অনিন্দ্য হাজরা
সংসদে পাশ হয়ে আইনে পরিণত হয়েছে ওয়াকফ বিল। এই মুহূর্তে সেই আইনের বিরোধিতায় সারা দেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গও উত্তাল। ওয়াকফ আইনবিরোধী আন্দোলনকে ঢাল করে মুর্শিদাবাদ জেলার কিছু এলাকায় ব্যাপক হিংসা ছড়িয়েছে। সেই সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন। তাঁদের মধ্যে দুজন – হরগোবিন্দ দাস আর তাঁর ছেলে চন্দন দাসকে নিজেদের দলের কর্মী বলে দাবি করেছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। ইজাজ আহমেদ নামে এক মুসলমান যুবকেরও মৃত্যু হয়েছে এই হিংসায়। মুর্শিদাবাদের হিংসায় ঘর ছেড়ে, গঙ্গা পেরিয়ে মালদার বৈষ্ণবনগরে আশ্রয় নেওয়া এক হিন্দু মহিলা আবার দাবি করেছেন, মুসলমানরা নয়, তাঁরা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন বিজেপি কর্মীদের আক্রমণে। বিজেপি অবশ্য বলেছে এসব তৃণমূলের শেখানো বুলি। এই নিয়ে তরজা অব্যাহত। অন্যদিকে গোটা ঘটনায় রাজ্য পুলিস এবং শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এই রাজনৈতিক রুটি সেঁকার পরিবেশে সংশোধিত ওয়াকফ আইনটাকে বোঝা দ্বিগুণ জরুরি হয়ে পড়েছে। ওয়াকফ আইন লোকসভা ও রাজ্যসভায় পেশ করার মুহূর্ত থেকে বিজেপি দাবি করে এসেছে – এই বিল আইনে পরিণত হলে সবথেকে বেশি উপকৃত হবেন মুসলমানরা, বিশেষত পিছিয়ে থাকা অংশের মুসলমান (পসমন্দা মুসলমান) এবং মুসলমান মহিলারা। একইসঙ্গে এই আইনের ফলে ওয়াকফ ঘিরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির চক্রকেও নাকি ভাঙা সম্ভব হবে। বিজেপির গোটা যুক্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে এই ধারণার উপরে যে, ওয়াকফ বোর্ডগুলোর উপরে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এরা যা খুশি তাই করতে পারে, যার জমি খুশি দখল করতে পারে এবং তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যেত না এতদিন। নতুন আইন এনে এই যা ইচ্ছে তাই করার পথ বন্ধ করা হয়েছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বিজেপির এই দাবিগুলোর সত্যতা কতখানি, সেটাই খুঁটিয়ে দেখা যাক।
ওয়াকফের মাধ্যমে দেশের জমি দখল বন্ধ হবে এই আইনের মাধ্যমে
সারা দেশে বিজেপি এবং আরএসএসের ওয়াকফবিরোধী প্রচারের মূলে রয়েছে এই ভাষ্য, যদিও এটা সম্পূর্ণ ভুল। প্রথমেই বোঝা দরকার, কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিল এবং রাজ্যে রাজ্যে থাকা ৩২টি ওয়াকফ বোর্ড মুসলমান ‘মোল্লা’ চালিত কোনো জমি মাফিয়াদের সিন্ডিকেট নয়, যার প্রধান কাজই হিন্দুদের জমি দখল করা। চাণক্য জাতীয় আইন বিশ্বদ্যালয়ের উপাচার্য ফয়জান মুস্তাফা দ্য ওয়ার ওয়েবসাইটকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দেশের সবথেকে কঠোরভাবে সরকার নিয়ন্ত্রিত ধর্মীয় সম্পত্তি হল ওয়াকফ সম্পত্তি। কারণ হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় সম্পত্তি সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো কেন্দ্রীয় আইন না থাকলেও, ১৯৫৪ সাল থেকেই মুসলমানদের জন্য সেই আইন রয়েছে।
