উত্তরবঙ্গ কি সত্যিই বিজেপিশূন্য হয়ে যাচ্ছে? সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনের ফলাফল আপাতদৃষ্টিতে তেমন ইঙ্গিত দিলেও ভাবনাটা কি বাস্তবোচিত? আসুন একটু তলিয়ে দেখা যাক সদ্য ঘটে যাওয়া নির্বাচনের ফলাফলের নিরিখে। শিলিগুড়ি কর্পোরেশনসহ দার্জিলিং জেলা বাদে উত্তরবঙ্গের বাকি জেলাগুলোতে পৌর নির্বাচনের দলভিত্তিক ফলাফল এইরকম

কোচবিহার

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মোট আসন: ৬০; তৃণমূল – ৫৫, সিপিএম (বাম) – ২, নির্দল – ৩, বি জে পি – ০, কংগ্রেস – ০

প্রাপ্ত ভোট: তৃণমূল – ৫৫২৩৪ (৫৯.২০%), সিপিএম – ৯৬৮১ (১০.৩৮%) ফরোয়ার্ড ব্লক – ২৮৭৪ (৩.০৮%) কংগ্রেস – ২৪৭৪ (২.৬৫%) বিজেপি – ১৭৫৪৭ (১৮.৮১%)

 

জলপাইগুড়ি

মোট আসন: ৫৭; তৃণমূল – ৫২, সিপিএম (বাম) – ১, নির্দল – ১ বিজেপি – ১, কংগ্রেস – ২

প্রাপ্ত ভোট: তৃণমূল – ৬৩৩৫৬ (৫৮.১০%), সিপিএম – ১৫৩২১ (১৪.০৫%), ফরোয়ার্ড ব্লক – ৫৬৮ (০.৫২%), আরএসপি – ১০২৩ (০.৯৪%), কংগ্রেস – ১২০৭৫ (১১.০৭%), বিজেপি – ১৫৩৭৫ (১৪.০৫%)

 

আলিপুরদুয়ার

মোট আসন: ৩৮; তৃণমূল – ৩৪, সিপিএম (বাম) – ০, নির্দল – ৩ বিজেপি – ০, কংগ্রেস – ৩

প্রাপ্ত ভোট: তৃণমূল – ৫৫২৩৪ (৫৯.২০%), সিপিএম (বাম) – ৯৬৮১ (১০.৩৮%), ফরোয়ার্ড ব্লক – ২৮৭৪ (৩.৮%), আরএসপি – ০, কংগ্রেস-২৪৭৪ (২.৬৫%) বিজেপি – ১৭৫৪৭ (১৮.৮১%)

 

উত্তর দিনাজপুর

মোট আসন: ৪৯; তৃণমূল – ৩২, সিপিএম (বাম) – ১, নির্দল – ৮, বিজেপি – ৮, কংগ্রেস – ৩

প্রাপ্ত ভোট: তৃণমূল – ৪৭০৯৩ (৫০.০২%), সিপিএম – ৪৭৩৮ (৫.০৩%), ফরোয়ার্ড ব্লক – ০%, আরএসপি – ০%, কংগ্রেস-২৭৬৫ (২৩.৯৪%), বিজেপি – ২৬৩৩১ (২৭.৯৭%)

 

দক্ষিণ দিনাজপুর

মোট আসন: ৪৩; তৃণমূল – ৪১, সিপিএম (বাম) – ১, আরএসপি – ১, নির্দল – ০, বিজেপি – ০, কংগ্রেস – ০

প্রাপ্ত ভোট: তৃণমূল – ৫৩৩৪৪ (৫৭.৩৩%), সিপিএম – ৭৯৭৭ (৮.৫৭%%) ফরোয়ার্ড ব্লক – ০%, আরএসপি – ১১৯৬১ (১২.৮৬%), কংগ্রেস – ৩৭১ (০.৪০%), বিজেপি – ১৮৫৫৭ (২০.২৭%)

 

