আর জি করের নৃশংস ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা নিয়ে যে গণআন্দোলন শুরু হয়েছিল তা যেন হঠাৎ করে মমতা ব্যানার্জি বনাম জুনিয়র ডাক্তারদের স্নায়ুযুদ্ধে এসে ঠেকেছে। সরকার ও জুনিয়র ডাক্তারদের বৈঠকের সরাসরি সম্প্রচার বা স্ট্রিমিং হবে কি হবে না, কে কতক্ষণ কোথায় অপেক্ষা করল, কেন মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তারদের ধর্না মঞ্চে পৌঁছে গেলেন, কারা ঠিক, ডাক্তাররা নাকি মুখ্যমন্ত্রী – এই সবই এখন মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলোই এমনভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে, যে আর জি কর কাণ্ডে তদন্তে গাফিলতির অভিযোগে কলকাতা পুলিসের একজন ইনস্পেক্টর পদমর্যাদার অফিসার তথা টালা থানার প্রাক্তন অফিসার ইন চার্জ অভিজিৎ মণ্ডলের গ্রেফতারি নিয়ে তেমন আলোড়নই তৈরি হল না। হাসপাতালের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষও একই অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। তিনি যদিও হাসপাতালে দুর্নীতির অভিযোগে আগেই সিবিআইয়ের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। সুতরাং সেটা এমন কিছু চমকপ্রদ ব্যাপার নয়, কিন্তু তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগটা জরুরি। আসলে তৃণমূল কংগ্রেস ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা এটাই চাইছিলেন। ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনকে বিজেপি-আরএসএস মদতপুষ্ট আন্দোলন তকমা দিয়ে আর ডিওয়াইএফআই নেতা কলতান দাশগুপ্তকে ডাক্তারদের আন্দোলনে নাশকতার ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত করে এই নাগরিক আন্দোলন থেকে রাম ও বামকে একপ্রকার সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে সরকার। এমনিতেই এই রাজ্যের ‘বিপ্লবী’ জনগণ বিজেপিকে বেজায় ভয় পায়। ফলে বিজেপির উত্থান রুখতে তৃণমূল কংগ্রেসের সুরেই সেই জনগণের একাংশও এখন একটা কথাই আওড়াতে শুরু করেছে – জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের ফলে কী বিষম বিপদে পড়েছে সাধারণ মানুষ! ঠিক এই কৌশলেই গত ৯ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের শুনানির শুরুতেই আদালতে স্বাস্থ্য দফতরের স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা করে রাজ্য সরকারের আইনজীবী কপিল সিবাল দাবি করেছিলেন – ডাক্তাররা এখনও কাজে ফিরছেন না এবং এর ফলে সরকারি হাসপাতালে ২৩ জন রোগী মারা গিয়েছেন।
অথচ একটি সরকারি হাসপাতালেই একজন ডাক্তারি ছাত্রীর ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার তদন্তে যে কতরকমের গাফিলতির ও তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগ উঠে আসছে, তা নিয়ে সওয়াল শুরু করতে দিতেই চাইছিলেন না সিবাল। যখন তাঁকে পাত্তা না দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সিবিআইয়ের কাছে খুন ও ধর্ষণের ঘটনার স্ট্যাটাস রিপোর্ট চাইছেন, তখনও সিবাল বিড়বিড় করে চলেছেন ‘আমরা একটা আলাদা আবেদন করেছি।’ সিবিআইয়ের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা সেই রিপোর্টের কপি পাননি বলায় সিবাল জোর গলায় বলেন – সেই কপি সিবিআইকে দেওয়া হয়নি। কারণ সেটি মুখবন্ধ খামে আদালতে দেওয়া হয়েছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
অর্থাৎ তদন্ত নিয়ে সিবিআই মুখবন্ধ খামে স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দিয়েছে, আর রাজ্য সরকার মুখবন্ধ খামে জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতির ফলে কী হয়েছে সেই নিয়ে রিপোর্ট জমা দিয়েছে। অর্থাৎ সেখানেও তদন্ত বনাম জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতি! সেদিন সওয়াল জবাবের শুরুতেই সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য আর জি কর তদন্তের স্ট্যাটাস রিপোর্ট পড়তেই আগ্রহী ছিল।
