গেছে। অথচ প্রধান জনকল্যাণমূলক নীতিগুলো এখনো সেই দেড় দশক পুরনো হিসাবের ভিত্তিতেই পরিচালিত হচ্ছে।

উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনের অধীনে গণবিতরণ ব্যবস্থা (পিডিএস) এখনো সেই ২০১১ সালের তথ্য ব্যবহার করে। ফলে আনুমানিক ১০ কোটির বেশি মানুষ এই ব্যবস্থার আওতা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছেন। একইভাবে মনরেগার তহবিল বরাদ্দ ২০১১ সালের গ্রামীণ জনসংখ্যার ভিত্তিতে হয়, যা উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের মত রাজ্যে জনসংখ্যা এবং কাজের চাহিদা যেভাবে বেড়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। স্বাস্থ্য প্রকল্পগুলোও এই ব্যবধানের শিকার। টিকাদান থেকে শুরু করে আয়ুষ্মান ভারত এবং সার্বিক টিকাকরণ প্রকল্প, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য পরিচর্যা – সবই সেই পুরনো হিসাবে চলছে। সত্যিকারের চাহিদা আর পরিকল্পিত পরিষেবার মধ্যে ব্যবধান, বহু বাড়তে থাকা অঞ্চলে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি করে এবং কর্মদক্ষতা কমিয়ে দেয়।

শহরাঞ্চলের উন্নয়নেও একই সমস্যা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা এবং অটল মিশন ফর রিজুভিনেশন অ্যান্ড আর্বান ট্রান্সফর্মেশনের মত প্রকল্প ২০১১ সালের নগরায়নের নকশার উপর ভিত্তি করে তৈরি। অথচ গত এক দশকে ছোট ও মাঝারি শহরগুলোর বিরাট বৃদ্ধি হয়েছে। ফলে বহু পৌরসভা এখনো অর্থের অভাবে ভুগছে এবং দুর্বল পরিকল্পনার শিকার।

শিক্ষা পরিকাঠামোও সত্যিকারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সমগ্র শিক্ষা অভিযানের অধীনে স্কুল নির্মাণ এবং শিক্ষক নিয়োগের নীতিও শেষ আদমশুমারিতে শিশুদের যে সংখ্যা পাওয়া গিয়েছিল তার উপর ভিত্তি করেই তৈরি। ফলে যেসব এলাকায় জনসংখ্যা বেশি বেড়েছে সেখানে ভিড় লেগে যায়, অন্যত্র সংস্থানের অপচয় হচ্ছে।

এমনকি রাজ্যগুলোর মধ্যে রাজস্ব বণ্টনের মত বৃহত্তর আর্থিক সিদ্ধান্তও ২০১১ সালের তথ্যের উপর নির্ভর করেই চলছে। যেমন ১৫তম অর্থ কমিশনের বণ্টন সূত্র। ফলে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো অসন্তুষ্ট। তারা মনে করছে, তাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়ার জন্য শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।

কারা সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত?

জনগণনায় দেরি হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সেই মানুষগুলোই, যাদের উন্নয়নের কথা রাষ্ট্র বারবার বলে – গরিব, ভ্রাম্যমাণ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, শহুরে অভিবাসী, যারা প্রায়শই কোনো পাকা কাগজপত্র ছাড়াই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হন। এঁরা সাতপুরনো তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি পরিকল্পনা কাঠামোর বাইরে পড়ে গেছেন। ২০২০-২১ সালের কিছু হিসাব অনুযায়ী এরকম মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ কোটি (জনসংখ্যার প্রায় ২৯%) হলেও, নগর পরিকল্পনায় এঁরা কার্যত অনুপস্থিত। কাগজপত্রে টাটকা তথ্য না থাকার ফলে এঁরা নিয়মিত রেশন কার্ড, আবাসন ও স্বাস্থ্য পরিষেবার মত মৌলিক পরিষেবাগুলো থেকে বঞ্চিত হন।

পলিসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাডভাইসারি গ্রুপের এক সমীক্ষা (ডিসেম্বর ২০২৩ – জুন ২০২৪) দেখায়, এক দেশ এক রেশন কার্ড প্রকল্প চালু হওয়া সত্ত্বেও অভিবাসীদের মধ্যে এর ব্যবহার অত্যন্ত কম। রাজস্থানে মাত্র ১৫.৯%, উত্তরপ্রদেশে ৪৩.৫%। অতিমারীর সময়ে তিন হাজারের বেশি উত্তর ভারতীয় অভিবাসীদের নিয়ে করা আরেকখানা সমীক্ষায় দেখা যায়, ৪২% রেশনের নাগাল পাননি এবং ৩৩% খাদ্য, জল ও নগদ টাকার চরম সংকটে পড়েছিলেন। এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে প্রশাসনের খাতায় অনুপস্থিতি এঁদের দুর্দশার কারণ।

