মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পুরাতন ও নতুন। বহু ইতিহাসের সাক্ষী পুরাতন, কিন্তু এ যেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল নতুন! সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে বিধিভঙ্গের দায়ে বরখাস্ত হলেন বিরোধীপক্ষের ১৪৬ জন সদস্য।
বৃত্তাকার পুরাতন সংসদ ভবনেও উঠেছে অজস্র বিধিভঙ্গের অভিযোগ, উত্তাল হয়েছে সংসদ কক্ষ, প্রতিবাদে স্লোগানে আন্দোলিত হয়েছে সভাকক্ষ, রে রে করে সদস্যরা তেড়ে গেছেন সভাপতির চেয়ারের দিকে ইত্যাদি। আর তার ফলে বিধি মেনেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন উচ্ছৃঙ্খল প্রতিবাদী সদস্যরা। বরখাস্তও করা হয়েছে এই ধরনের সদস্যদের।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কিন্তু ১৪৬! এ যেন প্রায় বিরোধীশূন্য সংসদ! রাজ্যসভায় তৃণমূল কংগ্রেস সংসদীয় দলের নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন লিখছেন, “দ্রুত হিসাব করলে দেখা যায়, লোকসভা থেকে বরখাস্ত হওয়া ১০০ জন সংসদ সদস্য প্রায় ১৫ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং রাজ্যসভায় বরখাস্ত হওয়া ৪৬ জন সাংসদ প্রায় ১৯ কোটি মানুষের প্রতিনিধি। অন্য কথায়, কার্যত ৩৪ কোটি মানুষের (জনসংখ্যার প্রায় ২৫%) কণ্ঠরোধ করা হয়েছে।”
১৩ ডিসেম্বর দুই যুবকের সংসদে হাঙ্গামা বাধানো নিয়ে বিরোধীপক্ষের সাংসদরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে বিবৃতির দাবি জানান। তার সঙ্গে ‘সংসদে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুতর লঙ্ঘন’ নিয়ে আলোচনার দাবি জানিয়ে নোটিস জমা দেন। তাঁদের জানানো হয় যে একটি উচ্চপদস্থ কমিটি এর তদন্ত করবে এবং নিরাপত্তা সুদৃঢ় করার জন্য সাংসদদের মতামত নেওয়া হবে। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতির জন্য নাছোড়বান্দা ছিল বিরোধীপক্ষ। লোকসভা এবং রাজ্যসভায় অধ্যক্ষ বা চেয়ারম্যানের দিকে তেড়ে যান তাঁরা। উভয় কক্ষে পোস্টার নিয়ে উচ্চস্বরে স্লোগান দিতে থাকেন ওয়েলে নেমে। তার ফলে ১৪ ডিসেম্বর থেকেই শুরু হয় তাঁদের বরখাস্তের পালা; চলে শীতকালীন অধিবেশনের অন্তিম দিন, অর্থাৎ ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এর আগেও ২০২১ সালে সংসদের শীতকালীন অধিবেশন চলাকালীন তিনটি বিতর্কিত কৃষি আইন বাতিল করে বিল পাস করার সময়ে উচ্ছৃঙ্খল আচরণের জন্য ডেরেক সহ প্রায় ডজনখানেক সাংসদকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।
সংসদকে গণতন্ত্রের মন্দির বলে মনে করা হয়। গণতন্ত্রে বিরোধীরা সরকারকে প্রশ্ন করবে। কোণঠাসা করার চেষ্টা করবেই। অন্যদিকে সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রিসভারও কিছু দায়বদ্ধতা থাকে। সংবিধানের ৭৫ (৩) অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা হয়েছে, মন্ত্রিপরিষদ লোকসভার প্রতি সম্মিলিতভাবে দায়বদ্ধ থাকবে। উভয়কক্ষে সাংসদরা যখন মন্ত্রীদের প্রশ্ন করেন, তার উত্তর সরকারের তরফ থেকে দেওয়াও হয়ে থাকে। এমনটাই নিয়ম। তাই সংসদ চলাকালীন মন্ত্রীদের সওয়াল-জবাবের সম্মুখীন হতেই হয়।