বিজেপির তরফে বলা হয়েছে, দেশের সংসদ ভবন, কলকাতার ইডেন উদ্যানের মত জায়গা ওয়াকফ বোর্ড চাইলেই দখল করে নেবে। সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী, বদরুদ্দিন আজমলের মত কিছু মুসলমান নেতা সেই প্রচারে দায়িত্ব নিয়ে হাওয়া দিয়েছেন। যদিও আইনজ্ঞদের মতে এটা একেবারেই ভিত্তিহীন দাবি। কারণ প্রথমত ওয়াকফ বোর্ড ও কাউন্সিলগুলো রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলা বিধিবদ্ধ সংস্থা, যা সংসদের আইনের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। পুরনো ওয়াকফ আইনের সেকশন ৯৭ অনুযায়ী, সরকার চাইলেই ওয়াকফ কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত খারিজ করতে পারে, পুরো বোর্ড ভেঙেও দিতে পারে। পুরনো আইনে কোনো সম্পত্তিকে ওয়াকফ বলে ঘোষণা করার আগে সেটা সরকারি সার্ভে কমিশনারের মাধ্যমে সমীক্ষা করা হত। জমির দলিল, করের রসিদ ইত্যাদি পরীক্ষা করার পরেই সরকারি সার্ভে কমিশনার সরকারের সেই রিপোর্ট পাঠাতেন। তা সরকারের তরফে রাজ্য ওয়াকফ বোর্ডের কাছে পাঠানো হত। সমস্ত নথি ঠিক থাকলে, তবেই ওয়াকফ বোর্ড আইনের ৩৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী ওই সম্পত্তিকে ওয়াকফ রেজিস্টারে নথিভুক্ত করা হত। এর পাশাপাশি সরকারের তরফে সরকারি গ্যাজেটে বিজ্ঞাপন দিয়ে কোনো সম্পত্তিকে ওয়াকফ ঘোষণা করতে হয়। কেউ নিজের ইচ্ছায় গোপনে জমি দখল করতে পারে না ওয়াকফের নামে।
সাধারণ মানুষ ওয়াকফ ঘোষণার বিরোধিতা করতে পারত না
কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী অর্করঞ্জন ভট্টাচার্য জানাচ্ছেন, এটাও ভুল প্রচার। ওয়াকফ ঘোষণার এক বছরের মধ্যে কারোর যদি এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ থাকে, তাহলে তিনি ওয়াকফ ট্রাইব্যুনালে যেতে পারতেন। ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালে বা ইনকাম ট্যাক্স ট্রাইব্যুনালের মত এটাও সরকার দ্বারা নিযুক্ত ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তেও খুশি না হলে, অভিযোগকারী হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করে অভিযোগ জানাতে পারতেন। সংশোধিত আইনে কিন্তু ওয়াকফ ট্রাইব্যুনালের অধিকার খর্ব করা হয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধান এবং আইনের ক্ষেত্রে একই যাত্রায় পৃথক ফল হয় না। ওয়াকফ ট্রাইব্যুনালের অধিকার খর্ব করে সাধারণ দেওয়ানি আদালতকে ক্ষমতা দিলে অন্যান্য ট্রাইব্যুনাল, যেমন ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংশোধনী আনা হবে কিনা সে প্রশ্ন উঠবে।
ধর্মনিরপেক্ষ দেশে ওয়াকফ বোর্ডে কেন অমুসলমান থাকতে পারবে না?
