অন্তত ২৭৯ জন। আমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যার ব্যাপারে দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ডেইলি স্টার, ফ্রান্স ২৪, আরব নিউজ, মানিকন্ট্রোল-এর মত বেশ কিছু সংবাদ সংগঠনের প্রতিবেদন এখন অবধি তাই বলছে। মৃত্যুর হিসাবটাও শুরুতেই দিয়ে রাখা ভাল। এই ২৭৯ জনের মধ্যে বিমানের সওয়ারি মারা গিয়েছেন ২৪১ জন (২২৯ জন যাত্রী ও ১২ জন বিমানকর্মী), আর বাকি ৩৮ জন মাটিতে ছিলেন। উপস্থিত বুদ্ধির জোরে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছেন কেবল একজন বিমানযাত্রী। এই সংখ্যার বাড়া-কমা পুরোটাই নির্ভর করছে ডিএনএ স্যাম্পলিং শেষ হওয়ার উপর।
১৭ জুন রাতে পাওয়া আপডেট অনুযায়ী মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৬২ জনের ডিএনএ শনাক্তকরণ সম্ভব হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১২০ জনের দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ১৬ জুন রাত অবধি শনাক্তকরণ সম্ভব হয়েছিল ১২৫ জনের, যার মধ্যে ৮৩ জনের দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। আমেদাবাদ সিভিল হাসপাতালের সুপারিন্টেন্ডেন্ট ডঃ রাকেশ যোশী যা বলেছেন তাতে এই লেখা প্রকাশিত হতে হতে ডিএনএ স্যাম্পলিং শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। এমনিতেও, সোয়া এক লক্ষ লিটার জ্বালানি পেটে নিয়ে ডাক্তারি হোস্টেলে আছড়ে পড়ার মুহূর্তে যে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটেছে, তাতে মোটামুটি ১,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ উৎপন্ন হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই সেই তাপে প্রায়-ভস্মীভূত দেহ থেকে ডিএনএ শনাক্তকরণের কাজটাও কঠিন। তার উপর পুরো প্রক্রিয়ায় আছে আইনি জটিলতা। তবে শেষপর্যন্ত সরকার যা-ই ঘোষণা করুক, মৃতের সংখ্যা তিনশোর কাছাকাছি বললে বোধহয় অতিশয়োক্তি হবে না।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
প্রতি মুহূর্তে ‘স্টোরি’-র খোঁজে থাকা বুভুক্ষু সংবাদমাধ্যমে এখন ব্যক্তি ধরে ধরে ট্র্যাজিক আখ্যান চালানো হচ্ছে। ঘটনাটা যে চূড়ান্ত দুঃখজনক তা নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু ঘোর মুনাফানিয়ন্ত্রিত সংবাদ পরিবেশনের বাস্তবতায় এইসব আখ্যান আসলে কতটা সংবেদনশীলতাজাত আর কতটা স্রেফ বাণিজ্যিক ফায়দা লুটতে – তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। বিশেষত, আজকের ভারতে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের যে ভূমিকা তাতে তাদের কোনো কাজকেই সাদা মনে দেখা মুশকিল। মনে রাখা ভাল, তারা একইসঙ্গে বিমানের ধ্বংসস্তূপ থেকে গীতা উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে ধর্মীয় সুড়সুড়ি দেওয়া খবর করছে। কেউ কেউ অবশ্য এয়ার ইন্ডিয়ার পরিষেবা নিয়ে সাম্প্রতিক অতীতে আলোচিত অভিযোগগুলোকে নিয়েও খবর করেছে; তবে সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না নীতিতে এয়ার ইন্ডিয়ার বেশিরভাগ অংশীদারিত্ব যাদের, সেই টাটা গোষ্ঠীর প্রত্যেক মৃতের পরিবারকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা ফলাও করে ছাপিয়ে মধ্যবিত্তের চোখে তাদের দানবীর পুঁজিপতি হিসাবে তুলে ধরার কাজটাও বেশ ঘটা করেই হয়েছে।
