পর্দায় ফুটে ওঠে এলোপাথাড়ি ভিড়। জনৈক গেরুয়া ফেট্টিধারী চুলের মুঠি, গেঞ্জি ধরে টানতে টানতে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে এক শ্যামবর্ণ দীর্ঘদেহী যুবককে। তার পূর্বকৃত পাপ ধোওয়াতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গঙ্গাতীরবর্তী কোনো এক হনুমান মন্দিরে। ভিড়ের মধ্যে ফেসবুক লাইভ স্ট্রিমে হামলাকারীদের মধ্যেই কেউ বলছে ‘এই সেই দীনকৃষ্ণ ঠাকুর যার আসল নাম সূর্য নস্কর, যে হিন্দু সনাতন ধর্মের দেবদেবীকে অপমান করে। এ আমাদের হিন্দুধর্মের কলঙ্ক। তাকে আজ বাড়ি থেকে আটক করল আমাদের রামসেনা কমিটি। আমাদের পক্ষ থেকে তাকে জয়নগর থানার হাতে তুলে দেওয়া হল। সমস্ত হিন্দুধর্মের মানুষেরা এরকম ভণ্ডদের থেকে সাবধানে থাকুন।’

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই ঘটনার পরেও কিন্তু দীনকৃষ্ণ দমেননি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার খেয়াদহের ঘোষপাড়ায় তিনি আবার তুলে ধরেছেন সাবেকি কীর্তনীয়া ঢঙে বাংলার বহুজন সমাজের বয়ান। দীনকৃষ্ণ প্রথম নন যিনি সমষ্টিকে ভক্তিরসে জারিত করে এক ভেদাভেদহীন সমাজের কথা বলছেন, বিপ্রতীপে পাচ্ছেন ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজকাঠামোর তিরস্কার ও চাবুক। আসামের বৈষ্ণব পুণ্যভূমি সত্র বাড়ির মূলাধার হল গিয়ে অক্ষদণ্ড লাইখুঁটা। শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের একটি বৈষ্ণব সত্র উদ্বোধনের সময় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ উচ্চারণ করা, তাছাড়া তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত অনুগামী মুসলমান দর্জিকে বহিষ্কার না করায় বহু ব্রাহ্মণ কায়স্থ শিষ্য তাঁকে ছেড়ে চলে যায়। সত্র উদ্বোধনের পর তিনি সেই অক্ষদণ্ডের নাম দেন লাইখুঁটা।

আজকের ভারতে যখন মুসলমানবিদ্বেষের চাষ স্বাভাবিকতায় পর্যবসিত, তখন ওই সিদ্ধান্তকে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসাবে না দেখে উপায় নেই। মনে রাখতে হবে, আজকের অসমিয়া-ভূমিতে বাঙালি মুসলমান জনতা নাগরিকত্বটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। সমন্বয়ের ইতিহাস মুছে ফেলে শঙ্করদেবের মঠে ভিড় জমাচ্ছে সঙ্ঘবাদী বর্ণহিন্দুরা, যাদের পূর্বজ গুরু-মহাজনরা ছেড়ে গেছিল সত্রের উত্তরাধিকার। উপনিবেশ আমাদের শস্যশ্যামলা ভূমি, কৃষিপদ্ধতি, বীজগুলিকে যেমন নিঃশেষিত করেছে তেমনই আমাদের কৌমস্মৃতি থেকে মুছে দিয়েছে এমন ‘ধর্ম’ পালনের ইতিহাসও। এমনকি কয়েকদিন আগেই আরএসএস-বিজেপি পরিচালিত আসাম সরকার ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রার সময়ে রাহুল গান্ধীকে শঙ্করদেবের জন্মভিটেতে ঢুকতে দেয়নি।

এই গণহিস্টিরিয়ার প্রহরে, ডিজে বক্স-হিন্দুত্বের দানবিক কালে শঙ্করদেব প্রতিষ্ঠিত লাইখুঁটার ভক্তি পরম্পরায় হিন্দুত্বের অগ্রগামী সেপাই অসমিয়া জাতীয়তাবাদীরা আস্থা রাখছেন না।