অনেকসময় দেখা যায়, এক সাংসদ হয়ত মন্ত্রীর জবাবে বা অন্য কোনো কারণে অখুশি। তাই বারংবার প্রশ্ন করেই চলেছেন, আবার হয়ত তার সঙ্গে গলা মেলালেন অন্যান্য সাংসদরা। ধীরে ধীরে সেটাই হয়ত রূপ নিল প্রতিবাদের। হয়ত তার থেকে হল প্রতিরোধ। সেই প্রতিরোধই আবার কখনো কখনো হয়ে দাঁড়ায় উচ্ছৃঙ্খল।
যেমন ২০ জুলাই ১৯৯৮। যখন তৎকালীন আইনমন্ত্রী এম থাম্বিদুরাই মহিলা সংরক্ষণ বিল পেশ করতে যাবেন, সে মুহূর্তে আরজেডি সাংসদ সুরেন্দ্র প্রকাশ যাদব তাঁর হাত থেকে বিলটি ছিনিয়ে নেন এবং তাঁরই দলের অজিত কুমার মেহতার সঙ্গে মিলে বিলের কপিগুলি ছিঁড়ে উড়িয়ে দেন। এক্ষেত্রে অধ্যক্ষকে কক্ষের নিয়ম অনুযায়ী এই প্রতিবাদে রাশ টানতে হয়।
অনেকসময়েই সংসদ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে লাগাম ধরতে হয় অধ্যক্ষকে। তা করতে হয় নিয়ম মেনেই। যেমন লোকসভার বিধি ৩৭৩ অনুযায়ী, স্পিকার যদি কোনো সদস্যের আচরণ বিশৃঙ্খল বলে মনে করেন তবে তিনি অবিলম্বে তাঁকে সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে ওই সাংসদ সেদিনের অবশিষ্ট অধিবেশনে অনুপস্থিত থাকবেন।
আবার কোনো সাংসদ যদি অধ্যক্ষের কর্তৃত্বকে অবজ্ঞা করেন বা তাঁর বিরুদ্ধে নিয়ম ভাঙার গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তাহলে লোকসভার বিধি ৩৭৪ অনুযায়ী স্পিকার তাঁর নাম উল্লেখ করতে পারেন। এক্ষেত্রে সেই সদস্য অবশিষ্ট অধিবেশনের জন্য সাসপেন্ড হতে পারেন। আর বিধি ৩৭৪ (ক) অনুয়ায়ী, অভিযোগ খুবই গুরুতর হলে স্পিকার পরপর পাঁচ দিনের অধিবেশন থেকে বা অবশিষ্ট অধিবেশনের জন্য (যেটি কম হবে) সেই সাংসদকে সাসপেন্ড করতে পারেন।
একইভাবে রাজ্যসভার সাধারণ কার্যপ্রণালী বিধি ২৫৫ অনুযায়ী রাজ্যসভার চেয়ারম্যান নিয়ম লঙ্ঘনকারী সাংসদকে বরখাস্ত করতে পারেন। এমনকি কোনো সাংসদকে সাসপেন্ড করার পরও তিনি যদি কক্ষের বাইরে না যান, তাহলে মার্শাল ডেকে তাকে বের করে দেওয়ার ক্ষমতাও থাকে অধ্যক্ষের হাতে। সুসংবাদ, তেমন ঘটনা বড় একটা দেখা যায় না।
লোকসভার প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল পিডিটি আচারী বলছেন, সভাকক্ষের নিয়মে সদস্যদের সাসপেনশনের বিধান রয়েছে। এর ফলে অসহিষ্ণু সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা স্পিকার বা অধ্যক্ষের হাতে থাকে। কিন্তু এই নিয়ম খুব কম ব্যবহার করা হয়। কারণ সাংসদরা জনগণের দায়িত্বশীল প্রতিনিধি এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থার প্রধান চালক। তাঁরা দেশের আইনপ্রণেতা এবং জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিনিধি।
