শিল্পী দেবাশিস চক্রবর্তীর শিল্পকর্ম বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। বাংলাদেশের সীমা ছাড়িয়ে বিভিন্ন দেশে আদৃত হয়েছে তাঁর তৈরি পোস্টার। তাঁর পোস্টারের কোনো কপিরাইট থাকবে না বলে ঘোষণা করেছিলেন দেবাশিস। হাজার হাজার মানুষ পোস্টার প্রিন্ট করে নেমে এসেছিলেন রাজপথের মিছিলে। তাঁর সঙ্গে কথা বলল নাগরিক ডট নেট।
দেবাশিস, আপনি একজন শিল্পী হিসাবে বাংলাদেশের চলমান গণঅভ্যুত্থানে সম্ভবত সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছেন। আপনার তৈরি করা ডিজিটাল পোস্টার হয়ে উঠেছে গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার৷ প্রায় ইস্তেহারের ভূমিকা পালন করেছে তারা। নিজের সম্পর্কে যদি দু–চার কথা বলেন। আপনি কে, কীভাবে পোস্টার তৈরি করতে শুরু করলেন, এই গণঅভ্যুত্থান এবং তাতে আপনার পোস্টারের ভূমিকাকে কীভাবে দেখছেন?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থাতেও বাংলাদেশে নানান বুদ্ধিবৃত্তিক সাংস্কৃতিক চর্চায়, আয়োজনে নানা ধরণের পেশাজীবী নতুন রাষ্ট্র কল্পনা করছিলেন। রাষ্ট্র গঠন এবং রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসাবে গঠিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বহু দিন ধরেই দানা বাঁধছিল। নজিরবিহীন লুঠপাট, বাটপাড়ি, অর্থ পাচার, গুমখুন, ভোট চুরি, ভয়ের বিরুদ্ধে নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষের মধ্যে সঙ্গত কারণেই অনেকদিন ধরে অসন্তোষ দানা বাঁধছিল। আমিও নিজেকে সেই বৃহত্তর প্রস্তুতির অংশ বলে মনে করি। অল্প কথায় বলতে গেলে, ২০১৮ সাল থেকে ধীরে ধীরে সচেতনভাবে বাংলাদেশে প্রচলিত প্রতিক্রিয়াশীল আধ্যাত্মিক ধারার শিল্পচর্চা বা সাংস্কৃতিক রাজনীতির সমস্যাজনক পথ থেকে নিজে সরিয়ে, জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হতে থাকে। সব কিছু যে কাঁটায় কাঁটায় পরিকল্পনা করে হয়েছে এমন না। প্রথমে সাদা কাগজে কালি ব্যবহার করে আঁকলেও ২০২০ সাল নাগাদ কারিগরি প্রয়োজনে ডিজিটাল মাধ্যমে ‘রাষ্ট্র যন্ত্রণা’ সিরিজটা চালিয়ে যেতে থাকি। কারণ, কাগজে কালি ব্যবহার আঁকার পিছনে মনে হচ্ছিল আমার নিজের মধ্যেই একটা হায়ারার্কি বা শ্রেষ্ঠত্ববাদী পজিশন কাজ করছে। নতুন জমানার প্রযুক্তি বা টুলসগুলি কেন ব্যবহার করব না! এটা স্নবারির লক্ষণ হিসাবে নিজের সামনেই এসে দাঁড়ায়।
আমি মূলত পোস্টার ডিজাইন করি না। সবগুলিই ড্রয়িং। যেখানে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অপারাপর দেশগুলিতে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যানার, ফেস্টুন, সিনেমার প্রচারণার বিভিন্ন চিত্র, বিজ্ঞাপন, পণ্য সামগ্রীর প্যাকেজিং, ডিজিটাল পরিসরের মিম সংস্কৃতি ইত্যাদি থেকে অকাতরে এস্থেটিকাল বা নান্দনিক অনুপ্রেরণা সংগ্রহ করেছি। বাংলা ভাষা এবং মানুষের মুখের ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে নয়, বরং রং ও রেখার মতই শিল্পের উপাদান বা কাঁচামাল হিসাবে বিচার করেছি। এভাবেই সিরিজটা চলতে থাকে, প্রতিদিন আঁকা এবং প্রায় প্রতিদিন সোশাল মিডিয়ায় প্রচার করার সিদ্ধান্ত নিই। লক্ষ্য একটাই ছিল, প্রতি মুহূর্তে যে কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে সাংস্কৃতিক বিষয়াদি নিয়ে দুই গোত্রে ভাগ হয়ে মারামারির প্রবণতা, তাকে পাশ কাটিয়ে সকল চিন্তা-কল্পনাকে রাষ্ট্র ক্ষমতার দিকে ঠেলে দেয়া। রাষ্ট্রকে সম্বোধন করে বহু মানুষের কল্যাণ এবং মুক্তিকে কল্পনা করে অবিরাম পথ খোঁজার চেষ্টাটাই জ্ঞানে-অজ্ঞানে কাজ করেছে। এভাবে নতুন নতুন বিষয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়। ডেঙ্গু মশার হয়রানি, ব্যাংক কেলেঙ্কারি, অর্থ পাচার, ট্র্যাফিক জ্যাম, লোডশেডিং ইত্যাদি অ-শৈল্পিক বিষয়াদিকে সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে সরিয়ে এর রাষ্ট্রীয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক পূর্বশর্তের দিকে নজর ফেরানোর সুযোগ খুঁজতে থাকি। সেই অবিরাম পথ খোঁজা এখনো জারি আছে। একটু বিস্তৃত পরিসরে প্রস্তুতি থাকার কারণে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপের সঙ্গে পরিচয় এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে কিছুটা অন্তরঙ্গ সংযোগ থাকার কারণে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরুর দিকেই আমার রেসপন্স করতে বেগ পেতে হয়নি। পরে এই ছাত্র আন্দোলন বৃহত্তর গণঅভ্যুত্থানের রূপ নিলে আমার কিছু কাজ হয়তো গণমানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ভাষা দিয়েছে। বহু মানুষের বহু প্রকারের কর্মতৎপরতার একটা অংশ হিসাবে আমার কাজও ছিল। এই যা।
ভারতের, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই শুরুতে গণঅভ্যুত্থানকে সমর্থন করেছিলেন৷ কিন্তু তারপর হিন্দুদের উপর সাম্প্রদায়িক হামলা, শেখ মুজিবের মূর্তি সহ বিভিন্ন ভাস্কর্য ভাঙা ইত্যাদিতে তাঁরা উদ্বিগ্ন। অনেকে মনে করছেন আন্দোলন জামাতে ইসলামির হাতে চলে গিয়েছে। আপনার কী মত?
শান্তিপূর্ণ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে খুনি হাসিনা রাষ্ট্র যন্ত্র, খুনি বাহিনী, পেটোয়া ছাত্রলীগ বেশুমার খুন জখম চালিয়ে যাচ্ছিল। বাংলাদেশিদের এমন কঠিন এবং দুর্বলতম সময়ে ভারতের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের যেসব রাজনৈতিক দল, গণতন্ত্রকামী শক্তি এবং অগণিত ব্যক্তিবিশেষ বাংলাদেশের পাশে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন তাদের ধন্যবাদ দিয়ে আমরা ছোট করতে যাব না। কারণ এই সংযোগ ঐতিহাসিক। নতুন কিছু না। ইন্টারনেট ব্ল্যাক আউটের সময় আপনারা যেভাবে নিপীড়ন হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে গিয়ে বাংলাদেশের জনগণের পাশে ছিলেন, প্রকৃত বন্ধুর কাজ এটাই। শুধু বলছি বাংলাদেশের জনগণ আপনাদের ভুলে নাই, ভুলবে না। জালিম, জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের যে একাত্মতা তৈরি হয়েছে তাতে আমরা প্যান সাউথ এশিয়ান অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট মুভমেন্ট গড়ে তুলতে পারব।
পৃথিবীর আর সব মানুষ এবং অভ্যুত্থানের ইতিহাস থেকে বাংলাদেশকে আলাদা করে বিচার করাটা অন্যায্য হবে। আমরা সবাই জানি, আওয়ামী লীগ গত ১৫ বছরের সকল প্রকার গুমখুন, চুরি, বাটপাড়ি, ভয়ের রাজত্ব তৈরির সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে সম্মতি উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করে আসছে মুক্তিযুদ্ধ এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে। ফ্যাসিস্ট আর ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ গিয়ে পড়েছে ফ্যাসিস্টের ব্যবহার করা এই ইমেজের উপর। বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে শেখ মুজিবুর রহমান এমনভাবে জড়িয়ে আছেন যে তাঁকে এড়িয়ে গিয়ে তো ইতিহাস লেখা যাবে না। উনি নানা কারণে বড় নেতা। বাংলাদেশের ইতিহাসের আর সব চরিত্রের মতন তিনিও যোগ্য সম্মান পাবেন। তাছাড়া এতদিনের মুক্তিযুদ্ধের ব্যবসার কারণে আমরা মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক ইতিহাস রচনা করতে পারি নাই। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রামকে বাক্সবন্দি করে ফেলা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধকে হাইজ্যাক করে আওয়ামী লীগ। বারবার আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা আমাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে চুরি করে নিজেদের আখের গোছাতে। বরং নিপীড়ন ঢাকতে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী কয়েকদিনের গণআক্রোশের দায় শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের। শেখ মুজিবের ইমেজের প্রতি মানুষের এই ক্ষোভের দায়ও তাদের।
একটা ব্যাপার খেয়াল রাখতে হবে যে এই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত শক্তি ছাত্র-জনতা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা নানা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বটে, তবে বহুদিন ধরে নিপীড়িত জনগণের সহ্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল বলেই তাঁরা রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। অকাতরে জীবন দিয়েছেন। কোন একক নেতা বা দলের অভ্যুত্থান এটা না। এই অভ্যুত্থানের তত্ত্বায়ন করতে আমাদের সময় লাগবে, তত্ত্বায়নের নতুন ভাষাও লাগবে। কোনো কেন্দ্রীয় দল বা নেতা না থাকায় অংশগ্রহণ যেমন স্বতঃস্ফূর্ত হয়েছে, ঠিক তেমন অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার শূন্যতার কারণে নানা বিশৃঙ্খলাও হয়েছে। সব পরিকল্পিত ছিল না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর দ্রুতই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে এবং দিনে দিনে পরিস্থিতি ভালর দিকেই যাবে। ভারত, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের, বন্ধুদের উদ্দেশ্য করে বলতে চাই, দয়া করে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যান্য গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের পাশে বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানকে রেখে পড়বেন। বাংলাদেশ বিশ্ব ইতিহাসের অংশ। বাংলাদেশিরাও মানব সন্তান, নক্ষত্রলোকের দেবাত্মা নন বা দানবও নন। মানুষকে মানুষের দোষগুণ মিলিয়েই বিচার করবেন। আমরা সব সহিংসতার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছি। আমরাও জানতে চাই এসব সহিংসতার পেছনে কারা জড়িত? এখানে সকলকে একটা বিষয় খেয়াল করতে বলব, ঢাকার মতন ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বা বাংলাদেশের মতন জনবহুল দেশে সাতদিন পুলিস ছাড়া কীভাবে বড় রকমের হানাহানি এড়ানো গেল? কালচারাল রেজিস্টান্সের দিকটাও জ্ঞানীগুণিদের ক্ষতিয়ে দেখতে বলব।
