সমগ্র মানবজাতির পাপের ভার লাঘব করতে মাথায় কাঁটার মুকুট পরে ক্রুশবিদ্ধ হন ঈশ্বরের পুত্র – গুড ফ্রাইডের দিন। তার ঠিক দুদিন পরে, ইস্টার সানডেতে, প্রিয় শিষ্যদের সাক্ষী রেখে তাঁর পুনরভ্যুদয়। বিশ্বজুড়ে সাড়ম্বরে পালন হওয়া বড়দিন যিশুখ্রিস্টের মানবসত্তার জন্মদিন মাত্র। পরম করুণাময়রূপে তাঁকে চিনে নেওয়ার দিনটা কিন্তু গুড ফ্রাইডে, আর ঈশ্বরের পুত্র হিসাবে তাঁকে মেনে নেওয়ার দিন হল ইস্টার। এই দিনকে তাই বলা যায় খ্রিস্টধর্মের জন্মলগ্ন। পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই ইস্টার তেমন করে পালিত হয় না, কিন্তু খ্রিস্টধর্মের হয়ে ওঠাটাই এই উৎসবের উপলক্ষ। এবছরের ইস্টার রবিবার যখন সোমবারে পা দিল, ঠিক সেইসময় খ্রিস্টান তথা অখ্রিস্টান জগতের বহু মানুষকে শোকস্তব্ধ করে মরজগৎ থেকে বিদায় নিলেন ৮৮ বছরের পোপ ফ্রান্সিস।
ভ্যাটিকান সিটির সেন্ট পিটার্স স্কোয়্যারে ইস্টারের প্রার্থনার জমায়েতে অল্প সময়ের জন্য জনসমক্ষে এসেছিলেন অসুস্থ বৃদ্ধ পোপ। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে আরও একবার গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান তিনি। সমস্ত ইজরায়েলি ও প্যালেস্তিনিয়দের যন্ত্রণার সঙ্গে একাত্ম বোধ করছেন জানিয়ে পোপ বলেন ‘যুদ্ধরত সকল পক্ষের কাছে আমার আবেদন – যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করুন, বন্দিদের মুক্ত করুন এবং শান্তির পথ চেয়ে থাকা বুভুক্ষু মানুষের সহায় হোন।’
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
প্যালেস্তাইনের পাশে
গাজার হোলি ফ্যামিলি প্যারিশের গির্জা ও স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন খ্রিস্টান, মুসলমান মিলিয়ে প্রায় ৬০০ মানুষ। গাজা পট্টির একমাত্র গির্জা এটি। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে প্রতি সন্ধ্যায় গাজার ধর্মযাজককে ফোন করে কুশল সংবাদ নিতেন পোপ ফ্রান্সিস। এই দৈনিক অভ্যাসটুকু হয়ত ছিল তাঁর যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি। গাজার বিরুদ্ধে ইজরায়েলের এই একতরফা যুদ্ধ যে গণহত্যারই শামিল, সাধারণ জনগণকে বোমার আঘাতে মেরে ফেলে, হাসপাতাল ধ্বংস করে, অসংখ্য শিশুর মৃত্যু ঘটিয়ে ইজরায়েল যে ন্যক্কারজনক কাজ করে চলেছে – যুদ্ধের একেবারে শুরু থেকেই একথা তিনি বারবার মনে করিয়েছেন পশ্চিমি দুনিয়াকে।
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ইজরায়েলের সশস্ত্র বাহিনির হাতে সাতজন ত্রাণকর্মীর হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে পোপের বক্তব্য বিশেষ স্মরণীয় ‘ন্যায়ের ধারণাকে বাদ দিয়ে কোনো শান্তি সম্ভব না। যেখানে অন্যায়, সেখানেই সংঘর্ষ জন্ম নেয়। ন্যায়ের অনুপস্থিতিতে দুর্বলের উপর সবলের নিয়ম খাটে।’
