ছোটবেলায় ভূগোল বইতে আমরা নিশ্চয় মহাসাগরীয় স্রোত সম্পর্কে কমবেশি পড়েছিলাম। এই স্রোত বা প্রবাহগুলো হল সাগর ও মহাসাগরের জলের অবিচ্ছিন্ন অঙ্গ, যারা বিভিন্ন বল/কারণ (যেমন বায়ু, তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, মহাসাগরের অববাহিকার আকৃতি এবং পৃথিবীর ঘূর্ণন ইত্যাদি) দ্বারা নির্দেশিত হয়ে প্রবহমান। এরা আমাদের গ্রহের জলবায়ু এবং বাস্তুতন্ত্রের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এদের অন্যতম হল গাল্ফ স্ট্রিম। এই প্রবাহ আজ বিপন্ন। ২০২৫ সালের প্রথম দিক থেকেই এই প্রবাহ থেমে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে, যা অদূর ভবিষ্যতে ছোটখাটো এক তুষার যুগের সূচনা করতে পারে বলে ডেনমার্কের ভূবিজ্ঞানীদের এক নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে।
গাল্ফ স্ট্রিম প্রাকৃতিক কারণে মেক্সিকো উপসাগরে উৎপন্ন এক শক্তিশালী সমুদ্র প্রবাহ, যা সমগ্র উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। এর উষ্ণ জলপ্রবাহ একটা প্রাকৃতিক পরিবাহক বলয়ের (natural conveyor belt) মত বিষুবরেখা থেকে মেরুর দিকে তাপ পরিবহন করে আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে। এর আশীর্বাদে কনকনে শীতের মাসগুলোতে পশ্চিম ইউরোপে কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক তাপমাত্রা বজায় থাকে। যদিও এই অঞ্চলে শীতকালে প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়ে, তবু স্বস্তিদায়ক বলার কারণ – উত্তর আমেরিকা, কানাডা, উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ইউরোপ, এমনকি এশিয়ার সাইবেরিয়ার মত নির্মম ঠান্ডার হাত থেকে পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপকে গাল্ফ স্ট্রিম রেহাই দেয়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিধ্বংসী প্রভাবগুলো ক্রমশ ভীষণ প্রকট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা জেনে ফেলেছি এর ভয়ঙ্করতম পরিণামগুলোর একটা হল বিশ্বব্যাপী হিমবাহগুলোর গলে যাওয়ার গতি বৃদ্ধি। বরফের এই দৈত্যাকার চাঁইগুলোকে একসময় চিরকালীন মনে করা হত। অথচ সেগুলো ক্রমবর্ধমান বিশ্ব উষ্ণায়নের আক্রমণে এক এক করে বিলুপ্তির পথে ধাবমান। হিমবাহ গলে যাওয়ার বিধ্বংসী প্রভাব হিসাবে অবশ্যই সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির পাশাপাশি সমুদ্রপ্রবাহগুলোর গতিপথ পরিবর্তন (বা বাধা পাওয়া) ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয়, গাল্ফ স্ট্রিম কোনো ব্যতিক্রম নয়।
গাল্ফ স্ট্রিম থেমে গেলে বেশকিছুটা তাপ আর পাওয়া যাবে না। ফলে উত্তর আমেরিকা মহাদেশ, উত্তর এশিয়া এবং ইউরোপের উল্লিখিত বিস্তীর্ণ এলাকায় গড় তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত কমে যাবে, যা এক বা দুই দশকে ১০-১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও দাঁড়াতে পারে বলে গবেষকদের অনুমান। এর মানে শুধু শীতলতর শীতকাল নয়, আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায় পরোক্ষে উষ্ণতর গ্রীষ্মকালও আসন্ন।
যদি বিশ্ব জুড়ে কার্বন নির্গমন তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমানো না হয়, ২০২৫ থেকে শুরু হওয়া এই পতন ২০৫০ সালের মধ্যে গাল্ফ স্ট্রিমকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে বলে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে আলোচ্য গবেষণায়। এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার ডিটলভসেন বলেছেন “এ এক খুব, খুব বড় পরিবর্তন হতে চলেছে। কারণ গত ১২,০০০ বছরে অতলান্তিক সমুদ্রপৃষ্ঠের এবং সমুদ্রগর্ভের স্রোত (আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন বা সংক্ষেপে ‘AMOC’) একবারের জন্যও বন্ধ হয়নি।”
নেচার কমিউনিকেশনস জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় ১৮৭০ সালের (যখন আরেকটা অপেক্ষাকৃত ছোট তুষারযুগ শেষ হয়েছিল) সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের স্রোতের শক্তি পরিবর্তনের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে এখনকার তথ্যের সঙ্গে তুলনার (data mapping and fitting)-এর কাজে।
তাই এখনো যারা ভেবে বসে আছি যে জলবায়ু পরিবর্তনে হিমবাহ গলে যাওয়া অদূর ভবিষ্যতে কোনো চিন্তার কারণ হবে না, বা হলেও বড়জোর উপকূলবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দাদেরই ভোগাবে বিখ্যাত দ্য ডে আফটার টুমরো (২০০৪) ছবিতে দেখানো আমেরিকার পূর্ব উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াল দৃশ্যের মত – তারা মারাত্মক ভুল ধারণা নিয়ে চলছি। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব থেকে দুর্ভাগ্যবশত পৃথিবীর কোথাও মানুষ তথা জীবজগৎ নিরাপদ নয়।
কীরকম?
জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক পরিণতির মধ্যে রয়েছে প্রাণঘাতী ঝড়, সাইক্লোন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি। পাঁচ-সাত বছর আগেও আমরা কি ভাবতে পারতাম, এখনকার মত বঙ্গোপসাগরে বছরে চার-পাঁচটা করে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের তৈরি হবে বা আমেরিকার উপকূলে এত ঘন ঘন সাইক্লোনের দৌরাত্ম্য চলবে? তাছাড়াও বৃষ্টিতে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটবে এবং বারবার খরা হবে। এর সঙ্গে কোটি কোটি মানুষের খাদ্য ও পানীয়ের প্রশ্ন জড়িয়ে। আবার অতিবৃষ্টির ফলেও বন্যা এবং চাষের ক্ষতি হবে। এছাড়াও নানা উপসর্গ দেখা দেবে, হীট স্ট্রেস ও বায়ুদূষণ, নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলে দাবানলের আরও বাড়বাড়ন্ত হবে। বাধ্য হয়ে মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যাবে, ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার নিয়ে বিরোধ বৃদ্ধি, আরও কত কী!
এখানেই শেষ নয়। এর উল্টোদিকে আছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় এল নিনোর খামখেয়ালিপনা। এল নিনো-সাদার্ন অসিলেশন (ENSO) নামক একটা বৃহত্তর ঘটনার অংশ হিসাবে এল নিনো হল এক জটিল জলবায়ু নকশা, যা পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে ভূপৃষ্ঠের জলের অস্বাভাবিক উষ্ণতার সঙ্গে জড়িত। ট্রেড উইন্ড নামক বায়ুপ্রবাহ সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগর জুড়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে বয়ে গিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণ জলকে এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে সমুদ্রগর্ভের অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা জলরাশি বিপরীত অভিমুখে দক্ষিণ আমেরিকা উপকূলের দিকে ধাবিত হয়ে সমুদ্র জুড়ে তাপমাত্রার পার্থক্য সৃষ্টি করে। এল নিনোর উপস্থিতিতে এই ট্রেড উইন্ড দুর্বল হয়ে যায়, এমনকি বিপরীত দিকেও বইতে শুরু করতে পারে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণ জলরাশি পশ্চিমের বদলে পূর্ব দিকে দক্ষিণ আমেরিকা অভিমুখে সরে যেতে থাকে আর পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।
এল নিনোর এই কার্যকলাপ বিশ্ব জুড়ে আবহাওয়ার চরিত্র নির্ধারণে নিম্নলিখিত প্রভাব ফেলে:
- কিছু অঞ্চলে, বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূল এবং ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু অংশে বৃষ্টিপাত অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়।
- উল্টোদিকে অস্ট্রেলিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো অন্যান্য অঞ্চলে খরার প্রাদুর্ভাব ঘটে।
- ভারতীয় উপমহাদেশে মৌসুমি বায়ুর উপর প্রভাবে ফেলে বৃষ্টিপাত কমায় বা বর্ষার আগমন পিছিয়ে দেয়।
- ঝড়ের ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটায়, বিশেষ করে আটলান্টিক ও গোটা প্রশান্ত মহাসাগরে হারিকেনের কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়।
- সর্বোপরি সাধারণ সমুদ্র প্রবাহে বাধাদান করে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের উপর কুপ্রভাব ফেলে।
