প্রতীপ নাগ

বাম শিবির সরগরম। সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য, পাল্টা মন্তব্য, বিতর্ক, শ্লেষ, কটাক্ষের ছড়াছড়ি। প্রসঙ্গ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধী পক্ষের প্রার্থী, হালে তৃণমূল সাংসদ, সাবেক অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের অর্থমন্ত্রী যশোবন্ত সিনহাকে কমিউনিস্টদের সমর্থন। যশোবন্তের পুত্র জয়ন্ত আবার ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগ কেন্দ্রের বিজেপি সাংসদ। এ হেন প্রার্থীকে ব্র‍্যাকেট ছাড়া, ব্র‍্যাকেটে এম, ব্র‍্যাকেটে এমের সঙ্গে এল – সব কমিউনিস্ট পার্টিই সমর্থন জানিয়েছে।

ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিমূর্তি হিসাবে তিন কমিউনিস্ট দলের সার্টিফিকেট পাওয়া মানুষটিৎ ১৬ এপ্রিল ২০১৪ তারিখে নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে মন্তব্য একবার দেখে নেওয়া যাক। তিনি হেডলাইন্স টুডেকে বলেছিলেন, মোদী ২০০২ সালের গুজরাটের ঘটনাবলীর জন্য ক্ষমা না চেয়ে ঠিকই করেছেন। “Modi is right… why should he apologise? A 12-year-old issue is being constantly revived to corner Modi whereas the people of this nation have completely forgotten it! It has lost all its momentum.”

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

২০১৪ সালে তো বটেই, ২০১৯ সালে মোদি দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে আরও বেশি করে বামপন্থী দলগুলো তো বটেই, অনেক অ-বিজেপি দলও বিজেপিকে ফ্যাসিস্ট বলে আখ্যায়িত করে। যদিও আক্রমণের সূচীমুখ হওয়া উচিত বিজেপি-আরএসএস-সংঘ পরিবার, অবাম বিরোধী দলগুলো আরএসএসের কথা বলে না। অধিকাংশ বামপন্থী দল আবার ফ্যাসিবাদ শব্দটি ব্যবহার করে অনিশ্চিতভাবে। তাদের অনেকের কাছে সবরকম স্বৈরতন্ত্রই ফ্যাসিবাদ। যেমন ১৯৭০-এর দশকে ইন্দিরার স্বৈরতন্ত্রকে আধা-ফ্যাসিবাদ বলেছিল সিপিএম সহ বেশ কিছু বাম দল। আর এসইউসিআই (সি) সহ কিছু বাম দল বুর্জোয়া শাসকমাত্রেই ফ্যাসিবাদী বলে চিহ্নিত করে। ফ্যাসিবাদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এই প্রবন্ধে নেই। অতি সংক্ষেপে ফ্যাসিবাদ ধনতন্ত্রের অবনতির পর্বে সৃষ্ট এক রাজনৈতিক সত্তা, যা উগ্র দক্ষিণপন্থী গণআন্দোলন, জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ এবং কাল্পনিক শত্রু নির্মাণের উপর দাঁড়িয়ে। এর ভিত্তি প্রধানত পেটি বুর্জোয়া আর প্রলেতারিয় ও বুর্জোয়া শ্রেণির মাঝের বিবিধ গোষ্ঠীগুলো। ফ্যাসিবাদ জন্মসূত্রে বড় বুর্জোয়াদের দ্বারা সৃষ্ট নয়।

সাধারণভাবে, বুর্জোয়া শাসনের সবচেয়ে সুবিধাজনক রূপ হল বুর্জোয়া গণতন্ত্র। কারণ নিয়মিত নির্বাচন, সরকার পরিবর্তন, সংস্কার প্রভৃতির মাধ্যমে এই ব্যবস্থা বারবার সামাজিক উত্তেজনা প্রশমনে সহায়ক এবং উচ্চশ্রেণির এক বড় অংশ এই ব্যবস্থায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতা পেয়ে থাকে। কিন্তু এই ধরণের বুর্জোয়া শাসন ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নির্ভর করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর এক বিশেষ ভারসাম্যের উপর। একবার সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলে বড় বুর্জোয়ারা তাদের ঐতিহাসিক স্বার্থ রক্ষা করতে ফ্যাসিবাদের উপর নির্ভরশীল হয়।