বড়দিনে গির্জায় গির্জায় পুতুল সাজিয়ে তৈরি করা হয় যিশুর জন্মবৃত্তান্তের দৃশ্য। ভ্যাটিকানে গত বড়দিনের সেই পুতুলসজ্জায় ছোট্ট যিশুকে দেখা গিয়েছিল সাদা-কালো প্যালেস্তিনিয় কেফিয়ায় মোড়ানো।
মার্কিন নীতির সমালোচনা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের নানা সাম্প্রতিক কার্যকলাপ, যেমন সামাজিক কল্যাণ খাতে ব্যয়সংকোচন, বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের প্রতি বৈদেশিক সহায়তা কমানো এবং অভিবাসী ও উদ্বাস্তুদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগের সমালোচনা করেন পোপ। ইতিপূর্বেও ট্রাম্প প্রথম দফায় রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ে আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল তোলার পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্পকে তিনি ‘অখ্রিস্টান’ বলেছিলেন। প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প ফ্রান্সিসকে একজন ‘অত্যধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব’ বলে বিঁধেছিলেন। যেসব দেশে জনসংখ্যা ক্রমহ্রাসমান, সেই দেশগুলোকে আরও বেশি করে অভিবাসীদের স্বাগত জানাতেও পরামর্শ দিয়েছিলেন পোপ ফ্রান্সিস।
আরো পড়ুন অভিবাসী দমন করে বাঁচার রাজনীতি ফাঁপরে পড়েছে
জলবায়ু সমস্যা ও বৈষম্যমূলক উন্নয়নের সমালোচনা
২০১৩ সালে পোপ নির্বাচিত হওয়ার পর, ২০১৫ সাল নাগাদ বিশ্বের সমস্ত রোমান ক্যাথলিক বিশপদের উদ্দেশে লিখিত দীর্ঘ পত্রে যে বিষয়গুলো নিয়ে তাঁর সুচিন্তিত মতামত পেশ করেন পোপ ফ্রান্সিস, তা খ্রিস্টধর্মের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে চলে যায় একেবারে রাজনীতি ও অর্থনীতির আঙিনায়। পবিত্র বাইবেল, ঈশ্বর বিশ্বাস বা ধর্মীয় নৈতিকতার চিরাচরিত আলোচনা সরিয়ে রেখে অত্যন্ত জোরের সঙ্গে তিনি তুলে ধরেন আধুনিক বিশ্বের প্রযুক্তিসর্বস্ব পুঁজিবাদ, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের বিনাশ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, জলসম্পদের বন্টন এবং মানুষের দুর্দশার কথা। বরং খ্রিস্টধর্মের পালনীয় সমদৃষ্টি, সহনশীলতা, সংযমের আদর্শ কেমন করে এইসব সমস্যা নিরসনের পথ দেখাতে পারে, বাইবেল কীভাবে মানুষে মানুষে সাম্যের কথা বলে, সমানাধিকার, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহমর্মী সহাবস্থানের কথা বলে – সেটাই ছিল এই দলিলপত্রে তাঁর ধর্মীয় প্রসঙ্গ উত্থাপনের তাৎপর্য।
বিশেষত অর্থনৈতিক বৈষম্য, স্বার্থসর্বস্ব ভোগবাদ এবং মুনাফার লোভকে তিনি যাবতীয় সংকটের মূল হিসাবে চিহ্নিত করেন। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের দায় নিয়ে যে মতানৈক্য, সে বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন ফ্রান্সিস। ‘গরিব দেশগুলোর বৈদেশিক ঋণ বস্তুত তাদের নিয়ন্ত্রণ করার একটা হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে… সবথেকে বেশি প্রাকৃতিক সম্পদ সঞ্চিত রয়েছে পৃথিবীর গরিব দেশগুলোতেই এবং তারা বাধ্য হচ্ছে নিজেদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের বিনিময়ে ধনী দেশগুলোর উন্নয়নের জ্বালানি জোগাতে। উন্নত দেশগুলো তাদের পুনর্নবীকরণ-অযোগ্য শক্তির ব্যবহার কমিয়ে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের প্রকল্পে সহায়তা করে এই ঋণ শোধ করতে পারে।’