একবার দেখা যাক, সেদিনের শুনানিতে শুধু তদন্ত নিয়ে কী কী গাফিলতির কথা উঠে এসেছিল। শুরুতেই কীরকম গরমিল ধরা পড়েছিল দেখুন।
জেনারেল ডায়েরি
সিবিআইয়ের স্ট্যাটাস রিপোর্ট পড়ার পর প্রধান বিচারতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় প্রথমেই সিবালকে জিজ্ঞাসা করেন – ঠিক কটার সময়ে জিডি (জেনারেল ডায়েরি) নম্বর ৮৬১ দায়ের করা হয়েছিল। এর উত্তরে সিবাল বলেন, ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছিল (৯ অগাস্ট ২০২৪) দুপুর ১টা ৪৭ মিনিটে। আর থানায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর জেনারেল ডায়েরি বা অভিযোগ দায়ের হয়েছিল দুপুর ২টো ৫৫ মিনিটে।
জিডি ৮৬১ কিসের ভিত্তিতে দায়ের করা হয়েছিল? প্রশ্ন করতেই সিবাল বলেন – জিডি এন্ট্রি ৫৬৫। সেই জিডি কখন দায়ের করা হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তরে রাজ্য সরকারের আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টকে প্রথমে বলেন রাতে করা হয়েছিল। প্রধান বিচারপতি খানিকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন দেখে সহকারী আইনজীবীদের থেকে নথি নিয়ে সিবাল বলেন – জিডি ৫৬৫ দায়ের হয়েছিল দুপুর ২টো ৫৫ মিনিটে! সিবিআইয়ের কৌঁসুলি, সলিসিটর জেনারেল, তুষার তখনই বলে ওঠেন – জিডি দায়ের হয়েছিল দুপুর ৩টে ৩০ মিনিটে। ‘৫৬৫’ কেবল একটা মেডিকেল সার্টিফিকেট। সেকথা শুনে সিবাল বলেন, কোর্টকে যা দেওয়া হল তা একটা প্রত্যয়িত নকল। তিনি তুষারকে পাত্তাই দিতে চাননি।
এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর কিন্তু সেদিনের সওয়াল-জবাবে পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ ঠিক কটার সময়ে অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য জেনারেল ডায়েরি দায়ের করা হয়েছিল, কতগুলো জেনারেল ডায়েরি এন্ট্রি ছিল? কিছুই পরিষ্কার হয়নি। কিন্তু এই জেনারেল ডায়েরি কটার সময়ে করা হয়েছে, তাতে কী ধরনের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে, তার ভিত্তিতে কীভাবে তদন্ত এগিয়েছে – এগুলো জানা খুব জরুরি। কিন্তু এই নিয়ে ধোঁয়াশা অব্যাহত।
ঘটনাস্থল থেকে ‘সার্চ অ্যান্ড সিজার’
আদালতের পরের প্রশ্নে সিবাল বলেন, ইনকোয়েস্টের জন্য জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসেন ৪টে ১০ মিনিটে। ইনকোয়েস্ট করা হয় ৪টে ২০ মিনিট থেকে ৪টে ৪০ মিনিটের মধ্যে। তার ভিডিও রেকর্ডিং হয়েছিল বলেও তিনি জানান।
এরপর প্রধান বিচারপতি ঘটনাস্থলের তল্লাশি এবং জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত কখন করা হয়েছিল জানতে চাইলে, সিবাল উত্তর দেন রাত ৮টা ৩০ থেকে ১০টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে ‘সার্চ অ্যান্ড সিজার’ করা হয়। যখন তিনি বুঝে গেছেন পরের প্রশ্ন কী হতে চলেছে, তখনই তিনি বলে ওঠেন ‘আগেই ফটো তুলে রাখা হয়েছিল।’
ভাবুন একবার! সকালবেলায় ডাক্তারি ছাত্রীর মৃতদেহ দেখা যায়, আর ঘটনাস্থল থেকে জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে তার প্রায় ১২ ঘন্টা পরে! তাতে রাজ্য সরকারের যুক্তি হচ্ছে ময়না তদন্তের জন্য দেহ সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরে এ কাজ করা হয়। কিন্তু তার আগে কতজন সেখানে ঘোরাঘুরি করেছিলেন তার ভিডিও আমরা দেখেছি এবং তা নিয়ে কলকাতা পুলিসের সাফাইও আমরা শুনেছি। আর ফটো তুলে রাখার যে কথা সিবাল বলেছিলেন, সেটাও তাঁরই বয়ান অনুযায়ী শুরু হয়েছিল দুপুরে ১২টা ৪৫ মিনিটের পর থেকে। তার মানে দেহ দেখতে পাওয়ার বহু ঘন্টা পর থেকে ছবি তুলে রাখা শুরু হয়েছিল।
সিসিটিভি ফুটেজ
সওয়াল-জবাব চলাকালীন প্রধান বিচারপতি বলেন ‘সিসিটিভি ফুটেজে প্রমাণ রয়েছে যে অভিযুক্ত কখন সেমিনার রুমে গিয়েছিল এবং কখন বেরিয়েছিল। তাহলে ভোর সাড়ে চারটের পরে সারা দিনের সিসিটিভি ফুটেজও নিশ্চয় রয়েছে?’