সংবিধানের ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেকটা ধর্মের অধিকার ধর্মীয় সম্পত্তি রাখার অধিকার এবং তাকে পরিচালিত করার অধিকার স্বীকৃত। এটা ভারতীয় নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। ওয়াকফ একান্তভাবেই ইসলাম ধর্মের সঙ্গে যুক্ত। সেখানে অমুসলমান কাউকে ঢোকানো মানে সেই অধিকারে হস্তক্ষেপ করা। এই বিতর্কের আরও একটা দিক রয়েছে। সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে হিন্দু হিসাবে বৌদ্ধ, জৈন আর শিখ সম্প্রদায়কেও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু দেশের অজস্র মন্দিরের পরিচালন সমিতিতে কেবলমাত্র বর্ণহিন্দুদেরই রাখা হয়। সেখানে বৌদ্ধ, জৈন, শিখদের ভিনধর্মের মানুষ হিসাবেই দেখা হয়। বহু মন্দিরে, যেমন পুরীর জগন্নাথ মন্দির, লিঙ্গরাজ মন্দির, কেরালার গুরুভায়ুর মন্দির, পদ্মনাভস্বামী মন্দিরে ভিনধর্মের মানুষের প্রবেশ পর্যন্ত নিষিদ্ধ। ওয়াকফ আইনের বদল ঘটিয়ে কেন্দ্র ওয়াকফ বোর্ড এবং কাউন্সিলে অমুসলমানের পাশাপাশি একজন ওবিসি সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষকেও রাখতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে বহু হিন্দু মন্দিরে প্রবেশের জন্য ওবিসি এবং তফসিলি জাতির মানুষকে লড়াই চালাতে হচ্ছে আজও। এমাসেই পুলিসের সহায়তায় পূর্ব বর্ধমানের গীধগ্রামের শিবমন্দিরে ঢোকার অনুমতি পেয়েছেন তফসিলি জাতির মানুষ। পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জায়গায় তফসিলি জাতির মানুষকে উচ্চবর্ণের লোকেরা মন্দিরে ঢুকতে দিচ্ছে না বলে গণ্ডগোল হয়েছে। মধ্যপ্রদেশের সঙ্গভি গ্রামের রামমন্দিরে এক দলিত যুবককে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এই মানুষগুলোকে নিজেদের ধর্মের মন্দিরে প্রবেশের ছাড়পত্র পাইয়ে দিতে এমন তৎপর নয় কেন কেন্দ্রীয় সরকার?
এই আইন মহিলাদের ক্ষমতায়ন করবে
নতুন আইন আনার মূলে বিজেপি এই দাবিটি তুলে ধরেছে। সমস্ত সংবাদমাধ্যমে এই সংক্রান্ত আলোচনায় বিজেপির তরফে বলা হয়েছে, এতদিন ওয়াকফ বোর্ডগুলোকে বিরোধীদের মদতে কট্টর মুসলমানরা দখল করে রেখেছিল। তারা মহিলাদের দমন করার মানসিকতা নিয়ে চলে। বর্তমান আইন মহিলাদের ওয়াকফ চালানোর সুযোগ করে দিতে চলেছে, যা যুগান্তকারী। আইনজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, এই দাবির কোনো সারবত্তা নেই। ১৯৫৪ সালে কেন্দ্রীয় ওয়াকফ আইন চালু হয়। ১৯৯৫ সালে সেই আইন সংশোধন করা হয়। সেই থেকে কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিলে কিংবা রাজ্যওয়াড়ি বোর্ডগুলোতে মহিলাদের নিয়োগের কোনো উর্ধ্বসীমা ছিল না। কিন্তু ২০২৪ সালে নতুন আইনের যে খসড়া কেন্দ্র সংসদে পেশ করে, সেখানে মাত্র দুজন মহিলাকে রাখার সংস্থান ছিল। পরবর্তীকালে যৌথ সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বিরোধীদের হস্তক্ষেপে এই ঊর্ধ্বসীমা শিথিল করা হয়। অর্থাৎ বিজেপির এই দাবি যে তারা পুরুষশাসিত ওয়াকফ কাউন্সিলে মহিলাদের প্রবেশ সুনিশ্চিত করেছে, একেবারেই ঠিক নয়।