এদিকে সংবিধানিক সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও দলিত ও আদিবাসীদের আজও ঠিক করে গোনা হয় না। ২০১১ সালে গ্রামাঞ্চলে ৭৯% আদিবাসী পরিবার এবং ৭৩% দলিত পরিবার সবচেয়ে বঞ্চিতদের মধ্যে ছিল। চলতি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, দলিত নারীরা প্রসবপূর্ব যত্ন বা হাসপাতালে সন্তান প্রসবের সুযোগ অন্যদের তুলনায় অনেক কম পান।

এনসিআরবি-র ধাঁচে করা সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হিংসাত্মক ঘটনা বাড়ছে। তফসিলি জাতির মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধ ২০২১ সালে ৫০,৯০০ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে হয়েছে ৫৭,৫৮২। এর মধ্যে উত্তরপ্রদেশেই ঘটেছে পনেরো হাজারের বেশি ঘটনা। কিন্তু অপরাধী সাব্যস্ত হওয়ার হার অত্যন্ত কম, প্রায়শই অর্ধেকেরও কম।

স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্যও প্রকট। উচ্চবর্ণের প্রায় ৬০% মানুষ বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা নেন। দলিতদের মধ্যে এই হার মাত্র ১৫% এবং আদিবাসীদের মধ্যে মাত্র ৪%। উদ্বেগের ব্যাপার হল, ২৬% দলিত নারী কোনো প্রসবপূর্ব যত্ন পাননি এবং আদিবাসী নারীদের মধ্যে রক্তাল্পতার হার ৬৫%। অন্য মহিলাদের মধ্যে কিন্তু ৪৮%। মাতৃসেবা, শিশুদের পুষ্টি এবং স্কুলের পরিকল্পনা শিশুদের পুরনো জনসংখ্যার তথ্যের উপর ভিত্তি করে চলায় নারী ও শিশুরাও স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। অথচ আসল জন্মহার বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্নরকম।

অতিমারীর মাঝামাঝি সময়ের তথ্য বলছে, ৭৬% অভিবাসী নারীর গন্তব্যস্থলে কোনো রেশন কার্ড ছিল না। প্রশাসনের খাতায় এই অনুপস্থিতি বাস্তব বঞ্চনার রূপ নেয়। পুষ্টি কর্মসূচি, প্রসবপূর্ব যত্ন ও শিশু টিকাদান প্রকল্প লক্ষ্যচ্যুত হয়। এমনকি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা পরিকাঠামোও এখনো ২০১১ সালের শিশু জনসংখ্যার তথ্যের উপর ভিত্তি করেই চলছে।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাও এর ফলে রাষ্ট্রের খাতায় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন ক্রমশ। ২০১১ সালের পর আর কোনো জনগণনা না হওয়ায় তাঁদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাস এবং সেই অনুযায়ী পরিষেবার চাহিদা অজানাই থেকে গেছে। অর্থাৎ শহুরে অভিবাসী, দলিত, আদিবাসী, নারী, শিশু ও সংখ্যালঘুরাই জনগণনা না হওয়ার ফল সবচেয়ে বেশি ভোগ করেন।

আরো পড়ুন বর্ণশুমারি শেষপর্যন্ত কার অস্ত্র হয়ে উঠবে?

২০১১ সালের পর আর আদমশুমারি না হওয়ায় ধর্মীয় জনবিন্যাস কীভাবে বদলেছে তাও যাচাই করা হয়নি। বিহারের ২০২২ সালের বর্ণশুমারির মত হিসাব ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক বৈষম্য তুলে ধরেছে। দেখা যাচ্ছে, তফসিলি জাতি ও উপজাতির ৪২.৯৩% মানুষের মাসিক আয় ৬,০০০ টাকার নিচে। কিন্তু এইসব তথ্য রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রতিফলিত হয়নি এখন পর্যন্ত। জাতীয় পর্যায়ে গণনা না হলে এই সম্প্রদায়গুলোর সমস্যা রাষ্ট্রের কাছে অস্তিত্বহীনই থেকে যায়। ফলে ন্যায্য নীতি তৈরি বা অগ্রগতির মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.