রতন থিয়াম যখন মারা গেলেন, তাঁর মৃত্যুশয্যার একটি ভিডিও ভাইরাল হল। সেই ভিডিওতে আমরা দেখছি, একটি মণিপুরী বাচ্চা তাঁর পায়ের কাছে বসে বাংলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছে। চিরকাল রতন যে কারণে বিখ্যাত, তা তাঁর দৃশ্যকল্প নির্মাণের ক্ষমতা। মৃত্যুর সময়েও তিনি এমন এক দৃশ্যকল্প তৈরি করে দিয়ে গিয়েছেন। সেই দৃশ্যকল্প প্রায় ত্রুটিহীন, কম্পোজিশন পর্যন্ত সঠিক। রতনের নাটকের কম্পোজিশন যেভাবে হত, প্রায় সেই কম্পোজিশন এই দৃশ্যে রয়েছে। ফোরগ্রাউন্ডে কয়েকজন মহিলা রয়েছেন, মিডগ্রাউন্ডে বাচ্চাটি রয়েছে, ব্যাকে রতন শুয়ে রয়েছেন। আর এই দৃশ্য ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন এদেশে বাংলা ভাষার উপর প্রবল আক্রমণ নেমে আসছে।
মৃত্যুশয্যার এই দৃশ্যকে আমি একটা শক্তিশালী রাজনৈতিক বক্তব্য হিসাবেই ধরব। এই ধরনের বক্তব্য তৈরি করতে পারার ক্ষমতা রতনের শেষদিন অবধি ছিল।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
তাঁর কাজের ক্ষেত্রে যা খেয়াল করতে বলব, তা হল তার ঘটনাক্রম। এই ঘটনাক্রম আমার কাছে খুব জরুরি। রতন ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামায় পড়তে যাচ্ছেন ১৯৭৪ সালে। তিন বছরের পাঠক্রম – ১৯৭৪, ’৭৫, ’৭৬ সাল জুড়ে চলছে। এই সময়েই ভারতে লাগু হচ্ছে জরুরি অবস্থা। স্থান কালের প্রেক্ষিতে এবার যদি বিচার করতে বসি, দেখব, রতন যে শহরে পড়তে যাচ্ছেন তার নাম দিল্লি। ওই শহরেরই জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে দাঁড় করিয়ে সীতারাম ইয়েচুরি নিজে পড়ে শোনাচ্ছেন ছাত্রদের সিদ্ধান্ত, এবং ইন্দিরা বাধ্য হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের পদ থেকে ইস্তফা দিতে। জরুরি অবস্থার কারণে সীতারামকে আত্মগোপন করতে হয়েছিল, তাই তাঁর পিএইচডি-ও শেষ করা হয়নি। অথচ সেরকম কোনোকিছু কিন্তু ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামায় ঘটছে না, অন্তত আমাদের জানা নেই।
কিন্তু একেবারেই কি ঘটছে না? এটাই সব থেকে বড় প্রশ্ন।
মণিপুর থেকে দুজন প্রবাদপ্রতিম নাট্যব্যক্তিত্ব উঠে এসেছেন, যাঁরা ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামায় গিয়েছিলেন। একজন রতন, আরেকজন রতনের কিছু আগের – হেইসনাম কানহাইলাল। মজার কথা, কানহাইলাল একবছরও ওখানে টিকতে পারেননি। এনএসডি ছেড়ে মণিপুরে চলে আসেন জোর করে হিন্দি আরোপের অভিযোগ জানিয়ে। হিন্দি চাপানো নিশ্চয় রতনের ক্ষেত্রেও হয়েছিল। তিনি নিজেও পরে বলেছেন, ওই তিন বছরের মধ্যে এনএসডি-র কোনো নাটকে তিনি অভিনয় করার সুযোগ পাননি। কিন্তু কানহাইলালের মত তিনি প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে বেরিয়ে আসেননি।
