যদি এই দুর্ঘটনার দিকে সার্বিকভাবে তাকানো যায়, তাহলে দেখা যাবে – সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো মাথায় রেখেই বলছি – অনেক দিক দিয়েই এ ঘটনা অপ্রত্যাশিত এবং আকস্মিক। কেন, সেকথায় আসছি।

ভারতের মাটিতে শেষ প্রাণঘাতী বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছিল ২০১০ সালে, ম্যাঙ্গালোরে। এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের ফ্লাইট ৮১২ আসছিল দুবাই থেকে। বিমানবন্দরে অবতরণ করার পরেও ক্যাপ্টেনের ভুলে রানওয়ে থেকে ছিটকে যায় সেই বিমান – বিমান পরিবহনের পরিভাষায় যাকে ‘রানওয়ে ওভাররান’ বলে। সোজা গিয়ে পড়ে পাশের পাহাড়ি ঢালে, সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ। আটজন যাত্রী বাদে ১৫৮ জন (১৫২ জন যাত্রী ও ছজন বিমানকর্মী) মারা যান।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ভারতের বিমান পরিবহন বা এয়ার ইন্ডিয়ার ইতিহাসে কয়েকটা ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার মধ্যে আছে ১৯৭৮ সালের ফ্লাইট ৮৫৫ বা ১৯৮৫ সালের ফ্লাইট ১৮২ (মন্ট্রিয়াল-লন্ডন-দিল্লি-বম্বে বিমান আসার পথে আটলান্টিক মহাসাগরের উপর কানাডাবাসী শিখ জঙ্গিদের ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রে ধ্বংস হয়, ৩২৯ জন সওয়ারিই মারা যান)। তবে ভারতের মাটিতে ভয়ঙ্করতম বিমান দুর্ঘটনা যেটা, তার সঙ্গে এয়ার ইন্ডিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।

১৯৯৬ সালে হরিয়ানার চরখি দাদরিতে সৌদিয়ার ফ্লাইট ৭৬৩ আর কাজাখস্তান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১৯০৭-এর মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই বিমান মিলিয়ে মোট ৩৪৯ জন মানুষের মৃত্যু হয়। সৌদিয়ার বিমানে যাত্রী ছিলেন ২৮৯ জন, আর বিমানকর্মী ২৩ জন। দিল্লি থেকে রওনা হয়ে সেই বিমান যাচ্ছিল সৌদি আরবের ধাহরানে। সাতাশ জন যাত্রী আর ১০ জন বিমানকর্মী নিয়ে উলটোদিকের বিমানটা আসছিল কাজাখস্তানের চিমকেন্ত (বর্তমানে শিমকেন্ত) থেকে, গন্তব্য ছিল দিল্লি। এই দুর্ঘটনায় সৌদি আরবগামী বেশ কয়েকজন ভারতীয় শ্রমজীবীর মৃত্যু হয়। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহনের ইতিহাসে আর কোনো মাঝ আকাশের সংঘর্ষে এত মানুষের মৃত্যু ঘটেনি।

চরখি দাদরির এই সংঘর্ষই হোক বা ফ্লাইট ৮৫৫-র আরব সাগরে সমাধি, এগুলো যে সময়ের ঘটনা তখনো বেসামরিক বিমান পরিবহন এক বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে চলেছে, আজকের মত এত উন্নত হয়নি। সামরিক বিমান চালিয়ে যুদ্ধ করে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখানো কমান্ডার যাত্রীবাহী বিমান চালাতে এসে প্রাণঘাতী ভুল করে ফেলেছেন – এমনটা নানা সময়ে ঘটেছে। সঙ্গে যান্ত্রিক ত্রুটির সম্ভাবনা তো থেকেই যেত। ফ্লাইট ৮৫৫-র ক্যাপ্টেন মদনলাল কুকারের বিমান চালানোর রেকর্ড ছিল প্রায় ১৮,০০০ ঘন্টার। বিমানের অল্টিচ্যুড ডিরেকশন ইন্ডিকেটর খারাপ হয়ে যাওয়ায় তাঁরও ভুল হয়ে যায়। চরখি দাদরির ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল, ৯,২০০ ঘন্টা বিমান চালানোর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কাজাখ বিমানের ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার চেরেপানভের ইংরিজি জ্ঞান ছিল নগণ্য। ফলে ভারতের সীমার মধ্যে এটিসি টাওয়ারের নির্দেশ বুঝতে না পেরে ফ্লাইট অল্টিচ্যুডে ভুলে করে ফেলেন। তারই ফলাফল ওই সংঘর্ষ।

