২০২৪ সালের অগাস্ট মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অপসারণের পর জনমানসে ক্রমশ গুরুত্ব হারাচ্ছেন স্বয়ং তাঁর বাবা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বলে ধরা হয় যাঁকে, সেই শেখ মুজিবুর রহমান। সমালোচকরা বলছেন, স্বৈরতন্ত্র আর বেলাগাম দুর্নীতি কায়েম রাখতেই হাসিনা তাঁকে দেবতা বানিয়ে তুলেছিলেন। এই কয়েক মাসে সে চিত্র বদলেছে, সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন করে লেখার উদ্যোগ শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশের জাতির পিতা মুজিবুর রহমান, মুজিব নামেই যিনি বেশি পরিচিত, ১৯৭৫ সালের অগাস্ট মাসে সেনাবাহিনীর বিপথগামী ব্যক্তিদের হাতে সপরিবারে নিহত হন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে নির্মিত স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স তখন সবে সাড়ে তিন পেরিয়েছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মুক্তিযুদ্ধে মুজিবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ঠিকই, তবে আওয়ামী লিগের বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগও দীর্ঘদিনের। খোদ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ – তিনি বাংলাদেশের জনতার সামনে মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস খাড়া করেছিলেন তা সম্পূর্ণত মুজিবকেন্দ্রিক। সেখান থেকে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য সংগ্রামী শক্তি বা ব্যক্তিত্বদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা হয় মুছে ফেলা হয়েছে অথবা তাঁদের ঠাঁই হয়েছে নিছক ফুটনোট হিসাবে।

হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে কয়েকমাস ধরে দেশের নানা প্রান্তে মুজিবের মূর্তি উপড়ে ফেলা হয়েছে, তাঁর ম্যুরাল বিকৃত করা হয়েছে, সরকারি অফিসের দেওয়াল থেকে তাঁর ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছে, পাঠ্যবই থেকে তাঁর প্রসঙ্গ বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি জাতীয় দিবসের তালিকাতেও তাঁর মৃত্যুদিন বা অন্যান্য স্মরণীয় দিনগুলোর আর কোনো অস্তিত্ব নেই। অনেকেই মনে করছেন যে এসব হাসিনার মুজিবকে দেবতা বানানোর আতিশয্যের প্রতিক্রিয়াতেই ঘটছে।

কিন্তু ইতিহাসের পুনর্লিখন কেবল মুজিবকে সরিয়েই ক্ষান্ত থাকবে তা নয়, বরং এর প্রভাব পড়তে পারে খোদ মুক্তিযুদ্ধের উপরেই। আওয়ামী লিগ ও তাদের জোট শরিকদের বক্তব্য, হাসিনাকে যারা ক্ষমতা থেকে সরিয়েছে তারাই এখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে দিতে চাইছে। এহেন অভিযোগ যে কেবল এই শিবির থেকেই আসছে তা কিন্তু নয়।

গত ১৩ ডিসেম্বর ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টির (বিএনপি) সাধারণ সম্পাদক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যেমন বলেছেন ‘১৯৭১-কে ছোট করে দেখানোর একটা প্রবণতা আমার চোখে পড়েছে। আমার মনে হয়, এটা একটা বড় ষড়যন্ত্রের অংশ। এ ধরনের ষড়যন্ত্র মানুষকে প্রকৃত ইতিহাস জানতে দেয় না। এও আরেক ধরনের ইতিহাস বিকৃতি।’

আওয়ামী লিগ ছাড়া জাতীয় স্তরে বড় দল বলতে এই বিএনপি। আওয়ামীর মত তারাও মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার দাবি করে থাকে।

ঘটনা হল, সাম্প্রতিককালে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে পরিকল্পিতভাবে মুজিবকেন্দ্রিক করে তোলার কারণে এই আলমগীরই হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে বারবার ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ এনেছেন।

বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইসলামপন্থী দল জামাত-ই-ইসলামী, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যারা পাক সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশ গণহত্যা ঘটিয়েছিল বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ, এই পরিস্থিতিতে তারাও নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছে। তাদের বক্তব্য, স্বাধীনতার লড়াইয়ে ভারতের সাহায্য নেওয়া আদপেই উচিত কাজ হয়নি। জামাতের পক্ষে সমর্থনও বাড়ছে।

‘যাঁরা চান, জামাত তাদের ’৭১-এর কার্যকলাপের জন্য ক্ষমা চাক, তাঁদের আমি বলব, উলটে মুক্তিসংগ্রামীদের ক্ষমা চাওয়া উচিত জামাতের কাছে। তাঁরা আজ যেটা বুঝছেন, জামাত সেটা ৫৩ বছর আগেই বুঝে গিয়েছিল’। ১৭ ডিসেম্বর এক ফেসবুক পোস্টে একথা লিখেছেন ইউটিউবার এলিয়াস হোসেন, ফেসবুকে যাঁর ভক্তের সংখ্যা ৪,৮০,০০০।

