অভিজিৎ সেন

সাতের দশকের মধ্যভাগের দুটি আলাদা আলাদা দিন। প্রথমটি, সাতটা বেজে চল্লিশ মিনিটের সকাল। একটু শোনা যাক। ‘আকাশবাণী কলকাতা। এখন থেকে বেলা আটটা পর্যন্ত আমাদের শর্ট ওয়েভ ট্রান্সমিটারের বিরতি। কলকাতা ক প্রচার তরঙ্গে এখন শুনবেন রবীন্দ্রসঙ্গীত। শিল্পী সুচিত্রা মিত্র।’ দ্বিতীয়টির সময় রাত আটটা, স্থান দূরদর্শন কেন্দ্র কলকাতা। ‘নমস্কার। সংবাদ।’ রেডিও ও টিভি আলাদা মাধ্যম, তাই উপস্থাপনায় পার্থক্যও স্পষ্ট। অথচ দুটি ক্ষেত্রেই ব্যক্তি এক, কণ্ঠ এক। ছন্দা সেন। কিংবদন্তি এই বাচিক শিল্পীর জীবনাবসান হল গত ১২ সেপ্টেম্বর, ৭৮ বছর বয়সে।

১৯৭৫ সালের ২৫ জুন সারা দেশে ঘোষিত হয় জরুরি অবস্থা। তার মাস কয়েকের মধ্যেই চালু হয় কলকাতা ও মাদ্রাজ (তখনো চেন্নাই নয়) দূরদর্শন কেন্দ্র। কলকাতার ক্ষেত্রে নিয়োগ হয়েছিল দুভাবে। বাছাই করা কলাকুশলীরা কয়েকমাস ধরে প্রশিক্ষণ নেন পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে আর উপস্থাপক ও সংবাদ পাঠকরা আসেন সরাসরি অডিশনের মাধ্যমে। এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা ছিল পশ্চিমবাংলার তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের। ঘোষকদের ক্ষেত্রে নবাগতরা এলেও, সংবাদ পাঠের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায় অভিজ্ঞতা। সেইভাবেই দূরদর্শনে সংবাদপাঠে এলেন আকাশবাণী থেকে তরুণ চক্রবর্তী, ছন্দা সেন, শঙ্কর ঘোষ ও সৌমেন চৌধুরী। চলচ্চিত্র জগৎ থেকে এলেন দেবরাজ রায়, আবার দূরদর্শনে খবর পড়েই রুপোলি পর্দায় ডাক পেলেন দীপক ‘চিরঞ্জিত’ চক্রবর্তী। একইভাবে দূরদর্শনের ঘোষকের ভূমিকা থেকে সিনেমায় পাড়ি দেন রীতা কয়রাল।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

প্রথমে দূরদর্শন কেন্দ্র কলকাতার সম্প্রচারের মেয়াদ ছিল তিন ঘন্টা, সন্ধে সাড়ে ছটা থেকে সাড়ে নটা। তার মধ্যে বাংলা সংবাদ হত রাত আটটায় আর ইংরিজি সংবাদ রাত নটা কুড়িতে। দুটির জন্যই সময় বরাদ্দ দশ মিনিট। সেইসময় ইংরেজি খবর পড়তেন এন বিশ্বনাথন, রীতা ভিমানি, জয়ন্ত কৃপালনি, পূর্ণিমা দত্ত, লীনা সেন (চৌধুরী), জিজা ভট্টাচার্যের মতো শহরের বিদ্বজ্জনরা। সবারই মূলধন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর এবং স্পষ্ট উচ্চারণ। তখন সাদাকালো দূরদর্শনই একমেবাদ্বিতীয়ম, তাই অন্য চ্যানেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতার প্রশ্নই ছিল না।

টেলিপ্রম্পটার তখনও দূর অস্ত। স্টুডিয়োতে বসে সংবাদ পাঠ করতে হত হাতে লেখা কাগজ দেখে। একঘেয়েমি কাটাতে কয়েক সেকেন্ড এক নাগাড়ে খবর পড়ার পর একবার তাকাতে হত ক্যামেরার দিকে। বছর দুই আগে, দূরদর্শনেরই এক অনুষ্ঠানে ছন্দা বলেছিলেন ‘মাইক ভীতি আমার ছিল না। শুধু লক্ষ রাখতাম, যা পড়ছি তা যেন দর্শকের কাছে অর্থবহ হয়।’ সেইসময় খবরের গুরুত্ব অনুযায়ী দেখানো হত স্থিরচিত্র। এছাড়া ছিল মাছির উপদ্রব। এক বার তো ‘তরুণদের জন্য’ অনুষ্ঠানে একজন ছড়া গাঁথলেন ‘মাছি মাছি, আছি আছি, নিউজ রিডারের কাছাকাছি।’

