মুবাশার হাসান

আগের মাসে তিন সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশে ফিরেছিলাম। ছয় বছরেরও বেশি সময় নির্বাসনের পর এই প্রথম দেশে ফেরা। যেদিন দেশে পা রাখলাম, অর্থাৎ ৭ নভেম্বর, আমার কাছে সে তারিখটার একটা বিশেষ গুরুত্ব আছে। কারণ ২০১৭ সালের ওই দিনেই, শেখ হাসিনা সরকারের গুপ্তচররা আমায় অপহরণ করে, তারপর চলে অকথ্য অত্যাচার। পুরো ঘটনাটাই ছিল, যাকে বলে বলপূর্বক গুম।

নভেম্বর আর ডিসেম্বর, এই দুমাস জুড়ে, মোট ৪৪ দিন কেটেছিল অশেষ যন্ত্রণায়। হাসিনার আমলে যে ৩,৫০০ মানুষকে জোর করে গুম করা হয়েছিল, আমি ছিলাম তাদেরই একজন। দুহাতে হাতকড়া, দুচোখ শক্ত করে কাপড় দিয়ে বাঁধা আর মাঝেমধ্যে ভয় দেখাতে মাথার উপর কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে অপহরণকারীরা। ওদের মধ্যে একজনের কথা এখনো আমার মনে আছে। সে বলছিল ‘তুই এখন আমাদের দাস।’ এই পুরো বেআইনি কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল আমার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া, আমার মানবিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়া। এই কাজে তারা কিছুটা হলেও সফল হয়েছিল।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

যা-ই হোক, আরও অনেক বাংলাদেশি, যাঁরা আর ফিরতে পারলেন না, তাঁদের পরিণতি আমার হয়নি। আমার সৌভাগ্য, আমি ছাড়া পেয়েছিলাম। জাতীয়আন্তর্জাতিক স্তরে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছিল, আমার মুক্তির পিছনে তারও আংশিক অবদান আছে। মুক্তির শর্ত ছিল, অপহরণকারীদের পরিচয় কোথাও জানানো যাবে না, উলটে সংবাদমাধ্যমের কাছে মিথ্যে গপ্পো ফাঁদতে হবে, আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল কয়েকজন গুন্ডা। কোনোরকম ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ গবেষণা বা লেখালিখি করা যাবে না। মুক্তি পাওয়ার পরপরই আমি বাংলাদেশ ছাড়ি। প্রথমে যাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, তারপর নরওয়ে এবং অবশেষে অস্ট্রেলিয়ায়। এখন আমি গর্বের সঙ্গে বলি, অস্ট্রেলিয়া আমার নতুন বাড়ি।

গত সাতবছর ধরে ওই দিনগুলোর অভিজ্ঞতা আমায় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এখনো বুঝি শুনতে পাই অসহায় বন্দিদের আকুল কান্নার শব্দ। তার উপর নিজের পরিবারের কাছ থেকে যে এত দূরে থাকতে বাধ্য হলাম, সেই মানসিক যন্ত্রণায় আমাকে গ্রাস করে বিচ্ছিন্নতাবোধ। তারপরেও নির্বাসনে থাকাকালীন এই বর্বর হাসিনা-শাসনের বিরুদ্ধে লাগাতার লিখে গিয়েছি, কথা বলে গিয়েছি

কিন্তু, যত নিবন্ধই আমি লিখে থাকি, যত আলোচনাতেই বক্তব্য রেখে থাকি, যত সাক্ষাৎকারই দিয়ে থাকি সংবাদমাধ্যমকে, আমাকে প্রতিনিয়ত নিজের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। মনে হত, আমার শরীর মুক্ত হলে কী হবে, আমি যেন এক মানসিক কারাগারের মধ্যে বাস করছি। এমন অন্তর্দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও আমি কিন্তু হাসিনার কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমাগত লড়ে গিয়েছি। আরও অনেকেই লড়েছেন। এই স্বৈরতান্ত্রিক নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে যে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ গড়ে উঠল, তার সুবাদে আমি আর এই শাসনব্যবস্থার অসহায় ‘ভিক্টিম’ নই, বরং ‘সারভাইভার’।