একই পারম্পর্য মেনে ধ্বংস হয়েছে চৈতন্যের ভক্তিপরম্পরাও। কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থের মধ্য খণ্ডে একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয় মুসলমান সাধকদের সঙ্গে চৈতন্যের ভাব বিনিময় হয়েছিল। তিনি বৃন্দাবন থেকে ফেরার পথে বিজলী খাঁ নামক এক পাঠান ও তার কয়েকজন সহচরকে এবং তাদের গুরু এক কৃষ্ণাম্বর পরিহিত পীরকে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা দিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক, গবেষক মহম্মদ এনামূল হকের মতে, চৈতন্যদেবের প্রিয়তম শিষ্য ‘হরিদাস বৈষ্ণব মত গ্রহণের পূর্বে পীর ছিলেন’। তিনি আরও দেখিয়েছেন কীভাবে কীর্তনের ভাবগত উৎসে মিশে আছে সমন্বয়ী ভাবনা। তিনি বলছেন ‘চৈতন্যদেবের কীর্ত্তনকে বঙ্গে তাহারই সৃষ্টি বলিয়া উল্লেখ করিতে হয়।…ইহাতে চৈতন্যদেবের প্রেমময় হৃদয়ের প্রেম প্রকাশ পাইত। চিশতীয়হ্ ও সুহরবরদীয়্হ সম্প্রদায়ভুক্ত সাধকদের মধ্যে অবিকল কীর্ত্তনের অনুরূপ প্রেম-প্রকাশের ধারা প্রচলিত ছিল – তাহার নাম ‘সমা’ বা ‘গানের বৈঠক’। কোন বিশেষ বিশেষ দিবসে এই সম্প্রদায়ভুক্ত সাধকগণ এক স্থানে একত্র হইতেন, এবং গান-বাজনার সাহায্যে অন্তরকে উদ্দীপ্ত করিয়া ভগবৎ-প্রেমে গড়াগড়ি দিতেন, বা নাচিতে থাকিতেন। বঙ্গীয় সুহরবর্ দীয়হ্ ও চিশতীয়হ্ সম্প্রদায়ের ‘সমা’-এর প্রভাবে কীর্ত্তনের সৃষ্টি বলিয়াই আমাদের ধারণা।’ কিন্তু কবিকঙ্কনের কাছাকাছি সময়ে ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে এই কৃষ্ণদাস কবিরাজেরই চৈতন্যচরিতামৃত কাব্যে বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের দুই উচ্চপদস্থ আমলা ভাই – দবীর খাস সুলতানের একান্ত সচিব সনাতন গোস্বামী আর অর্থমন্ত্রী সাকর মল্লিক রূপ গোস্বামী সুলতানের অধীনে চাকরি করার জন্য খেদ প্রকাশ করে শ্রীচৈতন্যের কাছে দয়া ভিক্ষা করেন।

মহাপ্রভুর কাছে এই দুই ভ্রাতা যেরূপ দৈন্যসূচক আত্মপরিচয় দান করেছিলেন, চৈতন্য-চরিতামৃতকার তাকেই এই রূপে বর্ণনা করিয়াছেন –

‘নীচ জাতি নীচ সঙ্গে করি নীচ কাজ।/তোমার আগেতে প্রভু কহিতে করি লাজ॥/পতিত তারিতে প্ৰভু তোমার অবতার।/আমা বই পতিত জগতে নাই আর॥/আপন অযোগ্যতা দেখি মনে পাই ক্ষোভ।/তথাপি তোমার গুণে উপজয়ে লোভ॥/বামন যৈছে চান্দ ধরিতে চাহে করে।/তৈছে এই বাঞ্ছা মোর উঠয়ে অন্তরে॥/ম্লেচ্ছ জাতি ম্লেচ্ছ সঙ্গী করি ম্লেচ্ছ কাম।/গোব্রাহ্মণদ্রোহী সঙ্গে আমার সঙ্গম॥/মোর কৰ্ম্ম মোর হাত গলায় বান্ধিয়া।/কুবিষয় বিষ্ঠাগর্ভে দিয়াছে ডাবিয়া॥/আমা উদ্ধারিতে বলি নাহি ত্রিভুবনে।/পতিত-পাবন বিনে সবে তোমা বিনে॥’

জেমস টডের মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানো অ্যানালস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিজ অফ রাজস্থান বইয়ের ৩০০ বছর আগে লেখা কাব্যে উল্লিখিত ‘পতিত তারিতে’ আসা শ্রীচৈতন্যের প্রধানতম পরিকরের উক্তি থেকে কি পরিষ্কার হয় না, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সুলতানি, নবাবি আমলের থেকে বহু নিচুস্তরে কাজের সুযোগ পেয়েও হিন্দুত্ববাদী, মুসলমানবিদ্বেষী, অভদ্রলোকবিদ্বেষী, মহিলাদ্বেষী কায়স্থ-ব্রাহ্মণ-বৈদ্য (কাবাব) বাঙালি কেন উপনিবেশের গোড়াপত্তন থেকে সঙ্ঘের উত্থান ও সামাজিক কাঠামোর দখলদারির আমলে এসে হিন্দুত্ববাদী, ইউরোপমন্য হয়ে ওঠে?

