পশ্চিমবাংলার যে বুদ্ধিজীবীরা আওয়ামী পতনে ব্যাথিত, কম্পিত, তাঁরা কেন মুজিব-কন্যা ছাড়া কোন আলো দেখতে পাচ্ছেন না?

অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ একটা টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সেই দেখে পশ্চিমবাংলায় আওয়ামী লীগের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা লাফালাফি শুরু করেছেন – এই দেখো, আমরাই ঠিক বলেছিলাম। হাসিনা গেলেই বাংলাদেশ মুসলিম মৌলবাদীদের হাতে চলে যাবে, তোমরা মিছিমিছি মানুষকে বিভ্রান্ত করলে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বিনয়ের সঙ্গে তাঁদের বলতে চাই – মহোদয়/মহোদয়া, বাংলাদেশের পরিস্থিতি টালমাটাল ও উদ্বেগজনক। কিন্তু তা অগাস্ট পূর্ববর্তী দিনের চেয়েও খারাপ, এমন বলার মত পরিস্থিতি এখনো দেখছি না। বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদীরা দাপাদাপি আগেও বারবার করত, হাসিনার সময়েও করেছে, এখনো আবার করছে। তবে দেশটা মৌলবাদীদের হাতে চলে যায়নি।

একদিকে যেমন ঢালাও মামলা দেওয়ার প্রবণতা, ‘মব’ সংস্কৃতি অনেক উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে, মন্দির-মাজারে হামলার ঘটনা ঘটছে, একইসঙ্গে বহু মতের আদানপ্রদানের মধ্যে দিয়ে হাসিনার ধ্বংস করে যাওয়া একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টাও চলছে এবং তাতে দেশের অনেক গণ্যমান্য বুদ্ধিজীবীর অংশগ্রহণও আছে।

মহম্মদ ইউনুসের সরকার অনেকসময়েই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সঠিক অবস্থান ও ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এর অন্যতম কারণ, যাঁরা সরকারের মুখ – ইউনুস ও গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তির মাহফুজ-নাহিদ-আসিফ – তাঁদের জনপ্রিয়তা থাকলেও রাজনৈতিক, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক শক্তি ক্ষীণ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেনা, বিএনপি, জামাত-এ-ইসলামী ও হেফাজত-এ-ইসলাম সহ নানা শক্তির সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল। তাই দ্রুত সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণে এই তদারকি সরকারের অক্ষমতা আছে। সেই সুযোগ দুষ্কৃতিরা নিচ্ছে।

কিন্তু এই টালমাটাল অবস্থার দায় তো শেখ হাসিনা এড়াতে পারেন না। দেশে সুস্থ, গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতার হাত বদল হয়নি। পরপর তিনবার ভোট লুঠ করে সে পথ তিনিই রাখেননি। গুম, গ্রেফতারি, গুন্ডামি – সর্বগুণান্বিত হাসিনা সরকারের সার্বিক গণতন্ত্র হনন তো আছেই, সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের প্রধান জানিয়েছেন, ১৫ বছরের শাসনে দুই লক্ষ কোটি বাংলাদেশি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে হাসিনার আমলে।

সংখ্যাটা সময় নিয়ে ভাবুন – দুই লক্ষ কোটি। দেশের অর্থনীতিকে ফোঁপরা করে দিয়েছে। আর মানুষ রাস্তায় নামলে, এমনকি সোশাল মিডিয়ায় সুর চড়ালেও, চলেছে গুলি, গুম, গ্রেফতারি। মুক্তিযুদ্ধের আত্মা রক্ষা করার নামে গণতন্ত্রের শ্রাদ্ধ করেছেন।

