মনমোহন সিংয়ের তত্ত্বাবধানে হওয়া দেশের আর্থিক সংস্কার নিয়ে বিতর্ক চিরকাল থেকে যাবে। কিন্তু, ভদ্র, নম্র, স্বল্পভাষী রাজনীতিবিদ হিসাবে বড় অংশের মানুষের কাছে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি দেশের অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী দুটোই হয়েছিলেন অপ্রত্যাশিতভাবে। অর্থমন্ত্রী হওয়ার আগে দেশের আমজনতার কাছে মনমোহন অপরিচিত ছিলেন। আবার তাঁর আর্থিক সংস্কারকে কেন্দ্র করে আমজনতা যেভাবে চর্চায় মেতেছে, তা আজ পর্যন্ত দেশের আর কোনো অর্থমন্ত্রীর ক্ষেত্রে হয়নি। ১৯৯১ সালে নরসিমা রাও প্রধানমন্ত্রী হলেও, ক্ষেত্রবিশেষে নানা মহলের আলোচনা বা চর্চায় মনমোহন তাঁকেও ছাপিয়ে গেছেন। ভবিষ্যতে নরসিমাকে অনেকে ভুলে গেলেও, ইতিবাচক বা নেতিবাচক যে দৃষ্টিভঙ্গিতেই হোক না কেন, মনমোহনকে মনে রাখবেন।

১৯৮৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস হেরে যায়, ক্ষমতায় আসে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট সরকার। একবছর পূর্ণ হওয়ার আগেই অনাস্থা ভোটে পরাজিত হয়ে বিশ্বনাথ প্রতাপ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। কংগ্রেসের সমর্থনে চন্দ্রশেখর প্রধানমন্ত্রী হন। সেই সরকার সাত মাসের বেশি টেকেনি। মাত্র দুবছর পরেই ১৯৯১ সালে ভারত অন্তর্বর্তী নির্বাচনের মুখোমুখি হয়, ক্ষমতায় আসে নরসিমার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার। রাজীব গান্ধীকে নির্বাচনী প্রচারের সময়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল, যা চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। অন্যদিকে রাম মন্দির-বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে উগ্র হিন্দুত্ববাদকে মূলধন করে জমি তৈরি করতে বিজেপি তখন মরিয়া। সেই টালমাটাল দশায় লোকসভায় সংখ্যালঘু হয়েও নরসিমার নেতৃত্বে সরকার গড়েছিল কংগ্রেস। ছলে বলে কৌশলে সেই রাও সরকার পাঁচবছর টিকেও গিয়েছিল।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

চন্দ্রশেখরের আমলে দেশের অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়ে উঠেছিল। বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি, বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় তলানিতে চলে যাওয়া, উপসাগরীয় যুদ্ধের ফলে বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধি – সব মিলিয়ে তখন এক সংকটজনক পরিস্থিতি। আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক সেই সুযোগে কাঠামোগত সংস্কারের শর্তে ঋণ নেওয়ার জন্য ভারতের উপর চাপ বাড়াতে থাকে। অবস্থা এমন হয় যে বিদেশি ঋণ নিতে সোনা বন্ধক রাখার সিদ্ধান্ত পর্যন্ত গ্রহণ করতে হয়েছিল। সেই সংকটাপন্ন আর্থিক পরিস্থিতির উত্তরাধিকার বহন করেই নরসিমা সরকার ক্ষমতায় আসে। এই অবস্থা অপ্রত্যাশিত হলেও মনমোহনকে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসারেই অর্থমন্ত্রী করা হয়েছিল।

একদা কেন্দ্রীয় সরকারের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর, যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যানের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী হওয়ার নেপথ্যে ছিল কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের মত প্রতিষ্ঠানগুলি বহুদিন ধরে যার জন্য ভারতকে চাপ দিচ্ছিল। জনকল্যাণমূলক উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র থেকে বাজার অর্থনীতির পথে ভারতের যাত্রা শুরু হয়েছিল মনমোহনেরই নেতৃত্বে। উদারীকরণ-বেসরকারিকরণ-বিশ্বায়ন সেই পথের মূলমন্ত্র।

