আম্বেদকরের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টদের সবথেকে বড় এবং গুরুতর অভিযোগ হল, আম্বেদকর ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতার যুদ্ধে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। এমনও বলা হয়, যে তিনি ব্রিটিশদের দালালি করেছেন ইত্যাদি। কিন্তু এভাবে বিষয়টাকে উপস্থাপন করা কি ঠিক?

এটা ঠিক, যে স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে আম্বেদকরের ভিন্ন ধারণা ছিল। তাঁর ধারণা কমিউনিস্ট পার্টির ধারণা বা কংগ্রেসের ধারণার সঙ্গে মিলবে না। কারণ তিনি সমস্ত বিষয়ের মত স্বাধীনতা আন্দোলনকেও দেখেছিলেন দলিত দৃষ্টিকোণ থেকে৷ কিন্তু তা কি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ছিল? আসুন, আমরা স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে আম্বেদকরের একটি বক্তব্য শুনে নিই।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৯৪২ সালে ইনস্টিটিউট অফ প্যাসিফিক রিলেশনসের ইন্ডিয়ান সেকশনের প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে আম্বেদকর ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং অস্পৃশ্যদের মনোভাব নিয়ে একটি পেপার লেখেন। সেটি পরিবর্ধিত আকারে পরের বছর Mr. Gandhi and the Emancipation of the Untouchables নামে প্রকাশিত হয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা। এখানে আম্বেদকর মন্তব্য করেন, ভারতে স্বাধীনতার জন্য যে লড়াই তার একমাত্র কারণ হল দলিত স্বার্থ। হিন্দুদের বা মুসলমানদের লড়াই স্বাধীনতার জন্য নয়, তারা লড়ছে ক্ষমতার জন্য

If there is any cause of freedom in this Indian turmoil for Independence it is the cause of the Untouchables. The cause of the Hindus and the cause of the Mussalmans is not the cause of freedom. Theirs is a struggle for power as distinguished from freedom.

সকলেই এ কথা বুঝবেন যে এখানে হিন্দু বা মুসলমান বলতে হিন্দু বা মুসলমান জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়নি। বোঝানো হয়েছে তাঁদের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক সংগঠন অর্থাৎ যথাক্রমে কংগ্রেস এবং মুসলীম লীগকে। এখন প্রশ্ন হল কংগ্রেস সম্পর্কে আম্বেদকরের এই মূল্যায়নের মধ্যে ভুলটা কোথায়? পার্টি নিজেই বহুবার কি কংগ্রেস সম্পর্কে এমন মূল্যায়ন করেনি? আবার দেখুন আম্বেদকর কংগ্রেস সম্পর্কে কী বলছেন

Indeed what they have done is what no lover of freedom would do. They have just identified themselves with the Hindu body calling itself the Indian National Congress. Now everybody in India, outside the Hindus, knows that whatever may be its title it is beyond question that the Congress is a body of middle-class Hindus supported by the Hindu Capitalists whose object is not to make India free but to be independent of British control and to occupy places of power now occupied by the British. (ibid)

এখন প্রশ্ন হল আম্বেদকরের এই ধারণার থেকে কমিউনিস্ট ধারণা কতটা আলাদা হতে পারত? একজন কমিউনিস্টেরও কংগ্রেস সম্পর্কে ওই একই ধারণা থাকা উচিত ছিল। কিন্তু তিনের দশক এবং চারের দশকের একটা বড় সময় জুড়ে কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেসের মধ্যে কাজ করেছে। সুতরাং তার পক্ষে কংগ্রেস সম্পর্কে ওই ধরণের ধারণা পোষণ করা কার্যত অসম্ভব ছিল। তাই বহুবার কমিউনিস্ট পার্টিও কংগ্রেস সম্পর্কে এই একই কথা বললেও নেতৃত্বের একটা বড় অংশের মধ্যে কংগ্রেস পার্টি এবং তার নেতৃত্ব সম্পর্কে বিরাট মোহও ছিল। এটা ঠিকই, যে জন্মলগ্ন থেকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ছিল। সুতরাং পার্টির আইনি অংশকে কোনো না কোনো আইনি এবং প্রকাশ্য প্ল্যাটফর্মে কাজ করতেই হত। কিন্তু তার জন্য জাতীয় কংগ্রেস কি খুব উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম ছিল? আম্বেদকরের মত কংগ্রেস সম্পর্কে একই রকম অবিশ্বাস, সন্দেহ (এবং ঘৃণা) যদি কমিউনিস্ট পার্টির থাকত, তাহলে নিশ্চয়ই কংগ্রেসের ভিতরে থেকে কাজ করা সম্ভব হত না।