এই গণঅভ্যুত্থানের গড়ন, অংশগ্রহণের মধ্যে, আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে একক রাজনৈতিক সত্তা হিসাবে জামাতে ইসলামির সম্পর্ক নাই, তারা নেতৃত্বেও নাই। জামাতে ইসলামি বাংলাদেশে একটা ছোট রাজনৈতিক দল। বহুদিন ধরে কোণঠাসা। তাছাড়া বাংলাদেশে জামাতে ইসলামি ছাড়া আরও বহু ইসলামি ধারার, মতের, তরিকার দল বা সংগঠন আছে। তাদের সকলের মধ্যে যে খুব মিল-মহব্বত রয়েছে এমন না। এসব ব্যাপারে আপনাদের খোঁজ খবর রাখতে হবে। পাশের দেশের মানুষকে জানতে হবে। বাংলাদেশিদের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। আর জামাতে ইসলামির সমর্থকরাও বাংলাদেশের নাগরিক। তাঁরা অনেকে হয়ত এই আন্দোলনে রাস্তায় ছিলেন। সহিংসতা না করলে, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রিপাবলিকের আর সব নাগরিকের মতন তাঁদেরও নিজের মত প্রকাশ করার অধিকার আছে এবং বাকিদের অধিকার আছে সেসব রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার, অনিঃশেষ সংলাপে লিপ্ত হওয়ার।
শুধুই কি কোটা সংস্কারের দাবি এত বড় একটা গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে দিল? নাকি বহু বছর ধরে ক্ষোভ জমছিল, তারই বহিঃপ্রকাশ হল। একটু যদি আপনার মতামত শেয়ার করেন
আপনারা যদি অভ্যুত্থানের গতিপ্রকৃতিটা একটু পরীক্ষা করে দেখেন, তবে প্রাথমিক বিচারেই ধরা পড়বে যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সরকারি চাকরির জন্য ন্যায্য দাবিটা আন্দোলনের প্রাথমিক পরিসর তৈরি করেছে বটে, তবে দীর্ঘদিনের চলমান নিপীড়ন, চুরি, বাটপাড়ি, অর্থ পাচার, ভোট চুরি, বিচারহীনতা, গুমখুন ইত্যাদি সব শ্রেণি ও পেশার মানুষকে এক জায়গায় নিয়ে আসে। আপনারা জানেন যে, আওয়ামী লীগ সরকারগুলি এতদিন যে কোনো বিরোধী মতকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে এবং নিজেদের পেটোয়া বাহিনী ব্যবহার করে দমন করেছে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এবং এর বন্দোবস্তের অন্তর্গত কিছু মানুষ ছাড়া সবাই হয়ে উঠেছিল ‘বধযোগ্য প্রাণ’। কিছু হলেই এরা তুলে নিয়ে যায়। ছাত্রলীগের পেটোয়া বাহিনী লেলিয়ে দেয়। শেষ রাতে মাইক্রোবাসে করে লোকজন আসে, বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর কাউকে কাউকে খুঁজে পাওয়া গেলেও অনেককেই পাওয়া যায় নাই। একটা নজিরবিহীন ভয়ের রাজত্ব তৈরি হয়েছিল। পৃথিবীর আর কোথায় এমন মারণ রাজনৈতিক বন্দোবস্ত রয়েছে তা আমার জানা নাই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বেলাতেও আওয়ামী লীগ সরকার সেই আগের মতই রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগ করে, পেটোয়া ছাত্রলীগ লেলিয়ে দেয়। কিন্তু এইবার আর এই আন্দোলনকে ভয়ের শক্তি দিয়ে গিলে ফেলতে পারে নাই। ছাত্র-জনতা অকাতরে প্রাণ দিয়েছে। শুধু কোটা আন্দোলন দিয়ে এই ত্যাগ ব্যাখ্যা করা যাবে না। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রতিরোধ বা সাধারণ গরীব মানুষের প্রতিরোধের কারণটা আমরা সরকারি চাকরির প্রতি আকাঙ্ক্ষা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারব না। আপনার ইঙ্গিতটা ঠিকই আছে। জ্ঞানে-অজ্ঞানে জনমানুষের মধ্যে নাগরিক অধিকারের জন্য যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল সেটাই এই গণঅভ্যুত্থানের পূর্বশর্ত।
অনেকে এমন আশঙ্কা করছেন যে গণঅভ্যুত্থান বিপন্ন হতে পারে। সংবিধান বদল করা হয়নি৷ শেখ হাসিনার পুত্র বিভিন্ন কথা বলছেন৷ নৈরাজ্য এখনো চলছে। কী মনে হয়?