তার আগের দিনই ছিল ১৬ ডিসেম্বর, বাংলাদেশে যে দিনটাকে বিজয় দিবস হিসাবে পালন করা হয়। ওইদিনই ১৯৭১ সালে পাক সেনাবাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ করে, পাক শাসন শেষ হয়ে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। কিন্তু হোসেনের মতে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মনে করেন, এই জয় শুধুই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের জয়। তাই বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানানোর কোনো প্রয়োজন আছে বলে তিনি মনে করেননি।

হোসেন জানিয়েছেন ‘মোদীর গতকালের পোস্ট পড়লেই বোঝা যায়, কেন জামাত সেসময়ে স্বাধীনতা চায়নি। স্বাধীনতার প্রয়োজন আমাদের ছিল, তবে ’৭১-এর পথে নয়। আমরা সেদিনই পুরোপুরি স্বাধীন হব, যেদিন বাংলাদেশ ভারতের কবল থেকে মুক্ত হতে পারবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, পাঠ্যবইতে মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখকালে তাদের যেন ‘শয়তান’ হিসাবে না দেখানো হয়, তা নিশ্চিত করতে জামাত এখন ইউনুস সরকারের সঙ্গে ‘ষড়’ করছে। বর্তমান সরকারের উপর জামাত কিছুটা হলেও প্রভাব বিস্তার করেছে বলে খবর।

জটিল ইতিহাস

মুক্তিযুদ্ধ ঘটেছিল মুজিবকে সামনে রেখেই, কিন্তু গোটা সময়কাল জুড়ে তিনি নিজে অনুপস্থিত ছিলেন। বলা ভাল, উপস্থিত থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া অবধি কাটে পাকিস্তানের এক জেলে। মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লিগ প্রধান শক্তি ছিল ঠিকই। কিন্তু ছাত্ররা, বিশেষত, আওয়ামী লিগের বামমনস্ক ছাত্ররা এবং কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যরা, ’৭১ সালে তো বটেই, ১৯৬৯ সাল থেকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের জমি তৈরি হয়েছিল তখনই।

মুজিবের অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লিগের দুই নেতা – তাজউদ্দীন আহমেদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম – বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেন। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, সিরাজ শিকদারের পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি এবং মণি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইস্টার্ন বেঙ্গল।

মুজিবের গ্রেফতারির পরপরই পূর্ব পাকিস্তানবাসী বাঙালি সেনা আধিকারিকদের এক বড় অংশ পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মেজর জিয়াউর রহমান তাঁদের অন্যতম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ২৭, ২৮ ও ২৯ মার্চ, পরপর তিনদিন তিনটি আলাদা বিবৃতি দিয়ে জিয়া ঘোষণা করে দেন – বাংলাদেশ স্বাধীন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি জেড বাহিনীকে নেতৃত্ব দেন, হয়ে ওঠেন দেশের বরেণ্য রণনায়কদের একজন।

মুজিব হত্যার প্রায় দুবছর পরে জিয়া যখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান, তখন দেশের প্রথম সামরিক শাসক হিসাবে তিনি রাষ্ট্রপতির পদে বসেন। তারপর ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বিএনপি দল। কিন্তু ১৯৮১ সালে ফের এক সেনা অভ্যুত্থানে মুজিবের মতই জিয়াও নিহত হন।

১৯৯১ সালে, প্রায় ১৫ বছরের সামরিক শাসন শেষে, বাংলাদেশে যখন প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, ততদিন পর্যন্ত স্কুলপাঠ্য বইতে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস বলতে যা বোঝায় তা সেভাবে জায়গা পায়নি। ১৯৯৬ সালে হাসিনার আওয়ামী লিগ প্রথমবার ক্ষমতায় আসে। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অধীনে যে নাগরিক আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, সেই আন্দোলনের চাপেই হাসিনার আমলে সরকারি তরফে স্কুলপাঠ্য বইগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের আখ্যান ‘শোধন’ শুরু হয়।

২০০১ থেকে ২০০৬ অবধি বিএনপি-জামাত সরকারের আমলে অবশ্য এই প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। ২০০৯ সালে প্রকাশিত মুমতাজউদ্দিন পাটোয়ারীর বই পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি এই কথাই বলছে। মুজিব ও আওয়ামী লিগের অবদান মুছে দিয়ে জিয়াকেন্দ্রিক এক ইতিহাস চালানোর চেষ্টা হয়েছিল। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর হাসিনা সরকার অসমাপ্ত পুনর্লিখন চালু করে।