যদিও এই সংবাদমাধ্যমগুলোর জানা আছে কিনা জানি না, মন্ট্রিয়ল কনভেনশন অনুযায়ী, প্রত্যেক মৃতের পরিবারকে ১.৫ কোটি টাকা দেওয়ার কথা এবং সে টাকা বিমানের বিমা থেকেই এসে যাবে, এয়ার ইন্ডিয়াকে নিজের পকেট থেকে দিতে হবে না। ফলে এক কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দেওয়া মহানুভবতা নয়, নির্ধারিত নিয়ম।
ভারতের বিমান পরিবহনের বাজারে এয়ার ইন্ডিয়া বা টাটা গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে বলতে গেলে ইতিহাসের অন্য গলিঘুঁজিগুলোও ঘুরে দেখা কর্তব্য। ১৯১১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন যুক্তপ্রদেশের এলাহাবাদ থেকে দশ কিলোমিটার দূরের নৈনি অবধি ফরাসি বিমানচালক হেনরি পেকোয়ের হাম্বার-সমার বাইপ্লেন-উড়ানটিই ছিল ভারতের মাটিতে (বা আকাশে) প্রথম বাণিজ্যিক বিমান পরিবহন। তার ঠিক পরের ডিসেম্বরেই ইন্ডিয়ান স্টেট এয়ার সার্ভিসেস ও ইম্পিরিয়াল এয়ারওয়েজের যৌথ উদ্যোগে শুরু হয় এদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবা – লন্ডন থেকে দিল্লি। কলকাতা, এলাহাবাদ ও বম্বেতে বিমানপোত নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার ঘটনাও ১০০ বছর পেরিয়েছে। টাটা সন্স করাচি থেকে মাদ্রাজ অবধি ডাকবিমান পরিষেবা চালু করে ১৯১৫ সালে। তারও ১৭ বছর পরে এই পুঁজিপতি বংশেরই সন্তান, ভারতের প্রথম লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিমানচালক, জাহাঙ্গির রতনজি দাদাভাই (জেআরডি) টাটার হাত ধরে প্রতিষ্ঠা হয় টাটা এয়ারলাইন্স, ১৯৪৬ সালে যার নতুন নামকরণ হয় এয়ার ইন্ডিয়া – কালে কালে যা ভারত সরকারের সম্পত্তিতে পরিণত হয়।
স্টেকহোল্ডার ম্যানেজমেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট শশাঙ্ক শাহের গবেষণা জানাচ্ছে, স্বাধীনতার পর এয়ার ইন্ডিয়ার রাষ্ট্রায়ত্তকরণে জেআরডি-র সায় ছিল না। ভারতে বিমান পরিবহনে টাটাদের প্রভূত ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও সরকার তাঁদের যথেষ্ট সম্মান দেয়নি – প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে এক মধ্যাহ্নভোজে তিনি এই ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। সেটা ১৯৫৩ সাল। জেআরডি-র যুক্তি ছিল, যেহেতু বিমান পরিবহন সম্পর্কে স্বাধীন ভারত সরকারের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই, সেহেতু বেসরকারি নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বিশ্বমানের পরিষেবা দেওয়া অসম্ভব। ওই মধ্যাহ্নভোজের অব্যবহিত পরেই সরকার অধিগৃহীত এয়ার ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান করা হয় তাঁকে, সঙ্গে সদ্য গঠিত ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বোর্ড অফ ডিরেক্টর্সেও সাম্মানিক পদ পান তিনি। নেহরুর আমলে তো বটেই, পরবর্তী কয়েকটা কংগ্রেস সরকারের সময়েও এয়ার ইন্ডিয়া তাঁরই হাতে ছিল।