অনেকের মত আমরাও এই গণঅভ্যুত্থানের পূর্ণ বিজয়ের ব্যাপারে শঙ্কা বোধ করছি। তবে আমরা আশাবাদী। সংবিধান শুধু বদল না, কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি ডেকে সকল জাতি-ধর্ম-শ্রেণি-পেশা-লিঙ্গের, অর্থাৎ শুধু এলিটদের জন্য না, বরং গণমানুষের জন্য নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করতে হবে। এটাই এখন গণদাবি। একটা কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই এখন মূল লক্ষ্য। শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বাংলাদেশের গণমানুষের আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করে দেশে-বিদেশে নানা রকমের বিশৃঙ্খলা তৈরি চেষ্টা করছেন। দিল্লির হস্তক্ষেপ কামনা করে তাঁর বক্তব্য ভয়ঙ্কর, কাণ্ডজ্ঞানহীন।
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী কয়েকদিন কেন্দ্রীয় ক্ষমতা না থাকায়, পুলিস মাঠে না থাকায় বিশৃঙ্খলা হয়েছে। তবে আগে যেমন বলেছি, বাংলাদেশের মানুষ জাতিধর্ম নির্বিশেষে সামাজিক-সাংস্কৃতিক যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে তা নজিরবিহীন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত। কিন্তু হয় নাই। এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করায় এবং পুলিশ কাজে ফেরায়, নানা সামাজিক উদ্যোগ বিদ্যমান থাকায় বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না অগাস্টের ৩-৪ তারিখের হত্যাযজ্ঞে মূলত নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগের খুনি বাহিনী। পুলিশসহ অপরাপর বাহিনী ততদিনে ক্লান্ত হয়ে যায় এবং তাদের গোলা বারুদের ঘাটতি দেখা দেয় বলে আমরা শুনেছি। এই পরিস্থিতিতে ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের অপরাপর গুন্ডাদের হাতে নানা রকমের দেশি অস্ত্রশস্ত্রসহ অটোমেটিক মারণাস্ত্র তুলে দেয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর সেসব অস্ত্র ব্যবহার করে নানা রকম সহিংসতা চালানো হয়ে থাকতে পারে। তাছাড়া এই সুযোগের ব্যবহার করে থাকতে পারে নানা পক্ষ। এতদিন ধরে যারা নিপীড়িত হয়েছে তারা প্রতিশোধের জন্য সহিংসতা চালাতে পারে। আবারও বলছি, আমরা সব সহিংসতার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচারের দাবি জানাচ্ছি। এখানে একটা ব্যাপার খেয়াল করবার মত। আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগী শক্তির গুজব-ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ করতে গিয়ে বাংলাদেশের গণমানুষের মধ্যে একটা অভূতপূর্ব ঐক্য তৈরি হয়েছে। নিজেদের রক্ষা করার দায়িত্ব নিয়েছেন বিভিন্ন পাড়া-এলাকার মানুষেরাই। বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন ধর্মের মানুষজনকে আমরা দেখেছি রাস্তায় রাস্তায়। একটু খুঁজলেই এমন ছবি বা ভিডিও আপনাদের চোখে পড়বে। সামাজিক সৌহার্দ্য এবং যোগাযোগের নবায়ন হয়েছে। নতুন সামাজিক চুক্তির দিকে আমাদের নজর দেয়ার সময় এখন।

বাংলাদেশের রাজনীতির কাঠামোগত সংস্কার কী আদৌ হবে? নাকি অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার নির্বাচন হলেই এক জালিমের বদলে আরেক জালিম ক্ষমতায় আসবে?
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজনীতিই অনুদিত হয় রাজনীতির সংস্কৃতিতে। একটা অভ্যুত্থানের কারণে এক ধাক্কায় কাঠামোগত অনেক পরিবর্তন আনা গেলেও মতাদর্শিক জগদ্দল পাথরগুলি একদিনে সরানো সম্ভব না। এর জন্য বহুদিনের লম্বা বয়ান তৈরি করা বা বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ বিপক্ষের মধ্যে দীর্ঘ মেয়াদী সংলাপ ছাড়া এটা সম্ভব না। এ বিষয়ে সবিস্তারে বলার জায়গা এটা না। তবে আর কোনো স্বৈরাচার যাতে ভিন্ন নামে ভিন্ন চেহারায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে না পারে সেজন্য প্রাতিষ্ঠানিক-গঠনতান্ত্রিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। পরিবর্তন আসন্ন। এই বিষয়গুলি জনমানসে ক্রমেই মূর্ত, পরিচ্ছন্ন অবয়ব নিচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানের নগদ একটা পাওনা আছে, সেটা হচ্ছে গণরাজনৈতিক ধারা বিকশিত করবার সম্ভাবনা।
বাংলাদেশের হিন্দুদের কি কোনো নিজস্ব এজেন্সি তৈরি হচ্ছে? সংসদে আসন সংরক্ষণের বা দলিত কমিশন গঠনের দাবি উঠছে। একইসঙ্গে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানকে কীভাবে দেখছেন?