তাহলে রতন ঠিক কী করলেন? রতন বুঝে গিয়েছিলেন, অভিনয়ের সুযোগ তিনি পাবেন না। কারণ মণিপুরী হওয়ার কারণে তাঁর হিন্দি নড়বড়ে। ফলে গোটা সময় ধরে তিনি মনোনিবেশ করলেন আলোকসজ্জায়। সারাজীবন রতন এই বিভাগ নিয়েই কাজ করে গেলেন – এই ভাবনা আমার কাছে খুব মজার। পরবর্তীকালে ভারতের থিয়েটারের ক্ষেত্রে ‘সিনোগ্রাফি’ কথাটা যদি উত্থাপিত হয় এবং কোনো আইকনিক ব্যক্তিত্বকে যদি তার উদ্ভাবক বলা হয়, সেই ব্যক্তিটি হলেন রতন। তাঁর কাজ সম্পর্কে যাঁরা জানেন, যাঁরা তাঁর কাজ দেখেছেন, সকলে একবাক্যে বলবেন, রতন একজন মহান সিনোগ্রাফার। তাঁর উত্তর প্রিয়দর্শী নাটক দেখতে গিয়ে দর্শক চমকে উঠেছে। দর্শকের মনে হয়েছে, মঞ্চে বোধহয় একটা জ্যান্ত হাতি উঠে পড়েছে। এমনই অবিশ্বাস্য সিনোগ্রাফির ক্ষমতা নিয়ে রতন মঞ্চে আসতেন।
ঋতুসমহারম নাটকটি আমি দেখেছিলাম আজ থেকে প্রায় ২০-২৫ বছর আগে। সেখানে রতন একটি ‘স্টিল গ্রে লাইট’ তৈরি করেছিলেন। মনে রাখতে হবে, যখন এই প্রযোজনা হচ্ছে, তখন কিন্তু এলইডি আলো আসেনি। আজ যাকে আমরা ‘কালার টেম্পারেচার’ অনুযায়ী ‘কুল কালার’ বলি, সেরকম ‘কুল হোয়াইট টোন’ তিনি নাটকে তৈরি করতে পেরেছিলেন ওই সময়ে দাঁড়িয়ে। নাটকটির আরও একটি দিক উল্লেখ করার মত। পুরো নাটক ধ্রুপদী ধাঁচেই করা। তার দৃশ্যসজ্জা, পোশাক, সবকিছু ধ্রুপদী। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে, ঋতু পরিবর্তন চলছে, প্রকৃতি তার মত করে বদলাচ্ছে, জীবন বদলাচ্ছে। ওই নাটকে একটি চরিত্র ছিল – সে ওভারকোট পরে আছে, হাতে স্ট্রলার ব্যাগ, প্রায় শার্লক হোমস বা জেমস বন্ড-মার্কা চেহারা। এই চরিত্র মাঝেমাঝেই মঞ্চে এসে দাঁড়াচ্ছে ওই স্ট্রলার ব্যাগটি নিয়ে। এক ধ্রুপদী নাটকে আমেরিকান থ্রিলারের চরিত্রকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে স্থান কালের নিরিখে এক চূড়ান্ত বৈপরীত্য তৈরি করা হচ্ছে। দর্শককে তা ধাক্কা দেয় এবং ওই ধাক্কাই শেষ অবধি থেকে যায়।
এই বৈপরীত্য ঘোরতরভাবে রাজনৈতিক।
রতনের কাজের এই ধারাকে বিশ্লেষণ করতে বসলে আমি পুরো প্রকরণকে আরও একটু জটিল করে তুলব। আমরা আবার ফিরে যাই রতনের ছাত্রাবস্থায়, অর্থাৎ জরুরি অবস্থার দিনগুলিতে। আমি একটু আগেই বললাম, এনএসডি-তে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। পরে বিখ্যাত হয়েছেন এমন অনেকেই তখন সেখানে ছাত্র, তাঁদের ক্লাস নির্বিঘ্নেই চলেছে। রাজনৈতিক সংকট উপস্থিত হলে বলা হয়, থিয়েটার হয়ে ওঠে তার ‘ইমিডিয়েট রেসিপ্রোকেশন’। কিন্তু থিয়েটারের স্কুলেই তার প্রভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি না। ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা ছিল কংগ্রেসি ঘরানার পরিকল্পনার অংশ – এক ধরনের ‘ভারতীয় থিয়েটার’-এর ভাবনাকে সামনে রেখে তৈরি। আমার মতে যে ভাবনার আসলে কোনো অস্তিত্বই নেই, থাকা সম্ভবও নয়। ‘ভারতীয় থিয়েটার’-এর ভাবনা চূড়ান্তভাবে আরোপিত, এবং তা আসলে হিন্দি কর্তৃত্ববাদী থিয়েটার। এই চাপিয়ে দেওয়ার প্রকল্প শুরু হয়েছিল ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামার প্রাতিষ্ঠানিক পরিসর থেকে, ওই সময়েই। তার একটি বড় কারণ, ওই সময়ে থিয়েটারের জগতেও ফোর্ড ফাউন্ডেশনের অনুদান ঢুকতে শুরু করে। তার অঙ্ক ছিল বিরাট।