সেইসময় শিল্প, বাণিজ্য, ব্যাংক, বিমা, সামাজিক পরিষেবা সমেত নানা ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা কমিয়ে বাজারের হাতে সব ছেড়ে দিলেই সুদিন আসবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। প্রচার চলেছিল, আমজনতার জন্য দেওয়া ভর্তুকি কমানো, অবাধ বেসরকারিকরণ, খোলা বাজার, কর্মী সংকোচনের পথেই নাকি দেশের অর্থনীতি উন্নত হবে। নয়া উদার অর্থনীতির স্বপ্নে দেশবাসীকে বিভোর করে দেওয়ার চেষ্টায় এতটুকুও ঘাটতি ছিল না। ভারতে এসব চলেছিল মনমোহনকে ঘিরে। দেশ বিদেশের শিল্প-বাণিজ্য মহল, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক সমেত নানা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন রাষ্ট্রনেতার কাছে তিনি তখন নায়ক। জওহরলাল নেহরু ঘরানার অর্থনীতির পথ ছেড়ে তাঁকে কেন্দ্র করে বদলে যাচ্ছিল শতাব্দীপ্রাচীন কংগ্রেস দলটির আর্থিক নীতি। আবার নয়া উদারনীতির বিরোধী, বিশেষত বামপন্থীদের বিরোধিতার, কেন্দ্রেও ছিলেন তিনিই। সেই বিরোধিতাকে পুরনো, বস্তাপচা ভাবনা বলে প্রচারের আয়োজনেও অবশ্য খামতি ছিল না। ‘সংস্কার’ শব্দটা খুবই আকর্ষণীয়। সংস্কার মানেই এগিয়ে চলা – এমন একটা ধারণা আমাদের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু সেই এগোনো যে সবসময় সামনের দিকে হয় না, পিছনের দিকেও যে আমরা এগিয়ে যেতে পারি তা সচরাচর বিশ্বাস হয় না।

স্বাধীনতা লাভের প্রায় ৪৫ বছর পরেও জীবন, জীবিকার সমস্যায় নাজেহাল মানুষের একটা বড় অংশ কিন্তু মনমোহনের সেই সংস্কারে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। কর্মসংস্থানের কথা না ভেবে অনেকেই ভাবতে শুরু করেছিলেন, সরকারি সংস্থায় বেশি কর্মী থাকাটাই সংকটের অন্যতম কারণ। খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে নানা প্রয়োজনীয় দ্রব্যে ভর্তুকিই যত নষ্টের গোড়া। বাজারে প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করলেই জিনিস শস্তায় পাওয়া যাবে, নানা ভোগ্যপণ্য শস্তা হবে। ভাল গুণমানের দ্রব্য আমরা ন্যায্য দামে পাব। যে পথ ধরে কয়েক বছরের মধ্যেই রেশন দোকানগুলোর নাম বদলে ‘ন্যায্য মূল্যের দোকান’ করে দিয়ে, গণবন্টন ব্যবস্থার পুরো ধারণাটাই বদলে দেওয়া হয়। মানুষের বড় অংশ কিন্তু প্রথমে বিশ্বাস করেছিল যে সবুরে মেওয়া ফলবে। কয়েকবছর কষ্ট হলেও আখেরে দেশ ও দশের মঙ্গল হবে।

তবে স্বপ্নভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগেনি।

১৯৯৪ সালের এপ্রিল মাসে মরক্কোর মারাকেশে ১২৩ খানা দেশের সই করা চুক্তির মধ্য দিয়ে কৃষি, মেধাজাত সম্পদ চলে যায় অবাধ বাণিজ্য নীতির আওতায়। যা গ্যাট চুক্তি নামেই বেশি পরিচিত। সেই চুক্তি অনুযায়ী ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি গ্যাটের বদলে তৈরি হয় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য হিসাবে আর্থিক উদারীকরণের পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল ভারত। সেই চুক্তি কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে ভারতের কৃষি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বড় মাইলফলক। সেই নীতি আজ কৃষিতে বিপর্যয় ডেকে এনেছে। বেড়েছে কৃষকের দেনা, তাঁদের আত্মহত্যা। পাশাপাশি বিপন্ন হয়েছে দেশবাসীর পেটভরা পুষ্টিকর খাদ্যের অধিকার। গ্যাট চুক্তি বা সেই সংক্রান্ত ডাংকেল প্রস্তাবের পক্ষে, বিপক্ষে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বা বাণিজ্যমন্ত্রীর থেকেও বেশি উঠে আসে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী মনমোহনের নাম। নয়া উদারনীতির পথেই শিক্ষা (গ্যাট চুক্তি যে পথকে আরও প্রসারিত করে), স্বাস্থ্যের বেসরকারিকরণ করার নীতির পরিণাম আজ টের পাওয়া যাচ্ছে।

