একশো ঘন্টার উপর বাংলাদেশের সঙ্গে পৃথিবীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। যতক্ষণ চালু ছিল, সোশাল মিডিয়ায় একের পর এক ভেসে এসেছে হাস্যোজ্জ্বল তরুণ ছাত্রদের করুণ মৃত্যুসংবাদ। তারপর থেকে গত তিন-চারদিন ধরে সেখানে কী হচ্ছে তা জানবার একমাত্র উপায় ছিল যৎসামান্য ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান প্রভৃতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেছিল বাংলাদেশ সরকার, মঙ্গলবার সন্ধে থেকে আংশিকভাবে চালু করা হয়েছে। টেলিফোন পরিষেবার হালও অত্যন্ত খারাপ। দেশের বাইরে থেকে আত্মীয় পরিজনের খবর নিতে চাওয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা জানাচ্ছেন যে ফোন করলেও শোনা যাচ্ছে না কিছুই।

কোটাবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল বাংলাদেশ নানা প্রশ্ন ও মতামতের জন্ম দিচ্ছে ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মনেও। বিশেষত, এই যোগাযোগবিচ্ছিন্নতার অবসরে যখন মৃত মুখের ছবিগুলো ফিকে হয়ে আসছে, আমরা মন দিচ্ছি কোটা আন্দোলনের যৌক্তিকতা, ভারতের কোটা ব্যবস্থার এবং বাংলাদেশের কোটা ব্যবস্থার তুল্যমূল্য আলোচনা, বাংলাদেশের এই আন্দোলন ভারতে কী প্রভাব ফেলতে পারে ইত্যাদি তাত্ত্বিক প্রশ্নে। আরও একবার সংকট মুহূর্তে বাংলাদেশকে উদ্ধার করে ভারত মহান হতে পারে কিনা – সে জল্পনাও চলছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তাদের ভারতীয় পৃষ্ঠপোষক বিজেপি (এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাম গণতান্ত্রিক মহলের একাংশও) প্রচার চালাচ্ছে যে এই আন্দোলন আসলে ছাত্র আন্দোলনের মোড়কে বিএনপি-জামাতের ভারতবিরোধী আন্দোলন ছাড়া কিছুই নয়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ইতিমধ্যে রবিবার বিতর্কিত কোটা ব্যবস্থা নিয়ে তড়িঘড়ি রায় দিয়েছে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট। সেই রায়ে সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষণ ৫৬% থেকে মাত্র সাত শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, যার মধ্যে ৫% রাখা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরাধিকারীদের জন্য। বাকি মাত্র ২% রয়েছে প্রতিবন্ধী ও নিপীড়িত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য। যদিও এই রায় ৯৩% সরকারি চাকরি উন্মুক্ত করে দিল সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের জন্য, এই ৭% কোটার বন্টন কিন্তু আন্দোলনকারীদের দাবি অনুযায়ী হল না। তাছাড়া, এই আন্দোলন আর কোটা সংক্রান্ত দাবিতে থেমে নেই। কোটার দাবিকে ছাপিয়ে গেছে গত এক সপ্তাহে ঝরে যাওয়া গুচ্ছ গুচ্ছ তরতাজা প্রাণের জন্য সুবিচারের দাবি।

বাংলাদেশের কোটা ব্যবস্থা নিয়ে বিক্ষোভ এই প্রথম নয়। দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালে এই কোটা ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিপুল আত্মদানের নিরিখে অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের সন্তানদের জন্য সরকারি সংরক্ষণ। মোট ৫৬% কোটার মধ্যে ৩০% সংরক্ষিত ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের সন্তানদের জন্য, ১০% মহিলাদের জন্য, আরও ১০% পিছিয়ে পড়া জেলার মানুষদের জন্য, ৫% নিপীড়িত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য এবং এক শতাংশ প্রতিবন্ধীদের জন্য।

মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সময়ের দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটার প্রয়োজনীয়তাও হ্রাস পেতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের শহিদের সন্তানকে যে জীবনসংগ্রাম করতে হয়েছে, তাঁর সন্তান তো আর সেই সংগ্রামের মুখোমুখি হননি। পুরো দেশের জনসংখ্যার বিচারে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ০.১%-এরও কম। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মের কোটার সুবিধা পাওয়া নিয়ে সঙ্গত আপত্তি উঠেছে বারবার। তদুপরি আছে সরকারি মদতে প্রবল দুর্নীতি, যার জেরে সংরক্ষিত পদের সিংহভাগই আওয়ামী ঘনিষ্ঠ লোকজনের দখলে। বস্তুত আওয়ামী লীগের কোনো নেতার ঘনিষ্ঠ না হলে এই কোটার সুবিধা পাওয়া বেশ কঠিন। ভুয়ো সার্টিফিকেট দেখিয়ে কোটা সুবিধা পাওয়া বা পুরোনো কমান্ডারদের ঘুষ দিয়ে রাতারাতি মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযোদ্ধার সন্ততি বনে যাওয়ার ঘটনাও বহুশ্রুত।

