শেখ খুরশিদ আলম

২০২০ সালে যখন কোভিড-১৯ অতিমারী এই দেশটাকে গ্রাস করল, আমি তখন ছত্তিসগড়ের একটা ছোট্ট ব্লকে ছিলাম। তখন সবাই সবেতেই ভীত। সংক্রমণের ভয়, অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুভয়। কিন্তু করোনা ভাইরাস যত ছড়াল, তত আরও একটা মহামারী দেখা দিল – সাম্প্রদায়িক ঘৃণার মহামারী। জনস্বাস্থ্য সংকট হিসাবে যা শুরু হয়েছিল তা দ্রুত কিছু মানুষকে বলির পাঁঠা করা এবং খলনায়ক বলে প্রমাণ করার প্রচারাভিযান হয়ে দাঁড়াল। এই ভাইরাস ভারতে ছড়ানোর জন্যে তবলিগী জামাত নামে মুসলমানদের এক ধর্মীয় গোষ্ঠীকে দায়ী করে দেওয়া হল। এমনকি বলা হল, এরা দেশের বিরুদ্ধে এক বায়ো-যুদ্ধ শুরু করেছে। এই বয়ান নির্মাণের আমি কেবল সাক্ষী নই। বেদনাদায়ক ব্যাপার হল, এতে আমার সামান্য অংশগ্রহণও ছিল।

আমাদের স্থানীয় মসজিদ – মোটামুটি পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধে একমাত্র মসজিদ – চালান তবলিগী জামাতের সঙ্গে যুক্ত মুসলমানরা। আমি নিয়মিত সেখানেই নমাজ পড়তে যেতাম। কিন্তু যখন সংবাদমাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে খাপ পঞ্চায়েত বসছে রোজ, সেইসময় আমিও ওই পঞ্চায়েতের ছড়ানো ভয়ের শিকার হই। ওই মসজিদে যাওয়া বন্ধ করে দিই, বাড়িতেই নমাজ পড়া শুরু করি। শুধু তাই নয়, ওই জামাতকে একত্রে প্রার্থনা বন্ধ করতে বলে এবং সাবধান হতে বলে আমি সোশাল মিডিয়ায় পোস্টও করেছিলাম। এখন পিছন ফিরে ভাবলে মনে হয়, আমি বোধহয় জনস্বাস্থ্য নিয়ে ততটা চিন্তিত ছিলাম না। বরং অবচেতনে যে বয়ান তখন আধিপত্য করছিল তার কাছেই আত্মসমর্পণ করেছিলাম। মনে করেছিলাম আমি যথেষ্ট ভারসাম্য বজায় রাখতে পেরেছি। এখন বুঝতে পারছি যে আসলে আমি কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েছিলাম এমন একটা সময়ে, যখন আমার আদর্শগত অবস্থান নেওয়া উচিত ছিল। এর জন্যে আমার এখন আফসোস হয়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

দিল্লির নিজামুদ্দীন মরকজে তবলিগী জামাত হয়েছিল ২০২০ সালের মার্চ মাসের গোড়ার দিকে। এমন একটা সময়ে, যখন দেশজুড়ে কোনো লকডাউন ঘোষিত হয়নি, আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবাও চালু ছিল এবং কোনো ধরনের প্রকাশ্য অনুষ্ঠানেই কোনো বারণ ছিল না। ওই জমায়েতে বহু জায়গার ভারতীয়দের সঙ্গে বিদেশিরাও এসেছিলেন। তাঁদের অনেকেই আটকে পড়েন হঠাৎ লকডাউন শুরু হওয়ায়। সঙ্গে সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের আক্রমণ আরম্ভ হয়। টিভি চ্যানেলগুলো প্রাইম টাইমে এই জমায়েতকে ‘সুপার-স্প্রেডার ইভেন্ট’ বলে আখ্যা দেয়। ভুয়ো খবর এবং সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের ছড়াছড়ি হয়। মুসলমানরা থুতু ফেলে করোনা ছড়াচ্ছে বা ‘করোনা জিহাদ’ করছে – এমন কথা আকাশে বাতাসে ভাসতে থাকে। তবলিগী জামাতের শুধু সমালোচনা করা হয়নি, ব্যাপারটাকে রীতিমত দানবিক বলে প্রচার করা হয়েছিল। বিশেষত দিল্লির সরকার এমন তথ্য প্রকাশ করে যা দেখায় যে ভারতে কোভিড-১৯ ছড়িয়ে দেওয়ায় ওই জামাত প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল। পুলিস এফআইআর করে, বিদেশিদের আটক করা হয়। বহু মসজিদে নজরদারি শুরু হয়, গোটা মুসলমান সমাজকেই সন্দেহের পাত্র করে ফেলা হয়।

