সারা দেশে বা আসামে কি বাঙালিদের নিশানা করা হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বললেও সত্য বলা হবে, আবার না বললেও। খালি চোখে দেখলে প্রথম উত্তরটা স্পষ্ট। দ্বিতীয় উত্তরের সত্যতা যাচাই করতে হলে বিষয়ের গভীরে যেতে হবে। দৃশ্যমান বাস্তবতা সত্যের পুরো চেহারাটা দেখাচ্ছে না।
আরএসএস বা বিজেপির রাজনীতির ধরনটাই এমন যে সবসময়েই একটা এক মুখ থেকে দুটো পরস্পরবিরোধী কথার সমর্থন পাওয়া যায়। এদের এই বৈশিষ্ট্য গোড়া থেকেই। আরএসএস যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, সেইসময় (১৯২৫) থেকেই তারা হিটলারের ইহুদিবিদ্বেষের সমর্থক। আবার ব্রিটেনের ব্যালফোর ঘোষণা (১৯১৭) মোতাবেক প্যালেস্তাইনে ইজরায়েল রাষ্ট্র গঠনের উগ্র জায়নবাদী বন্দোবস্তেরও সমর্থক। মহাত্মা গান্ধীর জীবদ্দশায় তারাই সবচেয়ে বেশি ঘৃণা ছড়িয়েছে, সেই ঘৃণার রাজনীতির কুৎসিততম প্রকাশ গান্ধীহত্যা। তারপর মিষ্টি বিতরণ করেছে বলে স্বয়ং বল্লভভাই প্যাটেল জানিয়েছিলেন, আবার পরে আরএসএস গদগদ ভাষায় শোকবার্তাও প্রকাশ করে। বিজেপি গঠনের সময়ে আদর্শ হিসাবে গান্ধীবাদকে গ্রহণ করা হয়েছে, আবার ১৯৭৮ সালে বিহারে দীননাথ পাণ্ডে থেকে নরেন্দ্র মোদী জমানার জনপ্রতিনিধি পর্যন্ত ‘নাথুরাম গডসে জিন্দাবাদ’ বলতেও কুণ্ঠিত হননি। মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হওয়ার পর সারা দেশে সংরক্ষণবিরোধী আন্দোলনে সঙ্ঘই মদত দিয়েছে, আবার অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির জন্য সংরক্ষণ বিস্তৃত করারও তারা সোচ্চার সমর্থক।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এক মুখে দুই কথার সবচেয়ে বড় নজির মানুষ দেখেছে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা সম্পর্কে লালকৃষ্ণ আদবানি একাধিকবার বলেছেন, দিনটা তাঁর জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন।
অথচ তিনি নিজে সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং দেশের প্রথম বিজেপি প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী, যিনি নাকি আদবানির চেয়ে নরমপন্থী, ৫ ডিসেম্বর অযোধ্যায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন জমি সমতল করতে হবে।
তার উপর বাবরি মসজিদ ভেঙে পড়তেই আনন্দে উমা ভারতী জড়িয়ে ধরেন মুরলী মনোহর যোশীকে। এইরকম পরস্পরবিরোধী মুখ তুলে ধরাই আরএসএসের রাজনৈতিক কৌশল।
অনেকে ভাবেন বাজপেয়ী উদার, মোদী কট্টর। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বহুদিন আগেই আরএসএস থেকে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বে যাওয়া গোবিন্দাচার্য বলেছিলেন, বাজপেয়ী বিজেপির মুখ নয়, মুখোশ। আসামে বাঙালি হিন্দুদের তুষ্ট করতে বঙ্গভাষী অঞ্চলে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে এমনভাবে প্রচার করা হয়েছিল, যেন এই আইনের সুবাদে যখন তখন বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা এসে সটান নাগরিকত্ব পেয়ে যাবে। অন্যদিকে অসমিয়াভাষী এলাকায় বিজেপি এনআরসি নিয়ে এমন প্রচার করেছে, লোকে ভেবেছে এনআরসি হলেই আসাম থেকে সব ‘বাংলাদেশী’ সাফ হয়ে যাবে। এতে প্রলুব্ধ হয়েই এখনো বাঙালি হিন্দুদের বিপুল অংশ মনে করে, হিমন্ত বিশ্বশর্মার সরকার যা করছে তা আসলে বাঙালি মুসলমানদের বিরুদ্ধে করছে। হিন্দুদের এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। অথচ এনআরসি থেকে