হাসিনা সরকারের হাতে অশেষ কষ্ট ভোগ করা ব্যক্তির তালিকা অবশ্য লম্বা। ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে (যে নির্বাচনে সবকটি দলই অংশ নিয়েছিল) জিতে সরকার গঠন করার পর থেকে ১৬ বছর হাসিনা কোনো অবাধ নির্বাচন হতে দেননি। তাঁর শাসনকাল জুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা আর বলপূর্বক অপহরণের মত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অগুন্তি ঘটনা ঘটেছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের (র‍্যাব) উপর নানা নিষেধাজ্ঞা চাপাতে হয়।

শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে মানুষ এই সরকারের হাতে বন্দি হয়েছেন, সরকারি নির্দেশমাফিক বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা দেশজুড়ে নির্মাণ করেছে একের পর এক গুপ্ত কারাগার। সর্বক্ষেত্রে তৈরি হয়েছিল ত্রাসের সংস্কৃতি। তার জোরেই এতদিন রাজত্ব চালিয়ে গিয়েছেন হাসিনা। বিরোধী রাজনীতিবিদ, শিক্ষাজীবী, সাংবাদিক, কার্টুনিস্ট, সমালোচক – কেউই বাদ যাননি। অন্যদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর স্থিতিশীলতার বয়ান সামনে রেখে, হাসিনার শাসন বরং মুষ্টিমেয় সুবিধাবাদীর প্রভূত সমৃদ্ধির কারণ হয়েছে। হাসিনার পরিবারের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।

সে অন্ধকার যুগের অবসান ঘটল খানিক আকস্মিকভাবেই। তারিখটা ৫ আগস্ট, ২০২৪। ওই দিনেই, ছাত্র যুবদের নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের আবহে হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলেন। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ক্ষমতায় একটি তদারকি সরকার, যার মাথায় আছেন নোবেল জয়ী ডঃ মহম্মদ ইউনুস।

যে অগণিত তাজা প্রাণ ঝরে গেল স্বাধীনতার লড়াইয়ে, আমার এবারে বাংলাদেশে ফেরা তাঁদের কথা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে। আজ যেহেতু হাসিনা আর ক্ষমতায় নেই, দেখতে চাইছিলাম আমাদের দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক চিত্রটা কতখানি বদলাল এই কমাসে বা আদৌ বদলাল কিনা।

বাকস্বাধীনতা আর গণতন্ত্র ফিরেছে, কিন্তু নজরদারিও চলছে

রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠান লেগেই রয়েছে। নানা ফোরাম তৈরি হয়েছে, আলোচনা সভা বসছে। সেসব আলোচনা সভায় বিগত সরকারের অপকর্ম আর দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ চলছে। এমন বেশ কয়েকটা জমায়েতে আমি বক্তা হিসাবে গিয়েছিলাম। তার মধ্যে একটা আমার নিজেরই শিক্ষায়তনে – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণজ্ঞাপন ও সাংবাদিকতা বিভাগ।

সেখানে আমার সঙ্গে এক মঞ্চে ছিলেন আরও দুই বিশিষ্ট বাংলাদেশি সাংবাদিক, শহিদুল আলম ও তাসনিম খলিল। আলমও হাসিনার আমলে জেলে গিয়েছিলেন, পরে টাইম ম্যাগাজিনের বর্ষসেরা ব্যক্তিত্বের তালিকায় জায়গা পান (২০১৮ সালে)। খলিল বর্তমানে সুইডেন-স্থিত অনুসন্ধানী সংবাদ সংস্থা নেত্র নিউজের মুখ্য সম্পাদক। এই মানুষটিকেও ২০০৭ সালে বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা দপ্তর ডিজিএফআইয়ের হাতে অত্যাচারিত হতে হয়েছে। তারপর থেকে তিনিও দেশের বাইরে।

আমার মতই খলিলও সম্প্রতি বাংলাদেশে ফিরেছিলেন। আমাদের এই প্রত্যাবর্তন কেবল আমাদের ব্যক্তিগত অর্জন নয়। বরং তা পরিষ্কার বুঝিয়ে দিচ্ছে, দেশের রাজনীতিতে এক বড়সড় বাঁক বদল ঘটেছে।