সিবাল সম্মতি দেন। তারপরেই প্রধান বিচারপতির প্রশ্ন ‘তাহলে পুরো সিসিটিভি ফুটেজই নিশ্চয়ই সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে?’ তাতেও জোর গলায় সিবাল বলেন ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ।’
কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই জানা যায়, কলকাতা পুলিস চারটে ক্লিপিংসে মাত্র ২৭ মিনিটের সিসিটিভি ফুটেজ দিয়েছে সিবিআইকে, এবং ভোর ৫টা ০৬ মিনিট থেকে ১০টা ৪৫ মিনিটের ফুটেজ দিয়েছে। সিবাল অবশ্য আবার দাবি করেন, বিভিন্ন অংশে ভাগ করে পুরো সিসিটিভি ফুটেজই সিবিআইকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সিবিআইয়ের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল দাবি করেন, পুরো দিনের ফুটেজ তাঁদের কাছে নেই। তাহলে ঠিক কতক্ষণের ফুটেজ সত্যি সত্যি সিবিআইয়ের কাছে রয়েছে? এই প্রশ্নেরও সঠিক জবাব পাওয়া গেল না। মৃতদেহ দেখতে পাওয়ার পর কারা কারা সেমিনার রুমে ঢুকলেন এবং বেরোলেন, তার প্রমাণ কি সিবিআই জোগাড় করতে পেরেছে কলকাতা পুলিস বা আর জি কর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে? এরও সঠিক উত্তর পাওয়া যায়নি।
ময়না তদন্ত রিপোর্ট
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে ময়না তদন্ত কীভাবে করা হয়েছে তা ঘিরে। সলিসিটর জেনারেল আদালতে বলেন – যখন ছাত্রীর দেহ সকাল সাড়ে নটার সময়ে দেখা যাচ্ছে, তখন তাঁর পরনে জিনস ও অন্তর্বাস ছিল না। সেগুলো দেহের কাছে রাখা ছিল। তিনি অর্ধনগ্ন অবস্থায় ছিলেন। দেহে আঘাতের চিহ্ন ছিল। নমুনা সংগ্রহ করে সেন্ট্রাল ফরেন্সিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছিল। সেই ল্যাবের রিপোর্ট বিচারপতিদের দিয়ে তুষার বলেন, এ রিপোর্ট এমনই যে সিবিআই আবার সেই নমুনা এইমস ও অন্যান্য ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার জন্য কে নমুনা সংগ্রহ করেছিল সেকথা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
খবরে প্রকাশ, সেই নমুনা সংগ্রহ করতে নাকি একজন সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার, একজন সায়েন্টিফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট ও দুজন সিভিক ভলান্টিয়ারকে পাঠানো হয়েছিল। কর্মীর অভাবে এমন ব্যবস্থাই নাকি চালু আছে।
এটুকু সওয়াল জবাবের পরেই প্রধান বিচারপতি নির্দেশ ঘোষণা করতে শুরু করেন। তাতে বলা হয়, সিবিআইয়ের তদন্ত এখনো বাকি রয়েছে। সেটা চলুক। কী করা উচিত বা উচিত নয়, তা এখনই আদালত বলতে চায় না। পরের শুনানির দিন ঠিক করার কথা বলেন চন্দ্রচূড়। কিন্তু তখনো সিবিআইয়ের তরফে তুষার বলে চলেছেন – কে নমুনা সংগ্রহ করেছে তা জানা জরুরি। কিন্তু সেই সওয়াল শুনতে চাইছিলেন না প্রধান বিচারপতি। তিনি সিবিআইয়ের উপরেই তদন্তের লাইন ঠিক করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
সন্ধেবেলায় ময়না তদন্ত
ঠিক এই সময়ে আইনজীবী ফিরোজ ইদুলজি বিচারপতিদের কাছে ময়না তদন্তের পদ্ধতিগত ত্রুটির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ময়না তদন্ত সন্ধে ছটার পরে হতে পারে না। বিচারপতিদের ময়না তদন্তের রিপোর্ট হাতে নিতে অনুরোধ করেন এবং বলেন, তিনি দেখাতে পারেন কীভাবে পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে ছেলেখেলা করা হয়েছে।