পনেরো বছর আগে ম্যাঙ্গালোর বিমানবন্দরে যে দুর্ঘটনা ঘটে, সেখানে অবশ্য জড়িয়ে ছিল একাধিক কারণ। পাহাড়-ঘেরা বিমানবন্দরের রানওয়ে ছিল ছোট, একদম শেষ প্রান্তের কাছেই নেমে গিয়েছে খাড়াই ঢাল। খুব হুঁশিয়ার চালক না হলে নির্ভুল অবতরণ সম্ভব নয়। সেখানে অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে সার্বিয়ান ক্যাপ্টেন জ্লাতকো গ্লুশিচা ছিলেন ক্লান্ত, এবং দুবাই থেকে আসার ঘন্টা তিনেকের উড়ানের বেশিরভাগ সময়টা তিনি ঘুমিয়েই কাটান। ফার্স্ট অফিসার হরবিন্দর সিং আলুওয়ালিয়াই একইসঙ্গে বিমান নিয়ন্ত্রণ এবং এটিসির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার কর্তব্য সারেন। অবতরণের কিছু আগে ক্যাপ্টেনকে ঘুম থেকে তোলেন আলুওয়ালিয়া। যে বিমানবন্দরে তিনি তার আগে অন্তত ১৬ বার নিশ্চিন্তে বিমান নামিয়েছেন, সেখানেই গ্লাইড অ্যাঙ্গেল বুঝতে মারাত্মক ভুল করে ফেলেন গ্লুশিচা। নেপথ্যে ওই ক্লান্তি আর ঘুমের ঘোর। খাড়া পথে দুরন্ত গতিতে নামতে থাকে বিমান, রানওয়ের অনেকটা কাছাকাছি এসে ভুলটা বুঝতে পারেন ১০,০০০ ঘন্টার বিমানচালনার অভিজ্ঞতা নিয়ে ককপিটে বসা গ্লুশিচা। রানওয়ের প্রান্তে এসে টেক-অফের চেষ্টা করলেও শেষরক্ষা হয়নি।

ফ্লাইট ১৮২-র ঘটনা এখানে দুর্ঘটনা হিসাবে বিবেচ্য নয়। কারণ ঠাণ্ডা যুদ্ধ-পরবর্তী পৃথিবীতে সংগঠিত সন্ত্রাসের বলি হয়েছে অসংখ্য যাত্রীবাহী বিমান। ৯/১১-র চারখানা বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা তো বহু আলোচিত। পরবর্তীকালে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ জিগির তুলে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার গণহত্যা চালানোও বেশ প্রশংসিত। এই ধারার সাম্প্রতিকতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১৭, যা আমস্টারডাম থেকে কুয়ালালামপুর যাওয়ার পথে পূর্ব ইউক্রেনের রাশিয়াপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গিদের ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রে ধ্বংস হয়ে যায়, যাত্রী ও বিমানকর্মী মিলিয়ে ২৯৮ জনই মারা যান।

এরকম কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা বাদ দিলে, গত দুই দশকে পুঁজি-নিয়ন্ত্রিত দুনিয়ায় বিমানে যাত্রীর সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তার পরিপূরক হিসাবে পরিবহনও অনেকটা নিরাপদ হয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি আসার কারণে বিমান প্রযুক্তির সামগ্রিক উন্নতি হয়েছে, উড়ানের আগে বিমানচালকদের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার ক্ষেত্রেও গত কয়েক বছরে কড়া নিয়ম লাগু হয়েছে। বহুস্তরীয় পরীক্ষানিরীক্ষার পরই সবুজ সংকেত আসে। এভিয়েশন সেফটি নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭০-এর দশকে যেখানে প্রতি ১০ লক্ষ উড়ানে ছটা দুর্ঘটনা ঘটত, সেখানে আজ ২০ লক্ষ উড়ানে একটা দুর্ঘটনা ঘটে। যাত্রী মৃত্যুর সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে কমেছে। সিরিয়ামের সমীক্ষা বলছে, ১৯৯০-এর দশকে প্রতি ১৮ লক্ষে একজন যাত্রীর মৃত্যু ঘটত। তা আজ প্রতি ২.৭ কোটিতে একজন।