এই আইনের ফলে ওয়াকফ পরিচালনা সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব হবে
ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে দুর্নীতি হয় না – একথা বলা মিথ্যাচারের সামিল। রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের বিরুদ্ধেই ওয়াকফ সম্পত্তি হাতানোর অভিযোগ উঠেছে। ওয়াকফের ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, সমস্ত সম্পত্তির দেখভাল করেন মুত্তাওয়ালিরা। বলা চলে এঁরা ওয়াকফ সম্পত্তির ম্যানেজার। দুর্নীতি মূলত এই স্তরেই হয়। মজার কথা, এই আধিকারিকদের দুর্নীতি বন্ধের জন্য কড়া সংস্থান না এনে, নতুন আইনে ওয়াকফ সম্পত্তি দখলের শাস্তি লঘু করা হয়েছে।
অর্করঞ্জন ভট্টাচার্যের কথায়, ওয়াকফ সম্পত্তির জবরদখলের রাস্তা খুলে যেতে পারে নতুন আইনের ফলে। এই আইন ওয়াকফ বোর্ডকে স্রেফ সম্পত্তি দেখাশোনার ভূমিকায় নামিয়ে এনেছে। কোনটা ওয়াকফ সম্পত্তি আর কোনটা নয়, তা নির্ধারণের ক্ষমতা হারিয়েছে ওয়াকফ কাউন্সিল এবং বোর্ড। সেই ক্ষমতা পেয়েছেন সরকারি আধিকারিকরা। তাঁরা রাজ্যের সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে ওয়াকফ সম্পত্তি রক্ষায় ভূমিকা নেবেন, সেই আশা সাধারণ মানুষ অন্তত করে না।
ওয়াকফ আইনের মাধ্যমে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়ন করার কাজ গতি পাবে
বিজেপি নেতারা নিয়ম করে দলীয় সমর্থকদের এই বার্তা দিয়ে আসছেন। যদিও আইনজ্ঞদের বক্তব্য, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি আনার দিকে এগোবার ভিত্তিপ্রস্তর হতে পারত ওয়াকফ আইন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার সেই সুযোগ হাতছাড়া করেছে। কীভাবে?
ফয়জান বলছেন, সমস্ত ধর্মের সম্পত্তি ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য একই আইন আনতে পারত কেন্দ্র, যা অভিন্ন দেওয়ানি বিধির ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু তা না করে বিভিন্ন ধর্মের সম্পত্তি পরিচালনার জন্য ভিন্ন ভিন্ন আইন রাখার পথেই হেঁটেছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। বলা ভাল, বিজেপি নিজের ভোটারদের বার্তা দিয়েছে – আমরা মুসলমানদের স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাদের জব্দ করেছি। তাই ওয়াকফের মত সরকার নিয়ন্ত্রিত সংস্থায় হস্তক্ষেপ করলেও হিন্দু মন্দিরগুলোকে কেন্দ্রীয় আইনের আওতায় আনার প্রয়োজন বোধ করেনি বিজেপি। সুপ্রিম কোর্টে এই আইনের বিরুদ্ধে জমা পড়া রিট পিটিশনগুলোর শুনানিতে ভারতের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্নাও সরকারকে এই নিয়ে প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন। অর্থাৎ মুখে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির কথা বললেও, স্রেফ নির্বাচনী লাভ-ক্ষতির অঙ্কই কষেছে বিজেপি সরকার।
ওয়াকফে এত জমি, তাও মুসলমানরা গরিব কেন?