১৯৩২ সালের কথা। কমিউনিস্ট পার্টি খুবই দুর্বল এবং ছন্নছাড়া অবস্থায় রয়েছে। মুম্বাই, কলকাতা প্রভৃতি কয়েকটি শহরে পার্টি সক্রিয় কিন্তু বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। একেক জায়গায় একেকটা গ্রুপ কাজ করছে। সর্বভারতীয় সংগঠন গড়ে ওঠেনি, গড়ে তোলার মানসিকতারও অভাব রয়েছে। জাতীয় কংগ্রেসের মূল্যায়ন নিয়েও প্রচুর বিভ্রান্তি রয়েছে। জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকাটা ঠিক কী – তা নিয়েও ধ্যানধারণা খুব একটা পরিষ্কার নয়। কাজের দিশা হিসাবে ১৯৩০ সালে ‘প্ল্যাটফর্ম অফ অ্যাকশন’ গৃহীত হয়েছিল, কিন্তু তাতেও স্পষ্ট ধ্যানধারণার অভাব ছিল। তদুপরি তার যতটুকু ইতিবাচক ছিল তা সর্বত্র পার্টির কমিটিগুলি পালনও করছিল না। সে সময়ে কমিউনিস্ট পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সভ্যও ছিল না (১৯৩৪ সালে পার্টি আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ পায়)। এমতাবস্থায় ১৯৩২ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিকের সঙ্গে যুক্ত তিনটি পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি একযোগে ভারতের পার্টিকে একটি খোলা চিঠি পাঠায়। এই তিনটি পার্টি ছিল গ্রেট ব্রিটেনের পার্টি, চিনের পার্টি এবং জার্মানির পার্টি। এই চিঠিতে ভারতীয় কমিউনিস্টদের কাজের ধরনের কয়েকটি দুর্বলতাকে চিহ্নিত করা হয়। তার মধ্যে একটি ছিল জাতীয় কংগ্রেসের মূল্যায়ন। চিঠিতে ভারতীয় কমিউনিস্টদের এই বলে সতর্ক করে দেওয়া হয়, যে শ্রমিক কৃষকদের উপর কংগ্রেস নেতৃত্ব যে প্রভাব বিস্তার করেছে তা খর্ব করতে না পারলে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে নিয়ে আসতে ভারতীয় কমিউনিস্টরা কোনোভাবেই সমর্থ হবে না। চিঠিতে আরও বলা হয়, এই প্রশ্নটির যথাযথ মূল্যায়ন ও রূপায়ণে ভারতীয় কমিউনিস্টদের গুরুতর দুর্বলতা রয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এই প্রশ্নটিকে গুরুত্ব সহকারে বিচার বিবেচনাই করেনি। উল্টে তারা সবসময়েই এমন কাজকর্ম করেছে যাতে করে জনগণের মধ্যে কংগ্রেসের প্রভাব ও মোহ বৃদ্ধি পেয়েছে। নেতৃত্বের প্রশ্নে কংগ্রেস এবং কমিউনিস্টদের মধ্যে সম্পর্ক যে ব্যাস্তানুপাতিক, অর্থাৎ কংগ্রেস শক্তিশালী হলে কমিউনিস্টরা দুর্বল হবে, এবং কমিউনিস্টদের শক্তিশালী হতে গেলে কংগ্রেসকে দুর্বল করেই তা সম্ভব হবে – এ ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয়ের অভাব ছিল। অনেকে বলেন, চাইলেই কি কমিউনিস্ট পার্টি নেতৃত্ব হাতে নিতে পারত? এটি একটি কুযুক্তি। চাইলেই সবকিছু করে ফেলা কারোর পক্ষেই সম্ভব হয় না। কিন্তু প্রশ্ন হল, চেয়েছিল কি? যদি চেয়ে থাকে তাহলে সর্বান্তঃকরণে তা প্রয়োগ করেছিল কি? তারপর ব্যর্থ হয়েছিলে কি? দুঃখজনক হলেও এই সমস্ত  প্রশ্নের উত্তর হল – না। কমিউনিস্ট পার্টি নেতৃত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাই করেনি। অথচ কী বিপুল আত্মত্যাগ করেছিলেন কমিউনিস্ট কর্মীরা। কী গৌরবান্বিত লড়াইটাই না লড়েছিলেন! কিন্তু ওই যে বৌদ্ধরা বলে থাকেন, যতই ত্যাগ করো না কেন, চিন্তা সঠিক না হলে কার্য কখনই কাঙ্ক্ষিত ফললাভ ঘটাবে না। কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