সেখানে একটা আন্তর্জাতিক বিমান ওড়ার মিনিটখানেকের মধ্যেই রানওয়ে থেকে দেড় কিলোমিটার দূরের ডাক্তারদের হোস্টেলে আছড়ে পড়ল! এখানেই উঠছে প্রশ্ন।

ওড়ার সঙ্গে সঙ্গেই চালক জানিয়েছিলেন, তিনি থ্রটল ঠেলে কোনও ‘থ্রাস্ট’ পাচ্ছেন না। অর্থাৎ উপরের দিকে উঠতে পারছে না বিমান। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ বলছে, দুটো ইঞ্জিনই বিকল হয়ে যাওয়ায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। মাটিতে যত মানুষ মারা গেছেন তার নিরীখেও এবারের দুর্ঘটনা বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। এখানেও ৯/১১-র সুপরিকল্পিত অপারেশন বাদ দেওয়া যায় (তিনটে বিমান মিলিয়ে সেবার মাটিতে মৃতের সংখ্যা ছিল আড়াই হাজারের বেশি)। সেক্ষেত্রে গত তিন দশকে ১৯৯৬ সালের এয়ার আফ্রিকার আন্তোনভ আন-৩৬ দুর্ঘটনার পর (মাটিতে মৃত ২৪৯) এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৭১-এর নামই দ্বিতীয় স্থানে আসবে।

ব্ল্যাকবক্স রেকর্ডার সমেত নানা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রমাণ ও নমুনা ঘেঁটে তদন্ত চলছে। যেহেতু আন্তর্জাতিক বিমানের ঘটনা, সেহেতু প্রমাণের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে ভূ-রাজনীতিও জড়িয়ে থাকবে বলে ধরে নেওয়া যায়।

এতদিনে মোটামুটি সকলে জেনে গিয়েছেন, এক দশকেরও পুরনো এই বিমানের নির্মাতা ছিল বহু পরিচিত বোয়িং কোম্পানি। পুরো মডেলের নাম বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার। বোয়িংয়ের বিমানের প্রচলন বেশি, স্বাভাবিক নিয়মে দুর্ঘটনার সংখ্যাও বেশি। এয়ার ইন্ডিয়াও শুরু থেকেই বোয়িং বিমানের উপরে ভরসা করেছে। ফ্লাইট ৮৫৫-র মডেলটা যেমন ছিল বোয়িং ৭৪৭-২৩৭বি, ফ্লাইট ১৮২-ও তাই। জোসেফ স্তালিনের শিল্পায়ন পর্বে সোভিয়েত প্রতিষ্ঠা করেছিল ইলিউশিন এভিয়েশন কমপ্লেক্স। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তির বিমান কোম্পানিদ্বয়কে গানের লাইনে ধরে রেখেছেন কবীর সুমন ‘নামলে বিমান রানওয়ের মসৃণে/বোয়িং কিম্বা রুস্কি ইলিউশিন’। চরখি দাদরি সংঘর্ষে, অদ্ভুতভাবে, সৌদিয়ার বিমানের মডেল ছিল বোয়িং ৭৪৭-১৬৮বি, আর কাজাখ বিমানটা ছিল ইলিউশিন ইল-৭৬ মডেলের।

বোয়িংয়ের যে তিনটে মডেল সিরিজ নিয়ে সাম্প্রতিক অতীতে বেশ হইচই হয়েছে, ৭৭৭ ছাড়া সেই তালিকায় আছে ৭৩৭ ম্যাক্স এবং এই ৭৮৭ ড্রিমলাইনার। বোয়িংয়ের একাধিক কর্মী-ইঞ্জিনিয়ার কোম্পানির দুর্নীতি নিয়ে মুখ খুলতে গিয়ে বিপদে পড়েছেন। এই ৭৭৭ অনেক পুরনো মডেল, বেশ কয়েকটা দুর্ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বাজারে আসে ২০১১ সালে, যদিও প্রথম উড়ান ২০০৯ সালে প্যারিস এয়ার শো-তে।