আরো পড়ুন বেহাল গণতন্ত্র বেহাত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে নির্বাচনী বন্ড
উল্টোদিকে বিরোধীপক্ষের আসন থেকে বরাবর এই ধারাগুলির অপব্যবহারের অভিযোগ হয়ে থাকে। সরকার যে দলেরই হোক, নিয়মাবলীর কথা উঠতেই সংসদে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্বৈরাচারের’ কথা শোনা যায় । কিন্তু সেটাই তো বাস্তব। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোটই তো সরকার গঠন করবে। কিন্তু সরকারপক্ষ কখন সংখ্যাগরিষ্ঠাতার আস্ফালন দেখাবে বা আদৌ দেখাবে কিনা, সে বিতর্ক চলতেই থাকবে।
এ অবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা সরকারের হাতে সংসদ পরিচালনা করার কেবল দায়িত্ব নয়, ক্ষমতাও তুলে দেওয়া আছে। আবার গণতন্ত্রে বিরোধীপক্ষেরও দায়িত্ব, কোথাও সরকারের ভুল দেখলে রুখে দাড়াঁতে হবে। কিন্তু তাদের সে ক্ষেত্রে ক্ষমতা সীমিত।
তাই অবস্থা বুঝে বিরোধীপক্ষকে কখনো কখনো এককাট্টা হয়ে, হাতে হাত ধরে সরকারের মোকাবিলা করতে হয়। তা আবার সবসময় না-ও ঘটতে পারে। বিরোধী দলগুলি যে সবসময় একজোট হবেই তা তো বলা যায় না। তাছাড়া বর্তমান লোকসভায় বিরোধীপক্ষের যা সংখ্যা, তাতে সেভাবে রুখে দাঁড়ানোর কথা ভাবা বেশ মুশকিল। তবু ইন্ডিয়া জোটের কল্যাণে সংসদ কক্ষের বাইরে সঙ্ঘবদ্ধতা দেখা গেল।
কিন্তু এই ১৪৬ সংখ্যাটি ভবিষ্যতের জন্য একটা বড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিতে পারে। আগামী সরকার এই উদাহরণ সামনে রেখে গায়ের জোর খাটাতেই পারে। কারণ তারা বলতেই পারে, সংসদের শৃঙ্খলা বজায় রাখা বা নিয়ম মেনে বিল পাস করানো, বাজেট পেশ করা এবং তা পাস করানো, আরও নানা সংসদীয় কাজ পরিচালনা করা তাদেরই দায়িত্ব। তাদেরই বিল পাস করাতে হবে, বাজেট পেশ করতে হবে। কিন্তু তা করতে গিয়ে তারা ভুলে যেতে পারে, বিরোধীপক্ষেরও দায়িত্ব সরকার ভুল করলে বা যুক্তিপূর্ণ দাবি না মানলে দরকার মত বিরোধিতা করা।
এই চক্করে গোটা সংসদীয় ব্যবস্থাই না ভেঙে পড়ে। আলাপ আলোচনা না করে একেবারে সাংসদদের সভাকক্ষের বাইরে বের করে দেওয়াই যেন ‘নিয়ম’ হয়ে না দাঁড়ায়। তাই ২০২৩ সালের শেষ লগ্নে নতুন করে সংসদীয় কার্যপ্রণালী নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। টেনে দেওয়া দরকার একটি লক্ষ্মণরেখা, যেখানে সরকারের দায়িত্বের পাশাপাশি বিরোধীপক্ষের হাতেও বিরোধ প্রকাশের হাতিয়ার থাকবে। সেই হাতিয়ার ব্যবহারের জন্য বেঁধে দিতে হবে শালীনতা ও সভাকক্ষের মর্যাদার সীমা। তা দেখার জন্য গঠন করা যেতে পারে বিশেষ কমিটিও। যে কমিটির সদস্য হতে পারেন সংসদ-বিশেষজ্ঞ, দায়িত্বশীল সাংসদ এবং ভোটদাতাদের একাংশ। সেই প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে এখনই।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