জলবায়ু ও জীবজগতের অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে আলাপ-আলোচনার গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি। আন্তর্জাতিক সমাবেশে পরিবেশ নিয়ে আলাপ,আধ্যাত্মিক বিশ্বাস এবং বিজ্ঞানের মধ্যে আলাপ, উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও সমস্যা অনুযায়ী স্থানীয় এবং জাতীয় স্তরের নীতি নির্ধারণ, এবং অবশ্যই রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন বিশদে। পরিবেশ সচেতন শিক্ষার বিস্তার ও পরিবেশ সচেতন জীবনযাত্রার পাশাপাশি সংরক্ষণ ও শান্তির আদর্শকে নীতি-প্রণয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক যাপনে সংবেশনশীলতার চর্চার মাধ্যমেই বৈশ্বিক সংকটের সমাধান সম্ভব বলে মত দেন।
ফ্রান্সিসের এই প্রস্তাবনা প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালের মার্কিন সফরের মাস তিনেক আগে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক বড় সংখ্যক মানুষ, বিশেষ করে মার্কিন ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের এক বড় অংশ জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বাসই করেন না এবং মানুষের কার্যকলাপের ফলেই যে জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে তাও অস্বীকার করেন। রিপাবলিকান পার্টির ক্যাথলিক সদস্যরা নিয়মিতভাবে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক সতর্কীকরণকে ভুয়ো রটনা বলে উড়িয়ে দেন। মার্কিন সরকার একের পর এক জলবায়ু চুক্তিতে অংশীদারিত্ব অস্বীকার করে বা চুক্তিভঙ্গ করে। সেখানে মার্কিন সফরের আগে জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যার প্রতিবিধানের লক্ষ্যে ওই দীর্ঘ প্রস্তাবনা পোপের দৃঢ় অবস্থানের পরিচয় দিয়েছিল। বুঝিয়ে দিয়েছিল যে জনপ্রিয়তা অর্জনের পরিবর্তে নিজের ধর্মীয় পদকে ব্যবহার করে পৃথিবীর কল্যাণের লক্ষ্যে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করাই তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য।
পোপ ফ্রান্সিসের জীবনীকার অস্টেন ইভেরির মতে, ‘একইসঙ্গে ক্যাথলিক এবং পরিবেশবাদী হওয়াকে কেবল সমর্থনই করেননি ফ্রান্সিস, বরং আবশ্যিক করে তুলেছেন… প্রযুক্তি এবং অন্তহীন প্রগতির কল্পনা যেভাবে মানুষ ও প্রকৃতির শোষণ ও পণ্যায়নের পথ প্রশস্ত করছে, তাতে আধুনিক বিশ্বের গতিপ্রকৃতির প্রতি তাঁর গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি। এ তাঁর অন্তরের উচ্চারণ।’
পোপ ফ্রান্সিস কি মার্কসবাদী?
