বিদ্যাভূষণ রাওয়াত
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের প্যালেস্তাইন সম্পর্কিত বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রাঞ্চেসকা আলবানিজ এখন মার্কিন প্রশাসনের শত্রুদের তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। এই প্রথম মার্কিন প্রশাসন প্রকাশ্যে এবং নির্লজ্জভাবে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের কোনো আধিকারিককে তাদের লক্ষ্যবস্তু বলে ঘোষণা করল নিজের কাজটুকু করার জন্য।
জন্মসূত্রে ইতালিয় ফ্রাঞ্চেসকা, ১৯৬৭ সাল থেকে অধিকৃত প্যালেস্তিনীয় এলাকায়, সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মানবাধিকার সম্পর্কিত বিশেষ প্রতিবেদক। মার্কিন প্রশাসন তাঁর উপর ক্ষিপ্ত, কারণ তিনি ইউরোপের দেশগুলোর সরকারকে বলছিলেন ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে যেন তাঁদের দেশের আকাশপথ ব্যবহার করতে না দেওয়া হয়। ফ্রাঞ্চেসকার যুক্তি হল, নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক আদালত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। যেসব দেশ সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের অধিকারপত্রে স্বাক্ষরকারী, তাদের সকলের ওই পরোয়ানা মানা উচিত।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এদিকে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘যুদ্ধের নায়ক’ বলে বরণ করে নিয়েছেন। বিনিময়ে ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পের হাতে একখানা চিঠি তুলে দিয়েছেন, যাতে তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। মজার কথা, ট্রাম্পের অন্য যে বন্ধু তাঁকে আগেই ওই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছেন তিনি হলেন পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনীর। এই দুই ঘৃণা-ব্যবসায়ীকে যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একমত করতে পেরেছে, তা মার্কিন দেশের আন্তর্জাতিক নীতির ভণ্ডামি প্রমাণ করে।
আমি অবশ্য বিশ্বাস করি না যে মার্কিন প্রশাসনের ফ্রাঞ্চেসকার উপর খেপে যাওয়ার আসল কারণ নেতানিয়াহুর গ্রেফতারি দাবি করা। একই দাবি বহু ইউরোপিয় নেতা একাধিকবার করেছেন রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন সম্পর্কে। এইসব আন্তর্জাতিক আদালতকেও আমি খুব একটা বিশ্বাস করি না। এসব হল পাশ্চাত্য ভাবনাচিন্তায় গঠিত, সার্বভৌম দেশগুলোর আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলাতে এবং আধিপত্য বিস্তার করতে তৈরি প্রতিষ্ঠান। এগুলোর কার্যকলাপে কেবল পশ্চিমি দুনিয়ার ভণ্ডামিই প্রকাশ পায়। যে দুনিয়া পুতিন আর রাশিয়াকে পৃথিবীর সর্বকালের সেরা দুষ্ট শক্তি বলে মনে করে, অথচ ইজরায়েল আর নেতানিয়াহু মানবতার বিরুদ্ধে যে অপরাধ করে চলেছে সে ব্যাপারে বেহায়ার মত নীরব থাকে।
আসলে ফ্রাঞ্চেসকার বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হওয়ার কারণ প্যালেস্তাইন সম্পর্কে তাঁর রাখঢাকহীন রিপোর্ট, যা তিনি পেশ করেছেন জেনিভায় মানবাধিকার কাউন্সিলের ৫৯তম অধিবেশনে। গাজার সংকট থেকে লোভী কর্পোরেশনগুলো কীভাবে লাভের গুড় খাচ্ছে, সে ব্যাপারে এই রিপোর্ট আপনার চোখ খুলে দেবে। ফ্রাঞ্চেসকাই প্রথম মানুষ, যিনি অত উঁচু স্তরে বা সম্মিলিত জাতিপুঞ্জে গাজার গণহত্যা থেকে কর্পোরেটের মুনাফা করার ব্যাপারটাকে পৃথিবীর সামনে উলঙ্গ করে দিলেন। তাঁর রিপোর্টে বড় বড় কর্পোরেশনগুলোর কাজকর্মের এবং তাদের সঙ্গে ইজরায়েল আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের সম্পর্কের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য রয়েছে।