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠী হচ্ছে এই দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাহীন নিপীড়িত জনগোষ্ঠী। কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক এজেন্সি নাই। কর্তাসত্তা নাই। মোটের উপর আওয়ামী লীগের কাছে হিন্দু জনগোষ্ঠীর ভাগ্য ইজারা দেয়া আছে। অথচ পরিস্থিতি বদলে গেছে। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা না থাকার দিনগুলিতে, ৫ অগাস্টের পর, আমরা প্রথম দেখতে পাচ্ছি হিন্দু জনগোষ্ঠীর মানুষজন নিজেদের রক্ষার দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। সাধারণ মানুষসহ নানান ইসলামিক সংগঠন বা মাদ্রাসার ছাত্ররাও হিন্দুদের জানমাল-স্থাপনা রক্ষার জন্য এগিয়ে এসেছে। এমন বহু প্রমাণ আমাদের সামনে আছে। আমরা সকলেই জানতাম যে, খুনি হাসিনা গদি টিকিয়ে রাখতে এবং হিন্দুত্ববাদী বিজেপির বয়ানে ঘি ঢালতে বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর উপর নিপীড়ন চালাতে পারেন। গণঅভ্যুত্থানের আগেই এ বিষয়ে আমাদের সতর্কতামূলক প্রস্তুতি নেয়ার জন্য প্রচার চালাতে হয়েছে। আমরা তো কেউ জানতাম না যে এভাবে গণঅভ্যুত্থান হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী লোকজন হিন্দুদের উপর আক্রমণের চেষ্টা করেছেন, আক্রমণ চালিয়েছেন। তাছাড়া পূর্বশত্রুতা থেকে এক হিন্দু আরেক হিন্দুর ক্ষতি করতে চেয়েছেন। তাছাড়া বহু প্রভাবশালী হিন্দু এতবছর খুনি হাসিনার সহযোগী হয়ে নানান নিপীড়নের কাজ হাত লাগিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে যদি কারো ক্ষোভ থেকে থাকে তবে সেটাকে কি সংখ্যালঘুর উপর আক্রমণ বলা যায়? এখন বলবেন না যে আমি সহিংসতার পক্ষে কথা বলছি। পরিস্থিতিটা তুলে ধরছি। আবার বলছি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সকল সহিংসতার হোতাদের খুঁজে বের করতে হবে। বিচার করতে হবে। এখানে একটা কথা বলা ভাল। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যে বাংলাদেশ সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের বন্ধুদের কিছু ব্যাপারে ধারণা অপরিচ্ছন্ন। যোগাযোগহীনতাই হয়ত এর জন্য দায়ী। আপনাদের প্রতি আর্জি থাকবে, গত ১৫-১৬ বছরের আওয়ামী আমলে বাংলাদেশের হিন্দুসহ অপরাপর সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উপর চলা নিপীড়নের খোঁজ নেবেন। বেশি গভীরে না যেতে পারলেও শুধু ‘আইন ও সালিসকেন্দ্রের’ দেয়া হিসাবটা খুঁজে দেখবেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে হিন্দুদের সম্পত্তি দখল, মন্দিরে হামলা বা হুমকি-ধমকি বহাল তবিয়তে হয়েছে। বাংলাদেশের কালচারাল এলিটরা কখনো এসব সহিংসতার পেছনে আওয়ামী লীগ দলবলের যোগসাজশের ব্যাপারে টুঁ শব্দটাও করেন নাই। তাই হয়ত ভারতের বা পশ্চিমবঙ্গের কালচারাল এলিটদের কান পর্যন্তও পৌঁছায় নাই।

শেষ প্রশ্ন। অনেকের দাবি আপনারা, বাংলাদেশিরা ভারতবিদ্বেষী। কী বলবেন?