তাঁর দাবি, নিয়ম অনুযায়ী যদি সন্ধে ছটার পরে ময়না তদন্ত করতে হয়, তাহলে সিভিল সার্জেনের নোট থাকতে হবে, যে পুলিসের কোনো ডেপুটি কমিশনার বা কমিশনার সই করে চিঠি পাঠিয়েছেন হাসপাতালের সুপারিন্টেনডেন্টকে। সুপার তাতে সই করে ময়না তদন্তের ডাক্তারকে পাঠাবেন। কেন এটা করা হয়নি? কারণ উদ্দেশ্য ছিল দেহটাকে তাড়াতাড়ি পুড়িয়ে ফেলা।
ফিরোজ বিচারপতিদের বলেন, রাজ্য সরকারকে ফর্ম ২৭ দেখাতে বলুন, যা এফআইআরের অংশ। সিবাল তখন বোকার মতো তাকিয়ে রয়েছেন বিচারপতিদের দিকে। কী হচ্ছে বুঝতেই পারছেন না। ফিরোজ এফআইআরের কলাম সি-২ দেখতে বলেন বিচারপতিদের। এতে জিডি এন্ট্রি নম্বর থাকে, যার ভিত্তিতে এফআইআর করা হয়েছে। এফআইআর করা হয়েছিল জিডি এন্ট্রি ৫৭৭ অনুযায়ী। অস্বাভাবিক মৃত্যুর জিডি এন্ট্রি ৫৭৬। কিন্তু এফআইআর করা হয়েছে রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে। সিজার বা ঘটনাস্থলের জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত হয়েছিল এফআইআর করার আগেই। এমনটা ঘটতে তিনি কখনো তিনি দেখেননি বলে দাবি করেন আইনজীবী ইদুলজি।
আরো পড়ুন আর জি করের সন্দীপ সাম্রাজ্যে সঞ্জয় কি বলির পাঁঠা?
ময়না তদন্তের ডাক্তারদের মৃতার পোশাক সিল করা প্যাকেটে তদন্তকারীদের দেওয়ার কথা। ইদুলজি বিচারপতিদের অনুরোধ করেন ‘শুধু দেখুন ময়না তদন্তের ডাক্তাররা সেটা করেছিলেন কিনা।’
এই নিয়ে সওয়াল জবাব চলতে চলতেই বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা আদালতে উপস্থিত সিবিআই অফিসারকে ময়না তদন্তের রিপোর্টটা হাতে নিয়ে দেখতে বলেন এবং জানতে চান, তিনি কী মনে করছেন? ময়না তদন্তের রিপোর্টে কি পরে কিছু ঢোকানো হয়েছিল? পরে জানা যায়, এই রিপোর্টও সিবিআইয়ের তদন্তের আওতায় রয়েছে।
ডেড বডি চালান
সবচেয়ে বিড়ম্বনার প্রশ্নটা গত দিনের শুনানির দিন আদালতে উঠে আসে – কে মৃতদেহ ময়না তদন্তের জন্য নিয়ে এসেছিল এবং দেহ ময়না তদন্তের ডাক্তারদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য যে চালান লাগে, সেটা কোথায়? এই প্রশ্ন উঠতেই ভ্যাবাচাকা খেয়ে যান রাজ্য সরকারের আইনজীবী সিবাল। কারণ ইদুলজি তখন প্রশ্ন তুলছেন, এই মৃতদেহ ময়না তদন্তের জন্য ডাক্তারদের দেওয়ার সময়ে এই চালান জরুরি। তাতেই মৃতদেহ সংক্রান্ত তথ্য ও ময়না তদন্তের জন্য কী কী পোশাক দেওয়া হচ্ছে তার উল্লেখ থাকার কথা।
কিন্তু ‘ডব্লুবি ফর্ম নাম্বার ৫৩৭১ পিআরবি ফর্ম ৫৪’ -র খোঁজ না সিবাল, না সিবিআইয়ের পক্ষে তুষার পেলেন। প্রধান বিচারপতিও তখন বলছেন, এই চালান ছাড়া ময়না তদন্ত করবেনই না ডাক্তার। শেষে সিবিআই জানায়, তারা এই চালান কলকাতা পুলিসের থেকে কেস ডায়েরির সঙ্গে পায়নি। আর সিবাল বলেন, এই মুহূর্তে তাঁর কাছে ওই চালান নেই। পরবর্তী শুনানিতে দিতে পারেন। বিচারপতি পারদিওয়ালা ময়না তদন্তের রিপোর্ট দেখিয়ে রাজ্য সরকারের আইনজীবীকে বলেন, সেখানেও লেখা নেই যে কোন কনস্টেবল মৃতদেহ নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে মৃতার আত্মীয় কেউ ছিলেন কিনা ইত্যাদি।