ভাবুন তো, আপনাদের কজনের ফোনে ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) অ্যাপ আছে? কজন জানেন ভিপিএনের কথা? সরকার কোনো দেশে কোনো ওয়েবসাইট ব্লক করলে ভিপিএন দিয়ে সেই ওয়েবসাইটে ঢোকা যায়। আমাদের এখানে সাধারণ মানুষের বিশেষ প্রয়োজন হয় না, তাই আমজনতার বড় অংশই এর কথা জানেন না। বাংলাদেশ এমন একটা দেশে যেখানে আমি নেহাত আমজনতার, এমনকি বয়স্কদের ফোনেও একাধিক ভিপিএন অ্যাপ থাকার কথা জানি। নেত্র নিউজ, বেনার নিউজ তো বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ছিলই, অপছন্দের সংবাদ বা বিশ্লেষণের দায়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও মাঝে মাঝেই ব্লক হয়ে যেত। সেইসঙ্গে সোশাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা তো ছিলই। এই বাড়াবাড়ি সাধারণ মানুষের কাছেও ভিপিএনকে পরিচিত করে তুলেছিল।

এক স্বৈরতন্ত্রী শাসক দেশের পুলিস, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা – সব দখল করে নিয়েছিলেন। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে দেশ থেকে তাড়িয়েছেন, বিচারকদের তাঁবেদার হতে চাপ দিয়েছেন। বিচারপতি মানিক তো একটামাত্র উদাহরণ, নাম করতে গেলে আরও আসবে। বিরোধী হলেই ‘রাজাকার’ বলে দাগিয়ে দমিয়ে দেওয়ার যে রাজনীতি, তাতে ‘রাজাকার’ শব্দটাই লঘু হয়ে গেছে। অতিব্যবহারে, অপব্যবহারে উনিই লঘু করেছেন। পুলিস প্রশাসনে নিরপেক্ষতা বলে কিছু বাকি রাখেননি। জুলাই-অগাস্টের গুলিবর্ষণের ফলে অবস্থা এমন যে অগাস্ট থেকে পলাতক বহু পুলিসকর্মী এখনো কাজেই যোগ দেননি। জনতার আস্থা হারিয়ে পুলিস এখন নিজেই পাল্টা মার খাওয়ার আতঙ্কে রয়েছে।

কিন্তু এসব বললেই এই বঙ্গের ওঁরা বলবেন – তোমরা যে বললে, তোমরা যে তখন মানুষকে বোঝালে, এটা ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ, গণজাগরণ? এখন তো শুনছি মাস্টারমাইন্ড ছিল আর মেটিকুলাস প্ল্যানিং ছিল? তাহলে তো সেই আমরা যা বলেছিলাম তা-ই হল, জামাতিরা চক্রান্ত করে মুক্তিযুদ্ধের সরকারটাকে ফেলে দিল। এবার দেশ কাঠমোল্লাদের দখলে।

‘মাস্টারমাইন্ড’ আর ‘মেটিকুলাস প্ল্যানিং’ প্রসঙ্গে পরে আসছি। আপাতত আপনাদের কাছে প্রশ্ন – ৫ অগাস্টের আগে আপনারা কোথায় ছিলেন? যখন সাংবাদিক শহীদুল আলম বা কার্টুনিস্ট কিশোর জেলে ঢুকেছেন, অধ্যাপক থেকে মানবাধিকার কর্মী ‘গুম’ হয়েছেন, যখন মাইকেল চাকমার পরিবার দোরে দোরে হত্যে দিয়েছে, যখন সব বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকে নানা অভিযোগে জেলে ঢোকানো হয়েছে, যখন ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মাধ্যমে সব সমালোচকের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে, আইন করে মুজিবুর রহমানের সমালোচনাকে (খাতায় কলমে বঙ্গবন্ধুর নামে অপপ্রচার বা অপপ্রচারে মদত) গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে তোলা হয়েছে, দিনে রাতে ভোট লুঠ হয়েছে, তখন এই আশঙ্কা ও উদ্বেগ দেখা গেলে হয়ত হাসিনার উপর চাপ থাকত। কিন্তু সেসব যেন ধর্মনিরপেক্ষতার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, তুচ্ছ ব্যাপার। জঙ্গি দমনের ওটুকু মূল্য তো দিতেই হয়।