আরো পড়ুন হিন্দুত্ববাদের পালটা কল্পনা নির্মাণ করছেন দীনকৃষ্ণ ঠাকুর

২০২০ সালে মুজিবের শতবর্ষ উপলক্ষে দেশজুড়ে শয়ে শয়ে মুজিবের মূর্তি বসানো হয়। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মুজিবের নামে শপথ গ্রহণ, মুজিবের জীবন উপলক্ষ করে নানাবিধ অনুষ্ঠান জনজীবনের অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। এই সময়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে যা ঘটেছে, তাকে দিব্যি ‘সম্পূর্ণ মুজিবায়ন’ বলে আখ্যা দেওয়া যায়।

এখন অবশ্য উল্টোটাই ঘটছে।

সাম্প্রতিক চিত্র

গত অক্টোবরে প্রধান উপদেষ্টা ইউনুসের বিশেষ সহকারী, ছাত্রনেতা মাহফুজ আলম তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে একটি নতুন কভার ছবি লাগান। সঙ্গে সঙ্গে ছবিটি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। কারণ, ছবিতে থাকা পাঁচ নেতাই ছিলেন ১৯৪০-এর দশকের পাকিস্তান আন্দোলনের পুরোধা। ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগ এবং পাকিস্তান গঠনের সঙ্গে তাঁরা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন। এই পাঁচজনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের অংশ ছিলেন কেবল ভাসানী। বাকিরা হয় ততদিনে মৃত, অথবা নিষ্ক্রিয়। স্বাভাবিকভাবেই ছবিতে মুজিবের অনুপস্থিতি এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের প্রায় না-থাকা মানুষের নজর কাড়ে।

ওই মাসেই ইউনুস সরকার আটটি জাতীয় দিবস বাতিল করে। তার মধ্যে ছটি জাতীয় দিবসের সঙ্গেই জড়িয়ে ছিলেন হাসিনার পরিবারের কোনো না কোনো সদস্য – ৭ মার্চ (১৯৭১ সালের এই দিনে মুজিব সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতা দেন), ১৭ মার্চ (মুজিবের জন্মদিন, যা পালিত হয় শিশু দিবস হিসাবে), ৫ অগাস্ট (হাসিনার ভাই শেখ কামালের জন্মদিন), ৮ আগস্ট (হাসিনার মা বেগম ফাজিলাতুন্নেসার জন্মদিন), ১৫ অগাস্ট (মুজিবের হত্যা দিবস, যা পালিত হয় জাতীয় শোকদিবস হিসাবে) এবং ১৮ অক্টোবর (হাসিনার ছোট ভাই শেখ রাসেলের জন্মদিন)।

অন্য যে দুটি তারিখকে জাতীয় দিবসের তালিকা থেকে বাতিল করা হয়েছে, সেগুলি হল ৪ নভেম্বর (১৯৭২ সালে সংবিধানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিকে স্মরণে রেখে এই দিনটিকে জাতীয় সংবিধান দিবস হিসাবে পালন করা হয়) আর ১২ ডিসেম্বর (স্মার্ট বাংলাদেশ দিবস)।

হাসিনার পরিবারের সঙ্গে জড়িত জাতীয় দিবসগুলিকে বাতিল করার সিদ্ধান্ত অনেকে সমর্থন করলেও, ৭ মার্চ (সেদিনের বক্তৃতায় মুজিব চলমান গণআন্দোলনকে সরাসরি ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে আখ্যা দেন) ও ৪ নভেম্বরের জাতীয় সংবিধান দিবস বাতিলের সিদ্ধান্তে যথেষ্ট বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

নাগরিক সমাজের বিশিষ্টরা তর্ক তুলেছেন, যে দুই ঘটনার কারণে এই দুটি দিন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, তা কেবল মুজিব বা আওয়ামী লিগের একার ব্যাপার নয়, গোটা দেশের জন্যেই ঐতিহাসিক। কয়েকজন আবার এই প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন, মুজিবের ৭ মার্চের বক্তৃতার আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিয়েছিলেন এবং ১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ছাত্রদের আন্দোলনই আসলে মুজিবের ৭ মার্চের বক্তৃতার জমি প্রস্তুত করেছিল।

আর ৪ নভেম্বর দিনটি কেন বিতর্কিত?