বিহারের রাজ্যপাল আরিফ মহম্মদ খান সম্প্রতি বলেছেন, সারা দেশে ওয়াকফ বোর্ডগুলোর হাতে বিপুল সম্পত্তি রয়েছে। তারপরেও মুসলমান সমাজের মধ্যে এত দারিদ্র্য কেন? বিজেপির তরফেও প্রচার চালানো হচ্ছে যে, ওয়াকফ বোর্ডের হাতে সারা দেশে ৯.৪০ লক্ষ একর জমি রয়েছে। বিজেপির দাবি, এই সম্পত্তির মোট পরিমাণ ১.২ লক্ষ কোটি টাকা এবং এই সম্পত্তি দিয়ে ২৭৫ খানা হাসপাতাল, ৯৪৭ খানা স্কুল তৈরি করা এবং ২.৩৭ লক্ষ কৃষকের সহায়তা করা সম্ভব।
বিজেপি বলছে, দেশে ভারতীয় রেল এবং সেনাবাহিনীর পরেই সবথেকে বেশি জমির মালিক হল ওয়াকফ বোর্ড। এদিকে শুধুমাত্র তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা আর অন্ধ্রপ্রদেশের মন্দির কমিটিগুলোর জমির পরিমাণ যোগ করলেই তা সারা দেশের ওয়াকফ জমির মোট পরিমাণের থেকে বেশি (৯.৫ লক্ষ একর)। যেহেতু কেবলমাত্র হিন্দু ধর্মীয় স্থানের জন্য কেন্দ্রীয় কোনো সংস্থা বা আইন নেই, তাই এই তথ্য চট করে সামনে আসে না। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হল, হিন্দু ধর্মস্থানগুলোর হাতে এই পরিমাণ জমি থাকা সত্ত্বেও দেশে চার কোটির বেশি হিন্দু দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছেন কেন?
প্রসঙ্গত, ওয়াকফের মাধ্যমে হাসপাতাল এবং বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই চালু রয়েছে। সেক্ষেত্রে যদিও প্রশ্ন থাকে, গরিব মানুষের জন্য স্কুল, হাসপাতাল ইত্যাদি তৈরির নৈতিক দায় কি ধর্মীয় সংস্থাগুলোর? নাকি সে দায়িত্ব রাষ্ট্রের?
বিজেপির আরও একটা দাবি হল, এই বিপুল সম্পদের থেকে বছরে মাত্র ১৬৩ কোটি টাকা আয় করা হয়। নতুন আইনে আয়ের পরিমাণ বাড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াকফ সম্পত্তি দান করা হয় ধর্মীয় কাজ যেমন মসজিদ, দরগা, কবরস্থান ইত্যাদি বানানোর জন্য কিম্বা দাতব্য প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য। সেখানে আয় বাড়ানো উদ্দেশ্য হবেই বা কেন? ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী ওয়াকফ সম্পত্তিকে মুনাফা করার যন্ত্রে পরিণত করা নিষিদ্ধ। একথা ঠিক যে ওয়াকফ সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ করা মুত্তাওয়ালীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই দুর্নীতি রোধের জন্য কঠোর আইনি সংস্থান না করে একটা ধর্মের মানুষের ধর্মীয় ব্যাপারে রাষ্ট্র এইভাবে নাক গলাতে পারে কি?
নতুন আইনের ফলে হিন্দুদের জমি দখল বন্ধ হবে
নতুন আইনে বলা হয়েছে, কোনো হিন্দু ওয়াকফের জন্য জমি দান করতে পারবেন না। ১৯৫৪ ও ১৯৯৫ সালের ওয়াকফ আইনে হিন্দুদের ওয়াকফে জমি দানের বিষয়ে আলাদা ভাবে উল্লেখ না থাকলেও, ২০১৩ সালের সংশোধনীতে স্পষ্ট করা হয় যে হিন্দুরা ওয়াকফের জন্য জমি দিতে পারবেন। নতুন আইন এই অধিকার কেড়ে নিয়েছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন আইনের এই ধারা সম্পত্তির অধিকারের ধারণাকে লঙ্ঘন করছে। কারণ সরকার ঠিক করে দিতে পারে না, কোনো ব্যক্তি তাঁর সম্পত্তি নিয়ে কী করবেন, দান করবেন না ভোগ করবেন। প্রসঙ্গত, প্রাক-স্বাধীনতা যুগে মাদ্রাজ হাইকোর্টের ১৯৩০ সালের রায়, লাহোর হাইকোর্টের ১৯৪০ সালের রায় এবং স্বাধীনোত্তর ভারতে নাগপুর হাইকোর্টের ১৯৫৪ সালের রায় স্পষ্ট করেছে যে হিন্দুরাও ওয়াকফের জন্য সম্পত্তি দান করতে পারেন।
