ভারতের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি পদটি নেহাতই আলংকারিক; বিশেষ ক্ষমতা নেই। নীতি নির্ধারণের সমস্ত ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতি কেন্দ্রীয় আইনসভা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার উপর নির্ভরশীল। বিলকে আইনে রূপান্তরিত করতে গেলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর লাগে ঠিকই, কিন্তু বিল আইনসভায় ফেরত গেলে আইনসভা যদি তা ফের পাস করে, তবে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর ছাড়াই তা আইন হয়ে যাবে। কেন্দ্রে যদি একটি শক্তিশালী সরকার থাকে, তাহলে রাষ্ট্রপতির ফোঁসফাঁস করার ক্ষমতা থাকলেও ছোবল মারার ক্ষমতা একেবারেই নেই। বরং রাষ্ট্রপতিকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মোটের উপর সমঝোতা করেই চলতে হয়। না হলে প্রতি পদে অপদস্থ হওয়া ছাড়া অন্য কোনো ভাগ্য সংবিধানে লিপিবদ্ধ হয়নি। এ কথা ঠিক, যে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব হল ভারতের সংবিধানকে রক্ষা করা। কিন্তু এই গুরুদায়িত্ব পালন করার জন্য তাঁর হাতে অস্ত্র তো দূরের কথা, ধারালো নখ পর্যন্ত নেই। কেন্দ্রীয় আইনসভা যদি সংবিধান সংশোধন করতে পারে, তাহলে রাষ্ট্রপতি মহোদয়ের তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া অন্য কোনো কর্তব্যকর্ম নেই। বড়জোর তিনি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে তাঁর হৃদয়বিদারক অবস্থার বর্ণনা দিতে পারেন। তার বেশি কিছু নয়।

এহেন একটি পদে বিজেপি প্রার্থীকে হারানোর মরিয়া প্রচেষ্টায় বামপন্থী দলগুলির কংগ্রেস-তৃণমূল কংগ্রেসের মত দক্ষিণপন্থী দলগুলির লেজুড় হয়ে যশোবন্ত সিনহার মত একজন কট্টর সাম্প্রদায়িক, প্রতিক্রিয়াশীল, দলবদলু এবং ভাগ্যান্বেষী প্রার্থীকে সমর্থন করে বসাটা আমাদের দেশের বামপন্থী রাজনীতির পক্ষে বড়ই দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বর্তমান ভারতে আরএসএস-বিজেপির গৈরিক কর্পোরেট ফ্যাসিবাদই যে প্রধান বিপদ তাতে সন্দেহ নেই। সমস্ত ক্ষেত্রে বিজেপিকে পরাস্ত করা, সরকারি ক্ষমতা থেকে তাকে দূরে রাখা বামপন্থী তথা কমিউনিস্টদের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শুধু নয়, প্রধান কাজ। কিন্তু সেটা প্রযোজ্য কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে, রাজ্যগুলির বিধানসভা নির্বাচনে, এমনকি পঞ্চায়েত বা পৌরসভা নির্বাচনেও। যেখানে নির্বাচিত সংস্থাগুলির নীতি নির্ধারণ এবং পালন করার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও ক্ষমতা আছে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন একেবারেই প্রতীকী নির্বাচন। এখানে নির্বাচনের ফলাফলের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল কোন রাজনৈতিক বার্তাটি সমাজকে দেওয়া গেল। সেখানেই বামপন্থীরা একটি ভুল বার্তা দিলেন।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী), অর্থাৎ সিপিএম দলটির কার্যকলাপ তো অত্যন্ত বিস্ময়কর। অল্প কিছুদিন আগেই পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁরা বিজেপির বদলে আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য করে তুলেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসকে। এটা করতে গিয়ে তাঁরা যে তত্ত্ব আমদানি করেছিলেন তা হল আরএসএসের বাড়িতে বিজেপি এবং তৃণমূল দুটি ঘর মাত্র। “যাহা ছাপান্ন তাহাই নবান্ন”! বিজেপি যা তৃণমূলও তাই। দুটিই ফ্যাসিবাদী দল। ঘাসফুল না থাকলে গরুও থাকবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। এইসব তাঁরা বললেন এমন একটা নির্বাচনে যেখানে বিজেপিকে পরাস্ত করাটাই ছিল বিপুলভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের ফলাফলটাই ছিল সেখানে প্রধান। সেখানে তাঁরা এইসব করলেন। আর যে নির্বাচনে ফলাফলের থেকেও প্রতীকী মূল্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে তাঁরা কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে প্রাক্তন বিজেপি নেতা, অধুনা তৃণমূলী যশোবন্ত সিনহাকে সমর্থন দিলেন। লোকটির ছেলে এখনো বিজেপি বিধায়ক, লোকটি আদ্যন্ত সাম্প্রদায়িক, মননে-চিন্তায় আরএসএস, ক্ষমতালোভী, নীতিবর্জিত, অনির্ভরযোগ্য এবং ভাগ্যান্বেষী। বলিহারি বামপন্থা, বলিহারি রণকৌশল।

সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের রাজনৈতিক লাইনের মধ্যে তবু ধারাবাহিকতা আছে। কিন্তু যে দুটি বিষয় বুঝতে তাঁরা ভুল করছেন, তার মধ্যে প্রথমটি হল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের চরিত্র – যার কথা ইতিমধ্যেই বলেছি। আর দ্বিতীয় বিষয়টি হল ফ্যাসিবিরোধী যুক্তফ্রন্টে বামপন্থী তথা কমিউনিস্টদের কর্তব্য। এই বিষয়টি নিয়ে দু-এক কথা বলা দরকার। ঠিক কথাই, যে ফ্যাসিবিরোধী যুক্তফ্রন্টে অ-ফ্যাসিবাদী দক্ষিণপন্থী বুর্জোয়া দলগুলির সাথে কমিউনিস্টদের জোটবদ্ধ হবার দরকার পড়ে। কিন্তু একটি ব্যাপার এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যাসিবাদী দলগুলির উৎপত্তি এবং বিকাশ হয় প্রচলিত বুর্জোয়া দলগুলি পুঁজিবাদী তথা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থাকে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে না বলে। অর্থাৎ এক কথায়, অ-ফ্যাসিবাদী বুর্জোয়া দলগুলির ব্যর্থতার ফলেই ফ্যাসিবাদের উৎপত্তি হয়। তাই ফ্যাসিবাদকে ঠেকাতে গিয়ে কমিউনিস্টরা যখন ওই ব্যর্থ দলগুলির সঙ্গেই জোটবদ্ধ হয়, তখন জোটবদ্ধতার ফলে যদি আবার ওই ব্যর্থ বুর্জোয়া দলগুলিই শক্তিশালী হয়, ক্ষমতায় ফেরে এবং ফ্যাসিবিরোধী যুক্তফ্রন্টের নেতা হিসাবে প্রতিপন্ন হয়, তবে আগের নিয়মে ফের ব্যর্থতা (এক্ষেত্রে আরও বড় ব্যর্থতা) পুনরায় ফ্যাসিবাদকেই (আরও বড় আকারে) প্রতিষ্ঠিত করবে। সুতরাং ফ্যাসিবিরোধী যুক্তফ্রন্টের অর্থ বুর্জোয়া দলগুলির লেজুড়বৃত্তি করা নয়। যুক্তফ্রন্টে যাওয়ার প্রয়োজন থাকে, আবার নেতৃত্ব ছিনিয়ে নেবারও প্রয়োজন থাকে। খেয়াল করে দেখুন, বুর্জোয়া দলগুলিও কিন্তু তাদের দিক থেকে ঠিক তাই করে। তারা কমিউনিস্টদের সাথে যুক্তফ্রন্টে যায় বটে, কিন্তু নেতৃত্ব হাতছাড়া করে না। সুতরাং যুক্তফ্রন্ট মানে শুধু ঐক্য নয়, সংগ্রামও। একসাথে দুটোই।

আরো পড়ুন আরএসএসের পছন্দসই অগভীর বিরোধিতার মুখ শত্রুঘ্ন, বাবুল

ফ্যাসিবিরোধী যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্ব ছিনিয়ে নিতে গেলে কয়েকটি শর্ত পালন করার প্রয়োজন পড়ে। প্রথমত, কমিউনিস্টদের স্বাধীন অস্তিত্ব থাকতে হয়। ফ্রন্টও করতে হবে, আবার স্বাধীনও থাকতে হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যেহেতু ফলাফলের থেকেও বার্তা গুরুত্বপূর্ণ, তাই এখানে বামপন্থীদের ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে স্বাধীনভাবে দাঁড় করানো দরকার ছিল। শক্তি বর্তমানে সামান্য হলেও তার স্বাধীন অস্তিত্ব জ্ঞাপন করার এই তো ছিল সময়। বামপন্থী তথা কমিউনিস্ট পার্টিগুলি তা করতে ব্যর্থ হল। দ্বিতীয় শর্ত হল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বামপন্থীরাই যে সর্বাধিক নীতিনিষ্ঠ, তা জনগণের কাছে প্রমাণ করা, প্রতিষ্ঠা করা। তবেই ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রামের নেতা হিসাবে জনতার কাছে বামপন্থীদের তথা কমিউনিস্টদের গ্রহণযোগ্যতা থাকে। এদিক থেকেও যশোবন্ত সিনহাকে সমর্থন করে বামপন্থী দলগুলি নিজেদের অসহায়তাকেই প্রকট করে তুলল। চোয়াল শক্ত করে নীতির পক্ষে দাঁড়াতে পারল না। ফ্রন্ট হল ঠিকই, কিন্তু নেতৃত্ব থেকে গেল দক্ষিণপন্থীদের হাতে এবং আগামী দিনগুলিতেও থেকে যাবার সমস্ত সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়ে গেল।

স্বাভাবিকভাবেই পার্টিগুলির কর্মীবাহিনী হতাশ, বিভ্রান্ত এবং উদ্যমহীন হয়ে পড়বে। যার প্রতিক্রিয়ায় পার্টিগুলি আরও বেশি করে বুর্জোয়াদের লেজুড়বৃত্তি করতে বাধ্য হবে। স্বাধীন সত্তা অর্জন করা, প্রতিষ্ঠা করা এবং যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্ব দখল করার কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.