১৯৪২ সাল ভারতের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের পক্ষে এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের পক্ষে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বছর। ইতিমধ্যে হিটলারের রাশিয়া আক্রমণের ফলে সোভিয়েত রাশিয়া যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। গ্রেট ব্রিটেনের সাথে ফ্যাসিবিরোধী যুক্তফ্রন্ট তৈরি হয়েছে। এমতাবস্থায় ভারতে ১৯৪২ সালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। কমিউনিস্ট পার্টির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, অন্যদিকে কংগ্রেস ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক দেয়।

কমিউনিস্ট পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিল না। এদিকে আইনি হয়েও প্রকাশ্যে এসেও কংগ্রেস ছেড়ে বেরনো হল না। যাঁরা কংগ্রেসে ছিলেন, তাঁরা রয়েই গেলেন। সমস্তটাই এক বিদঘুটে চিন্তার ফসল। ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ না দেওয়া অবশ্যই বিরাট ভুল। মুক্তি সংগ্রামে যে কংগ্রেসই একমাত্র নেতৃত্ব, তা জনমানসে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। অথচ ঘটনা হল, কমিউনিস্ট পার্টি তার জন্মলগ্ন থেকেই পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তুলেছে, যা কংগ্রেস তুলেছে তার জন্মের বহু পরে।

’৪২-এর পর কমিউনিস্টদের সাথে সোশালিস্টদের শত্রুতা চরমে ওঠে। উভয়েই কংগ্রেসের মধ্যে ছিল। সোশালিস্টরা গান্ধীকে বোঝাতে থাকে যে কমিউনিস্টরা ব্রিটিশের দালাল, তাদের শিগগির কংগ্রেস থেকে বের করে দেওয়া উচিত। এই পরিস্থিতিতে ১৯৪৪ সালে মহাত্মা গান্ধী এবং কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক পিসি যোশীর মধ্যে বেশ কয়েকটি চিঠি চালাচালি হয়। সেই চিঠিগুলির সংকলন ১৯৪৫ সালে পার্টি পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে। কংগ্রেস সম্পর্কে বা গান্ধী সম্পর্কে পার্টি কী মনোভাব পোষণ করত তা বোঝার পক্ষে গান্ধী-জোশী পত্রালাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

সেই চিঠিতে গান্ধী এমনকি কমিউনিস্ট পার্টির হিসাবের খাতাও পরীক্ষা করতে চাইছেন! কমিউনিস্টরা ব্রিটিশের টাকা খাচ্ছে কিনা তিনি তা জানতে চান। কিন্তু কমিউনিস্টরা চিঠি লিখে গান্ধীকে জানিয়ে দিচ্ছেন

সকলেরই নিজস্ব জাতীয় সংগঠনে যোগ দেবার যে দেশপ্রেমিক অধিকার দেশের প্রত্যেক ছেলেমেয়ের আছে, সেই অধিকারের জোরেই আমরা কংগ্রেসের মধ্যে আছি। জাতির মুক্তি সাধন হল সকলেরই উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্য সাধ্যমত প্রাণপণে সফল করতে চাই বলে আমরা কংগ্রেসে আছি। যতই আমাদের নামে অপবাদ রটানো হোক না কেন, আমাদের এই মনোভাবে কোন পরিবর্তন হবে না, আর এই গৌরবময় অধিকার আমরা কিছুতেই ছাড়ব না। (গান্ধী-জোশী পত্রালাপ)।

তাহলে বলুন, এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে কীভাবে এটা মনে করা সম্ভব, যে কংগ্রেসের আসল লক্ষ্য দেশের স্বাধীনতা নয়, ইংরেজদের জায়গা অধিকার করে একই কায়দায় শাসন-শোষণ চালিয়ে যাওয়া?