দেশের বহু হিন্দু রাজা ও জমিদার মসজিদ, কবরখানা, মাদ্রাসা ইত্যাদির জন্য ঐতিহাসিকভাবে জমি দান করেছেন। যেমন তামিলনাড়ুর নাগৌর দরগা শরিফের জন্য থঞ্জাভুরের রাজা অচ্যুতাপ্পা নায়েক ২০০ একর জমি দান করেছিলেন। সাম্প্রতিককালেও এমন নজির রয়েছে। ২০১৯ সালে অযোধ্যায় হিন্দু ধর্মগুরু সূর্যকুমার ঝিঙ্কন মহারাজের উদ্যোগে কবরখানার জন্য জমি দান করেন হিন্দুরা। ২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রের উল্লাসনগরে এক হিন্দু ব্যবসায়ী কবরখানার জন্য দুই একর জমি দান করেন।
বাংলার বহু জায়গায় তো এমন নজির আছেই। একইভাবে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষও মন্দির কিংবা শ্মশানে জন্য জমি দান করে থাকেন। ২০২০ সালে পূর্ব বর্ধমানের তালিটে কবরখানার জন্য এক একর জমি দান করেছিলেন কালীকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়। আবার মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জের কিরীটেশ্বরী গুপ্ত মন্দিরের জন্য জমি দান করেছিলেন আবদুল হাকিম মণ্ডল ও তকিমুন্নেসা বিবির পরিবার। ভাতের হোটেলে আলাপ হওয়া এক ব্যক্তির কাছে অস্ট্রেলিয়া ফেরত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দুল শেখ জানতে পেরেছিলেন হাওড়ার ডোমজুড়ের খাশমোরা গ্রামের মানুষ টাকার অভাবে মন্দির তৈরি করতে পারছেন না। সেকথা শুনে তৎক্ষণাৎ তিন লক্ষ টাকা দান করার সিদ্ধান্ত নেন সৈয়দুল। এই ঘটনা ২০১৮ সালের। বাংলার সমস্ত প্রান্তে এই মিশ্র সংস্কৃতি ছড়িয়ে আছে।
নতুন ওয়াকফ আইন এই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বুনোটের উপরেও আঘাত।
শুধু ব্যবহার করার অছিলায় হিন্দুর জমি দখল করা বন্ধ হবে
সোশাল মিডিয়া জুড়ে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে এই প্রচার। এই প্রচারের মূল অভিমুখ হল, ব্যবহার করার অছিলায় হিন্দুদের জমির উপর অধিকার তৈরি করে ফেলে, চক্রান্ত করে সেই জমিকে এতদিন ওয়াকফ জমিতে পরিণত করা হত। বিজেপির দাবি, নতুন আইন এ কাজ বন্ধ করে দেবে।
ফয়জান বলেছেন, ‘ওয়াকফ বাই ইউজার’ বা ব্যবহার করার ফলে ওয়াকফের জন্য অধিকার জন্মানোর ব্যাপারে বাবরি মসজিদ সংক্রান্ত রায়ের ১১৩৪ নম্বর অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে ‘Waqf by user is a principle of our jurisprudence’। এর অর্থ, এটা আমাদের দেশের আইনতত্ত্বের অবিচ্ছেদ্য নীতি। বাবরি মসজিদ রায়ের কুড়িটা পাতা জুড়ে এর স্বীকৃতি রয়েছে। প্রসঙ্গত, দেশের ভূমি আইনেও এর উল্লেখ রয়েছে। সহজ করে বললে, এক ব্যক্তির জমির সামনে যদি অন্য ব্যক্তির জমি থাকে,এবং অন্য ব্যক্তি যদি প্রতিদিন সেই জমি ব্যবহার করেন যাতায়াত ইত্যাদির জন্য এবং প্রথম ব্যক্তি যদি তাতে কোনো আপত্তি না জানান, তাহলে দীর্ঘ সময় পরে দ্বিতীয় ব্যক্তির সেই জমির ওই টুকরোর উপরে অধিকার জন্মায়। দেওয়ানি বিধি অনুযায়ী এই দাবি বৈধ। সেক্ষেত্রে ওয়াকফের ক্ষেত্রেও এই দাবি বৈধ হওয়া উচিত। নইলে দেশের দেওয়ানি আইনেও বদল আনতে হবে।