গত ৩০ বছরে আমরা দেখেছি, সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মঞ্চগুলোকে ব্যবহার করে কীভাবে অনিবার্যতার যুক্তিতে সর্বত্র কর্পোরেট প্রবেশকে বৈধতা দেওয়া হয়। প্যালেস্তাইন সম্পর্কে ফ্রাঞ্চেসকার রিপোর্ট আমাদের সামনে কর্পোরেট স্বার্থের অন্ধকার দিকটা তুলে ধরেছে। গতবছর যখন আমি ওয়েস্ট ব্যাংকের প্যালেস্তিনীয় চাষি আব্বাস মিলহেমের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, তিনি আমাকে বলেছিলেন কীভাবে উড়ে এসে জুড়ে বসা ইউরোপিয় ও আমেরিকানরা প্যালেস্তিনীয় চাষিদের জমি দখল করে নিচ্ছে এবং হুমকি দিচ্ছে। আব্বাস বলেছিলেন, লড়াইটা কেবল গাজার জন্যে নয়। ইজরায়েল ওয়েস্ট ব্যাংকও দখল করতে চায়, কারণ ওই এলাকা খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপের সমস্ত বড় কোম্পানি এতে আগ্রহী, আর যত নিয়মকানুনের কথা বলা হয়, সবই অত্যাচারিত মানুষের জন্য। উপনিবেশ কায়েম করা শক্তিশালী দেশগুলোর জন্য কোনো নিয়মকানুন নেই।
কর্পোরেট স্বার্থের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সুচতুরভাবে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু ওই শক্তির হাতে সংবাদমাধ্যম আর বিদ্যায়তনিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, সেহেতু শিগগির এসবের বৈধতা প্রমাণ করতে নতুন নতুন বয়ান তৈরি হয়ে যায়। এই আন্তর্জাতিক সংকটের আসল কারণ ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ। ঔপনিবেশিক ও ব্যবসায়িক শক্তিগুলো মিলেই একেকটা জনগোষ্ঠীকে কোথাও নিয়ে গিয়ে বসিয়েছে, আবার কোনো জায়গা থেকে উচ্ছেদ করেছে। উপনিবেশ স্থাপনের ৩০০ বছর পরে আজও সম্পদ নিষ্কাশন এবং বসতি স্থাপনের রাজনীতির সাহায্যে নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করে চলেছে ওই শক্তিগুলো। এর ফলে সর্বত্র স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে অভূতপূর্ব যন্ত্রণা ও বিপর্যয় ভোগ করতে হচ্ছে। ‘সেটলমেন্ট’-এর রাজনীতি এখনো শেষ হয়নি আর নতুন ‘শান্তি চুক্তি’ হল একটা প্রোপাগান্ডা। ওটা আসলে প্যালেস্তিনীয়দের সুদূর আফ্রিকার কোনো এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়ার মতলব, যাতে কর্পোরেশনগুলো নিশ্চিন্তে প্যালেস্তাইনের খনিজ সম্পদ তুলে নিয়ে যেতে পারে। তাতে ওই এলাকার মানুষ অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ভোগ করুন, জায়গাটা জনশূন্য হয়ে যাক – কিচ্ছু এসে যায় না।
আরো পড়ুন বন্দিশালার শিকল ভাঙলেন যুদ্ধবিরোধী অ্যাসাঞ্জ
তাঁর নির্ভীকতা এবং গাজার মানবিক সংকট আর মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে কর্পোরেট অংশগ্রহণের সত্য উন্মোচন করার জন্য ফ্রাঞ্চেসকাকে কুর্নিশ জানানো উচিত।
ইনিউজরুমে প্রকাশিত মূল প্রবন্ধ থেকে অনূদিত। নিবন্ধকার একজন সমাজকর্মী। এই মুহূর্তে হিমালয় ও ভারতের সমভূমির উপর গঙ্গা ও তার শাখানদীগুলোর প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন।মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