ভারতের ক্ষেত্রে বিশ্বায়নের সূচনা পর্বে ভারতীয় বুর্জোয়া শ্রেণি কংগ্রেসের উপরেই বেশি ভরসা রেখেছিল। রাজীব গান্ধীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় থেকেই নয়া উদারবাদী অর্থনীতি চালু হয়। অন্য দিকে, এই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের পতন, ধনতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা সার্বিকভাবে শ্রমিকশ্রেণিকে বিপন্ন করে তোলে। নেহরুবাদী আধিপত্যের (hegemony) বিপরীতে নয়া-উদারবাদী আধিপত্যের সূচনা হয়। লক্ষণীয়, এই সময়েই সংসদের ভিতরে বিজেপির শক্তি এবং বাইরে আরএসএস-সংঘ পরিবারের শক্তি বাড়তে থাকে। এর কয়েক বছরের মধ্যেই বাবরি মসজিদ ধ্বংস। এক দশকের মধ্যে কার্গিল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রচার।

২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকট সরাসরি এই দেশের সংকট না হলেও তার আঁচ এসে পড়ে ভারতেও। দেশিয় বড় পুঁজির মুনাফা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষমতা অর্জন এবং বিদেশি পুঁজির জন্য প্রয়োজন ছিল শ্রমিকের মজুরি কমানো, কঠোর শর্ত চাপানো। ইউপিএ-২ সরকার ছিল চরম দুর্নীতিগ্রস্ত। অন্যদিকে ২০১০ সাল থেকে বারবার সাধারণ ধর্মঘট হয়েছে। ২০১৪ সালে বিশ্বের বৃহত্তম সাধারণ ধর্মঘট হয়। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে পারেনি। পুঁজিপতিরা ভাইব্র্যান্ট গুজরাটে মোহিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদীকে পছন্দ করতে শুরু করে।

এই পরিস্থিতে ভারতীয় বুর্জোয়ারা ফ্যাসিবাদকে মেনে নেয়। তাতে অবশ্য তাদের অনেকটা রাজনৈতিক ক্ষমতা হারাতে হয়। ফ্যাসিবাদী সমাধান হল শ্রেণির পরিবর্তে জাতীয়তার ভিত্তিতে পাল্টা গণসমাবেশ করা। ফ্যাসিবাদীরা শ্রমিকশ্রেণিকে কেবল পরাস্ত করতে চায় না, তাদের শ্রেণিচেতনাকেও ধ্বংস করতে চায়। তাদের সব ধরনের সংগঠন ভেঙে দিতে চায়। এ কাজ শুধু পুলিশ বা অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দিয়ে করা হয় না, করা হয় বিকল্প মতাদর্শ এবং সমাজের তলার অংশ থেকে গণসন্ত্রাসের সমন্বয়ে। একদিকে অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে শ্রমিকশ্রেণির লড়াইয়ের মানসিকতা বৃদ্ধি পেটি বুর্জোয়া ও অন্তবর্তী শ্রেণিগুলোকে ভীত করে তোলে। ফলে ফ্যাসিবাদী শক্তি কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতা দখল করে।

এখন প্রশ্ন হল, এই ফ্যাসিবাদকে ঠেকানোর উপায় কি? নির্বাচনে বিজেপিকে পরাস্ত করলেই ফ্যাসিবাদ পরাস্ত হবে, নাকি ফ্যাসিবাদের পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ পরিবর্তনও প্রয়োজন?

গত শতাব্দীর তিরিশের দশকের ফ্যাসিবাদের সাথে আজকের ভারতের ফ্যাসিবাদের পার্থক্য আছে। সেই সময়কার জার্মানি বা ইতালির তুলনায় ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্র সমাজের অনেক গভীরে প্রোথিত। ভারতে শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন তৎকালীন জার্মানির তুলনায় অনেক নীচু স্তরে রয়েছে। আর হিন্দু সাম্প্রদায়িক তাস স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে কংগ্রেসও বারবার খেলেছে। এমনকি, ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী নিশ্চুপ ছিলেন।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম হল সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের, শ্রমিকশ্রেণির মুক্তিসংগ্রামের একটি অংশ। অতএব ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রামের এক স্বতন্ত্র গতি থাকলেও, তাকে সমাজতন্ত্রবিরোধী ভাবার কোনো কারণ নেই। তাই ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামকে শ্রেণিহীন বা বহু শ্রেণিভিত্তিক কাঠামোতে দেখা যায় না। রাহুল গান্ধী, শারদ পাওয়ার, মমতা ব্যানার্জি, তেজস্বী, অখিলেশ, কেজরিওয়ালদের সঙ্গে বিপ্লবী শ্রমিকদের নিয়ে কোন ফ্যাসিবিরোধী জোট করা সম্ভব নয়। বস্তুত, বুর্জোয়া দলগুলো দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা কেউই মৌলিকভাবে ফ্যাসিবিরোধী নয়। জার্মানি ও ইতালির ইতিহাসের শিক্ষা ভারতীয় অভিজ্ঞতাকে সমর্থন করে। উদাহরণ বাড়িয়ে লাভ নেই। হিটলারের উত্থানের সময়ে জার্মানির ওয়াইমার রিপাবলিকের বুর্জোয়াদের কার্যকলাপ আমাদের সকলের জানা। বাবরি মসজিদের ভিতরে রামলালার আবির্ভাব, তালা খুলে যাওয়া থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালে পশ্চিমবাংলায় রামনবমী ও হনুমান পুজো নিয়ে প্রতিযোগিতা এসবের উদাহরণ। আর অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে শ্রমিকশ্রেণির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে তো কংগ্রেস, বিজেপির মধ্যে কোন পার্থক্যই নেই।

এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যশোবন্ত সিনহাকে সমর্থনের বিষয়টি দেখা উচিত। আজ পরিস্থিতি এমন, যে বুর্জোয়া দলগুলো একজন বুর্জোয়া, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ব্যক্তিকে খুঁজে পেল না বিরোধী প্রার্থী হিসাবে। সংঘের আধিপত্যকে স্বীকার করল। আর তিন কমিউনিস্ট দলের সাধারণ সম্পাদক তা নির্দ্বিধায় মেনে নিলেন।

কমিউনিস্টদের নির্বাচনী অভিমুখ কী হবে? শ্রেণিসংগ্রামকে শক্তিশালী করা, রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত ভিত্তিকে শক্তিশালী করা। বিজেপি-আরএসএস-সংঘ পরিবারের হিন্দুত্বের আধিপত্যের বিরুদ্ধে শ্রেণিসংগ্রাম অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে নারী, এলজিবিটি, আদিবাসী, দলিত, পরিবেশ আন্দোলনকে ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ে যুক্ত করা বেশি প্রয়োজন।

অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে এই আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না। ঝাড়খণ্ডে নির্বাচনে জিততে সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন বিধায়ক ও পলিটব্যুরোর সদস্য রামনবমীর অনুষ্ঠানে বিজেপির প্রাক্তন বিধায়কের সাথে একই মঞ্চে বসেও ফ্যাসিবিরোধী লড়াইকে মজবুত করতে পারবেন না।

আরো পড়ুন কেন আমরা ‘নো ভোট টু বিজেপি’ বলছি

২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে সিপিএমের একাংশ বিজেমূল তত্ত্ব খাড়া করেছিল। (যদিও বিজেপি একটি ফ্যাসিস্ট দল আর তৃণমূল স্বৈরাচারী, লুম্পেনদের দল) তাদের ভাষ্য মতে যশোবন্ত সিনহা, বাবুল সুপ্রিয়রা হলেন বিজেমূল। যশোবন্তকে সমর্থন আসলে স্বৈরাচারী, আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত, শ্রমিকশ্রেণি বিরোধী তৃণমূল প্রার্থীকে সমর্থন, যা পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকারবিরোধী লড়াইকে দুর্বল করবে। আখেরে লাভ হবে বিজেপির। একুশের গণরায়কে অবজ্ঞা করা হয়েছে বলে সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন ‘বাবুলকে ভোট নয়’ বলে প্রচার করেছিল। তারাই বা কী করে যশোবন্ত সিনহাকে সমর্থন করে?

সংসদীয় গণতন্ত্রে সাময়িক সাফল্যের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বাম আধিপত্য বেশি প্রয়োজন। দিশাহীন এই বাম দলগুলোর ঘুরে দাঁড়াবার জন্য অনেক বেশি জরুরি স্বাধীন অবস্থান নেওয়া, যা আমরা দেখেছিলাম ত্রিদিব চৌধুরী বা লক্ষ্মী সায়গলকে স্বাধীন বাম প্রার্থী হিসাবে দাঁড় করানোর মধ্যে।

আজ সংসদীয় ব্যবস্থায় বামেরা নেহাতই ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। সুতরাং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কাউকে সমর্থন না করলে কিছুই এসে যেত না। বরং জরুরি ছিল ফ্যাসিবিরোধী লড়াইকে জোরদার করতে শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বামদলগুলোর একেবারে নীচের তলা থেকে ঐক্যবদ্ধ লড়াই।

লেখক বামপন্থী গণআন্দোলন এবং শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক। মতামত ব্যক্তিগত

1 মন্তব্য

  1. আপনি কোথায় পেয়েছেন suci সব বুর্জুয়া দল কে ফ্যাসিস্ট মনে করে । যা ইচ্ছা তাই বললেই হলো

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.