জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বাম ধারার বুদ্ধিজীবী এবং অ্যাকটিভিস্ট। তিনি বহুবছর ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। চলমান গণঅভ্যুত্থানের সমর্থনে গড়ে ওঠা নাগরিক আন্দোলনেও তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে কথা বললেন নাগরিক ডট নেটের সঙ্গে।

বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ঘটে গিয়েছে। ভারতের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজের অনেকেই ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন সমর্থন করছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর বেশ কিছু সাম্প্রদায়িক হিংসার খবর আসছে। বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাঁদের ধর্মস্থান আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার মত কী?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

যে কোনো স্বৈরতন্ত্র যখন গণআন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত হয়, তখন এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। তার সুযোগ নেয় কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ। বাংলাদেশেও ঠিক তাই হয়েছে। শেখ হাসিনার পদত্যাগের ঠিক পরেই কয়েক ঘন্টা কার্যত কোনো আইনের শাসন ছিল না। আচমকাই প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং দেশ ছাড়ার খবর আসে। আন্দোলনকারীরা সেই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। সেনাবাহিনীও অপ্রস্তুত ছিল। সেইসময় লুঠপাট হয়েছে, সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ হয়েছে। কিন্তু রাতের মধ্যেই আন্দোলনের প্রধান শক্তি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জায়গায় টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বহু মন্দিরের বাইরে পাহারার ব্যবস্থা হয়েছে। অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব যাঁরা দিয়েছেন, তাঁরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার বিষয়ে উদ্যেগী হয়েছেন।

এই বিষয়ে আরও একটি কথা বলতে চাই। গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ যাবতীয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের একটি ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তারা এর বিপরীত কাজ করেছে। গোটা দেশ জুড়ে জমি দখল, বনাঞ্চল দখলের মত কাজ তারা করেছে। বিপুল পরিমাণে হিন্দুদের জমি, সম্পদ তারা দখল করেছে। ফলে সংখ্যালঘুদের উপর হাসিনার পদত্যাগের পরেই সন্ধ্যা এবং রাতে আচমকা হামলা হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়। যাঁরা এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিলেন, তাঁদের অবশ্যই এই বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। যতদূর খবর পাচ্ছি, তাঁরা তা করছেন।

 

আপাতদৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের একটি ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তারা এর বিপরীত কাজ করেছে। গোটা দেশ জুড়ে জমি দখল, বনাঞ্চল দখলের মত কাজ তারা করেছে। বিপুল পরিমাণে হিন্দুদের জমি, সম্পদ তারা দখল করেছে। ফলে সংখ্যালঘুদের উপর হাসিনার পদত্যাগের পরেই সন্ধ্যা এবং রাতে আচমকা হামলা হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়।

 

তিন ধরনের মানুষ গতকালের নৈরাজ্যে যুক্ত ছিলেন। প্রথমত, যাঁরা দীর্ঘদিন, বছরের পর বছর ধরে আওয়ামী লীগের দ্বারা অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। মার খেয়েছেন। তাঁরা পাল্টা মার দিতে গিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, সুযোগসন্ধানী মানুষজন, যাঁরা এই সুযোগে কিছু জমি বা সম্পদ হাতিয়ে নিতে চেয়েছেন। তৃতীয়ত, সাম্প্রদায়িক শক্তি, যারা পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘুদের আক্রমণ করেছে। আবার এটাও ঠিক যে গণঅভ্যুত্থানের বিজয়কে কলঙ্কিত করার জন্যও বেশ কিছু ঘটনা সংগঠিত হয়েছে। শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর লোকজন দেশে রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের ফলে নৈরাজ্য, লুঠপাট, সাম্প্রদায়িক হামলা বেড়েছে – এই বয়ান জনপ্রিয় হলে সেই অংশের সুবিধা।

শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পরে আমরা দেখলাম সেনাপ্রধান কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করলেন৷ নাগরিক সমাজের কিছু প্রতিনিধিও সেখানে ছিলেন৷ কিন্তু প্রথম বৈঠকে গণঅভ্যুত্থানের প্রধান শক্তি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব ছিল না। এর কারণ কী?