এমন দাবি আমরা অনেকদিন ধরেই শুনছি। এই বিদ্বেষের রকমফেরটা কেমন সেটা কি আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি? বিদ্বেষ কার প্রতি? জনগণ না রাষ্ট্র ক্ষমতা? বিদ্বেষটা কি সাম্প্রদায়িক? গত তিনটা নির্বাচনে বাংলাদেশের গণমানুষ স্রেফ গণঅপমানের স্বীকার হয়েছেন। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি ধ্বংস হয়ে গেছে। এতসব ব্লান্ডার করার পরও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারগুলি ভারতের রাষ্ট্র ক্ষমতাকে ম্যানেজ করতে পেরেছেন, বৈধতা আদায় করেছেন। বাংলাদেশের মানুষের গণচৈতন্যে এর প্রভাব যে ব্যাপকভাবে পড়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভারত নানাদিক থেকে পরাশক্তি। এই পরাশক্তির ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ বাংলাদেশের মানুষের সামনে উদগ্র রূপে হাজির হয়েছে। তাছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের করা নানান অসম চুক্তি, সীমান্তে নির্মম সহিংসতা বা নদীর জল নিয়ে গড়িমসি ইত্যাদি অসন্তোষ অনুদিত হয়েছে নানা প্রকারের বিদ্বেষমূলক ভাষায় নানা পরিসরে। এই ক্ষোভ ক্ষমতা সম্পর্কের অসম অবস্থার কারণে জন্ম নিয়েছে। একে সাম্প্রদায়িক অভিব্যক্তি হিসাবে দেগে দেয়া হবে সত্যের অপলাপ। আপনারা হয়ত খেয়াল করেছেন যে বাংলাদেশে চলমান হত্যাযজ্ঞের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক জনমত প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের মানুষ বারবার আর্জি জানিয়েছেন দেশভক্ত (আকাশ ব্যানার্জি) বা ধ্রুব রাঠির মতন ভারতীয় মিডিয়া ব্যক্তিত্বের কাছে। কারণ তাঁরা জানতেন যে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যম সত্য পরিস্থিতটা কখনোই তুলে ধরবে না। বাংলাদেশের মানুষের উপর চলা খুনি হাসিনার নিপীড়নের ব্যাপারে তথ্যচিত্র তুলে ধরবার পর বহু বাংলাদেশি তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। উলটো আমরা সবাই দেখেছি, ভারতের মূলধারার বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের ব্যাপারে হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীর মত ফেক নিউজ প্রচার করেছে। সংখ্যালঘু নির্যাতনের নামে বাংলাদেশের পুরো জনগোষ্ঠীকে ডিহিউম্যানাইজ করেছে। অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি, কলকাতার ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বাংলাদেশের মেয়েরা-নাগরিকরা রাস্তায় নেমেছেন। তাঁরা বাংলাদেশে চলা নারী নির্যাতনেরও বিচার দাবি করেছেন।
ভারত একটা বিশাল দেশ, একাট্টা সকলের সাথে বাংলাদেশের মানুষের বিদ্বেষ থাকার কোনো কারণ নাই। আর সম্পর্কটা শুধুমাত্র রাজনৈতিক না, সাংস্কৃতিকও বটে। রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের বাইরে ভারতের নানান রাজ্যের মানুষের সাথে বাংলাদেশের মানুষের ভাষিক-বুদ্ধিবৃত্তিক যোগাযোগ রয়েছে। স্বৈরাচারী দলকে সহায়তা বন্ধ করলে, ক্ষমতা সম্পর্কের অসম অবস্থার পরিবর্তন ঘটলে এবং পারস্পারিক শ্রদ্ধা নিশ্চিত করা গেলে ‘ভারতবিদ্বেষের’ কোন বৈষয়িক পূর্বশর্তই থাকবে না। আমরা ভারতের জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, গণরাজনৈতিক ধারা বিকাশের যে পথ বাংলাদেশের মানুষের সামনে তাতে আপনারা পাশে থাকুন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সৌহার্দ্যের নতুন অধ্যায় এখন আমাদের সামনে।
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