যে ১৯ লাখ মানুষের নাম বাদ গেছে, তার সিংহভাগই হিন্দু। ডি-ভোটার ও অননুমোদিত আধার আবেদনকারী ছয় লক্ষের মধ্যেও অধিকাংশ হিন্দু। গোয়ালপাড়া জেলায় যাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে তারা বঙ্গীয় মূলের অসমিয়া মুসলমান হলেও, আসামের অন্যত্র উচ্ছেদের বলি হচ্ছেন অসমিয়া ও বাঙালি হিন্দুসহ জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষও। কোকরাঝাড়ের বাঁশবাড়িতে বোড়োদের ৩,৬০০ বিঘা জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে আদানিদের হাতে ওই জমি তুলে দেওয়ার জন্যে। নগাঁওয়ের মিকির বামুনির প্রায় ৩০০ বিঘা জমি থেকে কার্বি ও অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়কে উচ্ছেদ করা হয়েছে আনি এজুর পাওয়ার নামের একটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সৌরশক্তি কোম্পানির হাতে ওই জমি তুলে দেওয়ার জন্যে। পলাশবাড়ীর ১,৮০০ বিঘা জমি থেকে জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষকে উচ্ছেদ করার প্রচেষ্টা চলছে, যাতে সিঙ্গাপুরের একটি কোম্পানির হাতে ওই জমি তুলে দেওয়া যায়।
ফলে এ শুধু বাঙালি উচ্ছেদ বা মুসলমান উচ্ছেদ নয়। এর মূল লক্ষ্য সাধারণ মানুষের জমি কেড়ে নিয়ে কর্পোরেট দানবদের হাতে তুলে দেওয়া। আসামে গরিবের কেড়ে নেওয়া জমির সিংহভাগ তুলে দেওয়া হচ্ছে আদানি গোষ্ঠীকে। আবার লুণ্ঠিত জমি থেকে উপকৃতদের দলে হিমন্তর স্ত্রীও রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে নানা ধরনের ব্যবসাবাণিজ্যে যুক্ত।
উচ্ছেদের যে ঘটনা নিয়ে হিমন্ত সম্প্রতি হুঙ্কার দিয়েছেন, তা ঘটেছে গোয়ালপাড়া জেলার হাসিনা বিল অঞ্চলে। সেখানে উচ্ছেদের শিকার বঙ্গীয় মূলের অসমিয়া মুসলমান কৃষকরা। বঙ্গীয় মূল অভিধাটি আসামের সমাজ ও রাজনীতিতে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। উনিশ শতকের শেষ ও বিংশ শতকের গোড়ার দিক থেকে অবিভক্ত বঙ্গদেশের ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে সরকারি উদ্যোগে কৃষকদের নিয়ে এসে আসামের বিস্তীর্ণ অনাবাদী জমিতে বসানো হয়। এই কৃষিজীবী মানুষগুলো মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ধান ও পাট চাষের মাধ্যমে আসামের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম কারিগর হয়ে ওঠেন। একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে আসামকে আপন করে নেওয়া এঁদের একটি অংশ স্বাভাবিকভাবেই ভাষিক অসমিয়া সমাজের অংশ হয়ে গেছে। বৃহত্তর অংশ দেশভাগ পরবর্তী জটিল পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতায় নিজেদের জমি ও জীবনের নিরাপত্তারক্ষার্থে সরকার ও শাসক দলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজেদের মাতৃভাষা ত্যাগ করে জনগণনায় নিজেদের অসমিয়া হিসাবে নথিভুক্ত করেছিল। সদলবলে এদের অসমিয়াত্ব গ্রহণের ফলে ১৯৫১ সালের জনগণনায় অসমিয়াভাষীরা প্রথমবার ওই রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