নতুন কোনো সংবিধান রচিত হলে সেখানে ‘জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা’, বর্তমান সংবিধানের এই চার মৌলিক নীতিকে বদলে ফেলা হবে কিনা, একটি সাক্ষাৎকারে এ প্রশ্ন করা হলে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলি রিয়াজ বলেন, ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করা হল, সেই সময়ে ‘তিনটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ নীতি’-র কথা বলা হয়েছিল – সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মর্যাদা। ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে আলো দেখাতে পারত এই তিন নীতিই।

রিয়াজ বলেছেন ‘স্বাধীনতা ঘোষণার সময়ে এসবের উল্লেখ রাখা হলেও একবছর বাদে আর কারও এসব মনে নেই। তখন সেখানে জায়গা পেল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আমি মনে করি, সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মর্যাদা, এই তিনটিকেই আসলে আমাদের মৌলিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।’

সেদিক থেকে বিচার করলে এই পরিবর্তন মুক্তিযুদ্ধকে কোনোভাবে মুছে ফেলে না, বরং গুরুত্বহীন করে তোলে মুজিবকে। স্বাধীনতার ঘোষণা আসলে ছাত্রনেতাদের মিলিত সংগ্রামের ফল। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইতিহাস যদি নতুন করে লেখা হয়, সেখানে কী কী অন্তর্ভুক্ত হবে? বর্তমান সরকারের সদস্য, ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলামের মতে, মুজিবের অবদানকে কোনোভাবেই মুছে ফেলা হবে না। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়েই থাকবেন, তবে তাঁর অবদানকে বিচার করা হবে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে।

পাঠ্যবইয়ের এই আসন্ন পরিবর্তন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক জানিয়েছেন, মুজিবের অংশটি আকারে ছোট করা হবে, জিয়ার ভূমিকা নিয়েও পর্যাপ্ত আলোচনা থাকবে। তবে বিএনপির সময়ে যেভাবে তাঁকে দেবতা করে তোলা হয়েছিল, সেভাবে নয়। সঙ্গে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, যেমন ভাসানী, তাজউদ্দীন, আতাউল গনি ওসমানীর (মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশ বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ) অবদানকেও প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হবে।

ঢাকানিবাসী গবেষক সোহুল আহমেদ সম্প্রতি তাঁর এক নিবন্ধে জানিয়েছেন, হাসিনা তাঁর ১৫ বছরের শাসনকালে আওয়ামী লিগের মুক্তিযুদ্ধ সংস্করণটিকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। এর জন্য যেমন আইনি প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করেছেন, তেমন মহাফেজখানা থেকে বেছে বেছে কিছু পুরনো নথিপত্র প্রকাশ্যে এনেছেন।

সোহুল লিখেছেন, ‘এর মাধ্যমে একটি সরলীকৃত ইতিহাসকে তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে আওয়ামী লিগই সর্বেসর্বা। অত কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতায় যেসব বহু, বিচিত্র শক্তি লড়েছিল, তাদের উল্লেখ প্রায় নেই।’ সঙ্গে যোগ করেছেন, এ ধরনের চিত্রায়ন ‘জনতার গণতান্ত্রিক বোধ ও সংগ্রামী ঐক্যের ভীষণ ক্ষতি করেছে।’

হাসিনার আমলে কল্পকাহিনি বা ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণায় মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে দেখানো হবে তার নিয়ন্ত্রণও চলে গিয়েছিল আদালতের হাতে। তার উপর ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট এসে গিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। মুজিব বা মুক্তিযুদ্ধের সরকার নির্দেশিত বয়ান, এই দুইয়ের সমালোচনা করলেই তা হয়ে দাঁড়াত শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সোহুল লিখেছেন ‘দেশের জাতীয় ইতিহাস আসলে হয়ে দাঁড়িয়েছিল একটি বিশেষ পরিবারের জয় ও ট্র্যাজেডিকেন্দ্রিক আখ্যান।’

এই প্রতিবেদককে সোহুল জানিয়েছেন, ইতিহাস রচনার আজকের নতুন উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধকে কোনোভাবেই মুছে ফেলা হবে না। বরং মুক্তিযুদ্ধকে ওই বিশেষ পরিবার আর দলটার খপ্পর থেকে উদ্ধার করা হবে। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রাজনীতিকরা যাতে প্রাপ্য গুরুত্ব পান, তা দেখা হবে। তিনি বলছেন ‘বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক ধারা বা দলই মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করতে চায় না। যে ছাত্র প্রতিরোধ হাসিনাকে বাধ্য করল পদত্যাগ করতে, তারা তো নয়ই। কেবল জামাত তাদের পূর্বসূরিদের কাজ যে ঠিক ছিল, একথা প্রমাণ করতে নানা চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু তাদের কথা শোনার মত লোকের সংখ্যা নগণ্য।’

স্বৈরতান্ত্রিক শাসক তার রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে ইতিহাসকে সবসময়েই নিজের মত করে গড়েপিটে নেয়। সারা বিশ্বেই এমনটা ঘটেছে। ইতিহাস নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান সংগ্রাম কীভাবে এগোয় এবং কীভাবে তার অবসান হয় তা অবশ্যই দেশের ভবিষ্যতের উপর প্রভাব ফেলবে।

ভাষান্তর: সোহম দাস

লেখকের অনুমতিক্রমে দ্য ডিপ্লোম্যাট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মূল প্রতিবেদনের এই ভাষান্তর প্রকাশিত হল

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.