জরুরি অবস্থার পর – গণতন্ত্রঘাতী যে সিদ্ধান্তের বড় সমর্থক ছিলেন জেআরডি স্বয়ং – জনতা পার্টির সরকার যখন ক্ষমতায়, ১৯৭৮ সালের জানুয়ারি মাসে ২১৩ জন সওয়ারি নিয়ে ফ্লাইট ৮৫৫ আরব সাগরে আছড়ে পড়ে। পরের মাসেই দুটো বিমান সংস্থার পদ থেকেই সরিয়ে দেওয়া হয় জেআরডি-কে। তার আগের বছরেই প্রায় তিন দশক পরে অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন থেকেও তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
১৯৮০ সালে ইন্দিরা গান্ধী বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে ফিরে এলে এয়ার ইন্ডিয়ায় ফিরে আসেন জেআরডি। ১৯৮৬ সাল অবধি ওই সংস্থার পরিচালন সমিতিতে তিনি ছিলেন। লক্ষণীয় যে ওই বছরই প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এয়ার ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন রতন টাটাকে। ওই পদে তিনি ছিলেন তিন বছর। সময়কালটাও লক্ষ করার মত। জেআরডি তখন অশীতিপর, ওদিকে সোভিয়েত মুলুকে বিপন্ন অর্থনীতি বাঁচাতে ‘পেরেস্ত্রৈকা’ শুরু হয়েছে, ভারতেও কয়েক বছর পরেই বেসরকারি লগ্নির জন্য বাজার উন্মুক্ত করে দেবে সরকার। জেআরডি-র জমানা শেষ হয়ে নব্য উদারবাদের ভারতে টাটা সাম্রাজ্যের নয়া অধিপতি হয়ে উঠবেন রতন টাটাই।
জেআরডি টাটার মৃত্যু ১৯৯৩ সালে, আর পরের বছরেই নরসিমা রাওয়ের মন্ত্রিসভার বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী মাধবরাও সিন্ধিয়ার মন্ত্রক ১৯৫৩ সালের এয়ার কর্পোরেশন আইন বাতিল করে। সংসদে পাশ হয় নতুন এয়ার কর্পোরেশন (ট্রান্সফার অফ আন্ডারটেকিংস অ্যান্ড রিপিল) অ্যাক্ট, ১৯৯৪। বিমান ব্যবসায় খুলে যায় ঢালাও বেসরকারিকরণের দরজা। একসময় বড় আকারের জেট বিমান চালিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুনাম কুড়িয়েছিল যে সংস্থা, ছোট আকারের বিমান চালানো নিত্যনতুন বেসরকারি প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে এঁটে ওঠা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। পাশাপাশি ক্ষতির সম্মুখীন হয় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সও। ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কেস স্টাডি জানাচ্ছে, নয়ের দশকের শেষদিকে মোট পাঁচ বছরে এয়ার ইন্ডিয়ার ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১,৫০০ কোটি টাকা। এমনকি এয়ার ইন্ডিয়ার পুরনো দোসর সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের সঙ্গে জোট বেঁধে রতন টাটার নতুন বিমান সংস্থা তৈরির স্বপ্নিল প্রস্তাবও সেইসময় খারিজ হয়ে যায়। কারণ বাকি পুঁজিপতিদের মত তিনি নাকি মন্ত্রী-আমলাদের ঘুষ দিতে চাননি। ২০০০-০১ নাগাদ বাজপেয়ী সরকারের আমলে এয়ার ইন্ডিয়ার ৪০% বিলগ্নিকরণের ঘোষণা হলেও ট্রেড ইউনিয়নগুলোর প্রবল প্রতিবাদে সে যাত্রায় তা স্থগিত হয়। উলটে আর্থিক দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হয়ে বরখাস্ত হন এয়ার ইন্ডিয়ার প্রভাবশালী ম্যানেজিং ডিরেক্টর মাইকেল মাসকারেনহাস, যাঁর নেতৃত্বে লাভের মুখ দেখছিল সংস্থা। বিমান পরিবহনে রতন টাটার প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন অবশেষে পূরণ হয় গত দশকের মাঝামাঝি, ভিস্তারা আর এয়ারএশিয়া লঞ্চের মাধ্যমে।