ওই প্রস্তাবনা পত্র প্রকাশের মাসখানেক পরেই বলিভিয়াতে এক দীর্ঘ বক্তৃতায় আরও একটা কাণ্ড করেন তিনি। ইউরোপিয় দেশগুলোর আমেরিকান ভূখণ্ডে সাম্রাজ্যবিস্তারের সময়ে সেখানকার ভূমিপুত্র উপজাতি গোষ্ঠীর মানুষকে যে অসীম নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছে – অনেকসময় এমনকি ঈশ্বরের নাম করেও তাদের যন্ত্রণা দেওয়া হয়েছে, তাদের সর্বস্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে, মেরে ফেলা হয়েছে, সেজন্য রোমান ক্যাথলিক চার্চের পক্ষ থেকে তিনি ক্ষমাপ্রার্থনা করেন।
নব্য আধিপত্যবাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের অধিকার বুঝে নেওয়ার আহ্বান জানান প্রান্তিক নিপীড়িত মানুষকে। আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা যে এই নব্য আধিপত্যবাদেরই মুখ – সে ইঙ্গিতও স্পষ্ট ছিল তাঁর বক্তব্যে। তিনি শ্রমিক সংগঠন এবং সমবায় ব্যবস্থার প্রশংসা করেন এবং যে কোনো মূল্যে মুনাফা করার পুঁজিবাদী মানসিকতার সমালোচনা করে ফ্রান্সিস বলেন ‘আসুন, আমরা নির্ভয়ে বলি, আমরা পরিবর্তন চাই, সত্যিকার পরিবর্তন, (সমাজের) কাঠামোগত পরিবর্তন।’
সারা বিশ্বের গণআন্দোলনের সমর্থনে আয়োজিত সেই সম্মেলনে বলিভিয়ার তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান ইভো মোরেলসের সঙ্গে একই মঞ্চে ছিলেন ফ্রান্সিস। অনুষ্ঠান শেষে ইভো ফ্রান্সিসকে উপহার দেন কাস্তে হাতুড়ি সম্বলিত কাঠের তৈরি ভাস্কর্য, হাতুড়ির উপরে খোদাই করা ক্রুশবিদ্ধ যিশু।
এইসব ঘটনা ও বক্তব্যের জেরে একাধিকবার রক্ষণশীল ক্যাথলিকদের তোপের মুখে পড়েছেন এই আর্জেন্তিনীয় পোপ। পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির সমালোচনা করে পশ্চিমি বিশ্বের ভ্রুকুঞ্চনের কারণ হয়েছেন বারবার। ইউরোপ-আমেরিকার সংবাদমাধ্যমে আলোচনা জোরদার হয়েছে পোপ ফ্রান্সিসের রাজনৈতিক প্রবণতা নিয়ে।
খ্রিস্টধর্মের সর্বোচ্চ মশালবাহক হয়েও নাস্তিক কমিউনিস্টদের সঙ্গে দূরত্ব রাখার পরিবর্তে তাঁদের সঙ্গে কথোপকথনে গিয়েছেন ফ্রান্সিস। ২০১৪ সালে গ্রীসের সিরিজা পার্টির প্রতিনিধি এবং ইউরোপিয়ান লেফটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে একটি ‘কমন সোশ্যাল এথিক’ বা সাধারণ সামাজিক নীতি নির্ধারণের জন্য আলোচনা শুরু করেন তিনি। ২০২১ সালের একটি সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন ‘বাইবেলের কাহিনিকে আমি যদি সমাজবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তাহলে আমি কমিউনিস্ট বৈকি। স্বয়ং যিশুও তাই।’
ফ্রান্সিসের বড় হওয়ার সময়টায় আর্জেন্তিনার রাষ্ট্রপতি ছিলেন জুয়ান পেরন। প্রভাবশালী এই জননেতার রাজনৈতিক মতাদর্শ – পেরোনিজম নামে যা পরিচিত – আধারিত ছিল তিনটি বিষয়ের উপর। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, সামাজিক ন্যায় ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব। পেরোনিজম ফ্রান্সিসের চিন্তাভাবনাকেও প্রভাবিত করেছিল নিঃসন্দেহে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল খ্রিস্টধর্মের সংযম, করুণা এবং সংবেদনশীলতার শিক্ষা। মানুষের দুর্দশার কারণকে চিনতে পারা এবং তা থেকে মুক্তির পথ খোঁজার তাগিদই হয়ত তাঁর কথার সুরকে খানিকটা মিলিয়ে দিয়েছিল মার্কসিয় দর্শনের সঙ্গে। সেই জায়গা থেকেই তিনি বুঝেছিলেন যে বঞ্চিত নিপীড়িত সর্বহারা মানুষকে একটা সমাজ কী চোখে দেখছে, তা দিয়েই সেই সমাজের সভ্যতার মান বোঝা যায়।