আজ পাঁচ বছর পরে ভারতের বিচারবিভাগের কল্যাণে সত্য উদ্ঘাটিত হল। তবলিগী জামাতের ভারতীয় সদস্যদের বিরুদ্ধে যে ১৬ খানা চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছিল লকডাউনের সময়ে বিদেশিদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য, কয়েকদিন আগে দিল্লি হাইকোর্ট সেগুলোকে খারিজ করে দিয়েছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে দিল্লি পুলিস এই খারিজের আবেদন করে যে পিটিশনগুলো দায়ের করা হয়েছিল, সেগুলোর বিরোধিতা করে। পুলিসের বক্তব্য ছিল, ওই ব্যক্তিরা বিধিনিষেধ না মেনে ভাইরাস ছড়াতে সাহায্য করেছিল। এই দাবি আইনের চোখে সত্য বলে প্রমাণিত হয়নি। ওই নাগরিকরা কেউ অপরাধী ছিলেন না। ওঁরা আসলে ভ্রান্ত নীতি, সংবাদমাধ্যমের তৈরি করা হিস্টিরিয়া আর সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতের শিকার।

এই পরিস্থিতি তৈরি করার জন্যে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে যা-ই বলা হোক, যথেষ্ট হবে না। মার্কামারা গোদি মিডিয়ার অ্যাংকররা তো বটেই, রাজদীপ সরদেশাইয়ের মত যেসব সাংবাদিক নিজেদের যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন, ধর্মনিরপেক্ষ কণ্ঠ বলে তুলে ধরেন, তাঁরাও সরকারের অবস্থানই প্রচার করে গেছেন কোনোরকম সমালোচনা ছাড়া। তাঁরা প্রশ্ন না তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁরা জিজ্ঞেস করেননি – কেন জামাতের সদস্যদের প্রতি আচরণ কুম্ভমেলা বা রাজনৈতিক সভাগুলোতে যারা উপস্থিত থেকেছে তাদের প্রতি আচরণের থেকে আলাদা হল? কেন মুসলমানদের যে কোনো জমায়েতকে বলা হল দায়িত্বজ্ঞানহীন, আর হিন্দুদের সমাবেশগুলোকে বিশ্বাসের ব্যাপার বলে তুলে ধরা হল? সেইসময় চ্যানেলে চ্যানেলে বিতর্ক সভা বসানো হয়েছিল, যেখানে আলোচনা করা হত তবলিগী জামাতকে নিষিদ্ধ করা উচিত কিনা তা নিয়ে। অথচ আদৌ তারা কোনো আইন ভেঙেছে কিনা তা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। নমাজে বসা মুসলমানদের ছবি ফোনে ফোনে ছড়ানো হচ্ছিল নানারকম মিথ্যা অভিযোগ সমেত, অথচ সংবাদমাধ্যম সত্যের রক্ষাকর্তা হিসাবে কাজ করার বদলে নিরপরাধকে অপরাধী প্রমাণ করার অস্ত্র হয়ে উঠেছিল।

গোটা ঘটনায় তৎকালীন অরবিন্দ কেজরিওয়াল সরকারের ভূমিকা বিশেষভাবে হতাশাজনক। ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি এবং প্রশাসনিক কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য বিখ্যাত কেজরিওয়াল চাপের মুখে নতিস্বীকার করেন। তাঁর সরকার তথ্য দিয়ে বলে যে দিল্লির প্রায় অর্ধেক কোভিড কেসের জন্যেই নাকি তবলিগী জামাত দায়ী। অথচ এই তথ্যের ভিত্তি, সময়কাল প্রকাশ করা হয়নি। কোন প্রক্রিয়ায় এই তথ্য পাওয়া গেল তাও বলা হয়নি। কুম্ভমেলা বা রাজনৈতিক সভাগুলোর বেলায় কেজরিওয়ালের নীরবতা এক ভয়ঙ্কর সত্য প্রকাশ করে – তাঁর ধর্মনিরপেক্ষতা খাঁটি নয়, প্রয়োজনে পরিত্যাজ্য। যখন ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো আর সংখ্যাগুরুবাদী আবেগের মধ্যে একটা বেছে নেওয়ার সময় এসেছিল, তখন তিনি দ্বিতীয়টাকেই বেছে নিয়েছিলেন।

আরো পড়ুন কোভিডে মৃত মানুষের চিতার ধোঁয়া এখনো দেখা যাচ্ছে তাহলে?

একইরকম হৃদয়বিদারক মুসলমান নেতাদের সেই সময়কার নীরবতা বা দুর্বলতা। যে সময়ে মুসলমান সমাজকে সামগ্রিকভাবে খলনায়ক করে তোলা হচ্ছিল, তখন প্রভাবশালী মুসলমানরা হয় মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন অথবা রক্ষণাত্মক ভূমিকা নিয়েছিলেন। হাতেগোনা কয়েকজন তবলিগী জামাতের পাশে দাঁড়িয়েছেন বা তখনকার হিস্টিরিয়াকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। কেউ কেউ ওই জমায়েত দায়িত্বজ্ঞানহীন ছিল – এই মতের প্রতিধ্বনিও করেছেন। ফলে যে অন্যায় ব্যবহার মুসলমানদের প্রতি করা হয়েছিল তা আরও বৈধতা পেয়ে যায়। শক্তিশালী নেতৃত্বের অভাব মুসলমানদের দোষী হওয়ার বয়ানকে আরও ছড়ানোর সুযোগ করে দেয়।