অনুষ্ঠানে দর্শক ছিলেন মূলত সাংবাদিকতার ছাত্রছাত্রীরাই। তার মধ্যেও দুজনকে দেখলাম, যাঁদের চেহারা মোটেই শিক্ষার্থীদের মত নয়। তাঁরা চুপচাপ অনুষ্ঠানে এলেন, ছবি তুললেন, সঙ্গে কিছু নোটও নিলেন। আগন্তুকদের পরিচয় সম্পর্কে আয়োজকদের জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, এঁরা আসলে গোয়েন্দা দফতরের লোক। জানতে পেরে কিছুটা অস্বস্তিতেই পড়লাম। ভাবছিলাম, যেখানে একটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জনসমক্ষে এরকম অনুষ্ঠান হচ্ছে, যার নামও আবার ‘ফ্রি থিংকিং ইন এগজাইল’, সেখানে রাষ্ট্রীয় নজরদারি কেন? এরকম খোলামেলা আলোচনায় কী ধরনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে? এটা যে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা তা নয়।

জাতীয় জাদুঘরে আয়োজিত আরেকটা অনুষ্ঠানে, বলপূর্বক অপহরণের পর বেঁচে ফেরা মানুষজন মুক্ত কণ্ঠে নিজেদের কথা বললেন। আয়োজনের দায়িত্বে ছিল ডায়াস্পোরা অ্যালায়েন্স ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড দ্য বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালিসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (ব্রেইন)। সহ-আলোচকদের মধ্যে এমন একজন উপস্থিত ছিলেন, যিনি কেবল বিশিষ্ট বিশ্লেষকই নন, তদারকি সরকারের প্রধান ইউনুসের সংবাদ সচিবও বটে। দর্শকাসনে সামনের সারিতে ছিল একঝাঁক ছেলেমেয়ে, তাদের হাতে নিখোঁজ বাবার ছবি। নিখোঁজদের পরিবারের তরফে মায়ের ডাক নামে যে ঐক্য মঞ্চ গড়ে তোলা হয়েছে, এই ছেলেমেয়েরা তারই অংশ।

মঞ্চে ওঠার আগে একজন আলোচক চুপিচুপি বললেন, গোয়েন্দা দফতরের কয়েকজন তাঁকে ফোন করেছিলেন, ‘বড় কর্তাদের সঙ্গে চা পানের’ নিমন্ত্রণ করেছেন। এমনকি অনুষ্ঠানের মধ্যেই, গোয়েন্দা দফতরের প্রতিনিধি বলে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তিকে দেখলাম, তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, ‘আমাদের স্যার আপনার সঙ্গে কফি খেতে চাইছেন। আপনার বিশ্লেষণ আমাদের সত্যিই ভাল লেগেছে।’

এসব অভিজ্ঞতা থেকে এটুকু অন্তত পরিষ্কার যে মুক্ত চিন্তা-আলোচনার পরিসরে গোপন রাষ্ট্রীয় নজরদারি এখনো ব্যাপক হারে চলছে। হাসিনার আমলে নজরদারি ব্যবস্থার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ ছিল সরকারের হাতে। ইউনুসের সরকার কিছু পরিবর্তন আনলেও দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গুপ্তচর চক্রের তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। অতীতে এদের হাতেই বিভিন্ন সময়ে এদেশের মানুষ লাঞ্ছিত হয়েছেন। যা-ই হোক, প্রতিরোধের স্বর উত্তরোত্তর বাড়ছে। যে নৃশংস, স্বৈরতান্ত্রিক বাতাবরণ বিরাজ করছিল, এই প্রতিরোধের ফলে সেখানে উদার, মুক্তমনা পরিবেশ নির্মাণের এক ধীর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

হাসিনা ক্ষমতায় থাকার সময়ে ডিএফজেআইয়ের ন্যক্কারজনক ভূমিকা নিয়ে কথা উঠছে, কর্মী-সংগঠকরা এখন মুখ খুলছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগের মেন গেটে, ঐতিহ্যবাহী মধুর রেস্তোরাঁর দেওয়ালে এখন র‍্যাবকে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠছে, ডিজেএফআইকে বাতিল করার ডাক উঠছে – কয়েকমাস আগেও যা চিন্তা করা যেত না। এই দৃশ্যগুলো একদিকে যেমন অবাধ রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের চিত্র তুলে ধরছে, আরেক দিকে ধিকিধিকি প্রতিরোধের কথাও বলছে।