২০০৮ এবং ২০১৩ সালে এই নিয়ে প্রতিবাদ হয়েছিল। তবে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলন হয় ২০১৮ সালে। আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল, মোট সংরক্ষণ ৫৬% থেকে দশ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষণ বহাল রেখে কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার। এই যৌক্তিক সংস্কারের দাবিগুলোর মধ্যে ছিল নিয়োগ পরীক্ষায় সকলের জন্য সমান বয়ঃসীমা, কোটার মাধ্যমে ভর্তি না হওয়া সংরক্ষিত পদে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং একই ব্যক্তিকে একবারের বেশি কোটার সুবিধা না দেওয়ার দাবি।

ঢাকা থেকে শুরু করে রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, খুলনা – সর্বত্র বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছড়িয়ে পড়ে সেই আন্দোলন। আন্দোলন দমন করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সরকারে থাকা আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র লীগ। মাথায় হেলমেট পরে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের উপর চড়াও হওয়ার জন্য তারা পরিচিত হয় হেলমেট বাহিনী নামে।

আন্দোলনকারীদের নিবৃত্ত করতে সমস্ত কোটা তুলে নেওয়ার কথা ঘোষণা করেন হাসিনা। সেইমত প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষণ পুরোপুরি তুলেও নেওয়া হয়। কিন্তু ২০২১ সালে ওই ৩০% মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহাল করার দাবিতে আদালতে যান মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরাধিকারীদের একাংশ। তিন বছর শুনানির পর গত ৫ জুন মামলাকারীদের পক্ষে সেই মামলার রায় দেয় উচ্চ আদালত, ফিরে আসে মুক্তিযোদ্ধা কোটা। অবশ্য সরকারপক্ষ এর বিরুদ্ধে আবেদন করলে সাময়িক স্থগিতাদেশ দেওয়া হয় এই রায়ে, পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয় ৭ অগাস্ট।

কোটা ফিরিয়ে আনার প্রতিবাদে পুনরায় শুরু হয় কোটাবিরোধী আন্দোলন। কিন্তু শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে ঘৃতাহুতি দেয় প্রধানমন্ত্রী হাসিনার বিরূপ মন্তব্য, যেখানে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে সম্বোধন করেন তিনি। বস্তুত, শুধু কোটাবিরোধী আন্দোলনকারী নয়, মুক্তিযোদ্ধা কোটার বাইরে যে কোনো সাধারণ চাকরিপ্রার্থীর প্রতিই প্রযোজ্য ছিল তাঁর ওই মন্তব্য। উল্লেখ্য, ইতিপূর্বেও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা, মন্ত্রী। ২০১৮ সালেও কোটা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলেছিলেন মতিয়া চৌধুরী নামে এক মন্ত্রী। এই মতিয়া তাঁর তরুণ বয়সে ছিলেন আগুনে বামপন্থী ছাত্র নেত্রী।

স্বাধীন বাংলাদেশের ঘৃণ্যতম গালি এই রাজাকার শব্দটা। স্বভাবতই, প্রধানমন্ত্রীর ওই মন্তব্যে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ছাত্রসমাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে স্লোগান ওঠে ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার/কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার স্বৈরাচার।’ এখান থেকেই কোটাবিরোধী আন্দোলন রূপ নিতে থাকে সরকারি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের। কারণে অকারণে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’-র দোহাই দিয়ে আওয়ামী লীগের যথেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ উগরে দিতে থাকে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম।

১৬ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ ও ছাত্র লীগের যৌথ হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে গোটা বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ। স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ দেখিয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। দলে দলে রাস্তায় নেমেছেন ছাত্রীরা – আধুনিক পোশাক এবং বোরখা, হিজাব নির্বিশেষে। রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাসে সজ্জিত রায়ট পুলিশ নামানো হয়েছে আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে। রাবার বুলেটের আঘাতে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আবু সাঈদের মৃত্যুতেই চরম আকার নিল ছাত্রবিক্ষোভ। এমনকী ছাত্র লীগের সদস্যরাও বড় সংখ্যায় পদত্যাগ করে আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।

