অর্ক মুখার্জি

বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রে এবার তৃণমূল ও বিজেপির হয়ে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ দুই প্রাক্তন স্বামী-স্ত্রী – সুজাতা মণ্ডল এবং সৌমিত্র খান। এঁরা বিবাহ বিচ্ছেদের পর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসাবে ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছেন। লড়াইয়ের ময়দানে আরও কয়েকজন থাকলেও বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী শীতল কৈবর্ত ছাড়া বাকি সবাই ফ্যাকাশে।

বিষ্ণুপুর নামটা শুনলেই এক মন্দির নগরীর কথা মনে পড়ে। বিষ্ণুপুর লোকসভার শাখা উপশাখা কিন্তু বর্ধমান জেলার খণ্ডঘোষ, এমনকি নদীর ওপারের গলসি অঞ্চলের কিছুটা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই লোকসভার সাতটা বিধানসভার মধ্যে ছটা বাঁকুড়া জেলার অন্তর্গত (বিষ্ণুপুর, কোতুলপুর, ইন্দাস, ওন্দা, সোনামুখী এবং বড়জোড়া)। অন্যটা বর্ধমান জেলার খণ্ডঘোষ। যাদবপুর লোকসভাকে যেমন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরের ছাত্রছাত্রীদের রাজনৈতিক অবস্থানগত পরিমণ্ডলের নিরিখে মাপতে যাওয়া ভুল, তেমনই বিষ্ণুপুর লোকসভাকে মন্দির নগরীর শহুরে রাজনৈতিক কৃষ্টিতে মাপতে যাওয়াও ভুল।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৯৬২ সালে এই লোকসভা কেন্দ্র গঠন করা হয়। প্রথমবার এখান থেকে সাংসদ হন পশুপতি মণ্ডল। পরেরবারও পুনর্নির্বাচিত হন। তারপর থেকে বাম দুর্গ হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে বিষ্ণুপুর। ১৯৭১ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত এখান থেকে সংসদে যান সিপিএম প্রার্থীরা। অজিত কুমার সাহাকে দিয়ে সিপিএমের জয়যাত্রা শুরু হয় আর শেষ হয় সুস্মিতা বাউরিকে দিয়ে, যিনি ২০০৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত বিষ্ণুপুরের সাংসদ ছিলেন।

২০০৯ সালে যখন বাংলা জুড়ে তৃণমূলের উত্থান হয়, তখন বারবার রাজনৈতিক হিংসার জন্য বিষ্ণুপুর লোকসভার অন্তর্গত কোতুলপুর, ইন্দাস, জয়পুর এবং পাত্রসায়রের নাম উঠে আসে। সিপিএমের গ্রাম দখলের রাজনীতি এবং তৃণমূলের প্রতিরোধের ফলে বারবার অশান্ত হতে থাকে এইসব এলাকা। সিপিএমের বাইরে থেকে আনা লোকজনের দাপটে অনেক তৃণমূল কর্মী সেইসময় এলাকা ছাড়া হন। সিপিএম গ্রামের দখল নিতে পারলেও এই ধরনের কার্যকলাপের ফলে জনবিচ্ছিন্ন হতে থাকে। পরবর্তীকালে সিপিএম স্থানীয় স্তরে কর্মীদের আগ্রাসী প্রতিরক্ষায় প্রশিক্ষিত করলেও ‘বাইরে থেকে আসা’ লোকেদের আতঙ্কে শান্তিপ্রিয় বাম সমর্থকরাও বিশেষ করে ২০১১ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল-কংগ্রেস জোটকে সমর্থন করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বিষ্ণুপুরে সভা করতে এসে সিপিএমের আমলের সেই অত্যাচারের স্মৃতি উস্কে দিয়েছিলেন। তার কিছুটা মিথ, অনেকটা সত্যি, কোনোটা আবার রাজনৈতিক প্রয়োজনে অতিরঞ্জিত। কিন্তু কিছু ঘটনা তো আছেই। চোখের সামনে হাতিয়ার হাতে অচেনা লোকজনকে মুখে কাপড় বেঁধে ঘুরতে দেখার স্মৃতি এখনো অনেকের মনে দগদগে।

২০১১ নির্বাচনে কোতুলপুর থেকে কংগ্রেস প্রার্থী ছিলেন অধুনা বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খান। তিনি জয়ী এবং ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূলে যোগদান করেন, লোকসভার টিকিট পান। এরপর তৃণমূলে তরতরিয়ে উত্থান, রাজ্যস্তরের যুব নেতাও হয়ে ওঠেন। কিন্তু ক্রমশ খেই হারিয়ে ফেলেন। পরে মুকুল রায়ের হাত ধরে তিনি ২০১৯ সালে বিজেপিতে যোগ দেন