অন্যরকম পোপ
১৯৩৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর আর্জেন্তিনার বুয়েনস আয়ার্সে এক ইতালীয় অভিবাসী পরিবারে জন্মান অর্গে বের্গইয়ো। কিশোর বয়স থেকে দ্বাররক্ষী, সাফাইকর্মী, খাদ্যপণ্যের কারিগরী ইত্যাদি নানা পেশায় যুক্ত থাকার পর, ২১ বছর বয়সী অর্গের আকর্ষণ তৈরি হয় ধর্মীয় জীবনের প্রতি। বছর দুয়েক জেসুইট শিক্ষানবিশির পর ১৯৬০ সালে তিনি ক্যাথলিক সন্ন্যাসজীবনে দীক্ষা নেন, ১৯৬৯ সালে ধর্মযাজকের মর্যাদায় অভিষিক্ত হন এবং ১৯৯৮ সালে নিযুক্ত হন বুয়েনস আয়ার্সের আর্চবিশপ পদে। ধর্মতত্ত্বের পাশাপাশি সাহিত্য, মনস্তত্ত্ব এবং দর্শনের অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘকাল। ২০১৩ সালে ফ্রান্সিস নাম নিয়ে ভ্যাটিকানে পোপের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনিই সর্বপ্রথম লাতিন আমেরিকান পোপ।
শুধু লাতিন আমেরিকা নয় পুরো দক্ষিণ গোলার্ধ থেকেই প্রথম পোপ তিনি, এবং অষ্টম শতাব্দীর পরে প্রথম পোপ যিনি ইউরোপিয় নন। স্বভাবতই তিনি ছিলেন ভ্যাটিকানে তাঁর পূর্বসূরিদের থেকে অনেকটাই আলাদা। ২০১৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে সমকামিতা এবং গর্ভপাত নিয়ে চার্চের অনমনীয় অবস্থানের মৃদু সমালোচনা করেছিলেন, যদিও চার্চের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেননি। ২০১৬ সালে প্রকাশিত আরেকটি প্রস্তাবনায় ফ্রান্সিস এসব ব্যক্তিগত বিষয়ে চার্চকে আরও সহমর্মী হওয়ার অনুরোধ জানান। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সমকামী দাম্পত্য অনুমোদন করেন। সমকামী পুরুষদের ধর্মযাজক পদে নিযুক্ত হওয়ার অধিকারও দেওয়া হয় তাঁর আমলেই।
২০১৮ সালে তিনি মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে চার্চের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনিই প্রথম এবং একমাত্র পোপ, বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও শান্তির বার্তা নিয়ে যিনি আরব দেশে গিয়েছিলেন। বৈঠক করেছিলেন মিশরের প্রধান ইমামের সঙ্গে। ২০১৫ সালে বলিভিয়ার বক্তৃতায় আমেরিকার আদি অধিবাসীদের কাছে যে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছিলেন পোপ ফ্রান্সিস, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৩ সালে ভ্যাটিকান ঘোষিতভাবে আমেরিকান ভূখণ্ডে ইউরোপিয় দেশগুলোর ঐতিহাসিক জবরদখলের ধর্মীয় স্বীকৃতি বাতিল করে।
ধর্মীয় অনুশীলনকে আরও মানবিক, আরও সার্বজনীন করে তোলার লক্ষ্যে রোমান ক্যাথলিক চার্চের নানা আভ্যন্তরীণ সংস্কারের জন্য সচেষ্ট ছিলেন বরাবর। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সংকীর্ণতা থেকে যে তিনি একেবারে মুক্ত ছিলেন, এমন নয়। তবে পাপা ফ্রান্সিস আমৃত্যু প্রান্তিক মানুষের জন্যই নিজের জীবন ও কর্ম পরিচালনা করার প্রয়াস করেছেন।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