১৬ জুলাই সমস্ত স্কুল কলেজ বন্ধ করার নির্দেশ দেয় সরকার। পরদিন দেশব্যাপী ‘শাট ডাউন’, অর্থাৎ জরুরি পরিষেবা বাদে সবকিছু বন্ধ রাখার ডাক দেন ছাত্রছাত্রীরা। তাঁদের সমর্থনে পথে নামেন সাধারণ মানুষ। ঢাকার রিকশাচালকরা মিছিল করেন ছাত্রদের সমর্থনে। ১৬ থেকে ১৮ জুলাইয়ের মধ্যে শহিদ হন অন্তত ৬৫ জন ছাত্র, আহত ৫০০-র ও বেশি। নিহত ছাত্রদের মধ্যে ছিল স্কুলের গণ্ডি না পেরনো ১৪ বছরের তাহমিদ ও ১৭ বছরের ফাইয়াজও ছিলেন। সোশাল মিডিয়ায় হু হু করে ছড়িয়ে পড়ে হাসিমুখ মীর মুগ্ধর ছবি, মাত্র কিছুদিন আগে যে নিজের ছবির ক্যাপশন দিয়েছিল ‘বাবুমশাই, জিন্দেগী লম্বি নহি, বড়ি হোনি চাহিয়ে।’

২০ জুলাইয়ের মধ্যে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় অন্ততপক্ষে ১৬৩, গ্রেফতার একশোর বেশি এবং আহত হাজারের উপর। কোটাবিরোধী আন্দোলন কোটার দাবি ছাড়িয়ে সর্বাত্মক সরকারবিরোধিতার রূপ নিয়েছিল আগেই। কিন্তু এই পরিমাণ রক্তপাতের পর সরকার চাইলেও ছাত্রপক্ষ এবং সরকারপক্ষের মধ্যে আর কোনো আলোচনার পথ খোলা থাকে না। ছাত্রহত্যায় লিপ্ত পুলিশবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত পদাধিকারীদের অপসারণ এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা প্রার্থনার দাবিতে অনড় থাকে ছাত্ররা।

আন্তর্জাতিক মহলকে সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীরা। বিক্ষোভ শুরু করেন বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীরাও। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাবার অপরাধে আরব আমিরশাহীতে সাজা পেয়েছেন ৫৭ জন বাংলাদেশি।

শনিবার রাত থেকে জারি হয় সান্ধ্য আইন। আন্দোলনে দমনে সেনাবাহিনী নামানো হয়। ডাকা হয় র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) এবং বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) নামক সীমান্তরক্ষী বাহিনীকেও। টহল দিতে থাকে হেলিকপ্টার। খবর আসতে থাকে, নির্বিচারে আক্রমণ হচ্ছে ছাত্রজনতার উপর। ভিডিওতে দেখা যায় সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের কায়দায় বেপরোয়াভাবে এগিয়ে, পিছিয়ে আন্দোলনকারী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে একসঙ্গে তিন-চার জনকে পিষে দিচ্ছে র‍্যাবের রাক্ষুসে ভ্যান। পুলিশ ও সামরিক দমন প্রচেষ্টার মুখে গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয় শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হওয়া আন্দোলন।

এরপরই সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট পরিষেবা। সরকারি ফ্যাসিবাদ আর কোনো রাখঢাক রাখে না। উদ্দেশ্য এক ঢিলে দুই পাখি মারা – এক দিকে বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে আন্দোলনকারীদের জোট বাঁধতে না দেওয়া। দেশের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করতে পারা প্রবাসীরা টুকরো টুকরো খবর দিতে থাকেন – রাস্তায় নেমে পড়েছেন দেশের ৮০% মানুষ। দেশের মানুষকে রাজাকার দাগিয়ে দেওয়া মুক্তিযুদ্ধের ক্ষীর খাওয়া সরকারের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে আপামর বাংলাদেশ। অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি হয়েছে এবং আন্দোলনকারী কার্যকলাপ দেখলেই গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য বিষয় যে এতকিছুর পরেও এই আন্দোলনের কোনো নির্দিষ্ট নেতৃত্ব নেই। একটা স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনে নানা পক্ষ নানা অভিসন্ধিসহ এসে মিশবেই। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল এই আন্দোলনকে অধিকার করতে পারেনি। ছাত্রদের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে বিভিন্ন দল, প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছে ছাত্র শিবির, লাল পতাকা নিয়ে মিছিল করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (মার্কসবাদী) প্রমুখ বামপন্থী ছাত্র সংগঠন। কিন্তু চূড়ান্ত রক্তক্ষয়ী হয়ে ওঠার পরেও এই আন্দোলন সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন হয়েই থেকেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোকে দূরে রাখার জন্য বিবৃতি দিয়েছে।

