গতকাল থেকে শুরু হয়ে গেল ভারতের সাধারণ নির্বাচন। দ্য কোয়ান্টাম হাব নামে এক পলিসি রিসার্চ ফার্ম জানাচ্ছে, এই নির্বাচনের প্রথম দুই পর্বের নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে মাত্র ৮.৩% মহিলা। যদিও মহিলা ভোটদাতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। মনে রাখা দরকার, ২০২৩ সালেই পাস হয়েছে সেই আইন, যেখানে লোকসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩% আসন সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। অথচ কাজের বেলায় দেখা যাচ্ছে, যে রাজনৈতিক দলগুলো এই আইন সমর্থন করেছে তারাও মহিলা প্রার্থী দিতে পারছে না অথবা দিতে চাইছে না।
এদেশ ইন্দিরা গান্ধী সহ আরও অনেক মহিলাকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেখে দিতে দেখেছে। তা সত্ত্বেও পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব দূর করা রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে সম্ভব হয়নি। ১৯৯৮ সালে বিশাখা দত্ত সম্পাদিত অ্যান্ড হু উইল মেক চাপাতিজ বইটিতে আমরা পড়েছিলাম, মহারাষ্ট্রের মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত পঞ্চায়েতগুলোর কথা – কীভাবে মেয়েদের ঘরের কাজ এবং বাইরের কাজ একসঙ্গে সামলাতে হয়। সেই মনোভাব এত বছরেও হয়ত এদেশ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ‘রাজনৈতিক কর্মীকে দিনের অনেকটা সময় বাড়ির বাইরে থাকতে হয়। সেটা পুরুষ কর্মীদের জন্য যতটা সহজ হয় নারী কর্মীদের জন্য অত সহজ নয়”। একথা ডয়েশ ওয়েলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন ২১ বছর বয়সী চেন্নাইয়ের কাউন্সিলর প্রিয়দর্শিনী। তিনি বলেন রাস্তাঘাটে তো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বাথরুম নেই। সারাদিন ধরে মেয়েরা রাস্তায় থাকবে কী করে? ফলে রাজনীতি করতে আসা অনেক কমবয়সী মেয়েই কাজ শুরু করেও পিছিয়ে যায়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
মহিলা প্রার্থী দিতে পারুক না পারুক, সব রাজনৈতিক দলই মহিলা ভোটারদের ভোট পাওয়ার জন্য বিভিন্ন রকমের প্রতিশ্রুতি তাদের ইশতেহারে দিয়ে থাকে। এবছরের নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিজেপির ইশতেহারে বলা হয়েছে গ্রামীণ মহিলাদের মধ্যে লাখপতি দিদির সংখ্যা তিন কোটিতে পৌঁছবে। তারা আরও বলেছে, জিতলে স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি করতে বিশেষ উদ্যোগ নেবে। কর্মজীবী মহিলাদের জন্য হোস্টেল, তাঁদের সন্তানদের জন্য ক্রেশ ইত্যাদির ব্যবস্থা করারও প্রতিশ্রুতি আছে বিজেপির ইশতেহারে। যদিও এতবছর সরকারে থেকেও এই কাজগুলো তারা কেন করেনি তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বিজেপির ইশতেহারে মহিলা খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ প্রকল্পের উদ্যোগও নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেখানে ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের মত কোনো ব্যক্তি দায়িত্বে থাকবেন কিনা সে প্রশ্ন এদেশের মেয়েরা করতেই পারে। মেয়েদের জন্য পুলিশ স্টেশনে আলাদা করে শক্তি ডেস্ক বা হেল্পলাইনকে আরও মজবুত করার প্রতিশ্রুতির মধ্যে খুব সাধারণভাবে উল্লেখ করা আছে অভিন্ন দেওয়ানী বিধির কথা। ভারতবর্ষের মত বহুমাত্রিক দেশে অভিন্ন দেওয়ানী বিধি চালু করা কতটা অসুবিধাজনক তা নিয়ে নারী আন্দোলনের কর্মীরা বারবার কথা বলছেন। কিন্তু নরেন্দ্র মোদী সরকারের ভারতবর্ষের বহুমুখী সংস্কৃতিকে নষ্ট করে সবকিছুকে অভিন্ন করে তোলার যে আগ্রহ, তা খুব অভিন্ন দেওয়ানী আইনের পরিকল্পনাতেই স্পষ্ট।
আরো পড়ুন পকসো আইন পরিবর্তন হবে অভিযুক্তের মর্জি অনুযায়ী?