আসলে যদি একদিকে দীনকৃষ্ণের ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিবিরোধী বয়ান রাখি আর অন্যদিকে রাখি অসীম সরকারের মত মতুয়া সম্প্রদায়ের সামনে সিএএ-এনআরসির গাজর ঝুলিয়ে রাখা নেতার কবিগানকে, তবে দেখব যে দীর্ঘদিন ধরে অনালোচিত সামাজিক স্থানাঙ্কগুলির নিজস্ব একটি ভাষা, একটি সর্বজনীন অভিব্যক্তির জন্ম হয়েছে, যা স্বর হিসাবে স্বয়ংক্রিয় এমনকি জনমোহিনী রাজনীতির নাটবল্টু হিসাবেও কাজ করছে। বক্তাদের বাচনভঙ্গি, জনপ্রিয় কৌমভাবনার অনুবাদে নতুন ধর্মীয় কল্পনার বয়ান এবং তাৎক্ষণিক অনুভবের নির্মাণ – এই তিনের মিশ্রণে গড়ে ওঠা ধর্মোপদেশ সভাগুলি ডিজিটাল মাধ্যমেরও এক ধরনের নিম্নবর্গীয় গণতন্ত্রীকরণ ঘটিয়েছে। সেখানে ধর্ম, রাজনীতি ও কাব্যের ত্রিভুজ মিশছে ধর্মীয় নীতি কাঠামো, রাষ্ট্রীয় নিদান ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গের জগাখিচুড়ি নির্মাণে। নাটকীয় বর্ণনা, গলা কাঁপানোর বাড়বাড়ন্ত, সঙ্গীতের প্রয়োগ সমেত কয়েক যুগ অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়া এই জনতার নন্দনতত্ত্বকে, তার পারম্পরিক রাজনৈতিক আদানপ্রদানের এই স্থানিকতাগুলিকে আমরা এখনো পাঠ করে উঠতে পারিনি। সমাজগবেষক ম্যাক্স স্টিল, বিপুল ক্ষেত্রসমীক্ষা সমেত বাংলাদেশের ইসলামী ওয়াজ মাহফিলগুলি নিয়ে এই কাজ করেছেন তাঁর ইসলামিক সারমনস অ্যান্ড পাবলিক পিটি ইন বাংলাদেশ: দ্য পোয়েটিকস অফ পপুলার প্রিচিং (২০২০) বইতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এপার বাংলার কীর্তন সভা বা কবিগানের আসরগুলি এখনও তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণের আওতাভুক্ত হয়নি।

আরো পড়ুন কালী: তৃণমূলী আত্মসমর্পণ, বাম ঔদাসীন্যে শক্তি বাড়বে বিজেপির 

অনেকের প্রশ্ন থাকতে পারে, বিশেষত যুক্তিবাদী আন্দোলন অথবা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার মানুষজনের, যে ধর্মীয় রক্ষণশীলতার মোড়কে কি প্রগতিশীলতার চাষ হতে পারে? এমন অনেকেই ইতিমধ্যেই দীনকৃষ্ণের প্রতি শর্ত সাপেক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। এমন ভদ্রলোকি প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি সাহায্য নেব দুই উপনিবেশনাশী তাত্ত্বিকের।