২০১৯ নির্বাচনে তীব্র সন্ত্রাস এবং তৃণমূলের ভোট মেশিনারিকে কড়া টক্কর দিয়ে ৬,৫৭,০১৯ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূলের শ্যামল সাঁতরাকে ৭৮,০৪৭ ভোটে পরাস্ত করেন সৌমিত্র। সেই ভোটে আদালতের নির্দেশে বাঁকুড়া জেলার বিধানসভাগুলোতে সৌমিত্র ঢুকতেই পারেননি। তাঁর হয়ে প্রচার করেন তাঁর স্ত্রী (এখন প্রাক্তন) সুজাতা। ভোটে জেতার পর সৌমিত্র স্ত্রীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। সেই ভোটে বাঁকুড়া জেলার সবকটা বিধানসভায় এগিয়ে ছিলেন বিজেপি প্রার্থী। সবচেয়ে বেশি ভোট পান (১,০৬,৭৮৮) ওন্দা বিধানসভা এলাকায় এবং শুধু খণ্ডঘোষ বিধানসভায় পিছিয়ে ছিলেন।

২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে কিন্তু খণ্ডঘোষের সঙ্গে বড়জোড়াও সামান্য ব্যবধানে জিতে যায় তৃণমূল। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিষ্ণুপুরের বিজেপি বিধায়ক তন্ময় ঘোষ এবং পঞ্চায়েত ভোটের পর কোতুলপুরের বিধায়ক হরকালী প্রতিহার তৃণমূল কংগ্রেস যোগদান করেছেন। এই সমীকরণ অনুযায়ী সাত বিধানসভার চারটে তৃণমূলের (যদিও দলবদলু বিধায়করা আইনের মারপ্যাঁচ এড়াতে বিজেপি বিধায়ক হিসাবেই এখনো বিধানসভায় নথিভুক্ত) এবং তিন বিধায়ক বিজেপির।

আরো পড়ুন তৃণমূল না বিজেপি? একই অঙ্গে এত রূপ!

এই সমীকরণে তৃণমূলের স্বস্তিতে থাকা উচিত। কিন্তু তারা কি স্বস্তিতে আছে আদৌ? দুয়ারে সরকার, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী ইত্যাদি প্রকল্পের সুযোগসুবিধা নিয়ে প্রচারে নেমেছে তৃণমূল। কিন্তু দলের অন্দরে প্রার্থী বাছাই নিয়ে প্রশ্ন আছে। দৌড়ে ছিলেন বিজেপি থেকে আসা একজন বিধায়ক এবং তৃণমূলেরই আরেকজন বিধায়ক। সুজাতা তাঁদের টপকেছেন কিন্তু শেষ হার্ডলটা কি টপকাতে পারবেন? খণ্ডঘোষ থেকে তিনি কতটা লিড নিতে পারেন তার উপর অনেককিছু নির্ভর করছে। এছাড়া ওন্দা, সোনামুখী এবং বিষ্ণুপুরে তৃণমূল কেমন ভোট ‘করাতে’ পারবে তাও সুজাতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া জেলা জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন গোষ্ঠী সমীকরণ। কোন এলাকায় কারা সক্রিয় হবেন বা কারা নিষ্ক্রিয় থাকবেন, তার উপরেও অনেককিছু নির্ভর করছে। পঞ্চায়েত ভোটে কিছু ব্লকে মানুষকে ভোট দিতে দেওয়া হয়নি, বিশেষ করে দিন মজুরি করে খেটে খাওয়া ভোটারদের। তাই মানুষ যে খুব খুশি তাও নয়। সরকারি পরিষেবা নিয়ে অপ্রাপ্তির অভিযোগ তো আছেই। এছাড়া নিয়োগ দুর্নীতির প্রভাব পড়বে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত ভোটারদের উপর।

লোকসভার হিন্দুপ্রধান যে গ্রামগুলোতে খেটে খাওয়া মানুষের বাস, সেখানে বিজেপির রীতিমত প্রভাব রয়েছে। প্রান্তিক, অতি গ্রাম্য অঞ্চলে পতপত করে উড়ছে পতাকা। তৃণমূলের উপস্থিতিও আছে। দলিত এলাকায় পাড়ার দখলের নিরিখে এগিয়ে বিজেপি। বিশেষ করে যাঁদের বাবা-কাকা-ঠাকুর্দারা লাল ঝান্ডা বইতেন, তাঁরা প্রকাশ্যে বা গোপনে গেরুয়ার দিকে ঝুঁকছেন। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী সভা করতে এসে হালকা হিন্দুত্ব ,দুর্নীতি, পঞ্চায়েতের সন্ত্রাস এবং সরকারি উপেক্ষার কথা তুলে ধরছেন।