২০০৭ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার সঙ্গে যখন জুড়ে দেওয়া হচ্ছে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সকে, তার আগের দুবছরে ইউপিএ সরকারের অনুমোদনে বিপুল সংখ্যায় বিমান কেনা হয়েছে দুই সংস্থার তরফে। ২০০৫ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার হাতে এসেছে ৬৮টা বোয়িং, ২০০৬ সালে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের হস্তগত হয়েছে ৪৩টা এয়ারবাস ৩২০। তারপর, একত্রীকরণের মাত্র চার বছরে সম্মিলিত ঋণের পরিমাণ দাঁড়াল ৪২,৬০০ কোটি টাকা, সঙ্গে ২২,০০০ কোটি টাকার ‘অপারেশনাল লস’। বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের বিলগ্নিকরণ নীতির বিরোধী হলেও, বিবিধ কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত ও দিশেহারা ইউপিএ সরকার আশু সমাধান খুঁজে পায়নি।
২০১৪ সালে দুর্নীতি দূরীকরণকে হাতিয়ার করে এনডিএ যখন ক্ষমতায় এল, দেশের স্বঘোষিত চৌকিদার নরেন্দ্র মোদী বহুকাঙ্ক্ষিত প্রধানমন্ত্রীর গদিখানা পেলেন, ততদিনে ‘বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে’-র অব্যর্থ হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণি। সুচেতা দালালের মতো নামীদামী, উদারপন্থী সাংবাদিকরা জ্বালাময়ী নিবন্ধ লিখে বুঝিয়ে দিচ্ছেন, মন্ত্রী-আমলাদের খপ্পর থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার ধ্বংসসাধন বাঁচাতে বেসরকারিকরণই একমাত্র রাস্তা। মাঝেমধ্যে কিছু বিমান বিক্রি করে টাকা এলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। সুতরাং ক্ষমতায় আসার আগে গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব হচ্ছে বলে নানা ইস্যুতে ইউপিএ সরকারকে বিঁধত যে বিজেপি, যার মধ্যে ২০১৩ সালে ইউপিএ মন্ত্রী অজিত সিংয়ের এয়ার ইন্ডিয়ার বেসরকারিকরণ সংক্রান্ত মন্তব্যের বিরোধিতাও ছিল (এক্ষেত্রে অন্য বিরোধী বলতে সিপিএম), তারা ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেল বিলগ্নিকরণের পটুতায় এরা অতীতের এনডিএ সরকারের চেয়েও কয়েক কাঠি সরেস। সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর খুল্লমখুল্লা শেয়ার বিক্রির সুচতুর ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার বেসরকারি হাতে যাওয়ার ব্যবস্থা পাকা হয়ে গেল।
অবশেষে ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে, সরকার নির্ধারিত ১২,০৯৬ কোটি টাকার ন্যূনতম মূল্যের উপরে ১৮,০০০ কোটি টাকার কোটেশন দিয়ে মালিকানার প্রায় ৭৫% যখন টাটা গোষ্ঠী কিনে নিচ্ছে (বাকি মালিকানা যায় সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের কাছে), প্রায় ৬২,০০০ কোটি টাকার ঋণে ধ্বস্ত সংস্থার গায়ে ততদিনে বসে গিয়েছে ‘সাদা হাতি’-র অনাকাঙ্ক্ষিত ছাপ। টাটাদের জিনিস টাটাদের কাছেই ফিরে যাওয়া ভাল – উদারপন্থীরা একথা বলে বেশ তৃপ্ত হয়েছিলেন। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রায়ত্তকরণের পরিকাঠামো থেকে ব্যক্তিপুঁজিসর্বস্ব বিলগ্নিকরণের দিকে ধাবিত এই অসাম্য-যাত্রায় তাঁদের অবদান কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