এল নিনো সাধারণত ২-৭ বছরে একবার করে আসে। উদ্বেগের কারণ হল, সাম্প্রতিক অতীতের কিছু জলবায়ু মডেলের গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে আগামীদিনে এর আবির্ভাব আরও ঘন ঘন হবে এবং প্রভাব আরও তীব্র হবে। ইন্টারগভমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (EPCC)-র এই অনুমানে সিলমোহর দেওয়া হয়ত সময়ের অপেক্ষা।
এবার অনুগ্রহ করে নিম্নলিখিত ব্যাপারগুলো ভেবে দেখুন
- আমরা অপরিহার্য না হলেও সাত-পাঁচ না ভেবে যথেচ্ছ টিস্যু ব্যবহার করে থাকি।
- কলের জল খুলে রেখে প্রায়ই অন্য কাজ সেরে চলি।
- পুনর্ব্যবহারের অযোগ্য নানা জিনিসকে (যেমন প্লাস্টিক ব্যাগ, স্টাইরোফোমের কফি কাপ, স্ট্র, প্লাস্টিকের কাঁটা চামচ ইত্যাদি, খাবারের কন্টেনার ইত্যাদি) প্রাত্যহিক জীবনে অযথা গুরুত্ব দিয়ে থাকি।
- বাড়িতে, রেস্তোরাঁয় বা নেমন্তন্ন বাড়িতে খাবার নিয়ে অনেক সময়েই খেতে না পেরে নষ্ট করি।
- প্যাকেটজাত পণ্যই বেশি করে কিনে ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।
- বৃক্ষরোপণ বা বাগান করার শখ যত না আছে, এদিক ওদিক থেকে গাছের পাতা, ডাল ইত্যাদি ছিঁড়ে নেওয়ার প্রবণতা তার চেয়ে ঢের বেশি।
- খারাপ গণপরিবহন ব্যবস্থার দোহাই দিয়ে প্রায়ই নিজের গাড়ি বা ট্যাক্সি চড়ে যাতায়াত করছি কার্বন পদচিহ্ন বাড়ানোর কথা না ভেবেই (এমনকি কম দূরত্বে সাইকেল বা নিজের পাকেও ভরসা করি না)।
- বছরের একটা বড় সময় এয়ার কন্ডিশনার ছাড়া রাতে ঘুমোনোর কথা ভাবতেও পারি না। আবার আলো, পাখা ইত্যাদি দরকার না থাকলেও বন্ধ করতে ভুলে যাই।
এই কুঅভ্যাসগুলোর এক বা একাধিক আমাদের প্রায় প্রত্যেকেরই রয়েছে। হয় ভুল করে এসব করি, না হয় এ নিয়ে মাথাই ঘামাই না। ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েও এগুলো নিয়ে অনেকে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই মনে করে দেখে একটা জিনিসই মাথায় আসে।
আরো পড়ুন পরিবেশ রক্ষার নাম করেও শোষণ চালাচ্ছে প্রথম বিশ্ব
নিচের ছবিটার কথা মনে পড়ছে? দু-তিন বছর আগে বেশ ভাইরাল হয়েছিল। ১৯৬৩ সালের ১৮ এপ্রিল ইংল্যান্ডের নটিংহ্যামশায়ার কাউন্টির ছোট্ট শহর ম্যানসফিল্ডের স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন, যেখানে দাবি করা হয়েছিল, এমন একটা দিন আসতে চলেছে যেদিন লোকে নিজের ফোন নিজের পকেটেই বয়ে বেড়াবে। সেই প্রতিবেদনে এক স্থানীয় টেলিফোন কোম্পানির কমার্শিয়াল ম্যানেজার ফ্রেডেরিক হান্টসম্যানের আশাব্যঞ্জক উক্তি ছিল – এই টেলিফোন ভবিষ্যতে অনেক বেশি বাণিজ্যিক হয়ে উঠবে। সেই ভবিষ্যদ্বাণী যে কতটা মিলেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সেইসময় অনেকেই হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করে।

বিশ্ব উষ্ণায়ন তথা জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে ঠিক সেরকমই এক মাহেন্দ্রক্ষণে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। এবার আমাদের ভাবতে হবে, আমরা কীভাবে চলতে চাই। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব সম্পর্কে এই লেখায় বর্ণিত তথ্যকে পাত্তা না দিয়ে যেমন চলছি তেমন পরিবেশসচেতনতাবিহীন জীবনযাপনই চালিয়ে যাব; এ নিয়ে ভাবব, সাময়িক দুশ্চিন্তা হবে, তারপর বর্তমানে বাঁচাই ভাল ধরে নিয়ে কুঅভ্যাসগুলো না বদলেই চালিয়ে যাব? নাকি দেরি হয়ে যাওয়ার আগে একটু একটু করে নিজেদের বদলে পরিবেশবান্ধব হব এবং অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করব?
তথ্যসূত্র:
দ্য গার্ডিয়ান, নেচার কমিউনিকেশনস, এনডিটিভি, লিঙ্কডইন, উইকিপিডিয়া
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







