দিল্লির আবহাওয়ার হিসাবে শীত তেমন জাঁকিয়ে পড়েনি। কিন্তু দিনের আলো ফুরোতেই ঠান্ডা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাই মঙ্গলবার (১৯ ডিসেম্বর) রাজধানীর পাঁচতারা হোটেলে ইন্ডিয়া ব্লকের বৈঠকের ফলাফল জানার জন্য অপেক্ষারত সাংবাদিক ও আরও অনেকে টুপি, মাফলার বের করতে তখন ব্যস্ত। হঠাৎ উড়ে এল ব্রেকিং নিউজ – তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের প্রস্তাব, এই বিরোধী জোটের মুখ কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গেকে করা হোক। সাংবাদিকরা যখন নিজেদের সোর্সকে ফোন করে এই খবরের সত্যতা এবং তারপরের কাহিনী জানতে ব্যস্ত হয় পড়েছেন, ঠিক তখনই আবার ব্রেকিং – দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী এবং আম আদমি পার্টির সর্বেসর্বা অরবিন্দ কেজরিওয়াল সমর্থন জানালেন মমতার প্রস্তাবে।

এ কী কাণ্ড! মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে যিনি তাঁর পছন্দের সাংবাদিকদের ডেকে বলে গেলেন, প্রধানমন্ত্রী পদের ইস্যুটা এই মুহূর্তে জরুরি নয় এবং কে প্রধানমন্ত্রী হবেন তা নিয়ে নির্বাচনের পরে সিদ্ধান্ত হবে, তিনিই কিনা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে সেই পদের জন্য খড়্গের নাম প্রস্তাব করে বসলেন!

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এখানে বলে রাখা ভাল যে জোটের বৈঠকের আগে মমতা আলাদা করে কেজরিওয়াল এবং সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবের সঙ্গে দেখা করেন। এই ত্রয়ীকে কেউ কেউ ইন্ডিয়া ব্লকের মধ্যে ‘প্রেশার গ্রুপ’ বা ‘উপজোট’ হিসাবেও উল্লেখ করে থাকেন।

যেহেতু তিনিই ছিলেন শেষ বক্তা, সেহেতু তারপর কিছু আনুষ্ঠানিকতা মিটিয়ে বৈঠক শেষ হয়। বৈঠক শেষ করে বেরনোর সময়ে জোটের নেতাদের এই প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। তাঁরা যে যার নিজের মত বিশ্লেষণ করলেন। কিন্তু বোঝা গেল যে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী সেই সন্ধ্যায় এক ঢিলে তিন পাখি মারলেন।

প্রথমত, তিনি চাইলেন নিজেকে এমন একজন পরিপক্ক, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ হিসাবে তুলে ধরতে, যিনি কোনো লুকোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা লালন করেন না। দল তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাইলেও তিনি সেই ইচ্ছাকে এই মুহূর্তে জোটের উপরে স্থাপন করতে চান না। দ্বিতীয়ত, তিনি নীতীশ কুমার, শরদ পওয়ারের মত দাবিদারের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দিলেন। তৃতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, মমতা খড়্গের নাম বিরোধী জোটের প্রধান মুখ হিসাবে তুলে ধরলেন এই কারণেই যে তিনি নিশ্চিত, দলিত সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তিকে আক্রমণ করা বিজেপির পক্ষে কঠিন হবে।

যদিও ৮২ বছর বয়সী কর্ণাটকের রাজনীতিবিদ খড়্গেকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি কেবল গান্ধী পরিবারের প্রক্সি নন এবং দলের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতেই। তিনি কিন্তু রাজনীতির মাঠে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। তিনি সংসদের উভয় কক্ষে বিরোধী দলের নেতার ভূমিকা পালন করেছেন এবং আগে ক্যাবিনেট মন্ত্রীও ছিলেন। তাই তাঁর সমস্ত যোগ্যতা বিবেচনা করেই মমতা এই নাম প্রস্তাব করেছেন। তাঁর প্রস্তাবে কংগ্রেসে যাঁরা রাহুল গান্ধীকে বিরোধীদের ‘মুখ’ হিসাবে তোলার চেষ্টা সমর্থন করছিলেন, তাঁরাও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন সেদিন। তবে এটাও উল্লেখ করা দরকার যে খড়্গে নিজে লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার আগে প্রধানমন্ত্রী পদে কোনো সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করার বিষয়টি মেনে নিতে নারাজ। তাঁর বক্তব্য, আগে দেখতে হবে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর জোট সরকার গঠনের দাবি করার জন্য পর্যাপ্ত আসন বিরোধীরা পায় কি না।

আরো পড়ুন কতটা পথ পেরোলে পরে ভারত পাওয়া যায়?