কমিউনিস্ট পার্টি ব্রিটিশবিরোধী লড়াইয়ে কংগ্রেস-কমিউনিস্ট-মুসলীম লীগ-দলিত ফেডারেশন – এই চার শক্তির জোট চাইছে খুব ভালো কথা। কিন্তু আসল প্রশ্ন হল, সে জোটের নেতৃত্ব করবে কে? আম্বেদকর ব্রিটিশবিরোধী লড়াই লড়তে চাননি – এ এক সর্বৈব মিথ্যা রটনা৷ তিনি আসলে কংগ্রেসের নেতৃত্ব মানতে চাননি, কারণ কংগ্রেস তাঁর একটি দাবিও মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। আম্বেদকর আশঙ্কা করেছেন, এদের হাতে স্বাধীন দেশের নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে তা কখনোই গণতান্ত্রিক দেশ হবে না, দলিতদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে না। তাই তিনি চূড়ান্ত যুদ্ধের আগে নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে চাইতেন। কিন্তু কংগ্রেস তাতে কর্ণপাত করতে রাজি হয়নি। ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ড গঠনের জন্য ১৯১০ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে জন রেডমন্ড এবং এডওয়ার্ড কারসনের মধ্যে যে আলাপ-আলোচনা চলে তার উল্লেখ করে আম্বেদকর বলেন, রেডমন্ড যখন কারসনকে বলেন তোমার প্রোটেস্ট্যান্ট সংখ্যালঘুদের জন্য যা রক্ষাকবচ চাও আমি দিতে রাজি আছি, তখন কারসন জবাব দেন, চুলোয় যাক তোমার রক্ষাকবচ। আমি তোমার দ্বারা শাসিত হতেই চাই না। আম্বেদকর বলেন, দলিতরা যে এমন কিছু বলছে না তার জন্য হিন্দুদের ধন্যবাদ জানানো উচিত ছিল। কিন্তু তারা উল্টে রেগে যাচ্ছে, যে দলিতরা কেন রাজনৈতিক অধিকার দাবি করছে।

The Hindus are not aware of what Carson said to Redmond when the two were negotiating for a United Ireland. The incident is worth recalling. Redmond said to Carson “Ask any safeguards you like for the Protestant Minority of Ulster, I am prepared to give them; but let us have a United Ireland under one constitution”. Carson’s reply was curt and brutal. He said without asking for time to consider the offer “Damn your safeguards I don’t want to be ruled by you”. The Hindus ought to be thankful that the Untouchables have not taken the attitude which Carson took. But far from being thankful they are angry because the Untouchables are daring to ask for political rights.

Mr. Gandhi and the Emancipation of the Untouchables, page 40-41

এই যেখানে অবস্থা, সেখানে কমিউনিস্ট পার্টি, লীগ এবং আম্বেদকর উভয়কেই বোঝাচ্ছিল কংগ্রেসের নেতৃত্ব মেনে নেওয়ার জন্য। তাঁরা তখন কংগ্রেস এবং গান্ধীর উকিলের ভূমিকায় অবতীর্ণ। গান্ধীজি সম্পর্কে তাঁদের নিজেদের মোহই এত বেশি, যে তাঁরা তখন জনগণের উপর থেকে কংগ্রেস বা গান্ধীর প্রভাব কাটানোর কোনো প্রচেষ্টা নেওয়ার জায়গাতেই ছিলেন না। গান্ধীকে কেউ জাতির পিতা বলে মনে করুক আর না করুক, কমিউনিস্ট পার্টি সর্বাগ্রে তা শিরোধার্য করে নিয়েছে। গান্ধীর অত্যন্ত আপত্তিজনক চিঠির জবাবে জোশী তাঁকে জানিয়ে দেন