অসমিয়া ভাষা, সংস্কৃতিতে এই মানুষগুলোর যথেষ্ট অবদান আছে। এমনকি আসামের অসমিয়া জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতেও এরা জড়িয়ে থেকেছে নানা সময়ে। আসাম ও অসমিয়া সমাজের জন্যে এত বড় ত্যাগ করার পর আসামের আজকের রাজনীতিতে এদেরই চিহ্নিত করা হচ্ছে বাংলাদেশি হিসাবে। অথচ এরা যখন বঙ্গদেশ থেকে আসামে এসেছিল তখন বাংলাদেশ তো নয়ই, পাকিস্তানেরও জন্ম হয়নি। এরা বাড়িতে যে ভাষায় কথা বলে সেটা ময়মনসিংহীয় আঞ্চলিক বাংলা এবং অসমিয়ার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। লাতিন আমেরিকার ক্রিয়ল ভাষার মতই। এই জনগোষ্ঠীর নিরক্ষর কৃষক পরিবারগুলোর আজকের প্রজন্ম লেখাপড়া, সাহিত্য সংস্কৃতিসহ সবকিছুই করছে অসমিয়া ভাষায়। বাংলাদেশি বলে দেগে দিয়ে সরকারের নির্মম উচ্ছেদ অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় এই জনগোষ্ঠীর এক ছাত্রনেতা অভিমানে বলেছিল – তবে আমরা জনগণনায় বাংলাভাষী হিসাবেই নিজেদের ঘোষণা করব পরের জনগণনায়। হিমন্ত অসমিয়া ভাষায় এঁদের অবদানকে তুচ্ছ করার জন্যেই বাংলা ভাষার সঙ্গে বাংলাদেশিদের জড়িয়ে হুঙ্কার দিয়েছেন। এই হুঙ্কারের উদ্দেশ্য বহুবিধ। এক, উচ্ছেদ অভিযান যে কর্পোরেট পুঁজিকে উপহার দেওয়ার জন্য – সেই সত্য আড়াল করে একে বাংলাদেশিবিরোধী অভিযান বলে ভাষা সংস্কৃতির প্রশ্নে স্পর্শকাতর অসমিয়া সমাজের চোখে ঠুলি পরানো। দুই, অনর্গল মুসলমানবিদ্বেষী কথাবার্তা বলে বাঙালি হিন্দুর সমর্থনকেও অটুট রাখা।
কয়েকটি কথা বোধহয় অনুধাবন করা জরুরি। এই মুহূর্তে নানা ধরনের ঘটনা ঘটছে। উত্তর ও পশ্চিম ভারতের নানা রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের নানা জেলা থেকে যাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদের বাংলাদেশি বলে দেগে দিয়ে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাংলায় কথা বললে আর ধর্মে মুসলমান হলেই বলে দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশি। বেশ কয়েক বছর ধরেই বিজেপি একটি ধারণা তৈরি করছে যে ভারতে বাংলাভাষী মুসলমান যাদের দেখতে পাওয়া যায়, তারা সবাই বাংলাদেশি। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দুদের এক বড় অংশও মনে করে, রাজ্যের বাঙালি মুসলমানদের বেশিরভাগই বাংলাদেশি। বাজপেয়ীর আমলে আসামের রাজ্যপাল আসামে লুঙ্গি পরা মানুষকে দেখেই ধরে নিয়েছিলেন এরা সবাই বাংলাদেশি। সেই ভ্রান্ত ধারণা থেকেই তিনি একটি প্রতিবেদন কেন্দ্রে পাঠান, যাতে বলা হয় – আসামে এক কোটি অনুপ্রবেশকারী আছে। এই নিয়ে শোরগোল হয় সারা দেশে। তখন মমতা ব্যানার্জি লোকসভায় অধ্যক্ষের মুখে কাগজের তাড়া ছুঁড়ে দিয়ে দাবি করেন – বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য চক্রান্ত করে বাংলাদেশ থেকে লোক এনে ভোটার তালিকা ভরিয়ে দিয়েছেন। সেখান থেকে ভোটারদের সচিত্র পরিচয়পত্র তৈরি করার দাবি ওঠে। সেই প্রেক্ষাপটে মমতার উৎসাহ এবং বাজপেয়ীর চাণক্যবুদ্ধিতে ২০০৩ সালে আনা হয় নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন। আজকের যত গণ্ডগোল, তার মূলে ওই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন।
তার মানে আজকের জটিলতার সূত্রপাতও আসাম থেকেই। কিন্তু কারণটা কী? কেন আসাম? উনবিংশ শতক থেকে আসামে অসমিয়া ও বাঙালিদের মধ্যে ঐতিহাসিক কারণেই দ্বন্দ্ব, সংঘাত রয়েছে। বিষয়টা আভ্যন্তরীণ। ১৮২৬ সালে আসাম ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আসার পর থেকে স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত অনেকগুলো ঘটনা ঘটে। যেমন আসামকে বঙ্গদেশের সঙ্গে যুক্ত করা, বিপুল সংখ্যক বাঙালিকে আসামে নিয়ে যাওয়া, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সরকারি কাজে এবং শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে বাংলা চাপিয়ে দেওয়া, স্বতন্ত্র আসাম প্রদেশ গঠনের সময়ে বাংলার দুটি অংশকে আসামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার ফলে রাজ্যের জনবিন্যাস বদলে যাওয়া, ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যায় বাঙালি কৃষক এনে আসামের অনাবাদী জমিতে বসতি তৈরি করে দেওয়া। এসবের ফলে অসমিয়াদের মধ্যে বাঙালিবিরোধিতা তৈরি হয়। স্বাধীনতার পর বহুভাষী আসামকে একভাষী রাজ্যে পরিণত করার উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ফলে বারবার বাঙালিবিরোধী সহিংসতা হয়েছে। ১৯৭৮ সালে আসাম বিধানসভার নির্বাচনে সিপিএম সহ সব বামপন্থী দল চমকপ্রদ ফল করার পর নতুন করে বাঙালিবিরোধী রাজনৈতিক অসন্তোষ শুরু হয়। অন্যতম কারণ ছিল আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত বরুণ সেনগুপ্তের একটি নিবন্ধ, যেখানে তিনি আসামে সিপিএমের অগ্রগতিকে বাঙালির আধিপত্য বৃদ্ধি হিসাবে অভিহিত করেন।
এর প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ্যে আনন্দবাজার পুড়িয়ে শুরু হয় বিদেশি বিতাড়ন আন্দোলন নাম দিয়ে বাঙালিবিরোধী রাজনৈতিক অসন্তোষ। কেন্দ্রে তখন ক্ষমতায় জনতা পার্টির সরকার। ওই সরকারের অন্যতম শরিক আরএসএসের রাজনৈতিক শাখা জনসঙ্ঘের সদস্যরা তাদের রাজনীতি বিস্তারের একটি সুযোগ দেখতে পায়। ততদিন অবধি এই উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতি সীমিত ছিল শুধুমাত্র বাঙালিবিরোধিতায় এবং সম্পূর্ণত আসামে সীমাবদ্ধ। এবার যুক্ত হল সিপিএমবিরোধিতার নতুন মাত্রা এবং সর্বভারতীয় রাজনীতির সঙ্গেও যোগসূত্র তৈরি হল। আরএসএস বাঙালি তাড়ানোর আন্দোলনের পক্ষে প্রচার শুরু করে সারা দেশে। আরএসএস অনুধাবন করে যে আসামের এই বাঙালিবিরোধিতার রাজনীতিকে বাংলাদেশি বিরোধিতার নাম করে মুসলমানবিরোধিতার রাজনীতিতে পরিণত করতে পারলে সারা দেশে ছড়াতে না পারার ৫০ বছরের ব্যর্থতা কেটে যেতে পারে।
তখন থেকেই ধীরে ধীরে বাঙালিবিরোধিতা গড়াতে থাকে বাংলাদেশীবিরোধিতার নামে মুসলমানবিদ্বেষের দিকে। ১৯৯৯ সালে বাজপেয়ী সরকার গঠিত হওয়ার পর আসামে আরএসএস-ঘনিষ্ঠ লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস কে সিনহাকে রাজ্যপাল করে পাঠানো হয়। বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ নিয়ে তাঁর অসত্য প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন দিয়ে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বিরোধিতার রাজনীতির শুরুয়াত। হিন্দুত্ব রাজনীতির অগ্রণী গবেষক ক্রিস্তোফ জ্যাফ্রেলো একটি বইয়ে লিখেছেন, ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে একশো বছর ধরে আরএসএস তাদের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং সাংগঠনিক কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন আনেনি। কিন্তু সেই লক্ষ্যপূরণের পথে তারা বারবার রাজনৈতিক কৌশলের বদল ঘটিয়েছে। আরএসএসের লক্ষ্য মুসলমান ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ এবং কমিউনিস্টবিরোধিতার উপর ভিত্তি করে সমস্ত অমুসলিম ও অখ্রিস্টান ভারতীয়কে ঐক্যবদ্ধ করে ভারতকে সংখ্যাগুরুবাদী হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করা। সেই রাষ্ট্রে মুসলমান ও খ্রিস্টানরা হবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।
আরো পড়ুন বাংলাভাষী শ্রমিকরা আবার আক্রান্ত: এনআরসির প্রস্তুতি চলছে?
