শাহাদাৎ হোসাইন (স্বাধীন)

প্রিয় ভারতবাসী, আমার একটি মন খারাপের গল্প বলতে এসেছি।

পড়াশোনা করছি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে, সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে। ১৯ জুলাই থেকে পরিবার পরিজন, বন্ধুবান্ধব কারোর সঙ্গে যোগাযোগ নেই। বাংলাদেশ সরকার সব ধরনের ইন্টারনেট শাটডাউন করে, মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে কারফিউ জারি করেছিল, যা এখনো পুরোপুরি ওঠেনি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এর আগে জুলাইয়ের প্রথম থেকে শুরু হয় কোটা সংস্কার আন্দোলন। আন্দোলনকারীদের প্রতি সরকারের অপমানসূচক বার্তা এবং ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতা, কর্মীদের হামলায় ১৫ জুলাই থেকে আন্দোলন রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। আমরা কারবালার গল্প জেনেছি মীর মোশাররফ হোসেনের বিখ্যাত উপন্যাস বিষাদ-সিন্ধু পড়ে। কিন্তু এবারের আশুরায় দেখেছি আমার দেশের সবুজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের রক্তে লাল। পুলিশ অ্যাম্বুলেন্সে গিয়েও হামলা করছে। এ যেন আরেক কারবালা।

১৬ জুলাই নিরস্ত্র ছাত্রদের উপর পুলিশের গুলিতে মারা যায় ছজন, তার পরদিন ৪১ জন। ১৮ জুলাই থেকে আর লাশের সংখ্যা গণনা করা কঠিন হয়ে ওঠে। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে ফেলা হয়। ১৯ জুলাই সকালে এএফপি সংবাদ দিল যে তিনদিনে (১৬-১৮ জুলাই) নিহত হয়েছে ১০৫ জন। আজ যখন লিখছি তখন জানি না কতজন মারা গিয়েছে দেশে। প্রথম আলো মঙ্গলবার বলেছে অন্তত ১৭৪ জন। ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্কবিহীন দেশে সব লাশের খবর ঢাকার গণমাধ্যমে আসবে না সেটাই স্বাভাবিক। ফলে এখন কোনো কোনো সূত্র যখন লাশের সংখ্যা চারশোও হতে পারে বলছে, অবিশ্বাস করতে পারছি না। নেত্র নিউজ বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র দিয়ে বলছে এই আন্দোলনে গুরুতর আহত হয়েছেন ১,০০০ জনের বেশি। ঢাকা থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের একজন সাংবাদিক জানাচ্ছেন, হাসপাতালগুলোতে লাশের সারি ও আহতদের আহাজারি। কারফিউ থাকায় এবং ইন্টারনেট না থাকায় আহতদের জন্য রক্তের ব্যবস্থাও করা যাচ্ছিল না। অনেকে যথাযথ চিকিৎসা না পেয়ে হাসপাতালেও মারা যাচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, স্বাধীনতার পর এত বড় ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশে হয়নি। বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে কিন্তু মিশে আছে ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৬৬ সালের ছ দফা দাবি, ৬৯ সালের গণঅভ্যূত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্ররা ছিল অগ্রণী ভূমিকায়। সেই মাটির ছাত্ররাই আবার আন্দোলনে নেমেছে।

আরো পড়ুন বাংলাদেশ: জেগে থাকা স্মৃতি

এই আন্দোলনের ব্যানারের নাম ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। তারা দাবি করছে সরকারি চাকরিতে বিদ্যামান কোটা ব্যবস্থার সংস্কার। শুধু কি তাই? সরকারি চাকরি পরীক্ষায় একের পর এক প্রশ্ন ফাঁস, সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের দখলদারি ও গুন্ডামি, সারা দেশে বেকারত্ব, দুর্নীতি ও দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি যেন আকাশ ছুঁয়েছে। ছাত্ররা এইসব বৈষম্যের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে। এই ছাত্রদের হাতে জাতীয় পতাকা, মুখে জাতীয় সংগীত। কখনো রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের গান বা সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা।