প্রথমত, বুঝতে হবে বাবু বাঙালির ভাষায় যা ‘গৌণধর্ম’ অথবা ‘অবস্কিওর রিলিজিয়াস কাল্ট’, সেটা কি শুধুই সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্বের উপাদান মাত্র? কালের নিক্তিতে তার অথবা তাদের প্রাসঙ্গিকতা আজ কতটা? এর উত্তর আমরা পেতে পারি কয়েক দশক ধরে নদিয়ার ভাবান্দোলন ও লালন বিষয়ক চর্চাকে প্রায়োগিক মার্কসবাদীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার কারিগর ফরহাদ মাজহারের থেকে। তিনি লিখছেন ‘লালন বর্তমানবাদী। তিনি নদিয়ার মানুষ। নদিয়ার ভাবে ভাবুক। তন্ত্র ও শাক্ত ধারার বিপরীতে শ্রীচৈতন্যের জাতপাতবিরোধী সামাজিক-রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি যে ভাবান্দোলনের উৎপত্তি লালনের বিকাশও ওর মধ্যেই। কিন্তু বৃন্দাবনের গোস্বামীরা শ্রীচৈতন্যের আন্দোলন ও শিক্ষার যে ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন, লালন সেই পথে যাননি। তিনি বর্তমানের ভজনা করেছেন, অনুমান নয়। আধুনিক দর্শনের ভাষায় তাঁর জীবনচর্চায় কোন প্রকার পরাবিদ্যার (metaphysics) স্থান নাই। কারণ নদিয়া ‘অনুমান’-এ নয়, ‘বর্তমান’-এ বিশ্বাসী।’

এই বর্তমান সময়ে লড়াইয়ের অভিমুখ বিষয়ে ফরহাদ বলছেন, ‘..ইতিবাচক বিরোধিতার আকুতি বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতিরোধ ও রূপান্তরের বাসনার মধ্যে। এই বাসনার চরিত্র রাজনৈতিক হতে বাধ্য। সেই বাসনার দিক থেকে দেখলে বাংলার ভাবচর্চার দরকারি অভিমুখটা শনাক্ত করা সহজ হয়। এই পথেই লালনকে বর্তমান করে তুলবার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। প্রশ্ন হচ্ছে একালে নদিয়ার ভাবের প্রাসঙ্গিকতা কোথায়? এটা পরিষ্কার বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতিরোধ ও রূপান্তরের বাসনা থেকে কাজ করা না হলে এখনকার লড়াই সংগ্রামে ফকির লালন শাহ প্রাসঙ্গিক হবেন না। বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতিরোধ ও রূপান্তরের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক করে তোলাকেই আমরা তাঁকে ‘বর্তমান’ করে তোলা বলছি।’

দীনকৃষ্ণের আলাপগুলি বাংলার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন কিছু নয়। বৃন্দাবনদাস ঠাকুরের শ্রীচৈতন্যভাগবত জানান দিচ্ছে, স্মার্ত রঘুনন্দনের মাটিতে যেখানে সামাজিক বিধানের মূলমন্ত্র ছিল ব্রাহ্মণ ছাড়া সকলেই শূদ্র, এমনকি ভূস্বামী কায়স্থেরাও, সেখানে অদ্বৈতাচার্য গৌরাঙ্গকে বলছেন

বিদ্যাধন কুল আদি তপস্যার বাদে/তোর ভক্ত তোর ভক্তি যে যে জন বাধে।।
সে পাপিষ্ঠ সব দেখি মরুক পুড়িয়া/চন্ডাল নাচুক তোর নাম গুণ গায়া।।’

কয়েকদিন আগে প্রায় ২০০টি গণসংগঠন আয়োজিত ফ্যাসিবাদবিরোধী মহাসম্মেলনে কলকাতায় উপস্থিত হয়েছিলেন লেখক, অধ্যাপক, বিউপনিবেশায়নের তাত্ত্বিক আদিত্য নিগম। সেখানে ‘ভারতীয় ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য’ শীর্ষক বক্তব্যে তিনি বলেন ‘আমাদের ঐতিহ্যের মধ্যে যেমন চার্বাক দর্শন আছে, শাক্ত পরম্পরা আছে, গোহত্যা আছে, বহু আচার আচরণ আছে যা বৈদিকও নয়, ব্রাহ্মণ্যও নয়। ভারতীয়ত্বের নাম করে যা কিছু, সবই সঙ্ঘবাদী জাতীয়তাবাদীদের ব্যবহারের জন্যে তুলে দেওয়া ঠিক হবে কিনা আমাদের ভাবতে হবে। ভারতীয় যা কিছু সব কিছু সঙ্ঘবাদীদের রাজনীতি করার জন্যে ছেড়ে দিলাম, আমরা রয়ে গেলাম লেনিন-স্ট্যালিন নিয়ে রাজনীতি করার জন্যে, এটা রাজনীতি করার ঠিক পদ্ধতি কিনা ভাবতে হবে এবং আমরা এই রাজনীতি সম্বল করে কতদূর এগোতে পারব, আমার সন্দেহ আছে।’ তিনি বারবার জোর দিয়েছেন হিন্দুত্ববাদের কাঠামোগত ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের উপর, যার দেখা আমরা পাই অজিত দাসের জাতবৈষ্ণব কথা বইতে, বেহাইমশায়ের বেহায়া সংলাপে ‘বামুনকে রুখবে কে? বুদ্ধদেব পেরেছেন? পাঠান মোগল ইংরাজ – কেউ পেরেছে? জাতবৈষ্ণবও আর পারবে না। এদেশে ব্রাহ্মণেরই লীলা।’