গত নির্বাচনকে মাথায় রেখে ২০২৩ সালের জুন-জুলাই থেকে বিএনপি নেতা, কর্মীদের বিরুদ্ধে থাকা পুরনো মামলাগুলো খুঁচিয়ে তোলা শুরু করে পুলিস। বিচার এগোয় দ্রুত। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দায়ের করা পাঁচখানা মামলায় শুধুমাত্র ২০২৩ সালের ২১ নভেম্বর বিএনপির ১১২ জন সংগঠককে সাজা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ১৫০ জনের বেশি বিএনপি নেতা, কর্মীকে সাজা দেওয়া হয় নভেম্বরের মধ্যেই।

এছাড়া ২৮ অক্টোবর রাজধানী ঢাকায় বিএনপির বিক্ষোভ সমাবেশের পরের তিন সপ্তাহে পুলিস প্রায় ৩০০ মামলায় ১৩,০০০ বিএনপি নেতা, কর্মীকে গ্রেফতার করে বলে বিএনপি সেই নভেম্বরেই অভিযোগ করেছিল। বস্তুত নির্বাচন হওয়ার আগেই দেশের বৃহত্তম বিরোধী দল বিএনপির শীর্ষ-মাঝারি-তৃণমূল স্তরের নেতাদের হয় জেলবন্দি, নয় ঘরছাড়া করে দিয়েছিল সরকার। আর জামাত তো নিষিদ্ধ ছিলই। রইল বাকি ‘গৃহপালিত বিরোধী’ জাতীয় পার্টি আর আওয়ামীর শরিকরা। কোনোভাবেই কোনো সুস্থ নির্বাচন হতে না দিতে হাসিনা বদ্ধপরিকর ছিলেন।

সেই নভেম্বরেই সিভিকাস (CIVICUS) নামে এক আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজ জোট, এশিয়ান ফোরাম ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (FORUM-ASIA) এবং এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন (AHRC) এক যৌথ বিবৃতিতে বলে ‘জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে, বিরোধীদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান ক্র্যাকডাউন চলছে, বিরোধী সমর্থকদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার বানোয়াট মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তাদের বাসস্থানে অভিযান চালানো হয়েছে।’ ক্রমশ খারাপ হওয়া পরিস্থিতি দেখে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই সিভিকাস সংস্থা বাংলাদেশকে তার নাগরিক অধিকার পর্যবেক্ষণ তালিকায় যুক্ত করেছিল। এছাড়া ২০১৫-১৬ থেকে যে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বা সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ কতবার বাংলাদেশে মানবাধিকার লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েছে তার হিসাব যে কেউ নিজেই ইন্টারনেটে দেখে নিতে পারেন।

আজ কলকাতায় যাঁরা বাংলাদেশ নিয়ে চূড়ান্ত উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিকতা নিয়ে তাঁরা ছিলেন কী আশ্চর্য রকমের চুপ!

এবার আসি ‘মাস্টারমাইন্ড’ প্রসঙ্গে। সেই যে সাংবাদিক শফিকুল আলম একবার নাহিদ-আসিফের পাশে মাহফুজের ছবি দিয়ে বলে দিলেন, একে দেখা যায়নি, কিন্তু আড়ালে থেকেই এ-ই সব পরিচালনা করেছে, ব্যাস! মাস্টারমাইন্ড থাকলে আর স্বতঃস্ফূর্ত কেমনে হয়? সেখান থেকে মাহফুজ হয়ে গেল নিষিদ্ধ জঙ্গি গোষ্ঠী হিযবুত তাহরীরের লোক। কলকাতায় সেই খবর রমরমিয়ে প্রচার পেল।