আবার ৭৩৭ ম্যাক্স বাজারে এসেছিল ২০১৪ সালে, প্রথম উড়ান ২০১৬ সালে। অন্যদিকে ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ মডেলের দুটো বিমান, পরপর দুবছর, ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে, দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। ইন্দোনেশিয়ার লায়ন এয়ার ফ্লাইট ৬১০ পাংগেরাং থেকে পাংকাল পিনাংয়ে যাওয়ার পথে ১৮৯ জন সওয়ারিকে নিয়ে জাভা সমুদ্রে আছড়ে পড়ে ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর, কেউ বাঁচেননি। মাত্র সোয়া চার মাসের মধ্যে (১০ মার্চ ২০১৯) ইথিওপিয়া এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৩০২ ওড়ার ছ মিনিটের মাথায় ভেঙে পড়ে, ১৫৭ জনই নিহত হন। সেই বিমান ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা থেকে কেনিয়ার নাইরোবিতে যাচ্ছিল।

এই ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের আরও একখানা বিমানের কথা এখানে বলতে হয় – আলাস্কা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১২৮২, মডেল নম্বর ৭৩৭ ম্যাক্স ৯। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে অরেগনের পোর্টল্যান্ড থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার অন্টারিও যাচ্ছিল, মাঝ আকাশে পোর্ট সাইডের দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। তিনজন যাত্রীর আহত হওয়া ছাড়া ভয়াবহ কোনো দুর্ঘটনা সে যাত্রায় ঘটেনি। অথচ ২০২৪ সালের খবর অনুযায়ী, বোয়িংয়ের সর্বাধিক বিক্রীত প্রোডাক্টের নাম ৭৩৭ ম্যাক্স।

তা একই মডেলের বিমান যখন ঘনঘন দুর্ঘটনায় পড়ছে, তখন নির্মাতা কোম্পানি কী করছে – এই প্রশ্নটা ওঠা খুব স্বাভাবিক। গতবছর এপ্রিলে সেনেট কমার্স কমিটির শুনানিতে আমেরিকার ফেডেরাল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) যে রিপোর্ট পেশ করে, তাতে বলা হয়েছিল ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে দু-দুখানা মর্মান্তিক ঘটনার পরও ৭৩৭ ম্যাক্সের মডেলগুলোর নিরাপত্তা বাড়াতে বোয়িংয়ের তরফে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বোয়িংয়ের বহু কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দেখা গিয়েছে, অদ্ভুতভাবে ৯৫% কর্মীই জানেন না যে নিরাপত্তাজনিত প্রয়োজনে তাঁরা কার কাছে যাবেন। এই রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরির খেলায় ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কয়েকটা নাম।

প্রথমত, জন বার্নেট। ১৯৮৫ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে বোয়িংয়ের কোয়ালিটি কন্ট্রোল বিভাগে কাজ করতে ঢোকেন, কাজ করেন ২০১৭ সাল অবধি। শেষ সাত বছর সাউথ ক্যারোলাইনার অফিসে কোয়ালিটি কন্ট্রোল ম্যানেজার ছিলেন। এই অফিসেই তৈরি হচ্ছিল ৭৮৭ সিরিজের বিমানগুলো। ওই অভিজ্ঞ কর্মী লক্ষ করছিলেন, মানের দিকে নজর না দিয়ে কোম্পানি কেবল উৎপাদনের দিকে নজর ঘোরাচ্ছে। নির্দেশ এল – নির্মাণে বেশি ত্রুটি খোঁজার চেষ্টা না করাই ভাল। কিন্তু বার্নেট নাছোড়, খুঁটিয়ে সমস্তটা দেখাই তাঁর কাজ। দেখা গেল, ৭৮৭ সিরিজের ২৫% বিমানে অক্সিজেন সিস্টেমটায় গলদ আছে, জরুরি অবস্থায় পড়লে যাত্রীরা ঠিকমত অক্সিজেন পাবেন না। মুনাফার লোভে এমন নানা অনুশীলন চলছিল। কখনো পরীক্ষামূলক উড়ানের ঠিক আগে হরাইজন্টাল স্টেবিলাইজারের ভিতরে খুঁজে পাওয়া যায় মই, কখনো ইলেকট্রিকাল সার্কিটের সামনে পড়ে থাকে মেটাল শেভিং। কর্তাব্যক্তিদের একরকম অমান্য করেই ভুলগুলো বার করছিলেন বার্নেট। ২০১৭ সালে যখন অবসর নিতে বাধ্য হলেন, তখন হৃদযন্ত্রের অবস্থা বিশেষ ভাল নয়। তারপরেও কোম্পানির পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে চালিয়ে গিয়েছেন অসম লড়াই। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে পিস্তলের গুলিতে আত্মহত্যা করার (আসলে খুন করা হয়েছে বলেও অনেকের ধারণা) আগে অবধি বোয়িংয়ের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তি ছিলেন বোধহয় বার্নেটই।