এবারের দিল্লিতে যে মমতাকে দেখা গেল, তিনি যেন অন্য মমতা। সাধারণত অল্পেই অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠা, অপ্রীতিকর পরিস্থিতে মাথা গরম করা মমতা নয়। অনেক শান্ত, বিচক্ষণ। অবশ্যই বরাবরের মতো কুশলী।

তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতা কেউ অস্বীকার করতে পারেন না, আবার একথাও উপেক্ষা করা যায় না যে, তিনি কোনো সুযোগে পেলে হঠাৎ কোনো পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। অনেকসময় তিনি অনেক দক্ষ রাজনীতিবিদকে অবাক করেছেন। সেই মমতা এখনো আছেন, কিন্তু অনেকটাই সংযত।

শুধু এই চমক নয়। এবারের দিল্লি সফরে তিনি আরেকটি চমকও দিয়েছেন প্রকাশ্যেই।

ইন্ডিয়া ব্লকের বৈঠকের আগের দিন, অর্থাৎ সোমবার (১৮ ডিসেম্বর) তিনি কিছু সাংবাদিকের সঙ্গে সময় কাটান, তাঁদের প্রশ্নের জবাব দেন। কিন্তু সেই চায়ের আমন্ত্রিতের তালিকা থেকে বাদ রাখা হয় এমন সব সংবাদমাধ্যমকে, যারা তাঁর সমালোচনা করে থাকে। তবে এমন কিছু সাংবাদিককে ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যাঁরা ওই ধরনের মিডিয়া হাউসের প্রতিনিধি হলেও ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ আচরণ করে থাকেন।

সেই সাংবাদিক বৈঠক চলাকালীন প্রশ্ন ওঠে যে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস ও সিপিএমের সঙ্গে মমতা কি পশ্চিমবঙ্গে আসন ভাগাভাগি করতে রাজি হবেন? মনে হল যেন তিনি এই প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। প্রশ্নকর্তাকে বলেন “আলোচনা ছাড়া চাপিয়ে দেওয়া যাবে না”। তারপর দিতে থাকেন একের পর এক শিরোনাম করার মত উদ্ধৃতি। যেমন, তিনি “প্রতিশোধপরায়ণ নন”, “হাত ধরতে প্রস্তুত”, “কাউকে তো বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধতে হবে”, “আমার কোনো সমস্যা নেই” ইত্যাদি।

বটেই তো! তিনি বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ। তিনি জানেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তার ওজন, জানেন তার প্রভাব পশ্চিমবঙ্গেও পড়বে। গত লোকসভা ভোটে মোদীর মহিমায় বিজেপি রাজ্যের ৪২টি আসনের মধ্যে ১৮টি দখল করে নিয়েছিল। এবার রাজ্য বিজেপির অন্দরের ফাটলও মোদীর জনপ্রিয়তা ম্লান করে দিতে পারে।

সুতরাং তিনি সম্ভাবনাগুলি মাথায় রেখেই বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধতে রাজি হয়েছেন। যেমন মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্রটির কথাই ধরুন, যেখানে ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে মুসলমান জনসংখ্যা (৬৬.২৮%) রাজ্যে সর্বাধিক। বর্তমানে সংসদে বহরমপুরের প্রতিনিধিত্ব করছেন অধীররঞ্জন চৌধুরী। এই প্রথম নয়, তিনি টানা এই আসন থেকে জয়ী হয়ে আসছেন। এখন লোকসভায় তিনি কংগ্রেস দলের নেতা এবং রাজ্যে সভাপতি।

সংলগ্ন মালদা জেলায় বাংলার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মুসলমান জনসংখ্যা (৫১.২৭%)। মালদা দক্ষিণ আসনটি প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবিএ গনি খান চৌধুরীর ভাই কংগ্রেস সাংসদ আবু হাসেম খান চৌধুরীর দখলে রয়েছে। এই দুই কেন্দ্রে স্বাভাবিকভাবেই মমতা সংখ্যালঘুদের ভোট ভাগ না করতেই ঘন্টা বাঁধতে এগোবেন।

এবার আরও উত্তরে, রায়গঞ্জ লোকসভা কেন্দ্র, যা একসময় কংগ্রেসের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সির দখলে ছিল। এখানে ২০১৯ সালের নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী বিজেপির কাছে প্রায় ৬০,০০০ ভোটে পরাজিত হন এবং সিপিএম আর কংগ্রেস প্রার্থী মিলে প্রায় ২.৭ লক্ষ ভোট পেয়েছিলেন।

এই আসনে সিপিএম প্রার্থী ছিলেন মহম্মদ সেলিম, যিনি এখন দলের রাজ্য সম্পাদক। আর প্রিয়রঞ্জনের স্ত্রী দীপা দাসমুন্সি কংগ্রেসের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। অন্যান্য লোকসভা কেন্দ্রগুলির মধ্যে দার্জিলিং আর কোচবিহারও মমতা অন্যদের হাতে তুলে দিতে রাজি হতে পারেন। বর্তমানে বিজেপির দখলে থাকা দুটি এলাকায় পৃথক রাজ্যের দাবিতে বিক্ষোভের সম্মুখীন হচ্ছে তাঁর সরকার।

একটি মহলের ধারণা, সম্ভবত বাংলার এই আসনগুলির বিনিময়ে মমতা মণিপুর, ত্রিপুরা, এমনকি আসামে আসন ভাগাভাগি করার জন্য কংগ্রেসকে চাপ দিতে পারেন। তৃণমূল সুপ্রিমো পশ্চিমবঙ্গের বাইরে কয়েক শতাংশ ভোট নিয়ে তাঁর দলের নামের আগে ‘অল ইন্ডিয়া’ তকমাকে ন্যায়সঙ্গতভাবে নিশ্চিত করতে চান হয়ত।

ওদিকে নয়াদিল্লির এই শীতের কামড় পড়েছে রাজ্যের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি এবং কংগ্রেস নেতাদের মধ্যেও। এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উষ্ণতা রাজ্যে বরফ গলাতে পারছে না। সেক্ষেত্রে মমতা বলতেই পারেন, “আমি তো চেয়েছিলাম…”।

তবে কি এটা মমতার ‘ভেনি, ভিডি ভিচি’ মুহূর্ত, নাকি শুধুমাত্র আরেকটা চমক?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.