মাহফুজকে মাস্টারমাইন্ড বলাটা হয়ত আবেগের বশে শফিকুলের বাড়াবাড়ি। আমি নানা সূত্রে যা বুঝেছি, মাহফুজ নাহিদ-আসিফদের গ্রুপের মূলত তাত্ত্বিক নেতা, বুদ্ধিজীবী গোছের। নাহিদ-আসিফদের মত সংগঠক বা ভালো বক্তা নন। কিন্তু কৌশল ঠিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা নেন। সেটা বড় কথা নয়। কথা হল, বাংলায় একটা প্রবাদ আছে ‘এঁড়ে না বকনা, লেজ তুলে দেখ না।’ তা এই লেজের আড়ালটা সরিয়ে ইন্টারনেট ও সোশাল মিডিয়ায় গত কয়েক বছরের কার্যকলাপ সন্ধান করলেই এইসব লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীরা দেখতে পেতেন যে মাহফুজ যে ধরনের কথাবার্তা বলে থাকেন, তা কোনোভাবেই কোনো ধর্মীয় মৌলবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারেন না।

এবার ‘মেটিকুলাস প্ল্যানিং’ প্রসঙ্গে আসি। ওই যে, ইউনুস একবার ছাত্রনেতাদের প্রশংসা করতে গিয়ে বলে ফেলেছিলেন যে এই অভ্যুত্থানের পিছনে তাঁদের ‘মেটিকুলাস প্ল্যানিং’ ছিল, অমনি কলকাতার আওয়ামীপ্রেমীরা জামাতি চক্রান্তের ব্লুপ্রিন্ট ধরে ফেলেছেন।

হে মাননীয়/মাননীয়া, নির্বাচনের মাধ্যমে যে এই সরকারকে ফেলা যাবে না, কারণ সরকার কোনো স্বাভাবিক নির্বাচন করতেই দেবে না – একথা বিশাল অংশের মানুষের কাছে ২০২৩ সালেই স্পষ্ট হয়ে যায়। গণঅভ্যুত্থানই যে একমাত্র পথ, রাস্তার আন্দোলনই যে একমাত্র পথ, তা গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই আলোচনা শুরু হয়ে গেছিল। ফরহাদ মাজহারের গণঅভ্যুত্থান ও গঠন বইটা গতবছরই প্রকাশ পায়। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে খানিক জনপ্রিয়তাও পায়। সেই ২০১৮ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় থেকেই যে ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ কথাটা ছাত্রছাত্রীদের একাংশের মাথায় ঢুকেছে, হাসিনার ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচার সেই চিন্তাভাবনাকে আরও গভীর করে তুলেছিল।

২০২৩ সালের অক্টোবরে নাহিদ-আসিফদের গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির আত্মপ্রকাশ। এর আগে এর সংগঠকরা দীর্ঘদিন নানা পাঠচক্র, আলোচনা চক্র চালিয়েছেন। আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্যে সংগঠনের আহ্বায়ক আখতার হোসেন বলেন, নতুন দলের মূলনীতি হবে – শিক্ষা, শক্তি ও মুক্তি। আদর্শ হল ‘দায়, দরদ ও মানবিক মর্যাদাভিত্তিক রাজনৈতিক সমাজ গঠন’। দলের রাজনৈতিক অবস্থান হবে মধ্যপন্থী ও গণতান্ত্রিক, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে – শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন, রাজনৈতিক ব্যক্তি পরিসর ও সংস্কৃতি নির্মাণ, শিক্ষার্থী কল্যাণ, ছাত্র-নাগরিক রাজনীতি নির্মাণ ও রাষ্ট্র-রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন। এই যে ‘রাষ্ট্র-রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন’-এর কথা, তা কি গোপনে বলা হয়েছিল? প্রকাশ্যে হয়েছিল বলেই এই ঘোষণা করে ফেরার পথে ছাত্র লীগের হাতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন আখতার।