কলকাতা পুলিসের এক সিনিয়র অফিসারের বক্তব্য উল্লেখ করে কলকাতার এক কাগজে অবশ্য ইতিমধ্যে দাবি করা হয়েছে, যে কলকাতা পুলিস মৃতদেহ ময়না তদন্তে পাঠানোর আগে ‘চালান’ নয়, ‘রিকুইজিশন’ দেয়। চালানের মত সেখানেও সব তথ্য দেওয়া হয় ময়না তদন্তকারী ডাক্তারদের। এটাই নাকি কলকাতা পুলিসের ধারা। আর জি করের ঘটনার ক্ষেত্রেও সেটাই করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। জেলাগুলোতে অবশ্য মৃতদেহের সঙ্গে চালান পাঠানোর রীতি মানা হয়।
কিন্তু প্রশ্ন এখানে শেষ নয়। একই সঙ্গে এফআইআর ছাড়াই ফরেন্সিক টিম পাঠানোর ঘটনা উল্লেখ করে ইদুলজি প্রশ্ন তোলেন – তাহলে কি কোনো এফআইআর আগে করে সেই তথ্য চেপে যাওয়া হচ্ছে? প্রধান বিচারপতি সিবিআইয়ের তদন্তের প্রতি আস্থা রেখেই বলেন, প্রাথমিকভাবে এটা তো পরিষ্কার যে ঘটনাটা জানার সময় থেকে রাতে এফআইআর করা পর্যন্ত প্রায় ১৪ ঘন্টা সময় লেগেছে। এটা খুবই আশ্চর্যজনক।
ময়না তদন্তের ভিডিওগ্রাফি কে করেছিল, তার পদ কী? সেসবেরও উল্লেখ নেই ময়না তদন্তের রিপোর্টে। কী ধরনের সিডিতে করে সেই ভিডিও দেওয়া হয়েছিল? তারও উল্লেখ থাকা উচিত ময়না তদন্তের রিপোর্টের একেবারে শুরুতে। তারও উল্লেখ নেই বলে দাবি করেন আইনজীবী। তখন সিবাল আমতা আমতা করছেন, যে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ময়না তদন্তের সময়ে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর রিপোর্ট তলব করতে অনুরোধ করেন বিচারপতিদের। যে ডাক্তাররা ময়না তদন্তের সময়ে উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা সকলেই উত্তরবঙ্গ লবির বলেও আদালতে দাবি করেন ইদুলজি। মৃতার দেহের এক্স-রে করা হয়েছিল কিনা তাও তদন্ত করে দেখার আবেদন করেন তিনি।
কাজেই একটা জিনিস পরিষ্কার। প্রাথমিকভাবে কলকাতা পুলিস যে তদন্ত করেছে, তাতে বিস্তর গণ্ডগোল। মৃতার দেহের সৎকার করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিস হয়ত এতটাই তাড়াহুড়ো করেছিল যে বহু নিয়ম মানাই হয়নি তদন্ত ও ময়না তদন্তের ক্ষেত্রে। জেনারেল ডায়েরি বা এফআইআর কি তাহলে দায়সারাভাবে করা হয়েছিল? অন্য সাধারণ ঘটনার ক্ষেত্রেও কি তবে এমনটাই চলে? এই মামলা প্রচারের আলোয় চলে এসেছে বলেই এই ধরনের গাফিলতি ধরা পড়ল? এই প্রশ্নও আসবেই।
সিবিআই টালা থানার প্রাক্তন ওসিকে গ্রেফতার করেছে ঠিকই, কিন্তু অন্যান্য শীর্ষপদস্থ অফিসারেরা কি এর দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন? এই গাফিলতির জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা গেল না? সেই দায়ও কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী এড়িয়ে যেতে পারেন? এইসব প্রশ্ন তোলা মানেই কি কুৎসা করা, নাকি আর জি করের ধর্ষিতা ও মৃতা ছাত্রীর বিচারের দাবি করা?
আশা করা যায় এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আদালতে ১৭ সেপ্টেম্বরের শুনানিতে পাওয়া যাবে। সিবিআই নিশ্চয়ই এই প্রশ্নগুলোরও উত্তর খুঁজছে তাদের তদন্তে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