একথা আজ অনেকেই জানেন, ফোর্ড ফাউন্ডেশনের অনুদান প্রথম ঢুকেছিল কৃষিতে, তারপর সাংস্কৃতিক জগতে – অর্থাৎ প্রথমে এগ্রিকালচারে, তারপর কালচারে।
ঠিক যেভাবে পাঞ্জাবের চিরাচরিত কৃষিব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে সেই কৃষিকে পশ্চিমি পুঁজিবাদের অধীন করে তোলা হয়, একই ভাবে ফোর্ড ফাউন্ডেশন ভারতের সাংস্কৃতিক জগতেও প্রবেশ করে। সেই সময়ে থিয়েটারে যে প্রকল্পগুলি তারা নেয়, তার মধ্যে শাঁওলীদির (মিত্র) বিখ্যাত নাটক নাথবতী অনাথবৎ অবধি রয়েছে। এবার তাদের নীতিগুলি নিয়ে যদি আমরা বিশ্লেষণ করতে বসি, দেখব একটি প্রযোজনায় যে পরিমাণ টাকা লাগে, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা দেওয়া হচ্ছে। শর্ত হল, তুমি তোমার ভারতীয় থিয়েটারের শিকড়ে ফিরে যাও। ফলে সেইসময় যাঁরাই ফোর্ড ফাউন্ডেশনের টাকায় কাজ করেছেন, তাঁরাই পুরাণ, মহাকাব্যের গল্পে ফিরে গিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি কাজ হয়েছে মহাভারত নিয়ে। সে নাটকে তাঁরা প্রগতিশীল কথাই বলুন কি পশ্চাৎমুখী, কথাটি বলেছেন কোনো পৌরাণিক প্রসঙ্গ টেনে।
ভারতীয় থিয়েটারের যে ধাঁচা তৈরি করা হয়েছে, তার অন্যতম হল ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামাকে ধরে এই ধরনের হিন্দি কর্তৃত্ববাদী ধাঁচা বা পৌরাণিক কাহিনি নির্মাণের মাথা-ভারি ধাঁচা, যে পুরাণ অবধারিতভাবে হিন্দু পুরাণ। তার ভিত্তি আজকের বিজেপি তৈরি করেনি, তৈরি করেছে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার এবং ফোর্ড ফাউন্ডেশনের আনুকূল্যপ্রাপ্ত প্রত্যেক নির্দেশক সেই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করেছেন। আমি বলছি না যে, পুরাণ নিয়ে কাজ করা যাবে না। আমি এও স্বীকার করছি যে চিরায়ত সাহিত্যও সমসাময়িক। কিন্তু শুধুই পুরাণ বা ধ্রুপদী সাহিত্য কেন? বড় বড় নির্দেশকরা তাতেই আটকে গেলেন কেন? কারণ, সরকার আরোপিত প্রকল্প আর মার্কিন পুঁজি।
আরো পড়ুন তাপস সেন: আলো মানুষ, ভাল মানুষ
যাঁদের কাজের প্রসঙ্গে ওই শিকড়ের কথাটা ওঠে, তাঁদের মধ্যে একজনের নাম এখানে বলতে পারি। কেরলের পানিক্কর (কোভালম নারায়ণ পানিক্কর)। তিনিও ভাসের নাটক নিয়ে কাজ করেছেন। কর্ণভারম, উরুভঙ্গম-এর সফল প্রযোজনা করেছেন। ওঁর নাটকের বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি প্রকরণ বা আঙ্গিককে নানাভাবে ভেঙেছেন। যেমন, কুড়িয়াট্টম আর কালারিপায়াত্তুর ব্যাপক আধুনিকীকরণ ঘটে পানিক্করের হাত ধরে। কুড়িয়াট্টম ভারতের প্রাচীনতম নাট্যকলা। কুড়িয়াট্টমে যে ধরনের মেক-আপ হয়, তা দেখে অনেকেই পানিক্করের কাজে কথাকলির ব্যবহার হয়েছে বলে ভুল করে থাকেন, কিন্তু পানিক্কর কুড়িয়াট্টমেই কাজ করেছেন।