কোথায় পেলো তারা এই চেতনা, এত সাহস? এই শিক্ষার্থীরা যখন স্কুলে পড়ত ২০১৮ সালে, তখন ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ২০১৮’ নামে একটি আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, যা সারা দেশে আলোড়ন তোলে। এই প্রজন্ম সোশাল মিডিয়া ও ইন্টারনেটের কারণে এক আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় বাস করে। ফলে সারা দুনিয়া তাদের হাতে মুঠোয়। তারা ভালমন্দের তফাত করতে পারে; গণতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্রের পার্থক্য বুঝতে পারে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধা – এসব তাদের চেতনায় গেঁথে গেছে। ফলে এই তরুণ তুর্কিরা ২০২৪ সালে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছে, ফের আরেক বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে।

তারা দেখছে সারা দুনিয়ায় মানুষ নিজের অধিকারের কথা বলতে রাস্তায় নামছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন তারা দেখেছে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি যে যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের চর্চা হলেও আমরা বাংলাদেশে বসবাস করি শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনে। ফলে এই নিরস্ত্র ১৮-২৩ বছর বয়সী ছাত্রদের আন্দোলনে শেখ হাসিনা তাঁর ছাত্রলীগ, পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনী লেলিয়ে দিয়েছেন। দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে ঝরে যাচ্ছে আমাদের ছাত্র ভাইদের প্রাণ। আগে আমাদের দেশের ছাত্র আন্দোলন সাধারণত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও এবার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও। এমনকি মফস্বলের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও রাস্তায় নেমে এসেছে। বিবিসি বাংলা খবর দিচ্ছে, আন্দোলনে নিহতদের মধ্যে ফল ব্যবসায়ী, হকার, নির্মাণ শ্রমিক – এঁরাও আছেন। ছাত্রদের এত রক্ত, এত মৃত্যু দেখে সাধারণ মানুষও নেমে এসেছে রাস্তায়।

আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাম রাজনীতি করছি, টুকটাক মিছিল মিটিং করছি, তখন নানা আশা-হতাশার কথা বলতাম একজন শ্রদ্ধাভাজন সিনিয়রের সঙ্গে। তিনি একদিন বলেছিলেন, এসব কয়েকটা মিছিল বিপ্লব নয়। বিপ্লব হবে সেদিন যেদিন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, শহর-মফস্বল বিশ্ববিদ্যালয় নির্বিশেষে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসবে। মিছিলে আসবে নারী, আসবে শ্রমিক, মেহনতি মানুষ। সন্তানের হাত ধরে আসবে বাবা, স্বামীর হাত ধরে আসবে স্ত্রী। সবাই সমস্বরে বলবে ‘আমরা ইনসাফ চাই’। সেদিনই কাঙ্ক্ষিত বিপ্লব হবে। আমার মনে হচ্ছে এই আন্দোলন আমার সিনিয়রের ভবিষ্যদ্বাণী করে যাওয়া সেই বিপ্লব।

শেখ হাসিনা এবং তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকা বাংলাদেশের গণমাধ্যম এবং বেশ কিছু ভারতীয় গণমাধ্যম ও সোশাল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব বলার চেষ্টা করছে – এই আন্দোলন মৌলবাদীদের আন্দোলন। তাহলে আন্দোলনে নিহত হিন্দু ছাত্ররাও কি মৌলবাদী? মিছিলে আসা আদিবাসী নারী, রিকশাচালক, খ্রিস্টান ছাত্র, বস্ত্রশিল্পের শ্রমিক – এরাও কি মৌলবাদী?

ভারত আমাদের প্রতিবেশী। পশ্চিমবাংলার সঙ্গে আমার ভাষা এক, নদীও এক। ফলে আমরা খুব সহজে ভালবাসা ও ঘৃণা – দুটোই বিনিময় করতে পারি। বাংলাদেশের সঙ্গে বার্মিজদের সম্পর্ক ‘দা-কুমড়ো’ হলেও সোশাল মিডিয়ায় তার প্রকাশ দেখা যায় না, তার কারণ ভাষা। বার্মিজরা যেমন বাংলা বোঝে না, তেমনি আমরাও বার্মিজ বুঝি না। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবাংলার সবাই বাঙালি। একই পদের খাবার আমরা খাই, একই রবীন্দ্র-নজরুল আমরা গাই। ফলে আমরাই একে অপরকে জানি বেশি। এই জানার ফলে আপনি ঘৃণাও করতে পারেন, ভালবাসতেও পারেন, আপনি মুক্ত।