সমগ্রভাবে আপনার চিঠিটাকে দেখলে আমাদের মনের প্রতিক্রিয়া কিরকম হয়েছে, তা প্রথমেই বলা ভালো৷ আপনি আমাকে যা লিখেছেন, আমার বাবা তা লিখলে আমি তাঁর চিঠির জবাব দিতাম না। আর কখনও তাঁর মুখদর্শন করতাম না। আপনাকে আমি লিখছি, কারণ আপনি হলেন আমাদের জাতির পিতা; আপনি আমাদের অপমান ও অপদস্থ করলেও আপনার উপর রাগ করা আমার পক্ষে দেশপ্রেমের দিক থেকে অকর্তব্য। (গান্ধী-জোশী পত্রালাপ)

গান্ধী বা কংগ্রেস সম্পর্কে কমিউনিস্ট পার্টির এই ধরনের মোহময় ধ্যানধারণা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার ছিল না। ১৯৪৪ সালে গান্ধী যখন কমিউনিস্টদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তখন পার্টি নেতৃত্ব গান্ধীর কাছে ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ পর্যন্ত পার্টির কর্মনীতি সংক্রান্ত বিভিন্ন সময়ে নেওয়া প্রস্তাবগুলি পাঠিয়ে দিয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে, যে কমিউনিস্ট পার্টি গান্ধী এবং কংগ্রেসের একান্ত অনুগত।

১৯৪২ সাল। ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। আন্দোলনের ডাক দিয়েই গান্ধীরা জেলে ঢুকে গেছেন। আত্মগোপন করে সংগ্রাম পরিচালনার কোনো প্রচেষ্টাই করেননি। কমিউনিস্টরা লড়াইয়ে নেই। বীরবিক্রমে সেই শূন্যস্থান দখল করেছে সোশালিস্টরা। গোটা দেশজুড়ে স্বতঃস্ফূর্ত গণবিক্ষোভ চলছে। সেইসময় নিষেধাজ্ঞা রদ হবার পর সেপ্টেম্বর মাসে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম অধিবেশনে গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়

বর্তমান সময়ে পার্টির কাজ তিনটি

১) জাতীয় ঐক্যের জন্য দেশব্যাপী আন্দোলন গড়িয়া তোলা।

২) বর্তমান সংগ্রামের ধ্বংসাত্মক বিশৃঙ্খলামূলক আত্মঘাতী রূপ পরিষ্কার করিয়া বুঝাইবার জন্য শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র ও কংগ্রেসসেবীদের ভিতর রাজনৈতিক প্রচার চালান।

৩) কংগ্রেস-লীগ ঐক্যের জন্য হিন্দু ও মুসলীম জনসাধারণের ভিতর অবিরাম ব্যাপক প্রচার ও আন্দোলন চালান।

ঐক্য আন্দোলন ও প্রচারের প্রধান স্লোগান হইতেছে: মহাত্মা গান্ধী ও জাতীয় নেতাদের মুক্ত কর; দমন বন্ধ কর; ধ্বংস, বিশৃঙ্খলতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা বন্ধ কর; কংগ্রেসের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কর; সর্বব্যাপী আপোষ মীমাংসার জন্য আলাপ-আলোচনা আরম্ভ কর; ভারত রক্ষার জন্য অস্থায়ী জাতীয় সরকার স্থাপন কর।

১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়

সমগ্র দেশের সম্মুখে আজ প্রশ্ন: মন্ত্রের সাধন কিম্বা শরীর পাতন। বিলম্বে অনর্থ ঘটিবে। গান্ধীজিকে মুক্ত করিয়া আমরা সংকটের সমাধান করিতে পারি; অন্যথায় গভীরতর সংকটের জটিলতর স্রোতে নিঃসহায়ের মত ভাসিয়া গিয়া দেশ এক নতুনতর দাসত্বে শৃঙ্খলিত হইবে। অবিলম্বে গান্ধীজিকে মুক্ত করিয়া আনিবার সামর্থ্য বা ব্যর্থতার উপরই জাতির জীবন-মরণ নির্ভর করিতেছে।

প্রসঙ্গত, প্রস্তাবটির শিরোনাম ছিল ‘জাতীয় সংকটের অবসানের জন্য গান্ধীজিকে চাই: ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ তোলো!’