এর পাশাপাশি বাস্তবের সঙ্গে বিজেপির বহু দাবির বিরোধ রয়েছে। যেমন বিজেপির তরফে প্রচার চালানো হচ্ছে, নতুন আইন অনুযায়ী ওয়াকফ সম্পত্তিগুলোকে কেন্দ্রীয় পোর্টালে নথিভুক্ত করা শুরু হবে এবং মাত্র ১০৮৮ খানা ওয়াকফ সম্পত্তির এই মুহূর্তে বৈধ দলিল রয়েছে। যদিও ফয়জানের বক্তব্য, ২০১০ সাল থেকে ওয়াকফ সম্পত্তির দলিল ডিজিটাইজ করার কাজ শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৪২% জমির দলিলের ডিজিটাল নথিভুক্তিকরণ করা হয়েছে। বাকি কাজ শেষ হতে আরও ৫-৭ বছর লাগা উচিত। তাই ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার কাজ এই প্রথম শুরু হল এমনটা নয়।
বিজেপির আরও দাবি, ওয়াকফ ট্রাইব্যুনালের কাছে ওয়াকফ নিয়ে ৪০,৯৫১ আবেদন ও অভিযোগ জমা রয়েছে। সেসবের এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। দেওয়ানি আদালতকে এর সঙ্গে যুক্ত করলে ন্যায় পেতে সুবিধা হবে। যদিও ন্যাশনাল জুডিসিয়াল ডেটা গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের নিম্ন আদালতে এক কোটি আট লক্ষ দেওয়ানি মামলা বকেয়া রয়েছে। এর উপরে আরও নতুন মামলার ভার চাপালে কীভাবে দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব তা বিজেপি স্পষ্ট করেনি।
মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে মৌখিক দান বৈধ ও স্বীকৃত। কিন্তু নতুন ওয়াকফ আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মৌখিকভাবে ওয়াকফের জন্য জমি দান করা যাবে না। অর্করঞ্জনের কথায়, আইনের এই ধারা সরাসরিভাবে মুসলিম পার্সোনাল ল বা মুসলমান ব্যক্তিগত আইনের পরিপন্থী। পাশাপাশি এরফলে বহু ঐতিহাসিক ওয়াকফ সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে নতুন করে বিবাদ মাথাচাড়া দিতে পারে বলে অনেকের আশঙ্কা।
অবশ্য আইনজ্ঞদের একাংশের বক্তব্য – ওয়াকফ সম্পত্তিতে পরিণত হওয়া কোনো জমির চরিত্র বদল এই আইনেও সম্ভব নয়। কিন্তু বিতর্কের অবকাশ থেকেই যাচ্ছে।
ফয়জানের কথায়, ইংরেজ আমলেও কোনো আইন নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হলে সেই সম্প্রদায়ের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বিভ্রান্তি ও আশঙ্কা দূর করার চেষ্টা করা হত। নতুন ওয়াকফ আইনের ফলে বহু মানুষের মনে হচ্ছে যে তাঁদের কবরস্থান বা মসজিদ কেড়ে নেওয়া হতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব ছিল তাঁদের আশ্বস্ত করা। সেটা করা হয়নি বলেই সারা দেশে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
নিবন্ধকার সাংবাদিক, বর্তমানে ব্রিটেনে স্নাতকোত্তর স্তরে পাঠরত। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