এই ঐক্যবদ্ধ করার ব্যাপারটা খুবই গোলমেলে। আরএসএস মুখে অস্পৃশ্যতার বিরোধিতা করলেও অস্পৃশ্যতার উৎস যে বর্ণবাদ, তার দৃঢ় সমর্থক। এ বিষয়েও তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত এবং অপরিবর্তনীয়। ফলে মুসলিম ও খ্রিস্টান ছাড়া বাকিদের ঐক্যবদ্ধ করে যে হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্ন তারা লালন করে, তা প্রকৃতপক্ষে এক বর্ণবাদী হিন্দুরাষ্ট্র, যেখানে শাসনক্ষমতা থাকবে উচ্চবর্ণের হাতে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর সরকার আরএসএসের এতদিনকার ঘোষিত স্বদেশি অর্থনীতির মুখোশ খুলে নয়া উদারবাদী ধান্দার পুঁজিবাদের সঙ্গে মিত্রতা করে। ফলে ভারতের শিল্পক্ষেত্রে এতদিনকার প্রতিষ্ঠিত পুঁজিপতি গোষ্ঠীগুলোকে সরিয়ে হঠাৎ করে উল্কার মত উত্থান হয় গৌতম আদানির; মুকেশ আম্বানিও ফুলে ফেঁপে ওঠেন। বিজেপির রাজনীতি হিন্দুত্ব ও নয়া উদারবাদের ককটেল হয়ে দাঁড়ায়। আজকের ভারতে ছত্তিসগড়ে মাওবাদীবিরোধী অভিযানের উদ্দেশ্য যেমন সেখানকার খনিজসমৃদ্ধ পাহাড় জঙ্গলকে কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়া, তেমনি আসামের উচ্ছেদ অভিযান, মণিপুরের কুকি-মেইতেই সংঘাতের নেপথ্যেও খনিজসমৃদ্ধ পাহাড় ও অরণ্য কর্পোরেট পুঁজিকে সঁপে দেওয়া। আবার উত্তর ভারত জুড়ে বাংলাদেশীবিরোধী অভিযান আর বিহার থেকে শুরু হওয়া ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া হিন্দুরাষ্ট্রের নির্বাচনী স্বৈরতন্দ্র গড়া দিকেই একটি পদক্ষেপ। আসামে প্রশাসন পরিচালনায় সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থ হিমন্ত সরকার চাইছে সরকারের অপদার্থতা থেকে মানুষের নজর ঘোরাতে চিরাচরিত বাঙালিবিদ্বেষের উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে উস্কে দিতে। এখন অবধি আসামের অসমিয়া সমাজের মধ্যে এই প্রচেষ্টা কোনো দাগ ফেলতে পারেনি। হিমন্ত সম্ভবত আশা করছেন, পশ্চিমবঙ্গে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উগ্র বাঙালিয়ানার দিকে যাবে। তাহলেই আসামের স্তিমিত হয়ে যাওয়া উগ্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদ আবার মাথা তুলবে। সঙ্গে বাংলাদেশিবিরোধিতা তুঙ্গে তোলায় বাঙালি হিন্দুর সমর্থন বজায় থাকার আশা তো রইলই।
সুতরাং বাঙালি উপলক্ষ মাত্র, আসল লক্ষ্য ধান্দার পুঁজিবাদের প্রতিভূ শিল্পপতিদের হাতে প্রাকৃতিক সম্পদ তুলে দেওয়া এবং ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র হওয়ার দিকে আরও এক কদম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