যোগাযোগের মাধ্যমগুলোকে বন্ধ করা এবং সশস্ত্র আক্রমণে আন্দোলন দমন করার পাশাপাশি কোটা বিতর্কের সমাধান করেও আন্দোলনকে নিবৃত্ত করতে চায় হাসিনা সরকার। তাই কোটা মামলায় সুপ্রিম কোর্টে যে শুনানির তারিখ ছিল ৭ অগাস্ট, তড়িঘড়ি তার রায় দেওয়া হয় ২১ জুলাই (রবিবার), যে রায়ের কথা প্রথমেই উল্লেখ করেছি। কিন্তু এই রায়ের প্রধান বলি নিপীড়িত ক্ষুদ্র জনজাতি, পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের মানুষ এবং মেয়েরা। যেটুকু যা সংরক্ষণ, তার সিংহভাগ রয়ে গেল সেই মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতির জন্য।

যতটুকু খবর পাওয়া গেছে, আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন এই রায় তাঁরা মানছেন না। আন্দোলনের মূল সমন্বয়ক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলাম প্রকাশ্য বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে গ্রেফতার হওয়া আন্দোলনকারীদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া, কারফিউ তুলে নেওয়া, বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া ইত্যাদি দাবি পূরণের জন্য তাঁরা ৪৮ ঘন্টা সময় দিচ্ছেন সরকারকে

এদিকে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার তুলনা টেনে জল্পনা শুরু হয়েছে সীমান্তের এপারে – এবার কি হস্তক্ষেপ করবে ভারত সরকার? কী হবে তার ভূমিকা? এই আন্দোলন যে বস্তুত ভারতবিরোধী আন্দোলন, ‘সেকুলার’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্পন্ন’ হাসিনা সরকারকে উৎখাত করতে বিএনপি-জামাতের মদতপুষ্ট আন্দোলন – এই জাতীয় প্রচারও ছড়াচ্ছে দ্রুত। তদুপরি, সুপ্রিম কোর্টের রবিবারের রায়ের পর নারীদের কোটা বাতিল হয়ে যাওয়ায় এদেশের বাম মনোভাবাপন্ন মানুষও এই আন্দোলন ও তার উদ্দেশ্যকে সন্দেহের চোখে দেখছেন।

ঠিক এখানেই কয়েকটা কথা পরিষ্কার করে বোঝা দরকার। বাংলাদেশের মানুষের ভারতবিরোধিতা অপ্রিয় হলেও বাস্তব। বাংলাদেশ দেশটার বহু বামপন্থী বা উদার বামমনস্ক মানুষও মনে করেন যে ভারত সরকারের সহায়তা ছাড়া হাসিনা সরকারের পক্ষে এতদিন টিকে থাকা অসম্ভব ছিল। হাসিনা-আওয়ামী সরকারের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ক্ষোভ এবং ভারত রাষ্ট্রের প্রতি তাঁদের ক্ষোভ একেবারে সম্পর্কহীন নয়। বস্তুত, বাংলাদেশের মানুষের ভারতবিরোধিতার দুটো দিক রয়েছে। এক, নরেন্দ্র মোদী সরকারের অধীনে ক্রমশ হিন্দুত্ববাদী এবং ইসলামবিদ্বেষী হয়ে ওঠা ভারতের প্রতি ৯০ শতাংশের বেশি মুসলমান নাগরিকসম্পন্ন বাংলাদেশের বিরাগ। দুই, ভারত রাষ্ট্রের ঔপনিবেশিক ধাঁচের বিদেশনীতি এবং বাংলাদেশ সরকারের উপর ভারত সরকারের গভীর প্রভাব, প্রতিপত্তিজনিত ক্ষোভ।