বিএনপি তো একাধিকবার প্রকাশ্যেই বলেছে, পথের আন্দোলনেই এই সরকার পড়বে। সেই ভরসাতেই তারা নির্বাচন বয়কটের মত জোরালো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পথের আন্দোলনে সরকার ফেলা কি অভ্যুত্থান নয়? বিএনপি এর জন্য কোনো পরিকল্পনা করেননি বলতে চান? তারা সফল হয়নি। তাই যারা সফল হয়েছে, সেই ছাত্রনেতারা বিএনপিকে ক্ষমতার ধারেকাছে আসতে দিতে চাইছেন না।

২০০৮ সালে হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর থেকে পরপর তিনটে অন্যায্য নির্বাচনের পরও যদি কোনো রাজনৈতিক শক্তি সরকার ফেলার জন্য গণজাগরণ বা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা না করত, তাহলে তো তাদের সরাসরি আওয়ামী লীগ হয়ে যাওয়াই উচিত ছিল, তাই না?

কিন্তু আওয়ামীপ্রেমীদের সাফ বক্তব্য – পরিকল্পনা কেন করেছে? ফাউল!

তবে একথা অনস্বীকার্য, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সেই দিন আসবে – এ হয়ত ছাত্রশক্তির নেতারা ভাবেননি। তাই কোনোভাবেই কোনো বিকল্প সরকার গড়ার বা বড় গণআন্দোলন পরিচালনার জায়গায় তাঁরা ছিলেন না। তাঁদের নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলনের যে জনজোয়ার, তাতে বিএনপি ও জামায়েতের পাঠানো অনেকেই ছিলেন। এটাও খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। বিএনপি লাগাতার মাঠেই ছিল, রাস্তায় আন্দোলন হচ্ছে দেখেও তাঁরা লোক পাঠাবেন না – এমন হয় না। কিন্তু ছাত্র নেতৃত্ব আন্দোলনের রাশ বিএনপি বা জামাত কারোর হাতেই যেতে দিতে চাননি, যদিও হাসিনার পলায়নের পর তাঁরা দুই দলেরই সহায়তা চেয়েছেন অন্তবর্তী সরকারের কাজ ও সংস্কারের উদ্যোগে। এর মধ্যে বিএনপির সঙ্গে তাঁদের একটা শীতল সংঘাত শুরু হয়েছে। আবার বিএনপির সঙ্গে একদা জোটসঙ্গী জামাতের সংঘাতও তীব্র হয়ে চলেছে। হাসিনার পতনের পর থেকে ধর্মনিরপেক্ষ পরিসরটা ধরার উদ্দেশ্যে বিএনপি বারবার নিজেদের ‘লিবারাল ডেমোক্র্যাটিক’ হিসাবে তুলে ধরছে।

হাসিনার পতনে তিনি যাঁদের দাবিয়ে রেখেছিলেন তারা সবাই মাথাচাড়া দিয়েছে। এর মধ্যে মৌলবাদীও আছে, মানবাধিকার গণআন্দোলনের কর্মীও আছেন। কলকাতার আওয়ামীপ্রেমীরা, কী মোহে বা মধুতে বলা মুশকিল, শুধু মৌলবাদীদেরই দেখতে পান।

আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার পর আত্মগোপন করে ছাত্র রাজনীতি করা নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্র শিবিরের কিছু গোপন সংগঠক বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ক হয়ে যান। বিএনপির ছাত্র দল বা বামেরা প্রকাশ্যে নিজ পরিচয়ে রাজনীতি করতেন। তাই তাঁরা ‘অরাজনৈতিক’ প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ক হতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধে কলঙ্কজনক ভূমিকার উত্তরাধিকার বহন করা শিবির গোপন সংগঠন, তাই পরিচয় গোপন করে তাঁদের সংগঠকরা সমন্বয়ক হতে পেরেছিলেন। এসবের পরেও, মূল রাশ নাহিদ-আসিফদের হাতেই ছিল। নাহিদ-আসিফদের আমার কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী মনে হয়নি এখন পর্যন্ত। তবে মানুষকে নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না।