সাংবাদিকতা এখন অনেক স্বাধীন, কিন্তু প্রতিবন্ধকতাহীন নয়

আগের সরকারের আমলে নেত্র নিউজ এবং যুক্তরাষ্ট্র-স্থিত বেনার নিউজ -এর মত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সংস্থাকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সে নিষেধাজ্ঞা কেবল তুলে নেওয়াই হয়নি, ওই দুই সংবাদ সংস্থা চাইলে ঢাকায় কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজনও করতে পারে। নিঃসন্দেহে সাংবাদিকতার পরিবেশ আগের চেয়ে অনেকটা স্বাধীন হয়েছে।

নেত্র নিউজ তো ঢাকায় নিজেদের শাখাও খুলে ফেলেছে। উদ্বোধনের দিন উচ্চপদস্থ সরকারি আমলারাও উপস্থিত ছিলেন। ইউনুসের সংবাদ সচিব ছাড়াও সেখানে এসেছিলেন সরকারের একজন উপদেষ্টা। বেনার নিউজ একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, নাম দিয়েছিল ‘হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট ইন নিউ বাংলাদেশ?’ সে অনুষ্ঠানেও শয়ে শয়ে লোক ভিড় করেছিল। টেলিভিশনের টক শো-ই হোক বা খবরের বুলেটিন, সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা এখন এমন অনেক বিষয় নিয়েই মুক্ত কণ্ঠে আলোচনা করতে পারছেন, আগে যেসব বিষয়ে মুখ খোলা যেত না।

এতৎসত্ত্বেও সাংবাদিকতায় এখনো যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা রয়ে গিয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের সমর্থকরা কী ধরনের আক্রমণের মুখোমুখি হচ্ছেন, বেশিরভাগ প্রতিবেদন তারই মামুলি বিবরণী। গভীর, তথ্যনিষ্ঠ বিশ্লেষণ সেখানে নেই। রাজনৈতিক উপদেষ্টা নির্বাচনে বা সংস্কার কমিটিগুলোতে সদস্য নিয়োগে যে ধরনের স্বজনপোষণ চলছে, তা আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত ইংরাজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এ কর্মরত আমার এক সাংবাদিক বন্ধু আমায় জানালেন, তাঁর বেশ কিছু সহকর্মীকে এখন বিদেশভ্রমণের আগে গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে সবুজ সংকেত নিতে হচ্ছে, যাতে নিরাপত্তার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। এই নিবন্ধ যখন লিখছি, ঢাকার অদূরেই সাভারে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। কারণ এক রাজনৈতিক কর্মীকে নাকি চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে গিয়েছিল নিরাপত্তা বাহিনি, যদিও কয়েক ঘন্টা পরে ছেড়ে দিয়েছে। আরেক রাজনৈতিক কর্মী সেঁজুতি হোসেন জানিয়েছেন, সাধারণ পোশাক পরা কয়েকজন অচেনা লোক কিছুদিন আগে তাঁর বাড়িতে আসে, দরজা খোলার জন্য ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, সরকারি মহলে হাসিনার আমলের স্বৈরতান্ত্রিক অনুশীলন এখনো চলছে।

ডেইলি নিউ এজ-এর সম্পাদক নুরুল কবীর তো প্রকাশ্যেই বলেছেন, একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সম্মেলনে যোগ দিতে যাওয়ার সময়ে কীভাবে তাঁকে বিমানবন্দরে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন গোয়েন্দারা। এ ধরনের ঘটনা আগেকার সরকারের আমলে প্রায় সাধারণ ব্যাপার ছিল। এখনো যে তা দিব্যি চলছে, এটা দেখে তিনি অবাক বলে ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন। তবে ঘটনাটি নজরে আসতেই নতুন সরকার যে দ্রুত পদক্ষেপ নিল, তাতে এই ক্ষীণ আশা অন্তত জাগছে যে, পরিবর্তন ধীরে ধীরে হলেও আসবে। মোটের উপর, একথা তো সত্যি যে এই সরকারের আমলে একটিও বিচারবহির্ভূত হত্যা ঘটেনি বা কেউ রাতারাতি গুম হয়ে যায়নি।

অনিশ্চয়তা আছে, সঙ্গে আশাও

অনেকের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, বর্তমান সরকারের স্থায়িত্ব নিয়ে তাঁরা সন্দিহান। এই অনিশ্চয়তার উৎস মূলত দুটি। প্রথমত, জুলাই-অগাস্টের অভ্যুত্থানের সময়ে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের উপর পুলিশকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল হাসিনা প্রশাসন। এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটেছে, আরও কয়েকশো মানুষ চিরদিনের মত অন্ধ হয়ে গিয়েছেন।