এই লীলাময় মধুচাকে দীনকৃষ্ণ ঠাকুর জোরের সঙ্গে ঢিল ছুড়েছেন। আদিত্য সেই সর্বগ্রাসী হিন্দুত্বের ময়না তদন্ত করতে গিয়ে বলছেন ‘আজকে যে হিন্দুত্ববাদ দেখছি, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি শুরু হয়েছিল সেটা ছিল পরম্পরা আবিষ্কারের একটা রূপ। আজকেও এক ধরনের নতুন পরম্পরা আবিষ্কারের রাজনীতি শুরু হয়েছে। মাথায় রাখতে হবে লড়াইটা ইতিহাসের জায়গায় দাঁড়িয়ে হচ্ছে না, মিথের রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে হচ্ছে। মহিষাসুর থেকে শুরু করে বহু মিথ নতুন করে উপস্থিত হচ্ছে, প্রত্যেকটা মিথকে নতুন ব্যাখ্যায় উপস্থিত করা হচ্ছে। এই ব্যাখ্যাগুলো ঐতিহাসিকভাবে ঠিক কি ভুল, সেটা মূল প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হল পাল্টা একটা কল্পনা সামনে রাখা হচ্ছে। ভারতীয় ইতিহাস, ভারতীয় পরম্পরা কী, হিন্দু ট্র্যাডিশনটাই বা কী, তার পাল্টা ইম্যাজিনেশন আমাদের তৈরি করার দরকার আছে। তার জন্যে আমরা কি তৈরি? এবং আমাদের আগামীদিনে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে যদি সেই ইম্যাজিনেশন তৈরি করার দরকার হয়, তাহলে কাদের সঙ্গে আমাদের কোন ধরনের কোল্যাবোরেশন করা দরকার সেটাও ঠিক করতে হবে।’

এইখানেই এই লেখায় আদিত্যের বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা। দীনকৃষ্ণ অবতার শ্রীকৃষ্ণকে অসুর বলেছেন বলে হিন্দুত্ববাদীদের গোঁসা হয়েছে

ইউরোপীয় পজিটিভিজমে জারিত মস্তিষ্কের ব্রিটিশ ডেপুটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন কৃষ্ণচরিত্র নির্মাণ করেন, তখন সে আর গ্রামসখা কানাই থাকে না, তার রাখালবালক রূপটি বিস্মৃত হয়। বরং সামনে আসেন করতলের গীতায় নিমজ্জিত গোপন হিংসার বাণী উগরে চলা আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের প্রতিভূ এক তুখোড় রাজনীতিবিদ কৃষ্ণ। এখানেই দীনকৃষ্ণের প্রজ্ঞা। তিনি অসুর বলে চিহ্নিত করে কৃষ্ণকে অপমানসূচক শব্দের ঘেরাটোপে নামাননি, বরং ‘দলিত’ জনতার মাঝে একাত্ম হতে কৃষ্ণকে তিনি এই নতুন পরিচয়ে পরিচিত করেছেন। এই কল্পনির্মাণ পুনর্বার একটি পুরাণ রচনা করেছে, জনগণের কৃষ্ণচরিত্র রচনা করেছে। প্রতিটি বিজেপি-আরএসএসবিরোধী মানুষের তাই কৃষ্ণের এই নববিগ্রহকে তাদের কুলুঙ্গিতে স্থান দেওয়া উচিত। উচিত দীনকৃষ্ণের পাশে দাঁড়ানো।

তথ্যসূত্র:
১. টডের তরবারি: ভদ্রবিত্তের ইসলামোফোবিয়া ও রাজপুত পৌরুষের সন্ধানে- বিশ্বেন্দু নন্দ, অত্রি ভট্টাচার্য (জ্ঞানগঞ্জ প্রকাশনা)
২. বঙ্গে স্বূফী প্রভাব- মহম্মদ এনামূল হক
৩. উপনিবেশবিরোধী চর্চা ও আমরা: কি করিতে হইবে (না)- আদিত্য নিগম, বিশ্বেন্দু নন্দ, অত্রি ভট্টাচার্য

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.