জরুরি অবস্থা চলছে, তাই সরকারের বিশ দফা কর্মসূচি নিয়ে নানা প্রচারমূলক অনুষ্ঠান হত ‘শিল্পজগৎ,’ ‘সুস্বাস্থ্য’ ও ‘পল্লীকথা’ অনুষ্ঠানে। টেলিভিশনের পর্দায় ফুটে উঠত সরকারি স্লোগান ‘হম দো, হমারে দো,’ ‘ওয়ার্ক মোর, টক লেস,’ ‘নেশন ইজ অন দ্য মুভ,’ ‘কঠোর পরিশ্রমের কোনও বিকল্প নেই।’ মাঝে মাঝে দর্শকদের একই সঙ্গে বিরক্তি ও বিনোদন জোগাত ‘অনুষ্ঠান প্রচারে বিঘ্ন ঘটায় দুঃখিত’ পোস্টার।

কলকাতা দূরদর্শন শুরু হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে ঘটে যায় সে বছরের সব থেকে ভয়ঙ্কর ঘটনা – বাংলাদেশের রূপকার ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবর রহমানের হত্যাকাণ্ড। যথাযথ মর্যাদা এবং অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে সেদিনের সংবাদ পাঠ করেন তরুণ চক্রবর্তী। বছরের শেষ দিকে ঘটে যায় আর এক বিপর্যয়। ধানবাদের কাছে চাসনালা কয়লাখনি দুর্ঘটনায় মারা যান ৩৭৫ জন শ্রমিক। পরিকাঠামোগত অসুবিধা এবং সীমিত সামর্থ্য সত্ত্বেও সেই সময় অসাধ্যসাধন করেছিল কলকাতা দূরদর্শনের সংবাদ বিভাগ।

১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করার পরেই বেজে ওঠে ভোটের দামামা। মার্চে লোকসভা, জুনে বিধানসভা। ভোটের ফলাফল জানাতে নির্বাচনী সংবাদ সম্প্রচার হত মাঝরাত পর্যন্ত। নিরুত্তাপ গলায়, বিন্দুমাত্র উচ্ছ্বাস প্রকাশ না করে দিল্লির মসনদে পালাবদলের খবর দিতেন ছন্দা-তরুণ-রীতা-বিশ্বনাথনরা। তিরিশ বছর একটানা দেশ শাসনের পর ক্ষমতাচ্যুত হল কংগ্রেস। শাসনভার পেল জনতা পার্টি। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসকে হারিয়ে ক্ষমতায় এল বামফ্রন্ট। ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে আবার লোকসভা নির্বাচন। এবার ক্ষমতায় ফিরে এলেন সেই ইন্দিরাই। আগেরবারের মত দূরদর্শনে ফলাফল দেখার পাশাপাশি, রাত জাগার পাওনা হিসাবে থাকত জনপ্রিয় বাংলা বা হিন্দি ছবি।

১৯৮২ সালের ১৫ অগাস্ট দূরদর্শন রঙিন হল। আর সেদিনই রাত সাড়ে আটটা থেকে দূরদর্শনে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম শুরু হওয়ায় ইংরিজি খবরের দখল নিল দিল্লি। এর ফলে দিল্লিতে আর সীমাবদ্ধ না থেকে জাতীয় স্তরে পরিচিতি পেলেন সালমা সুলতান, জে বি রামন, শম্মী নারঙের মত হিন্দি সংবাদ পাঠক। একইভাবে জনপ্রিয় হলেন মিনু, গীতাঞ্জলি আইয়ার, নীতি রবীন্দ্রন, তেজেশ্বর সিং, প্রীত সিং বেদির মত ইংরিজি সংবাদ পাঠকরা। সৌভাগ্যবশত, বাংলা সংবাদ বিভাগ অক্ষতই থেকে যায়। এর বছরখানেকের মধ্যে কলকাতা দূরদর্শনও রঙিন হল। ১৯৮৬ সালে ঠিকানা বদল, দেশপ্রাণ শাসমল রোডের রাধা ফিল্ম স্টুডিও (বর্তমানে চলচ্চিত্র শতবার্ষিকী ভবন) থেকে গল্ফ গ্রিনের নিজস্ব বাড়িতে।