হাসিনা দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর বদলা নিতে বিক্ষোভকারীরা থানার পর থানায় আগুন লাগিয়ে দেন। সরকারি হিসাবে এই আক্রমণের ফলে প্রায় ৪৪ জন অফিসার নিহত হন। মাত্র কয়েক দিনের এই নৃশংসতার জেরে সাধারণ জনতা আর পুলিসের মধ্যে যেটুকু পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গা ছিল, তা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে। যদিও পুলিস আবারও পুরোদমে কাজে ফিরছে – আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর হাতে – তাদের প্রতি মানুষের বিশ্বাস এখন নড়বড়ে। অনিশ্চয়তার দ্বিতীয় উৎসটি অর্থনৈতিক। আগেকার সব সরকারের আমলে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলি মোটামুটি চেনা ছকে, চেনা গণ্ডির মধ্যেই কাজ করেছে। এখন খেলার নিয়ম বদলেছে। কাদের কাছে গেলে সঠিক নিরাপত্তা পাওয়া যাবে – সে ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় ব্যবসায়ীরা এখনো বিভ্রান্ত।

আমার এক বন্ধু ঢাকায় একটি রেস্তোরাঁ চালান। তিনি বেশ উদ্বেগের সঙ্গেই বললেন, হাসিনার পতনের পর একাধিক পক্ষ ‘এলাকা দখল’ নিয়ে খেয়োখেয়ি শুরু করেছে, যার প্রভাব পড়ছে তাঁর ব্যবসায়। এক সাংবাদিক জানালেন, হাসিনার সময়ে ব্যবসায়ীরা জানতেন কোথায় গেলে সবুজ সংকেত পাওয়া যাবে আর কোথায় গেলে লালবাতি জ্বলবে। কিন্তু এখন সবটাই আবছা।

এহেন অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মানুষ যে এখন অনেকটা স্বস্তিতে – একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাঁরা এখন মুক্ত কণ্ঠে অনেক কথা বলতে পারছেন। কিছু বললেই বিপদ হবে – এই ভয় কেটে গিয়েছে।

সফর শেষে যেদিন বাংলাদেশ ছাড়লাম, আমার মনে তখন মিশ্র অনুভূতির মেলা। বাড়ি ফিরছি নির্ভয়ে – এই ভাবনা যেমন আনন্দের ছিল, তেমনই অস্বস্তি অনুভব করেছি, যখন দেখেছি গভীরে প্রোথিত শক্তিগুলি এখনো বেশ সক্রিয়। অন্তত একজন সংগঠককেও যে নিরাপত্তা বাহিনী চোখে কাপড় বেঁধে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, তাতেই বোঝা যাচ্ছে যে হাসিনার আমলের স্বৈরতান্ত্রিক চেহারা এখনো মুছে যায়নি। নাগরিক পরিসরে রাষ্ট্রীয় নজরদারি এখনো চলছে, যদিও তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জারি আছে।

একইসঙ্গে আমি প্রচণ্ড আশাবাদীও বটে। কর্মী-সংগঠক, সাংবাদিক, সাধারণ নাগরিক – যাঁর সঙ্গেই দেখা হল, প্রত্যেকেই এই সুযোগে নিজেদের জায়গা বুঝে নিচ্ছেন, নিজেদের দাবি তুলছেন। এভাবেই একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সরকারের পরবর্তী গুরুদায়িত্ব – সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের আয়োজন করে গণতান্ত্রিক রূপান্তর সুনিশ্চিত করা। দিনের শেষে প্রত্যেককেই মনে রাখতে হবে, দেশে স্বৈরতন্ত্রের অন্ধকার নামিয়ে আনা হয়েছিল এই নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করেই – যে প্রক্রিয়া হল গণতন্ত্রের মৌলিক অনুশীলন।

ভাষান্তর: সোহম দাস

লেখক বাংলাদেশের বিশিষ্ট স্কলার। তাঁর অনুমতিক্রমে দ্য ডিপ্লোম্যাট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মূল লেখার এই ভাষান্তর প্রকাশিত হল

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.