অনেকটা পানিক্করের ধাঁচেই প্রাচীন নাট্যকলার আধুনিকীকরণ হয় মণিপুরে, রতনের হাত ধরে। কালারিপায়াত্তুর জায়গায় তিনি মণিপুরের মার্শাল আর্ট ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ – রতন পৌরাণিক বিষয় নিয়ে কাজ করলেও তাঁর কাজে বরাবর জোরদার দ্বন্দ্বের জায়গা ছিল, গোটা ব্যাপারটি কোনোদিনই খুব সহজ ছিল না। তার কারণ রতনের মণিপুরী পরিচয়।
মণিপুরে যাঁরা থাকেন, তাঁরা কিছুদিন আগে পর্যন্ত ভারতের মূল ভূখণ্ডকে, মানে দিল্লি বা কলকাতাকে ‘ইন্ডিয়া’ বলতেন। অর্থাৎ এই যে হিন্দু পুরাণ নিয়ে কাজ করা হচ্ছে, সেই পুরাণ কিন্তু ওঁদের কাছে চাপিয়ে দেওয়ার সামিল। ওঁদের কাংলা ইতিহাসের পুরাণ সম্পূর্ণ আলাদা, ভারতের বাকি অংশের সঙ্গে মণিপুর বা উত্তর-পূর্ব ভারতের পুরাণের কোনো মিল নেই, থাকার কথাও নয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে রতনের কাজ এক মজার বৈপরীত্যের মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করায়। তিনি যেমন এই পৌরাণিক কাজ করার প্রকল্পে অংশ নিয়েছেন, একইসঙ্গে মণিপুরের স্থানীয় বিষয় আশয়কে ধারাবাহিকভাবে তাঁর নাটকে এত সুচারু পদ্ধতিতে ব্যবহার করেছেন, যার ফলে রতনকে খুব সহজে নিজেদের মত করে ব্যবহার করা যায় না।
খুব সোজা ভাষায় বলতে গেলে, রতনের ঋতুসমহারম বা কর্ণভারম প্রযোজনা আর পানিক্করের প্রযোজনার ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। ভাস যা বলেছেন, পানিক্কর তা মেনেই কর্ণভারম বা উরুভঙ্গম করেন। সেই একই নাটকে রতন যখন কাজ করছেন, তাঁর কম্পোজিশনের মধ্যে সিনোগ্রাফির প্রভূত প্রভাব রয়েছে। সেই কারণেই আমি বারবার বলছি, ‘সব ব্যাদে আছে’-র মত থিয়েটারের ক্ষেত্রেও ‘সব নাট্যশাস্ত্রে আছে’-মার্কা পশ্চাৎমুখী, গোঁড়া বয়ান খাড়া করে ‘ভারতীয় থিয়েটার’, আরও সরাসরি বলতে গেলে ‘উত্তর ভারতীয় হিন্দি থিয়েটার’-এর যে প্রকল্প নির্মাণ করা হয়েছে – যা আজ সফলভাবে ব্যবহার করতে পারে বিজেপি – সেই প্রকল্পে রতনকে জুতসই করে নেওয়া যাবে না। ভরতের নাট্যশাস্ত্র দক্ষিণ ভারতে মেনে চলা হয় বলে ওখানে এই পুরাণ প্রকল্প নিয়ে অসুবিধা হয় না, কিন্তু মণিপুর দক্ষিণ ভারত নয়।