কিন্তু প্রশ্ন হল, কলকাতার আওয়ামীপ্রেমী বুদ্ধিজীবীরা শুধু শিবিরের সমন্বয়কদেরই দেখতে পান কেন? কেন তাঁরা ফারজানা সিঁথি, সাহিনূর সুমীদের দেখতে পান না? কেন দেখতে পান না যে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ছাত্রনেতা মেঘমল্লার বসু, গ্রাফিক শিল্পী দেবাশিস চক্রবর্তীদের লড়াই? বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল আলমগীর, গণবুদ্ধিজীবি সলিমুল্লাহ খান বা ফরহাদ মাজহার বা সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রিয়াজ – এঁদের মৌলবাদী মনে হয়?

আরো পড়ুন ‘ভারতের সকলের সাথে বাংলাদেশের মানুষের বিদ্বেষ থাকার কারণ নাই’

এই ধারণাহীনতার কারণ – একইসঙ্গে আওয়ামীর ফ্যাসিবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরোধিতা করছিল যে শক্তিগুলো, তাদের খবর তাঁরা রাখেন না। তাঁরা হাসিনা ও আওয়ামী লিগের বাইরের বাংলাদেশ চেনেন না, চেনার চেষ্টা করেননি। আঁধারে তাঁরা ইসলামিক মৌলবাদী ছাড়া কিছু দেখতে পান না। তাই হাসিনা মেট্রোরেলের দুঃখে কাঁদলে তাঁরাও কেঁদে ফেলেন, হাসিনা হেসে উঠলে তাঁদের সূর্য লজ্জা পায়; শয়ে শয়ে তরুণের লাশ ‘বর্বর জামাতি’ হয়ে যায়।

অজ্ঞানতা অন্ধকার। অন্ধকার আনে আতঙ্ক। এ প্রসঙ্গে দুটি তথ্য উল্লেখ না করে পারি না।

১) মুক্তিযুদ্ধের শত্রু জামাতের সঙ্গে হাসিনা নিজেই হাত মিলিয়েছিলেন।

১৯৯৪-৯৬ জামাতের সঙ্গে জোট বেঁধে বিএনপি-বিরোধী আন্দোলন করা প্রসঙ্গে ১৯৯৬ সালের একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে সঞ্চালক তাঁকে জিজ্ঞেস করেন ‘একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিয়েছে, আওয়ামী লীগের ডাকে আমরা সবাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি; আমরা সবাই মনে করতাম – মনে করতাম বলছি – যে আওয়ামী লীগ হল মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বিগত আন্দোলনে আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে জোট বেঁধেছে, লিয়াজঁ কমিটি বানিয়েছে। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে আজ কি আর আমরা একে মুক্তিযুদ্ধের বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিবেচনা করতে পারব?’

হাসিনা বলেন ‘আমার এখানে একটা কথা, আমরা আমাদের আদর্শ থেকেও বিচ্যুত হইনি, বা নীতিমালা থেকেও দূরে যাইনি। যেখানে জনগণের ভোটের অধিকারের বিষয়টা রয়েছে, জনগণের অধিকার আদায়ের কিছু কৌশল আমরা অবশ্যই অবলম্বন করেছি। আপনি যেমন বললেন, সেদিক থেকে বিচার করলে তো (প্যালেস্তাইনের প্রেসিডেন্ট) ইয়াসের আরাফত, তিনি যেভাবে (ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী য়িৎঝাক) রাবিনের সাথে চুক্তি করলেন, জনগণের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য বা তাঁদের অ্যাচিভমেন্টের জন্য যে পদক্ষেপ নিলেন, সেখানেও তো আপনারা তাঁকে দোষারোপ করতে পারেন যে তিনি আদর্শ বিচ্যুত হলেন। কিন্তু এটা তো আদর্শ বিচ্যুতি নয়!’