আজকে ঢাকায় ছাত্রদের রক্ত দেখে কলকাতায়, দিল্লিতে আমার ভারতীয় ভাইবোনরা স্থির থাকতে পারেননি। তাঁরা রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করেছেন। আমি তাঁদের সাধুবাদ জানাই। এ যেন মুক্তিযুদ্ধের মত প্রতিবেশীর কঠিন দিনে এগিয়ে আসা।

কিন্তু আমার দুঃখও অনেক। আমি যেহেতু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে পড়াশোনা করছি, একদিন ঢাকায় একটি পাঠচক্রে কিছু তরুণ আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত – এই তিনটি দেশকে আমাদের কীভাবে দেখা উচিত’? আমার উত্তর ছিল, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের কিছু পশ্চিমা ধাঁচের বুদ্ধিজীবি তৈরী করে দেবে। এসি রুমে বসে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করার আহ্বান জানাবে। অন্যদিকে চীন আসবে এখানে ব্যবসা করতে। কিন্তু আমাদের সঠিকভাবে বোঝা দরকার ভারতকে। ভারতেরও দরকার আমাদের বোঝা। আমাদের এই দুদেশের বোঝাপড়ার মধ্যে ঘাটতি থাকা দুঃখজনক। বাংলাদেশের জনগণ ও ভারতের জনগণের উন্মুক্ত যোগাযোগ থাকতে হবে। অরাষ্ট্রীয় পরিসর, যেমন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক পরিসরে আমাদের যোগাযোগকে যেন দৃঢ় করতে পারি। যেন আমরা সুখের দিনে, দুঃখের দিনে একসাথে থাকতে পারি।

আজ ভারতবর্ষ থেকে কেউ কেউ হাজার ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে। হয়ত ভারতের বিদেশনীতির স্বার্থে, নতুবা সত্যি সত্যি বাংলাদেশ সম্পর্কে এবং আন্দোলন সম্পর্কে আবছা ধারণা থাকার কারণে। কিন্তু এ যুগে কিছুই গোপন রাখা যায় না। সোশাল মিডিয়া আমাদের রাজনৈতিক সীমান্ত ভেদ করেছে। আন্দোলন সফল কি ব্যর্থ তা বলার সময় আসেনি। কিন্তু আমাদের জেনারেশন Z-র আন্দোলন দেশ বিদেশ সবখানে নাড়া দিয়েছে। আন্দোলন আমার দেশের উদ্যমী তারুণ্যের চেতনাকে মজবুত করেছে। তাদের লড়াকু বানিয়েছে। তারা যখন জানে যে তাদের প্রাণের আন্দোলন, যেখানে তারা বন্ধুকে হারিয়েছে, সহপাঠীকে রক্তাক্ত হতে দেখেছে, যে আন্দোলনের কারণে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে জলপাই পোশাক পরা সামরিক বাহিনী ঢুকেছে, সেই আন্দোলনের প্রতিবেশী দেশ ভুল ব্যাখ্যা করছে, ‘মৌলবাদীদের আন্দোলন’ বলে হাসিনার ভাষায় কথা বলছে, তখন একটা গোটা প্রজন্মের কাছে ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যায়। আস্ত এক প্রজন্মকে বিক্ষুব্ধ করে জনবিচ্ছিন্ন এক সরকারকে সমর্থন করে হয়ত ভারতের বিদেশনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি হবে, কিন্তু বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর আবেগকে মূল্য না দেওয়াও ভুল।

ভারত এক গর্বিত গণতান্ত্রিক দেশ, আমাদের তিন পাশ ঘিরে থাকা প্রতিবেশী। আমাদের দুই দেশের সম্পর্ক এমন হওয়া উচিত যাতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ ও মানুষের জন্য লড়াইয়ের চেতনা একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি। ঘৃণার চাষ নয়, আমরা যেন ভালবাসার ১০৮ পদ্ম ফোটাই। ভারতের জনগণের একাংশ যেভাবে বাংলাদেশের ছাত্র জনতার পাশে দাঁড়িয়েছে, সেভাবে বাকিরাও দাঁড়াক। আমরা যেন একে অপরের সত্যিকারের বন্ধু হই। বিপদের দিনে যেমন একে অপরকে বুকে টেনে নেব, তেমনি একে অপরের সাফল্যও যেন আমরা উদযাপন করতে পারি।

আসুন নতুন দিনের ভাষা বুঝি, নতুন দিনের সম্পর্ক বুনি।

নিবন্ধকার মন খারাপ করে বসে থাকা একজন বাংলাদেশি তরুণ। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.