মালদা

মোট আসন: ৪৯; তৃণমূল – ৪২, সিপিএম (বাম) – ০, আরএসপি – ১০, নির্দল-২, বিজেপি – ৫, কংগ্রেস-০

প্রাপ্ত ভোট: তৃণমূল – ৯২৬১৬ (৫৩.৮৪%), সিপিএম – ১৩২৫৭ (৭.৭১%), ফরোয়ার্ড ব্লক – ০%, আরএসপি – ৯৪৮ (০.৫৫%), কংগ্রেস-৫৯৭২ (৩.৪৭%), বিজেপি – ৪৪২২৬ (২৫.৭)

শিলিগুড়ি কর্পোরেশন নির্বাচনের ফলাফলও প্রায় একইরকম। আরও অবাক করার মত, যে নিশীথ প্রামাণিকের এলাকার দিনহাটা পৌরসভা শাসক দল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছে। বিজেপি সেখানে সামান্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। তার আগেই অবশ্য দিনহাটা বিধানসভা উপনির্বাচনে জেতা আসন লক্ষাধিক ভোটে হেরেছে বিজেপি। এমনকি শিলিগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক কর্পোরেশন নির্বাচনে নিজের জেতা ওয়ার্ডে তৃতীয় হয়েছেন।

অথচ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি উত্তরবঙ্গে মাত্র দশ মাস আগে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে ছিল সমানে সমানে টক্কর। মুর্শিদাবাদ জেলা বাদ দিলে মালদা পর্যন্ত বিজেপির বিধায়ক সংখ্যা ৩০। অর্থাৎ রাজ্যের ৭৭ জন বিজেপি বিধায়কের মধ্যে ৩০ জনই উত্তরবঙ্গের। সেখানে পৌর ভোটে বিজেপির ধস নেমেছে। স্বাভাবিক প্রশ্ন, হঠাৎ কেন এমন হল? এর কারণ কি শুধুই শাসকের ভোট সন্ত্রাস? শাসকের সামাজিক প্রকল্প, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, দুয়ারে সরকারের কেরামতি, নাকি বিজেপির নিজের ব্যর্থতা? আতস কাচে দেখলে শাসকের সন্ত্রাসের চেয়ে বিজেপির ব্যর্থতাই প্রকট হয়ে উঠছে।

গত কয়েক বছরের বাংলায় বিজেপির শ্রীবৃদ্ধির অন্যতম কারণ আরএসএসের উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং হিন্দু-মুসলিম বৈরিতা। সারা দেশে গত কয়েক বছরে বিজেপিকে মানুষ সাধারণত ভোট দিয়ে এসেছে হিন্দুরাষ্ট্র চেয়ে, বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির চেয়ে। বিজেপি ভোটাররা পাকিস্তানকে জব্দ করতে, মুসলমানদের দমন করার বাসনায় ভোট দিয়েছিলেন। বিজেপি ক্যাডারভিত্তিক দল হলেও নীচুতলায় সংগঠনহীন। এই রাজ্যে ভোট পেয়েছিল “আব কি বার মোদী সরকার” স্লোগান। নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী দেখতে চেয়েই মানুষ ভোট দিয়েছিলেন। বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক আসলে আবেগভিত্তিক। এই আছে, এই নেই।

কিন্তু গত বিধানসভা নির্বাচনে প্রায় সরকার তৈরি করে ফেলা বিজেপি ২ মে-র পর থেকে একেবারে অন্য চেহারায়। যাঁরা বিধায়ক হয়েছেন তাঁদের অধিকাংশই সামাজিক জীবন বা চলমান রাজনীতির সাথে সম্পর্কহীন। হঠাৎ এসেছেন, জিতেছেন। এঁদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি রাজনীতি নেই। ভেবেই নিয়েছিলেন সরকার হয়ে গেছে, কিন্তু ব্যর্থতার পরেও যে রাজনীতি থাকে তা এঁরা জানেন না। তাই বর্তমানে উত্তরবঙ্গে বিজেপি বিধায়কদের উপস্থিতি চোখে পড়ে না। বুথস্তরের কর্মীদের সাথে যোগাযোগ নেই। দলীয় আন্দোলন, কর্মসূচি উত্তরবঙ্গে হয় না বললেই চলে। পৌর নির্বাচনের পরে দলের ডাকা বনধ সফল করতে সামান্যতম প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। রাস্তায় নেমে বনধ সফল করা তো দূরের কথা, সামান্য মাইক প্রচার পর্যন্ত করতে পারেনি বিজেপি।