সঞ্চালক ধরিয়ে দেন ‘এটা তো এক দেশ থেকে আরেক দেশ হয়ে গেল!’

হাসিনা হেসে বলেন ‘এক দেশ থেকে আরেক দেশ হলেও এখানে জাতিগত একটা বিষয় রয়ে গেছে, তাই না? সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা দৃষ্টিতে আপনি দেখতে পারেন না। এটা একটা কৌশলের ব্যাপার। সবচেয়ে বড় কথা এই, আমরা যা কিছু করছি, জনগণের স্বার্থে করছি। সেটা হল বড় কথা।’

তো আমার প্রশ্ন – হাসিনা জামাতের সঙ্গে হাত মেলালে সেটা কৌশল, জনগণের স্বার্থ, ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই। আর হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে জামাতিরা ঢুকে গেলে সেটা চক্রান্ত?

২) হেফাজতের আবদারে পাঠ্যপুস্তকেও বদল হয় ২০১৭ সালে। ২০১৮ সালে হেফাজতে ইসলামের আমীর শাহ আহমদ শফী হাসিনাকে ‘কওমী জননী’ আখ্যা দেন, মূলত কওমী মাদ্রাসা ও তার আলেমদের উন্নয়নে বিপুল রাষ্ট্রীয় সহায়তার জন্য। সেটা ঘটে নির্বাচনের কয়েক মাস আগে।

কিন্তু কলকাতার আওয়ামীপ্রেমীদের চোখে হাসিনা ছাড়া সবাই মৌলবাদী, সব অন্ধকার।

পশ্চিমবাংলার এই আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবী কারা? সাংবাদিক, কবি, লেখক, শিল্পী, সিপিএম, তৃণমূল, বিজেপি-আরএসএস – কে নেই সেই তালিকায়? এঁদের একটা অংশ হয়ত নানা সময়ে বাংলাদেশ ভ্রমণকালে মধু পেয়ে থাকতে পারেন, বাংলাদেশের আওয়ামী নেটওয়ার্ক কলকাতার বুদ্ধিজীবী সমাজের অনেককেই রসেবশে রাখতে চাইতেন। কিন্তু অধিকাংশই, আমি নিশ্চিত, কোনো মধু পাননি, প্রত্যাশাও করেন না। কারণ শুধু বুদ্ধিজীবী নয়, একই ধারণা পশ্চিমবঙ্গের বিপুল সংখ্যক আমজনতার মধ্যেও রয়েছে।

পূর্ববঙ্গ থেকে আগত (১৯৪৭ সালের আগে থেকে) মানুষের মধ্যে পরম্পরাগত মুজিব-দুর্বলতা আছে। যাঁদের বয়স ৭০-৮০, তাঁরা অনেকেই আজও মুক্তিযুদ্ধের আবেগে ভরপুর। বাংলাদেশ বললেই মনে পড়ে যায় মুজিবের ‘আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না,’ মনে পড়ে যায় আকাশবাণীর কিংবদন্তি সংবাদ পাঠক-ঘোষক দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতির বর্ণনা। যাঁদের বয়স ৩০-৪০, তারা অনেকেই পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাছে এইসব গল্প শুনে বড় হয়েছি, যা বলতে বলতে আবেগে তাঁদের গলা বুজে আসত। দেশভাগের ক্ষতের পর এ যেন আবার দেশ জোড়া লাগার প্রলেপ। তাঁদের কাছে মুজিব-হত্যাতেই বাংলাদেশ ‘শ্যাষ’। ‘মুজিবরে মাইর‍্যা ফ্যালাইল!’