১৯৪৪ সালের মে মাস। গান্ধী জেল থেকে ছাড়া পাবার পর কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় মুখপত্র পিপলস ওয়ার পত্রিকায় সম্পাদকীয় লেখা হয়

জাতির শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিক প্রতিষ্ঠান, মহান জাতীয় কংগ্রেসের প্রিয়তম নেতা গান্ধীজি আবার আমাদের মধ্যে ফিরিয়া আসিয়াছেন। সমগ্র জাতির সহিত একাত্মভাবে আমরাও এতদিনের দুঃসহ ভার বুক হইতে দূর হওয়ার জন্য স্বস্তিবোধ করিতেছি। তাঁহাকে আমাদের সশ্রদ্ধ অভিনন্দন জানাই।

তাহলে বলুন, কংগ্রেসকে যে কমিউনিস্ট পার্টি নিজেই জাতির শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিক প্রতিষ্ঠানের তকমা দিয়ে দেয়, গান্ধীকে জাতির পিতা বলে মাথায় করে রাখে, গান্ধী না থাকলে যে কমিউনিস্ট পার্টি অসহায় বোধ করে, “নিঃসহায়ের মত ভাসিয়া যাইতেছি” ভেবে মাতৃসন্ধানে আকুল বালকের মত পথে পথে রোদন করে বেড়ায় – সে কীভাবে আম্বেদকরের বক্তব্যের মূল্যায়ন করবে? আম্বেদকরের সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে শ্রমিক-কৃষক ঐক্যকে শক্তিশালী করে কংগ্রেসের হাত মুচড়ে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে এনে এক নয়া গণতান্ত্রিক ভারত গঠনে নেতৃত্ব দেবে? তার থেকে আম্বেদকরকে ব্রিটিশের দালাল বলে দেগে দিয়ে কংগ্রেসের ল্যাজ হয়ে ঝুলতে থাকাই কি সহজ রাস্তা নয়?

জাতির জীবনে কতবড় দুর্ভাগ্য উপস্থিত হলে কমিউনিস্ট পার্টির এরকম মতিভ্রম হতে পারে! এই মতিভ্রম, অর্থাৎ ভাবনাচিন্তা ধ্যানধারণার এক ভয়ঙ্কর বিভ্রমই ছিল কমিউনিস্ট পার্টি এবং আম্বেদকর ও তাঁর অনুরাগীদের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠা শত্রুতার প্রকৃত কারণ। এর পরে ইতিহাস তার নিজের গতিতে চলেছে। আম্বেদকর পরবর্তী সময়কালে দলিত আন্দোলনের মধ্যে গড়ে উঠেছে নয়া আম্বেদকরীয় নেতৃত্ব, যাঁরা স্পষ্টতই আম্বেদকরের জাতি উন্মূলনের লাইন থেকে সরে গিয়েছেন এবং বর্ণব্যবস্থাকে হাতিয়ার করে নিজেদের কিছু সুযোগসুবিধা পাওয়াকেই একমাত্র ধ্যানজ্ঞান করে তুলেছেন। ফলত কমিউনিস্টদের সঙ্গে ঐক্য গড়ে তোলার কোনো আকাঙ্ক্ষাই তাঁদের নেই। তাঁরাও পুরনো শত্রুতার আগুন ফুঁ দিয়ে উস্কে চলেছেন। অন্যদিকে কমিউনিস্টদের বৃহদংশ আজও তাঁদের যান্ত্রিক ভাবনাচিন্তার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। ফলে সেই ঐতিহাসিক ভুলের সংশোধন আজও হয়নি। তারপরেও অবশ্য আজকাল কিছু লোক নতুন করে ভাবছেন। এর মধ্যেই ভবিষ্যতের আশা টিকে থাকছে।

মতামত ব্যক্তিগত

প্রথম পর্ব

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

3 মন্তব্য

  1. প্রতিটি লেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।আশা করি এই ধরণের লেখাগুলি যতোটা পারা যায় ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন।

  2. So, it’s all fault of dalits??? They are “using” ambedkar’s name.??
    Brhaminic communist… what else they can think?? Look at Bengal… Bhadrolok communists… bengali dalits never voted for castes..they always voted Communists in their 3 decade run no-interregnum misrule. What is the result???
    No investment in education.no investment in health. Bengali dalits remain poorest, malnourished, illeterate till this day.

    To think “Upper caste communists ” will improve their condition ….is mirage. As Asim Ali said ” Progressive Politics will never come from privileged in self-righteous fashion. It will always have to come from the lot who are at the suffering end of political mechination”…

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.