নিম্ন মধ্যবিত্ত মহিলারা অবশ্যই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুযোগসুবিধা পাচ্ছেন। গোষ্ঠী ঋণের সুবিধাও আছে, যদিও অনেক পরিবার এমনভাবে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে যে নাভিশ্বাস উঠছে। তৃণমূল আমলে শিল্পতালুক হিসাবে বিষ্ণুপুর বা বড়জোড়াকে সেইভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা হয়নি। বহু ছেলে বাইরে আছে কাজের তাগিদে। সেই তুলনায় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গ্রামে তৃণমূলের সংগঠন মজবুত। নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ বা ছোট ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগ রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সুযোগসুবিধা পাচ্ছেন। অধিকাংশ শিক্ষিত ভোটার অবশ্য দুই প্রার্থীর মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি দেখে বিরক্ত। যেহেতু দুজনেই দলবদল করছেন, তাই প্রার্থীদের দলীয় গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একটু হলেও সন্দেহ আছে।

বিদায়ী সাংসদ সৌমিত্র প্রচারে বলছেন তিনি কত কাজ করেছেন বা কী কী করেছেন। সংসদে তাঁর উপস্থিতি ৭৮%, যেখানে জাতীয় গড় ৪৬.৭%। তিনি ২৭টি বিতর্কে অংশ নিয়েছেন, ১২০ টি প্রশ্ন করেছেন, যদিও জাতীয় গড় ১৪০। কোনো প্রাইভেট বিল আনেননি। সৌমিত্র মুখে কাজ করার দাবি করলেও আসলে কাজ কতটা করেছেন সেটা ভোটাররাই বলবেন। বিষ্ণুপুরের পর্যটন শিল্পকে চাঙ্গা করার জন্য বা শিল্প তথা কারুশিল্পের বিকাশের জন্য বা শালি, দারকেশ্বর নদীর ভাঙন রোখার জন্য সেইভাবে কিছু করেছেন বলে নিজেও দাবি করেন না। সৌরশক্তিতে চালিত আলোর স্তম্ভ বসানো, কিছু জায়গায় স্টেডিয়াম তৈরি, মন্দির সংস্কারের মত কিছু কাজ অবশ্যই করেছেন। কোভিডের সময়ে হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নয়নে এবং অ্যাম্বুলেন্স কেনার জন্য সাংসদ তহবিলের টাকা খরচ করেছেন। মশাগ্রাম-বাঁকুড়া ট্রেন লাইন হাওড়া পর্যন্ত সম্প্রসারণের জন্য সচেষ্ট হয়েছেন।

জনসংযোগে অবশ্য সৌমিত্র দারুণ দক্ষ। সাবলীলভাবে সোশাল মিডিয়া সামলান, কর্মীদের ফোন ধরেন, তাঁর সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করা যায়। কিন্তু এমন নয় যে বিজেপির ভিতরে তিনি খুব জনপ্রিয়। এবারে বিজেপির একটা অংশ চেয়েছিল তিনি যেন টিকিট না পান। এছাড়া লোকসভার কিছু জায়গায় সংগঠন খুব দুর্বল। নদীর বালি চুরির বিরুদ্ধে সৌমিত্র সরব হয়েছেন সোশাল মিডিয়ায়, কিন্তু সাংসদ হিসাবে কী আইনসঙ্গত ব্যবস্থা নিয়েছেন তা কোথাও বলেননি। এছাড়া বিষ্ণুপুর ঘিরে এমন কোনো পরিকল্পনার কথা বলতে পারেননি, যেখানে কর্মসংস্থান হতে পারে।

তৃতীয় শক্তি বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী শীতলের উপস্থিতি এখানে ক্ষীণ। গতবারের বাম প্রার্থী প্রায় এক লক্ষ ভোট পেয়েছিলেন এবং ২০১৪ সালে বাম প্রার্থী দ্বিতীয় হয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বামেদের ঘিরে যেভাবে সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন আসনে, বিষ্ণুপুর সেইসব আসনের শত মাইল দূরে। মলিন থেকে মলিনতর সাংগঠনিক শক্তি। কেবলমাত্র সক্রিয় সমর্থকদের ভোটই নিশ্চিত। সেইভাবে প্রচার নেই, কংগ্রেসেরও তেমন উদ্যোগ নেই। হয়ত কমবয়সী শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের কিছু ভোট জোটের ঝুলি ভরাতে পারে। ফলে সিপিএমের এখানে অনেক পিছিয়ে থেকে তৃতীয় হওয়াই স্বাভাবিক, ভোট বাড়ে কিনা সেটাই দেখার। লড়াই দুই প্রাক্তনের মধ্যে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.