কোনো দেশের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে আমি দাঁড়াব কিনা এইটুকু অবধি আমি বাছতে পারি। তাঁদের সেই আত্মনিয়ন্ত্রণ কোন দিকে যাবে তা আমি বাইরে থেকে বলে দিতে পারি না। হতেই পারে সেই আত্মনিয়ন্ত্রণের অভিমুখ আমার স্বার্থের বা আমার ইতিহাসবোধের পরিপন্থী। মোটা দাগে বলতে গেলে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিয়ে মুজিবকন্যা হাসিনা ও তাঁর আওয়ামী লীগ অনুচররা করেননি হেন অপকর্ম নেই। দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারের উপর নিজেদের মৌরসী পাট্টা কায়েম করে বাদবাকি সব পক্ষের মানুষকে স্বাধীনতাবিরোধী বলে দেগে দিয়েছেন তাঁরা। গত এক দশকে কোনো স্বাভাবিক নির্বাচন হতে দেননি বাংলাদেশে। একদিকে জামাতের সঙ্গে জোটের কারণে প্রধান বিরোধী বিএনপিকে মৌলবাদী তকমায় দাগিয়ে, অন্যদিকে ইসলামের হেফাজত করে ফ্যাসিবাদী কায়দা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। বিরোধী নেত্রীকে দেশের মধ্যে আটকে রেখে বিদেশে উন্নততর চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কার্যত পঙ্গু বানিয়ে রেখেছেন। দেশের সর্বত্র অন্যায়ভাবে সম্পদ নিজেদের কুক্ষিগত করেছেন আওয়ামী নেতারা। জড়িয়ে পড়েছেন একের পর এক কেলেঙ্কারিতে। প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রী ও লীগ ব্যতীত অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের উপর যথেচ্ছ অত্যাচার চালিয়েছে ছাত্র লীগ।

জাতীয় আয়, দারিদ্র্য সীমা ইত্যাদি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে গত দশ বছরে তরতরে উন্নয়ন দেখালেও দেশের মানুষের দুর্দশা ঘোচেনি। খাদ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার অগ্নিমূল্য। বিগত দেড় দশক ধরে ক্রমাগত বেড়েছে বেকারত্বের হার। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, অদূর ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বেকারত্ব। দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ অনিশ্চিত স্বল্প আয়ের জীবিকা বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। উচ্চশিক্ষিতদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ দেশে নামমাত্র। একদিকে সরকারি পদ ফাঁকা পড়ে থাকছে, অন্যদিকে নতুন শিল্পের অভাব। বাংলাদেশ যে বস্ত্রশিল্পের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত, সেখানে শ্রমিকের সুরক্ষার ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই, মজুরিও নামমাত্র। গতবছরই বিশাল আকার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও রীতিমত সাড়া ফেলেছিল বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পের শ্রমিকদের আন্দোলন।

আরো পড়ুন শোষণের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত বাংলাদেশের শ্রমিক

তাই মুক্তিযুদ্ধের মহান ইতিহাসে থেমে থাকলে আজকের বাংলাদেশ যে যন্ত্রণায় আছে তাকে বোঝা যাবে না। বোঝা যাবে না গণঅভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া ছাত্র আন্দোলনের স্বরূপকেও। আমাদের দেশের কোটা ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করে বাংলাদেশের কোটা ব্যবস্থাকে বুঝতে চাওয়াও মোটেই প্রাসঙ্গিক নয়। বাংলাদেশিদের ভারতবিদ্বেষকে ‘আমাদের দেশের প্রতি বিদ্বেষ’ হিসাবে দেখলে কখনোই সে দেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সুবিচার হবে না। প্রতিবেশী বৃহৎ রাষ্ট্রের কূটনৈতিক দমনপীড়নের প্রতি ছোট রাষ্ট্রের ক্ষোভ হিসাবে দেখলে তবেই বর্তমান বাংলাদেশের সরকারের প্রতি ক্ষোভ এবং ভারত সরকারের প্রতি ক্ষোভের যোগসূত্র বোঝা সম্ভব। বাংলাদেশের মানুষ আক্ষরিক অর্থেই বহুদিন যাবৎ বলছেন ‘দেশটা কারও বাপের না।’

একুশ শতকের গণঅভ্যুত্থান বিশ শতকের মত হবে না। একুশ শতকের রাজনৈতিক সংকটগুলোকেও তাই বিশ শতকের চশমায় দেখার কোনো সুযোগ নেই৷ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং ৯/১১ পরবর্তী সময়ে গোটা পৃথিবীতেই রাজনৈতিক বাস্তবতার কিছু মৌলিক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। কেনিয়া বা শ্রীলঙ্কার অভ্যুত্থানের মত বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানকেও সেই প্রেক্ষিতেই দেখা জরুরি। প্রাচীনপন্থী চিন্তা যেন আমাদের বর্তমান সময়কে উপলদ্ধি করতে বাধা না দেয়।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.