এটা একদমই ঠিক হয়নি। সেনাপ্রধান আইনকানুন বুঝে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করেছেন বলে আমার মনে হয় না। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করার পরে তো সেনাপ্রধানই তখন দেশের ক্ষমতায়। তাঁর অবশ্যই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে প্রথম বৈঠক করা উচিত ছিল। আমি মনে করি, যদি প্রথম বৈঠকে ছাত্রনেতারা উপস্থিত থাকতেন, তাহলে এই সহিংসতা অনেক কম হত।

আমরা তো অনেকগুলি গণঅভ্যুত্থান দেখেছি। এবারের অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এটির অরাজনৈতিক চরিত্র। কোনো রাজনৈতিক দল এই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়নি। আন্দোলনের প্রধান শক্তি ছিল ছাত্রসমাজ। তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন অভিভাবকরা, আইনজীবীরা, শিক্ষকসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ। সেই ছাত্ররাই যদি অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রথম বৈঠকে না থাকেন, তাহলে সেই বৈঠক অর্থহীন হয়ে পড়ে।

 

মূর্তি ভাঙার আমি তীব্র বিরোধিতা করি। অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ। সমর্থনের প্রশ্নই আসে না। এই ধরণের কাজ গণঅভ্যুত্থানকে কলঙ্কিত করে। অন্ধকারের শক্তিগুলি বাংলাদেশের সমাজে আছে। কিন্তু তাদের সঙ্গে সামাজিক, রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছে।

 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছাড়াও সেনাপ্রধান গণতান্ত্রিক বাম জোটকেও বৈঠকে ডাকেননি। অথচ এই অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে তাঁরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি। তিনি বিএনপির সঙ্গে জামাতে ইসলামিকেও ডাকলেন, হেফাজতে ইসলামকে ডাকলেন। যে জামাতে ইসলামি দুদিন আগেই নিষিদ্ধ হয়েছে, তাদের বৈঠকে ডাকা হল, অথচ ছাত্রছাত্রীরা প্রথম বৈঠকে নেই – এটা মানা যায় না।

অর্ন্তবর্তীকালীন জাতীয় সরকারের প্রধান হিসাবে নোবেলজয়ী মহম্মদ ইউনুসের নাম ঘোষিত হয়েছে। আপনারা যাঁরা বামপন্থী, তাঁদের সঙ্গে ইউনুসের রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে। তাঁর নিয়োগকে কী চোখে দেখছেন? আপনাকে যদি এই সরকারে অংশগ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়, আপনি কি রাজি হবেন?

অর্ন্তবর্তীকালীন জাতীয় সরকার দ্রুত গঠন করা দরকার। উপদেষ্টা হিসাবে বিভিন্ন নাম এসেছে। ছাত্ররাই ইউনুসের নাম প্রস্তাব করেছিল। এই অর্ন্তবর্তীকালীন জাতীয় সরকারের কাজ হল, দেশে একটি নির্বাচন করা। ইউনুসের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অবশ্যই আমাদের দ্বিমত আছে। তবে উনি পরিচিত মুখ, তাই সম্ভবত ছাত্ররা তাঁর নাম প্রস্তাব করেছেন। আমার মনে হয় না ইউনুস অভ্যুত্থানের স্পিরিটের বিরুদ্ধে কিছু করবেন বা করে উঠতে পারবেন।

একটা কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই। এই অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণ। সর্বজনের বাংলাদেশ নির্মাণ। সমস্যা হল, যে রাজনৈতিক দলগুলি এই আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে, তারা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল। এই অবস্থায় অর্ন্তবর্তীকালীন জাতীয় সরকার যাতে গণঅভ্যুত্থানের এই আকাঙ্ক্ষার দিকে অগ্রসর হয়, তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। আমার সরকারের অংশ হওয়ার প্রশ্ন নেই। সেখানে আমার কিছু করার আছে বলে মনে হয় না। অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার যাতে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণে ভূমিকা নেয়, সেদিকে সবাই মিলে নজর রাখতে হবে। আমিও সেই প্রক্রিয়াতেই থাকব।

পশ্চিমবঙ্গে এমন একটি ধারণা বেশ জনপ্রিয়, যে আওয়ামী লীগ যত স্বৈরাচারীই হোক, তারা ক্ষমতাচ্যুত হলেই বিএনপি, জামাত চলে আসবে, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ শেষ হয়ে যাবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস হবে। এই ধারণা সম্পর্কে কিছু বলবেন?