তারপর আবার মুজিবকন্যার প্রত্যাবর্তন। যে কোনো কারণেই হোক, কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের বড় অংশের বুদ্ধিজীবী আওয়ামী লিগের বাইরের বাংলাদেশ কল্পনা করতে পারেননি। বাইরে যা আছে তা-ই মুসলিম মৌলবাদ। মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে, হত্যাকারীরা শাস্তি পায়নি, পাকিস্তানের মত সেনাবাহিনীর শাসন চলেছে, পাকিস্তানপন্থী জামাতিরা ক্ষমতায় এসেছে – এইসব গভীর ক্ষত।

কিন্তু তা বলে প্রতিবেশীর কোনো খবর রাখব না, এটা কি ঠিক? বাংলাদেশে গত ৫০ বছরের ওলটপালটে যে এই দুই ধারার বাইরে অন্য রাজনৈতিক ধারা ক্ষীণ হলেও বিদ্যমান, এবং কোথাও কোথাও তা খানিক শক্তিশালীও হচ্ছে – সে খোঁজ এপার বাংলার মানুষ রাখেননি। তাঁরা মুজিব অথবা মৌলবাদ – এই বাইনারির চক্করে পড়ে গেছেন। অথচ তখন মুজিববাদের নামে লুঠ হচ্ছিল জনতার অর্থ, অধিকার, সম্পদ ও সম্মান।

বাংলাদেশ এখন পুলিসি ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য প্রশাসনিক সংস্কারের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বারবার স্বৈরতন্ত্রের খপ্পরে পড়েছে বাংলাদেশ। তা থেকে মুক্তির রাস্তা খোঁজার চেষ্টা চলছে। এইসব সংস্কারের জন্য তৈরি কমিটি বা কমিশনের সদস্যদের ইতিহাস সম্পর্কে কতটা খোঁজ আপনারা নিজ উদ্যোগে নিয়েছেন, নিজেই ভাবুন।

কিন্তু অজ্ঞানতাপ্রসূত আতঙ্ক থেকে যেসব কথাবার্তা বলে যাচ্ছেন, তা ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের বাংলাদেশ-বিদ্বেষ ছড়িয়ে তাকে মুসলমানবিদ্বেষে পরিণত করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ঝাড়খণ্ডে রাজ করার যে পরিকল্পনা, তাতেই হাওয়া দিচ্ছে। আওয়ামী লীগ ও ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা যে একই বাস্তুতন্ত্রের অংশ হিসাবে সুপরিকল্পিত অপপ্রচার করছে – তা ভারতের হিন্দুত্ববাদ-বিরোধীদের অনেকেরই বোধগম্য হয়নি। নইলে ভাবুন, ২০২১ সালে যখন আরও ব্যাপক আকারে বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর হামলা হয়েছিল, হাসিনার একচ্ছত্র আধিপত্যের কালে, তখন এই ভারত সরকার চুপ ছিল কেন? তখন ভারত সরকার বা বিজেপি বাংলাদেশ নিয়ে কতটা কী প্রচার করেছিল, সেটাও একবার ইন্টারনেটে বা লাইব্রেরিতে দেখে নিন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক, সামাজিক গবেষকদের কাছে আমি একটা প্রস্তাব রাখতে পারি। কলকাতার যেসব সংবাদমাধ্যম হাসিনার পতনে বারবার মূর্ছা যাচ্ছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর আর ২০২৪ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর – তাদের এই আট মাসের কভারেজ দেখুন, তুলনামূলক আলোচনা করুন। কলকাতার এই বাংলাদেশ-দর্শনের সারকথা ওখানেই পাবেন।

যদিও এসব ইউনিস সরকারের দায়ভার কমায় না। দায়িত্ব যখন নিয়েছেন, পুলিস প্রশাসনের উপর জনতার আস্থা ফেরানো আপনাদের দায়িত্ব। দুষ্কৃতি দমন চিরকাল সব সরকারের দায়িত্ব। দুষ্কৃতি দমনের ছুতোয় বিরোধী কণ্ঠরোধ করা পরিত্যাজ্য।

মতামত ব্যক্তিগত

 

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.