ফলে রতন যেমন পৌরাণিক বিষয় নিয়ে কাজ করতে পেরেছেন, ম্যাকবেথ করতেও তাঁর কোনো অসুবিধা হয় না এবং সেই নাটকে সমসাময়িক মণিপুরী রাজনীতির প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন। তাঁর শরীরী ভাষায় বরাবর সেই প্রক্রিয়া কাজ করে এসেছে। আমি শুনেছি, তিনি নিজে খুব বড় শারীরিক ‘পারফর্মার’ ছিলেন, যদিও তাঁর কোনো অভিনয় আমি দেখিনি। কিন্তু মণিপুর বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষজনের শারীরিক যে গঠন – যার জন্যে আমরা তাঁদের ‘চিংকি’ বলে কটূক্তি করে থাকি – রতন জিনগতভাবেই তার উত্তরাধিকারী। তিনি কখনোই সেই শারীরিক উপাদান বা আঞ্চলিক উপাদানকে এড়িয়ে যাননি।
এই অনুশীলনের ফলে যা ঘটেছে, তার অসাধারণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন অনুরাগ কাশ্যপ। আমার মতে অনুরাগ একদম সঠিক উপমা ব্যবহার করেছেন যে, রতন হলেন ভারতীয় থিয়েটারের কুরোসাওয়া। আকিরা কুরোসাওয়ার ছবি দেখলেই দেখা যাবে, সেখানে সামুরাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে উঠে আসে। সামুরাইরা প্রাচীন জাপানি যোদ্ধা। আবার মেইতেই সংস্কৃতি, কাংলা পুরাণের নানা বিষয়, যেমন যোদ্ধা, সমরাস্ত্র, সমরসজ্জা, মার্শাল আর্ট, বৈষ্ণব সংস্কৃতি, এমনকি বৌদ্ধ সংস্কৃতির উপাদানেরও ব্যবহার রতনের নাটককে চেনায়। রতন যখনই যে নাটক করেছেন, বাস্তববাদের দায়ভার থেকে করেননি। আবার শুধুই ‘ভারতীয় থিয়েটারের শিকড়ে ফিরে চলার অভিযান’-কে বাকি ভারত যেভাবে বুঝেছে, যেভাবে চাপাতে চেষ্টা করেছে, রতন সেভাবেও করেননি।
তাঁর কর্ণভারম নাটকের একটি দৃশ্যের কথা বলি, যা সারা পৃথিবীকে চমকে দেওয়ার মত। ধনুকে ছিলা পরানো হচ্ছে। সেই ধনুক আসলে একজন পুরুষ অভিনেতার শরীর। সেই অভিনেতার হাত হল ধনুকের জ্যা। জ্যা যখন ছাড়া হচ্ছে, তখন তা যেভাবে লাফিয়ে ওঠে, অভিনেতার শরীরের ওই অংশও সেভাবে লাফিয়ে ওঠে। শরীরকে ব্যবহারের এই যে ভাবনা এবং তার রূপায়ণ, তার প্রেক্ষিতে অনুরাগের কথা ধরেই বলা যায় – এই অভিনেতা তাহলে তোশিরো মিফুনে (আকিরা কুরোসাওয়ার ১৬টি ছবির মূল অভিনেতা)। এই দৃশ্যকল্প নির্মাণ একইসঙ্গে যেমন বিস্ময়ের জন্ম দিচ্ছে, তেমনই অস্বস্তিও তৈরি করছে।
হাবিব তনভীরও তাঁর কাজে অস্বস্তি রেখে গিয়েছেন। তাঁর থিয়েটারকে শুধুই ‘ফোক থিয়েটার’ বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় না, আবার সে নাটককে এই ব্যবস্থা ফেলে দিতেও পারে না তার সক্ষমতার জন্য, কারিগরি উৎকর্ষের জন্য, যে উৎকর্ষে ভারতীয়ত্বের শিকড়, আচার সবই আছে, কিন্তু শুধুই তা নেই। হাবিবের কাজের মধ্যে ইউরোপিয় থিয়েটার প্রবলভাবে রয়েছে, তিনি হয়ত ছত্তিসগড়ের লোকশিল্পীদের নিয়ে কাজ করছেন, সেদিক থেকে তা ফোক থিয়েটারই বটে, কিন্তু কাজের মধ্যে অসম্ভব আধুনিকতা, যা আসলে ইউরোপিয় ঘরানা।