বাংলাদেশ নিয়ে গড়পড়তা ভারতীয়দের ধারণা সংকীর্ণ। এর জন্য আমি ভারতের মূলধারার মিডিয়াকে দায়ী করব। কেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বর্তমানে ভারত রাষ্ট্রের প্রতি বিক্ষুব্ধ, সেই সংক্রান্ত আলোচনা ভারতীয় মিডিয়ায় আসে না। স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয়রা বিষয়গুলি জানতেই পারেন না। অনেকেই মনে করেন বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা সাম্প্রদায়িকতা। নিশ্চয় সাম্প্রদায়িকতা একটি বড় সমস্যা। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী লুঠপাট, সম্পদের কেন্দ্রীভবনের মত সমস্যাই বাংলাদেশের কাছে প্রধান চ্যালেঞ্জ। অধিকাংশ ভারতীয় জানেন না, যে ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা নির্মাণে আওয়ামী লীগের কোনো ভূমিকা নেই। তারা বরং মুক্তিযুদ্ধের যা ক্ষতি করেছে, তা আর কেউ করেনি। মুক্তিযুদ্ধের নাম করে জনগণের উপর অত্যাচারের স্টিমরোলার চালিয়েছে আওয়ামী লীগ। এর ফলে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আকর্ষণ কমেছে। আওয়ামী লীগের কারণেই মুক্তিযুদ্ধের প্রতি জনগণের একাংশের বীতরাগ তৈরি হয়েছে।

আরো পড়ুন প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভারতবিরোধী গণরোষ অহেতুক নয়

আওয়ামী লীগ চলে গেলেই বিএনপি, জামাত চলে আসবে – এমন ভাবনা সঠিক নয়। জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক বিকল্প যে তৈরি হতে পারে, এই গণঅভ্যুত্থান তার প্রমাণ। আওয়ামী লীগের আমলে যা বিরোধিতা হয়েছে, প্রতিরোধ হয়েছে, সেখানে বিএনপি, জামাত কী ভূমিকা পালন করেছে? নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলন – জনগণই ছিল কেন্দ্রীয় ভূমিকায়। এবারের গণঅভ্যুত্থানেও তাই।

 

বাংলাদেশ নিয়ে গড়পড়তা ভারতীয়দের ধারণা সংকীর্ণ। এর জন্য আমি ভারতের মূলধারার মিডিয়াকে দায়ী করব। কেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বর্তমানে ভারত রাষ্ট্রের প্রতি বিক্ষুব্ধ, সেই সংক্রান্ত আলোচনা ভারতীয় মিডিয়ায় আসে না। স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয়রা বিষয়গুলি জানতেই পারেন না।

 

মুক্তিযুদ্ধ কারা করেছেন? এই দেশের সাধারণ মানুষ। কজন আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন? তাঁরা ছিলেন নিরাপদ আশ্রয়ে। এই দেশের মানুষ বুকের রক্ত ঢেলে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। দেশ স্বাধীন করেছেন। তাই আমি বারবার করে বলি, মুক্তিযুদ্ধকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধকে জনগণের হাতে নিয়ে আসতে হবে।

শেখ মুজিবুর রহমানের মূর্তি ভাঙা হচ্ছে। অনেকের আশঙ্কা বাংলাদেশ হয়ত আফগানিস্তানে পরিণত হবে।

মূর্তি ভাঙার আমি তীব্র বিরোধিতা করি। অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ। সমর্থনের প্রশ্নই আসে না। এই ধরণের কাজ গণঅভ্যুত্থানকে কলঙ্কিত করে। কিন্তু বাংলাদেশ কোনোভাবেই আফগানিস্তানে পরিণত হবে না। অন্ধকারের শক্তিগুলি বাংলাদেশের সমাজে আছে। কিন্তু তাদের সঙ্গে সামাজিক, রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছে। তারা কখনোই জয়ী হতে পারবে না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এই গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দিয়েছে, সাফল্য অর্জন করেছে। সাম্প্রদায়িক শক্তি কখনোই সেই সাফল্যকে গ্রাস করতে পারবে না। গণঅভ্যুত্থানের সাফল্যকে সংহত করে বাংলাদেশ আগামীর পথে এগোবে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.