আরো পড়ুন ‘১৯৯১ থেকে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের পথ ত্যাগ করার ফল গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে ১০১তম স্থান’

দ্বিতীয় নাম অবশ্যই বোয়িংয়ের দীর্ঘদিনের কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ার স্যাম সালেহপোর। ৭৩৭-এর মডেলগুলো তো বটেই, স্যাম প্রশ্ন তুলেছেন ৭৮৭ ড্রিমলাইনার সিরিজ নিয়েও। ২০০৭ সাল থেকে এই কোম্পানিতে কাজ করছেন তিনি। অভিজ্ঞ মানুষটি জানিয়েছিলেন, ৭৮৭ সিরিজের বিমানগুলিতে ফিউসিলেজের মধ্যে যে ছোট ছোট ফাঁক থেকে যায়, তা অধিকাংশ সময়েই সঠিকভাবে ভরাট করা হয় না। স্বাভাবিকভাবেই সেই ফাঁকা জায়গায় এসে জমা হয় নানা বর্জ্য। সেক্ষেত্রে কোনোভাবে যদি আগুন ধরে যায়, তা যে কত বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারে তা আন্দাজ করে নেওয়া খুব কষ্টকর নয়। এছাড়া, ২০২৪ সালেই, তাঁর সওয়াল জবাবের আগে বিশ্বজুড়ে সবকটা ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমানকে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করার অনুরোধও করেছিলেন। বিমানচালনার পরিভাষায় একে ‘গ্রাউন্ডিং’ বলে। বিপুল আর্থিক ক্ষতির কথা ভেবে পুঁজিপতি কোম্পানি সে অনুরোধ শোনেনি, বলাই বাহুল্য। কর্তাব্যক্তিরা দাবি করেন, ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের যথেষ্ট পরীক্ষা হয়েছে। তা সম্পূর্ণ বিপন্মুক্ত। উলটে এ ধরনের বেফাঁস মন্তব্য করলে যে বিপদ আছে, সেকথাও বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

এখানে বলে রাখা ভাল, এফএএ-র নির্দেশে ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের ‘গ্লোবাল গ্রাউন্ডিং’ হয়েছিল ২০১৩ সালে, যখন জাপানের অল নিপ্পন এয়ারলাইন্স ও জাপান এয়ারলাইন্সের দুটো বিমানে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি থেকে বৈদ্যুতিক সার্কিটে আগুন ধরে গিয়েছিল। ১৯৭৯ সালের ম্যাকডনেল-ডগলাস ডিসি-১০ মডেলের পর ইতিহাসে সেই প্রথম গ্রাউন্ডিং। এয়ার ইন্ডিয়ার সেই টালমাটাল সময়ে ওই গ্রাউন্ডিং করাতে গিয়ে সংস্থার বাড়তি খরচ হয়ে যায় দিন পিছু ৬০ লক্ষ টাকাদ্য হিন্দু কাগজের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এয়ার ইন্ডিয়ার অধীনস্থ ৭৮৭ সিরিজের বিমানগুলোতে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়া, কেবিন থেকে ধোঁয়া বেরনো, টায়ার ফাটা, হাইড্রলিক লিক, ঝাঁকুনি, বিমান নিয়ন্ত্রণের সমস্যার মত অন্তত ৩২ খানা ঘটনা ঘটেছে, যার অভিঘাত তীব্র হতে পারত।

এমন তথ্য আরও বেরিয়ে আসতে থাকবে। ওদিকে অজ্ঞাত কারণে বাড়তে থাকবে বিমানের টিকিটের মূল্য, ১১এ সিটের জন্য কাড়াকাড়ি পড়বে, কোটি টাকার ক্ষতিপূরণেও ফিরবে না ওই শ তিনেক মানুষের প্রাণ।

বোয়িং বা এয়ার ইন্ডিয়ার এত বিপদ সংকেতের পরও কি টনক নড়েনি? মনে হয়নি, যে ২০ লক্ষে একের মধ্যে যে কোনোদিন পড়ে যেতে পারে যে কোনো বিমান?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.