রতনও ঠিক তাই। তিনি আলোকসজ্জা শিখেছেন ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা থেকে, তাঁর মঞ্চসজ্জা বা আলো দেখলে অনেক কিছু শেখা যায়। এই যে আমি উত্তর প্রিয়দর্শী নাটকে মঞ্চে হাতি উঠে পড়ার বিস্ময়ের কথা বললাম, তা পুরোপুরি আলোর দ্বারা তৈরি, কিন্তু তা শুধুমাত্র ওই ভারতীয় থিয়েটার নামক প্রকল্প বা মণিপুরি লোক-উপাদান বা আচারকেন্দ্রিকতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। ইউরোপিয় ঘরানার অসম্ভব অত্যাধুনিক কারিগরি বোধ না থাকলে ওই প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। একইভাবে, এলইডি যখন আসেনি, তখন ঋতুসমহারম-এ ওই রং করাও কারিগরি দক্ষতা ছাড়া সম্ভব নয়। রতন জানতেন, টাংস্টেন স্টিলকে কতখানি ব্যবহার করবেন, ওয়ার্ম টোন কতখানি কেটে দেবেন। ফলে প্রতিষ্ঠানকে ওই একইরকম অস্বস্তিতে রতনও বারবার ফেলেছেন – তুমি আমাকে নিতেও পারবে না, ফেলতেও পারবে না, কেবলমাত্র আমার সক্ষমতার জন্য।
আশ্চর্য এই, যে ভারতীয় থিয়েটারের প্রকল্পকে এই দুজন ধাক্কা দিলেন, অথচ একসময় ভারতীয় থিয়েটার বলতে দাঁড়াল হাবিব আর রতন। কারণ তাঁদের চূড়ান্ত সক্ষমতা।
রতনেরই রাজ্যের মানুষ কানহাইলালও হাবিবের মত এই প্রকল্পকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তাঁর প্রতিবাদ এনএসডি থেকেই শুরু। সেই প্রতিষ্ঠানকে সটান বলে দিয়েছেন – তোমাকে আমার লাগবে না, আমি আমার থিয়েটার করে নেব। তাঁর কাজের সঙ্গে রতনের কাজের পার্থক্য হল, কানহাইলাল ন্যূনতম উপাদান ব্যবহার করে নাটক করতে পছন্দ করতেন, বাদল সরকারের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। ওঁর নাটকে অভিনয়ই হয়ে উঠত বক্তব্য। রতনের কাজ সেখানে অনেক বিস্ময়ের জন্ম দেয়। কারণ রতন এনএসডি-তে থেকেছেন, কাজ শিখেছেন। কিন্তু শিখে এসে তাঁর কাজে মণিপুরের আঞ্চলিকতাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ রতন লড়েছেন অনেক কৌশল করে। যে ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা রতনকে অভিনয় করতে দেয়নি, সেই ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা তাঁকে ডিরেক্টর করতে বাধ্য হয়েছে। এ তাঁর জয়।
মণিপুরের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অশান্তি, জাতি-বৈরিতা নিয়ে রতন সাংবাদিক করণ থাপারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন।
না নিলে তাঁর সমালোচনা আমরা করতেই পারতাম, সমালোচনার উর্ধ্বে কেউই নন। কিন্তু তথাকথিত মূল ভূখণ্ডে বসে একজন মণিপুরী মানুষের সমালোচনা করা উচিত কাজ নয়। আমি বলব, স্বাধীনতার পর থেকে যে পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অত্যাচার বা শোষণ মণিপুর তথা উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিকে সহ্য করতে হয়েছে, রতনের নাটক সেই রাষ্ট্রকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
রাষ্ট্রের সঙ্গে রতনের সম্পর্ক জটিল এবং বৈচিত্র্যময়।
মতামত ব্যক্তিগত
অনুলিখন: সোহম দাস
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