পরিস্থিতি এমন যে প্রকাশ্যে “বিজেপি করি” বলার সাহসটুকুও যেন হারিয়ে গেছে। উত্তরবঙ্গ বিজেপির কর্মীদের মধ্যে ভয় কাজ করছে। শাসক দলের চাপা সন্ত্রাস, হুমকি তো আছেই। বিজেপি কেন, অন্য যে কোনো বিরোধী দল করলে বাংলায়, উত্তরবঙ্গে এখন মানুষের জীবন জীবিকার সমস্যা দেখা দিচ্ছে। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। হয় তৃণমূল করো, না হয় মুখ বন্ধ করে থাকো, অন্য দল করা যাবে না। এটা যেমন কারণ, তেমনই এর বিরুদ্ধে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের গুটিয়ে যাওয়াটাও আশ্চর্যজনক। অনেকে বলছেন এর পিছনে আছে অন্য সমীকরণ।

আরএসএস এখন ভাবছে বিজেপি নয়, বাংলায় তাদের এজেন্ডা সফল করতে পারে তৃণমূলই। তাই তৃণমূলের বিজেপিকরণ হচ্ছে। একের পর এক বিজেপি বিধায়ক, নেতা তৃণমূলে যোগ দিচ্ছেন। ফলে বিজেপির মধ্যে তৃণমূলের প্রতি বিদ্বেষ নেই বললেই চলে। গত বিধানসভায় যে বিজেপি কর্মী ছিল, এখন সে তৃণমূলের বুথ স্তরের মাতব্বর। এইভাবে আস্তে আস্তে বিজেপি উত্তরবঙ্গে ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে।

যে রাজবংশী ভোটব্যাঙ্ক কিছুদিন আগেও বিজেপির শক্তি ছিল, তা-ও এখন ক্ষয়িষ্ণু। পৃথক কামতাপুর রাজ্যের স্লোগান, পৃথক উত্তরবঙ্গ রাজ্য, গ্রেটার কোচবিহার আন্দোলন — এসবের পিছনে বিজেপির সক্রিয় ইন্ধন ছিল। কিন্তু এই আন্দোলনের যাঁরা হোতা, তাঁরা বুঝতে পারছেন যে বিজেপির লক্ষ্য তাদের ভোট, জাতিসত্তার আন্দোলনে পাশে থাকা তাদের উদ্দেশ্য নয়। একই কথা বলা যায় মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক সম্পর্কেও। সিএএ কার্যকর না হওয়ায় একচেটিয়া বিজেপি ভোটার মতুয়াদের মধ্যে বিজেপি সম্পর্কে মোহভঙ্গ হচ্ছে। সব মিলিয়ে বিজেপি এখন ছন্নছাড়া।