আরো পড়ুন ট্র্যাক্টর ফের রাজপথে, ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বড় নির্বাচনী ইস্যু

তবে এত বড় কর্মযজ্ঞ একা মনমোহন করেছিলেন ভাবলে ভুল হবে। ১৯২৯ সালে বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দার পর বিভিন্ন দেশে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা হয়। সবকিছু বাজারের হাতে ছেড়ে না দিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব বাড়ানো হয়। মহৎ উদ্দেশ্যে নয়, পুঁজিবাদকে সংকট থেকে বাঁচাতেই এই দাওয়াই গ্রহণে বিশ্বের নীতিনির্ধারকরা তখন বাধ্য হয়েছিলেন। দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের মত সদ্যস্বাধীন দেশগুলোও সেই নীতি গ্রহণ করে। মিশ্র অর্থনীতি বা সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের অর্থনীতি – যা-ই বলা হোক না কেন, তা ছিল আসলে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ। কেবল নেহরু নন, পুঁজিবাদী বিভিন্ন দেশের শাসকই নানা নামে নানা রূপে সেই পথ নিয়েছিলেন।

বিগত শতকের সাতের দশকের সংকটে সেই মডেল পড়ল প্রশ্নের মুখে। আবার শুরু হল অবাধ বাণিজ্য, বাজার অর্থনীতির জয়গান। পরবর্তীকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, পূর্ব ইউরোপে রাজনৈতিক পালাবদলের ফলে নয়া উদারনীতি কার্যকর করতে যে রাজনৈতিক বাধা ছিল তাও অনেকখানি দূর হয়।

আটের দশকে কংগ্রেসের হাত ধরেই কিছু কিছু সংস্কারের কাজ শুরু হলেও দরকার ছিল বড়সড় পরিবর্তন। সেজন্য রাজনীতির লোক না হলেও, মনমোহনের মত একজন পণ্ডিত ও নয়া উদারবাদী অর্থনীতির সমর্থককে প্রয়োজন ছিল। বলা যেতে পারে, রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ থেকে ভারতের অর্থনীতিকে নয়া উদারনীতিতে রূপান্তরিত করতে তিনি ছিলেন পুঁজিবাদী শিবিরের একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। তিনি প্রচার, অপপ্রচারের পরোয়া না করে ব্যক্তিস্বার্থের কথা না ভেবে নিষ্ঠার সঙ্গে সেই কাজ করে গেছেন। নয়া উদারনীতি কার্যকর করতে তাঁর এই নিষ্ঠা, দেশবাসীর স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে পুঁজিবাদের স্বার্থ রক্ষা করেছে।

তিরিশ বছরেরও বেশি সময় চলার পর আজ নয়া উদারনীতির আসল রূপ বুঝতে অসুবিধা হয় না। দেশবাসীর জীবন, জীবিকাকে আরও বিপন্ন করে আর্থিক বৈষম্য লজ্জাজনকভাবে বাড়িয়ে দেশ বিদেশের কর্পোরেট দুনিয়ার কাছে ভারতকে লোভনীয় করে তোলার সেই পথ সুদিনের বদলে ঘোর দুর্দিন উপহার দিয়েছে। তা নিয়ে আলোচনা বিস্তৃত করার সুযোগ এই লেখায় নেই।

মনমোহনের ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়াও অনেকখানি নয়া উদারবাদী অর্থনীতির স্বার্থেই। ২০০৪ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের পতন অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল। নয়া উদারনীতির গতিকে আরও তীব্র করে, পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে, কারগিল সীমান্ত সংঘর্ষের পর জাতীয়তাবাদী টোটকা ব্যবহার করে আর ‘শাইনিং ইন্ডিয়া’-র স্বপ্ন বেচে সেই সরকার কর্পোরেট মহলের একান্ত বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠতে পেরেছিল। কিন্তু বিধি বাম। তাই ২০০৪ সালের ভোটে কংগ্রেস হয়ে গেল একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। আসনসংখ্যার অসাধারণ বৃদ্ধিতে বামেরা হয়ে গেল সরকার গঠনের নির্ধারক শক্তি।