কংগ্রেসের ইশতেহারে মহালক্ষ্মী প্রকল্পে মহিলাদের আর্থিক সহায়তার কথা বলা হয়েছে। বিজেপির মতই তারাও মহিলা খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা, কর্মজীবী মহিলাদের হোস্টেল ইত্যাদির কথা উল্লেখ করেছে। ২০২৫ সাল থেকে সরকারি চাকরিতে মেয়েদের জন্য ৫০% সংরক্ষণের কথাও তারা বলেছে। নারী আন্দোলনের এক কর্মীর মতে, বিজেপির চেয়ে কংগ্রেসের ইশতেহারে মহিলাদের জন্য অনেকগুলো বেশি প্রতিশ্রুতি আছে ঠিকই, কিন্তু কেন যেন মনে হয় তারা নতুন কোনো বার্তা দিতে পারছে না। তাঁর মতে রাহুল গান্ধী যে ভারত জোড়ো যাত্রা করে এত মানুষের সঙ্গে মিশলেন, সেখান থেকে কংগ্রেস যে কিছু শিক্ষা পেয়েছে তা তাদের ইশতেহারে দেখে মনে হয় না।
সামাজিক বিষয়গুলোর মধ্যে পৃথক চিন্তাভাবনার ছাপ পাওয়া যায় সিপিএমের ইশতেহার পড়লে। তারা শুধু নারীদের জন্য চালু যে আইনগুলো আছে তা প্রয়োগ করার কথা বলেনি, নির্ভয়া কাণ্ডের পর গঠিত জাস্টিস ভার্মা কমিটির সুপারিশ অনুসারে বিভিন্ন ধরনের প্রান্তিক মহিলাদের কথা আলাদা করে উল্লেখ করেছে। অনার কিলিং বা খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে নারী নির্যাতনের সালিশি করার বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছে। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটি দ্বারা প্রকাশিত ইশতেহার ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে পৃথকভাবে তাদের দলের মহিলা প্রার্থীরা সাংবাদিক সম্মেলন করে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই প্রতিশ্রুতির মধ্যে আছে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ করা করার জন্য পাড়ায় পাড়ায় সমিতি তৈরি করা, আইনি পরামর্শ এবং কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা, যৌথ রান্নাঘর তৈরি করা, স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন বসানোর মত বিষয়। এগুলো সাধারণ মেয়েদের দৈনন্দিন জীবনের বেশ কিছু জরুরি চাহিদা।
এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে সিপিএম বা বামফ্রন্ট সম্পর্কে একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। নির্বাচন সংক্রান্ত যে কোনো সাংবাদিক সম্মেলনে একজনও মহিলা মুখ দেখতে পাওয়া যায় না কেন? যাঁরা বক্তব্য রাখেন তাঁরা সবাই পুরুষ। আবার পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের জন্য আলাদা করে যে সাংবাদিক সম্মেলন হল, সেখানে পুরুষ নেতারা বক্তা হিসাবে অনুপস্থিত। শ্রমিক মেয়েদের জন্য ভাবনাচিন্তা পৃথকভাবে করা প্রয়োজন, কিন্তু যে পুরুষ নেতারা শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা যদি এই বিষয়গুলোর দায়িত্ব না নেন, তা হলে লিঙ্গ বিভাজন বোধহয় কোনোদিনই মিটবে না।
নির্বাচন শুরুর ঠিক দুদিন আগে তৃণমূল কংগ্রেসের ইশতেহার প্রকাশিত হল। তৃণমূল কংগ্রেসের বক্তব্য, তাদের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প এক যুগান্তকারী প্রকল্প এবং সেই প্রকল্পকে আরও শক্তিশালী করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনার শীঘ্র নিষ্পত্তির জন্য তারা প্রত্যেক জেলায় ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট স্থাপন করতে চায়। এছাড়াও সম কাজে সম মজুরি, কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা ইত্যাদি আইন রূপায়ণ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
আমরা যদি সবকটা ইশতেহার পড়ি, দেখতে পাব সব দলই সংসদে মহিলাদের ৩৩% সংরক্ষণের প্রতি দায়বদ্ধ। এই প্রতিশ্রুতি পালন করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে কি নিজেদেরও পরিবর্তন করতে হবে না? শুধুই কি সাংসারিক কাজের দায়িত্ব বা রাস্তাঘাটে চলাফেরার অসুবিধা জন্য মহিলারা রাজনৈতিক দলের কাজকর্মে কম যোগ দেন? অনেক মহিলা তো রাজনীতি করতে এসেও পরে দূরে সরে যান। তার পিছনে কী কী কারণ থাকে তা দলগুলো নিজেরা বিশ্লেষণ করেছে কি? সবকটা রাজনৈতিক দল কর্মক্ষেত্রে নারীর উপর যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে কাজ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। অথচ এই দলগুলোর কতগুলোর নিজেদের যৌন হয়রানি বিরোধী কমিটি সক্রিয়ভাবে কাজ করে – সে হিসাব আমরা নারী আন্দোলনের কর্মীরা জানার দাবি করতে পারি না?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