তবে ৪৫,০০০ কোটি টাকারও বেশি বকেয়া ঋণের হিসাব স্মরণ করিয়ে দিয়ে সীতারাম ইয়েচুরি জোর গলায় বলেছিলেন, নামমাত্র দামে জাতীয় সম্পত্তির সবটা পেয়ে গেলেন টাটারা, এ একেবারে দিনে ডাকাতি।
আরো পড়ুন সিঙ্গুর নিয়ে হা-হুতাশ বাম আন্দোলনের উপকার করবে না
তবে বেসরকারিকরণের টনিক অন্তত এয়ার ইন্ডিয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। টাটার অধিগ্রহণের পর থেকে গত তিন বছর আট মাসে – যে সময়কালে রতন টাটা আর ইয়েচুরি প্রয়াত হয়েছেন – ব্যবস্থাপনার বিস্তর গলদ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে নানা স্তরে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট ৪৩৬-এ নিজের নির্ধারিত আসনে বসতে গিয়ে স্বয়ং কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান আবিষ্কার করেন, আসনটি ভাঙা। তার পরের মাসেই দিল্লিগামী ফ্লাইট ১২৬ শিকাগো থেকে রওনা হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার শিকাগোতে ফিরে যায়। জানা যায়, বিমানের শৌচাগারে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তারও দুমাস আগে বেঙ্গালুরু থেকে দিল্লি যাওয়ার পথে মাঝ আকাশেই বন্ধ হয়ে যায় ফ্লাইট ২৮২০-র একটি ইঞ্জিন। এক ঘন্টা পরে বেঙ্গালুরুর বিমানবন্দরেই ফিরে আসে, কোনমতে বড়সড় দুর্ঘটনা এড়ানো গিয়েছিল। এহেন অস্বস্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মী অসন্তোষ। পুরনো কর্মীদের অভিযোগ, সরকারি তরফে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে মালিকানা বদল হলেও সমস্ত সুযোগসুবিধাই তাঁরা পাবেন। কিন্তু নতুন মালিকগোষ্ঠী তা মেনে চলেনি। বিনামূল্যের বিমান টিকিট থেকে আজীবন চিকিৎসা সহায়তার মত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো ছেঁটে ফেলা হয়েছে। অনেকেই স্বেচ্ছা অবসর নিতে বাধ্য হয়েছেন। প্রচণ্ড কর্মীদরদি হিসাবে খ্যাত টাটা গোষ্ঠীর জন্য এসব আদৌ ভাল বিজ্ঞাপন নয়।
মোদী-আম্বানি-আদানি খারাপ, কিন্তু টাটা ভাল – এই অলীক বিশ্বাসে স্থিত প্রগতিশীল মানুষজনের কাছে এসব তথ্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়।
সদ্য ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনার রেশ তো এখন থাকবেই, বিশেষত গুজরাটের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী যেখানে মৃতের তালিকায়। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে এয়ার ইন্ডিয়ার বিভিন্ন বিমানের যান্ত্রিক গোলযোগের ধারাবাহিক খবর আসার ডামাডোলে আবার কোনো নতুন ধনতান্ত্রিক উলটপুরাণ জমে ওঠে কিনা, সেটাই এখন দেখার। বিশেষত, গোদি মিডিয়ার বেতাজ বাদশা রিপাবলিক টিভির মত চ্যানেলে খোদ মালিক-সঞ্চালকের মুখে টাটার বিরোধিতা করতে গিয়ে ‘কর্পোরেট অ্যাগ্রেশন’-এর মত মোদী জমানার সংবাদমাধ্যমে প্রায় নিষিদ্ধ শব্দগুচ্ছ উচ্চারিত হওয়ার মধ্যেও কিছু লুকিয়ে আছে কিনা তাও কৌতূহলোদ্দীপক।
শেষাংশ আগামীকাল। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