১৯৯১ সালে যে কারণে মনমোহন অর্থমন্ত্রী হয়েছিলেন, সে কারণেই ২০০৪ সালে তিনি হলেন প্রধানমন্ত্রী। সেবারের মতই অনেকের কাছে তা ছিল অপ্রত্যাশিত। প্রশ্ন উঠতে পারে, কর্পোরেট মহল চাইলেই তিনি কীভাবে অর্থমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন? সরকার তো জনগণ নির্বাচিত করে। কিন্তু বাস্তবে ভোট দেওয়া ছাড়া জনগণের বক্তব্য জানানো বা ইচ্ছেপূরণের আর কোনো উপায় আছে কি? শাসক দলের উপর কর্পোরেটের প্রভাব থাকে। যত দিন যাচ্ছে, সেই প্রভাব বাড়ছে। স্যাঙাত পুঁজিবাদ এই সম্পর্ককে অনেকখানি নগ্ন করে দিয়েছে। সেদিন ‘অন্তরাত্মার ডাক’ শুনে সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অন্তরাত্মার ডাকের আসল রহস্য ২০ বছর পরেও উদ্ঘাটিত হয়নি। কিন্তু মনমোহন প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় যে কর্পোরেট মহল কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছিল তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

অনেকেরই মত, মনমোহন প্রধানমন্ত্রী হলেও, সোনিয়াই নাকি সরকার চালাতেন। সোনিয়ার নেতৃত্বাধীন জাতীয় পরামর্শদাতা পরিষদ এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিল, যা নয়া উদারনীতির ধর্মবিরোধী। তার সঙ্গে ছিল অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি বাস্তবায়নে বামেদের চাপ। সেই কর্মসূচির উপর ভিত্তি করেই ইউপিএ সরকার গঠিত হয়। ২০০৮ সালে ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তিকে কেন্দ্র করে বামেরা সমর্থন প্রত্যাহার করার পরেও সরকার টিকে গিয়েছিল, গড়ে উঠেছিল জাতীয় রাজনীতির নতুন সমীকরণ। ২০০৯ সালের নির্বাচনের পর  মনমোহন আবার প্রধানমন্ত্রী হন, গঠিত হয় দ্বিতীয় ইউপিএ সরকার।

দুই দফায় ইউপিএ সরকারের আমলে খাদ্য সুরক্ষা, শিশুদের শিক্ষার অধিকার, একশো দিনের কাজ, বনাধিকার, তথ্যের অধিকার সহ অনেকগুলো যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন করা হয়। সংবিধান প্রদত্ত সসম্মানে বেঁচে থাকার অধিকার, রাষ্ট্রের নির্দেশাত্মক নীতি অনুসারী এই আইনগুলো গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসবের জন্য মনমোহন সরকার চিরস্মরণীয়। পাশাপাশি নয়া উদারনীতির পথও কিন্তু এই সরকার পরিহার করেনি। ভারত-মার্কিন কৌশলগত সমঝোতা দেশের কৃষিনীতি, শিক্ষানীতি, পরিবেশ সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বড়সড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব, ভারত-মার্কিন কৃষি জ্ঞান বিনিময় চুক্তি, সংশোধিত বীজ আইনের মাধ্যমে কৃষি ব্যবস্থাকে আরও কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণাধীন করা হয়। নানা প্রকল্প, শিল্পায়ন, বিশেষ আর্থিক অঞ্চল প্রভৃতির নামে অবাধে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে দেশের নানা প্রান্তে আন্দোলন শুরু হয়। অপারেশন গ্রীন হান্ট, ইউএপিএ আইন সংশোধনের পথে রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক রূপও প্রকাশ্যে চলে এসেছিল। বেসরকারিকরণ, বিলগ্নিকরণকে কেন্দ্র করে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগেও সরকার বিদ্ধ হয়েছিল।

একদিকে নানা গণতান্ত্রিক আইন প্রণয়ন, অপরদিকে নয়া উদারনীতির নির্দেশ অনুসারে উন্নয়ন নামক ধ্বংসযজ্ঞ – পরস্পরবিরোধী এই পথে মনমোহনের সরকার মানুষ ও কর্পোরেট – উভয় পক্ষের আস্থাই দ্রুত হারাতে থাকে। ইউপিএ ১ সরকারের আর্থিক সংস্কারে ‘ধীরে চলো’ নীতি, নানা গণতান্ত্রিক আইন প্রণয়ন কর্পোরেট কখনই ভালো চোখে দেখেনি। নয়া উদার অর্থনীতিও চলবে, আবার শাসন পদ্ধতি হবে আগের মতই উদার গণতান্ত্রিক – এ তো সোনার পাথরবাটি। পুঁজিবাদের বর্তমান পর্বে কর্পোরেট চায় স্বৈরাচারী, অগণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতি।