কেন্দ্রের উদারনীতির আবহে নয়ের দশকের শেষভাগে গোটা দেশে আত্মপ্রকাশ করে বিভিন্ন ভাষার বেসরকারি নিউজ চ্যানেল। এরই পাশাপাশি প্রায় সিকি শতক জনপ্রিয়তা ধরে রাখার পর, ১৯৯৮ সালে গ্রহণ লাগে কলকাতা দূরদর্শনের বিভিন্ন বিভাগে। কিছু কর্তার হঠকারী সিদ্ধান্তে একাধিক টাইম স্লট পেয়ে যায় এক বেসরকারি প্রযোজক সংস্থা। সবথেকে বেশি ধাক্কা লাগে সংবাদ বিভাগে। সন্ধ্যার ‘সংবাদ’ দেখার বদলে দর্শকরা ভিড় জমান রাত সাড়ে নটার ‘খাস খবর’ দেখতে। ছন্দা-তরুণ-প্রণতি-ব্রততীর জনপ্রিয়তা ডুবে যায় মীর-রিনি-সুদীপ্তা-কৌশিকের নবজোয়ারে। দর্শকমন মজাল কয়েকটি অল্পবয়সি, স্মার্ট হাসিমুখ।

শুধু কয়েকটি বছর। তারপরই বিদায় নিল ‘খাস খবর’। একটু একটু করে হারা জমি ফিরে পেলেন সাবেক দূরদর্শনের সংবাদ পাঠকরা। সেই ধারাই আজ বহন করে চলেছেন স্বপ্না দে, লোপামুদ্রা সিনহা, দূর্বা ভট্টাচার্য, তানিয়া ইসলামের মত সংবাদ পাঠকরা। দূরদর্শন কেন্দ্র কলকাতা এখন নয়া অবতারে ডিডি বাংলা। হাতে লেখা খবরের জায়গায় অনেক দিন হল এসেছে টেলিপ্রম্পটার। দশ মিনিটের খবর এখন অতীত। গোটা দিনে সম্প্রচার হয় চারটি বড় নিউজ বুলেটিন। তিনটি আধঘন্টার, একটি পনেরো মিনিটের। এছাড়াও থাকে স্বল্প সময়ের মিনি নিউজ বুলেটিন। সময়ের দাবি মেনে দূরদর্শন এখন অনেক বেশি ‘ইন্টারঅ্যাক্টিভ’। সংবাদ পাঠকের থেকে পর্দায় বেশি জায়গা পান সংবাদদাতারা। সংবাদ পাঠকের সামনে থাকা ল্যাপটপের পিঠে শোভা পায় স্পনসরের নাম।

আরো পড়ুন রবীশ কুমারকে নিয়ে তথ্যচিত্র: কেউ কেউ জেগে আছে বলে

নতুন সহস্রাব্দ শুরু হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করে একাধিক বেসরকারি বাংলা নিউজ চ্যানেল। দূরদর্শনের থেকে এদের মূল তফাত উপস্থাপনায়। প্রতিটিই ভীষণভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং উপস্থাপকরা প্রায় সবাই দর্শকমনে প্রভাব বিস্তারে পটু। তাঁরা কতটা প্রশিক্ষিত সাংবাদিক, আর কতটা ‘শোম্যান’ – এই খটকা থেকেই যায়। দুদশক আগে একটি চ্যানেল, তাদের উদ্বোধনের আগে পোস্টারে দুটি জনপ্রিয় মুখ দেখিয়ে ঘোষণাই করে বসেছিল ‘আমরা ছাড়া খবর হয় না।’

ছন্দা-তরুণের সম্পূর্ণ বিপ্রতীপে অবস্থান আজকের নিউজ অ্যাংকরদের। বিশেষ বিশেষ উৎসবের সময়ে তাঁরা পরিধান করেন শাড়ি-ধুতি-পাঞ্জাবি। বাকি সময় শুধুই ‘ওয়েস্টার্ন ওয়্যার’। এঁদের বেশির ভাগই আবেগসর্বস্ব এবং উচ্চকিত। বুম হাতে পথেঘাটে এঁদের বিশেষ দেখা যায় না। প্রতি সন্ধ্যায় চ্যানেলে চ্যানেলে আলোচনার নামে যে প্রহসন অভিনীত হয়, তার স্কেল বাঁধা থাকে চড়ায়। সেখানে ঘড়িবাবুর ভূমিকা এঁরা দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন। ‘জানিস আমি স্যান্ডো করি’-র মত প্ররোচনামূলক ভাব না এলে এই সব অনুষ্ঠানের টিআরপিতে ধস নামে। প্রায় সব কটি চ্যানেলই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের ধামাধারী এবং এই অ্যাংকররা সেই অ্যাজেন্ডাই তুলে ধরেন। বাংলার দর্শক অত্যন্ত সজাগ উপভোক্তা। তাঁরা সব জানেন, বোঝেন। অপেক্ষায় আছি, কবে তাঁরা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতির মত উচ্চকিত নিউজ চ্যানেলগুলির উদ্দেশে চেতাবনি দেবেন ‘প্লিজ লোয়ার ইওর পিচ (দয়া করে স্বর নামান)।’

নিবন্ধকার স্বাধীন সাংবাদিক, সম্পাদক ও অনুবাদক। প্রায় তিন দশক ইকনমিক টাইমসএই সময় কাগজে কাজ করেছেন। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.