ওয়াকফ আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনেও দ্বিধা এবং বিলম্বিত প্রতিরোধের এই ধারাই আবার দেখা গেছে। গতবছর যখন ওয়াকফ সম্পত্তি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর উপরে দেশজুড়ে আক্রমণ শুরু হল বিভিন্ন সমীক্ষা, বেআইনি দখল এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে, সাধারণ মুসলমান নীরব ছিলেন। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে এতে তাঁদের কিছু এসে যায় না। মুসলমানদের বড় বড় সংগঠনগুলো অনেক দেরিতে নড়েচড়ে বসে। তারপরেও তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল নেহাতই নিরীহ। কিন্তু তবলিগী জামাতের ব্যাপারটার মতই, ওয়াকফের উপরে আক্রমণও স্রেফ একটা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ব্যাপার নয়। এই আক্রমণ মুসলমান পরিচিতি, স্বনির্ভরতা, এমনকি খোদ উপস্থিতির উপরে। যতদিনে ওয়াকফ আইন সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে পড়ল, ততদিনে যা হওয়ার হয়ে গেছে। বহু সম্পত্তি সিল করা হয়েছে, মাদ্রাসার জন্য মঞ্জুর অর্থ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং আবার এক বয়ান তৈরি করা হয়েছে যে ওয়াকফ সম্পত্তি মানেই সেটা বেআইনিভাবে দখল করা।

এই দুয়ের তুলনা অনেকের অহেতুক মনে হতে পারে। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই মুসলমানদের প্রথমে অপরাধী হিসাবে দেখানো হয়েছে, তারপর কোণঠাসা করা হয়েছে। তাদের নেতারা হিসাব কষেছেন, দ্বিধায় ভুগেছেন অথবা চুপ করে থেকেছেন।

এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রের ভূমিকাও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। পুলিস কেবল তদন্ত করেনি, হয়রান করেছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই মানুষকে আটক এবং গ্রেফতার করা হয়েছে। সামান্য কারণে বা অকারণে এফআইআর করা হয়েছে। এমনকি আমার ছোট্ট জেলাতেও স্থানীয় প্রশাসকরা তবলিগী জামাতের সঙ্গে যুক্ত মুসলমানদের তালিকা বানাতে শুরু করেছিলেন। অর্থ পরিষ্কার – একটা নির্দিষ্ট ধর্মের লোক হলেই তুমি নজরদারির আওতায় এসে যেতে পারো।

দিল্লি হাইকোর্টের রায়কে স্বাগত। কিন্তু যা যা ঘটেছে তার কেউ নেবে কি? পুলিস যাদের হয়রান করেছে তাদের কাছে দুঃখপ্রকাশ করবে? রাষ্ট্র এই নিরপরাধদের ক্ষতিপূরণ দেবে? নাকি একটা গোটা জনগোষ্ঠীকে বদনাম করার পর এবং আতঙ্কে রাখার পর আবার যেমন চলছিল সব তেমনই চলবে? তবলিগী জামাত পর্ব মনে রাখা উচিত কেবল এতদিনের আইনি অবিচারের জন্য নয়, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার যে ভঙ্গুর চেহারা এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে উঠে এল – তার জন্যেও। একটা ভাইরাসের নামে একটা গোটা সম্প্রদায়কে দানব বলে তুলে ধরা হল, আর সেইসময় অনেকেই, এমনকি আমিও, পিঠ সোজা করে দাঁড়াতে ব্যর্থ হলাম। তবলিগী জামাত আর ওয়াকফ আইন সংক্রান্ত ঘটনা আমাদের যা শেখায় তা এই যে, যখন সত্য আক্রান্ত হয় তখন নিরপেক্ষ থাকা মানে মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা। যখন একটা সম্প্রদায়কে চাঁদমারি করা হয়, তখন চুপ করে থাকা বিচক্ষণতা নয় – আক্রমণকারীর পক্ষে দাঁড়ানো। আদালত মিথ্যা অভিযোগ খারিজ করে নিজের দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু আমাদের দায়িত্ব নিজেদের মধ্যে গেড়ে বসা পক্ষপাত এবং অন্ধবিশ্বাসগুলোকে খারিজ করা। ওগুলো না থাকলে এই ধরনের অভিযোগ কলকে পায় না।

ইনিউজরুমে প্রকাশিত মূল প্রবন্ধ থেকে অনূদিত। নিবন্ধকার পেশায় আইনজীবী। সাংবিধানিক অধিকার, সংখ্যালঘু উন্নয়ন এবং শিক্ষা সংস্কার নিয়ে কাজ করেন। নাগরিক অধিকার, শিশু অধিকার এবং ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ নিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ শিবির চালান। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.