নয়া উদারনীতি পথ চলতে শুরুই করেছে স্বৈরাচারকে সম্বল করে। ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর লাতিন আমেরিকার চিলিতে নির্বাচিত বামপন্থী রাষ্ট্রপতি সালভাদোর আয়েন্দেকে হত্যা করে কায়েম করা হয়েছিল একনায়কতন্ত্র। চিলিকে নয়া উদারনীতির পরীক্ষাগার হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। বেসরকারিকরণ, প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ, শ্রমিকদের অধিকারের উপর আঘাতের পথে স্বৈরাচারের উপর ভর করেই এগিয়েছে নয়া উদারবাদী আর্থিক নীতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেনও একের পর এক শ্রমিকদের অধিকার কেড়ে নেয়। বিশ্বজুড়েই গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া, বিভিন্ন স্বশাসিত ও গণতান্ত্রিক সংস্থায় খবরদারি বাড়ানো, প্রাকৃতিক সম্পদ অবাধে লুঠ, পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস, জনগোষ্ঠীগুলোর জীবন-জীবিকা-সংস্কৃতির উপর আক্রমণ করেই নয়া উদারনীতিকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। বিদ্বেষ, অপরকে ঘৃণার মাধ্যমে বৈচিত্র্য, বহুত্ববাদকে দুর্বল করা এর অন্যতম অঙ্গ। তার জন্য প্রয়োজন হয় নিজের ও তার বিশ্বস্ত অনুচরদের দিয়ে ঢাক পিটিয়ে মিথ্যাকে সত্য বলার মত আত্মপ্রচারসর্বস্ব শাসক। যিনি দল, মন্ত্রিসভাকে ছাপিয়ে হবেন সর্বেসর্বা। রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যান্য বিভাগ ও প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, প্রচারমাধ্যম, নির্বাচন কমিশন, তদন্তকারী সংস্থা – সবই থাকবে সেই শাসকের নিয়ন্ত্রণে।

দেশে দেশে আজ চলছে সেই শাসন পদ্ধতি। মনমোহনের মত প্রচারবিমুখ, নম্র, মৃদুভাষী ব্যক্তিকে দিয়ে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির আর চলবে না। চাই নরেন্দ্র মোদীর মত শাসক। চাই বেপরোয়া বিদ্বেষের রাজনীতির কারিগর, গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী মূল্যবোধের বিরোধী বিজেপির মত একটা দল। বামপন্থা তো বটেই, উদার গণতন্ত্রও এখন নয়া উদারবাদী অর্থনীতির শত্রু। মোদী তাই ক্ষমতায় বসেই উদার গণতান্ত্রিক পথ, তার অনুসারী গণতান্ত্রিক কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করতে সচেষ্ট। ইউপিএ আমলে বা তার আগে প্রণীত গণতান্ত্রিক আইনগুলো হয় সংশোধন, নয় লঙ্ঘন করে অর্জিত গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো কেড়ে নিচ্ছে। বিতর্ক, সমালোচনার পরোয়া না করে কর্পোরেটের স্যাঙাতগিরি করে চলেছে। আসন সংখ্যা হ্রাস বা আভ্যন্তরীণ মতবিরোধ থাকলেও মোদী ও তাঁর হাতেগোনা কিছু সাথি বেপরোয়া, অবিচল।

মোদি ও বিজেপি তাই নয়া উদারনীতির পক্ষে মানানসই, উপযুক্ত শাসক। মনমোহনের মত কর্মনিষ্ঠ পণ্ডিতকে এক সময়ে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি কার্যকর করতে প্রয়োজন ছিল। এখন সেই প্রয়োজন নেই। নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতির উপযুক্ত শাসক হিসাবে তিনি আর মানানসই নন, তাই ব্রাত্য। যতই নয়া উদারনীতির সেবক হোন না কেন, স্বৈরাচার, ভণ্ডামি তাঁর ধাতে ছিল না। পুঁজিকে আরও আগ্রাসী, বেপরোয়া করতে আজ চাই মোদীর মত শাসক। মনমোহনদের জীবনে এটাই বোধহয় সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

মতামত ব্যক্তিগত

 

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.