বিজেপি যেখানে শেষ করছে, উত্তরবঙ্গে বামেরা সেখান থেকেই আরম্ভ করার চেষ্টা করছে। ২ মে-র পর কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দিনহাটা, রায়গঞ্জ — একাধিক জায়গায় রেড ভলান্টিয়ার্স পথে নেমেছে। পৌর নির্বাচনে অধিকাংশ পৌরসভায় জোটহীন বামফ্রন্ট আলাদাভাবে প্রার্থী দিয়েছে। বিজেপি কখনোই স্থানীয় ইস্যু, পাড়ার ড্রেন, আলো, এসব নিয়ে রাজনীতি করে না। বামেরা সেখানে যতটা সম্ভব এই সমস্ত স্থানীয় ইস্যু তাদের প্রচারে তুলে এনেছে, কিছুটা সফলও হয়েছে। এখন আর বামেদের রক্তক্ষরণ কথাটা বলা যাবে না। উত্তর দিনাজপুর জেলা বাদে উত্তরবঙ্গের প্রায় সমস্ত জেলায় বামেদের ভোট প্রাপ্তি বিজেপির সমান সমান। কোথাও সামান্য কম, কোথাও সামান্য বেশি। যেমন বালুরঘাট পৌরসভায়, বিজেপির রাজ্য সভাপতির নিজের শহরে, বিজেপি একটা ওয়ার্ডও জিততে পারেনি, কিন্তু বামেরা দুটো ওয়ার্ড জিতেছে। শুধু তাই নয়, ভোটপ্রাপ্তিতে বামেরা বিজেপির সমান। অথচ দক্ষিণ দিনাজপুরের সাংসদ বিজেপির, মোট ছটা বিধানসভার মধ্যে তিনটে বিজেপির। বালুরঘাট শহরের বিধায়ক বিজেপির। উত্তরবঙ্গে অনেক পৌরসভায় বিজেপি সমস্ত আসনে প্রার্থীও দিতে পারেনি। ডালখোলা পৌরসভায় ১৬টা ওয়ার্ডের মধ্যে বিজেপি প্রার্থী দিয়েছিল সাতটা ওয়ার্ডে। বামেদের আস্তে আস্তে শ্রীবৃদ্ধির লক্ষণ দেখা গেলেও, বিজেপির ভোট চলে যাচ্ছে তৃণমূলের ঘরে।

কংগ্রেস উত্তরবঙ্গে ক্রমশ জমি হারিয়ে অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। এই পৌর নির্বাচনে কিছু পকেটে ব্যক্তিগত প্রভাবে কিছু ভোট পেলেও. সুস্থতার কোনো লক্ষণ নেই। তাহলে উত্তরবঙ্গে শাসকের বিরোধী কে? বিজেপি না বাম? আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বলা যায় উত্তরবঙ্গ বিরোধীহীন। একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। বিজেপি ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে, আরও পিছোবে। এখন দেখার বাম দলগুলো সেই জায়গা নিতে পারে কিনা। এক্ষেত্রে বামেদের প্রধান সমস্যা, উত্তরবঙ্গ জুড়ে রাজবংশী, মতুয়া এবং অবশ্যই সংখ্যালঘু শ্রেণির মধ্যে তাদের প্রতি আস্থার অভাব।

তাহলে কি বিজেপি হারিয়েই যাবে? ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে উত্তরবঙ্গে? এমন কথা বলার সময় কিন্তু এখনো আসেনি। বিজেপির মতাদর্শ অনেকটা ভাইরাসের মত। আপাতত লুকিয়ে আছে, কালকেই ফিরতে পারে বীরবিক্রমে, যে কোনো সময় যে কোন ঢেউ আসতে পারে। আবার হয়ত “আব কি বার মোদী সরকার” স্লোগানে, হিন্দুরাষ্ট্রের ধুয়ো উঠলেই ভরে উঠবে বিজেপির উত্তরবঙ্গ ভোটের ঝুলি। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সাথে পেরে ওঠা বড় কঠিন। আজ বাবুল সুপ্রিয়, জয়প্রকাশ মজুমদার, মুকুল রায়রা দলে দলে বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে ফিরছেন। আগামী লোকসভা নির্বাচনের সময়ে হয়ত দেখা যাবে জার্সি বদল করে তৃণমূলের স্ট্রাইকার বিজেপির হয়ে খেলতে নেমেছে।

মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

পৃথক উত্তরবঙ্গ রাজ্য: ইতিহাস ও সম্ভাবনা

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.