দেবব্রত মণ্ডল

কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী লিখেছিলেন ‘অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল’। অথচ অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি, যে ছেলেটা একদিন ক্ষান্তবর্ষণ কাক ডাকা বিকেলের লাজুক রোদ্দুর হতে চেয়েছিল, সে শেষপর্যন্ত হয়েছিল ছাপাখানার কর্মচারী। এমন কতশত অমলকান্তির স্বপ্ন অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যায় তার ইয়ত্তা নেই। কত অমলকান্তি শীতের অবসন্ন দুপুরে বা বৃষ্টিভেজা বিকেলের মনকেমন করা আলোয় স্কুলের শেষ বেঞ্চেই তার সোনালি স্বপ্ন ফেলে রেখে আসে তার হিসাব মেলে না। বহু অমলকান্তি অকালে হারিয়ে যায়, আমরা মনে রাখি না। কিন্তু এবার বোধহয় সেই দিন শেষ হতে চলেছে। তার কারণ পশ্চিমবঙ্গের বেশকিছু সরকারি এবং সরকারপোষিত স্কুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে স্কুলে পিছনের বেঞ্চ থাকবে না। উত্তর ২৪ পরগণা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগণার স্কুলে পরীক্ষামূলকভাবে এই ব্যবস্থা শুরুও হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা ক্লাসে বসছে অর্ধবৃত্তাকারে। এই ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দূরত্ব কমছে শিক্ষক, শিক্ষিকাদের। ক্লাসঘরে বৈষম্যের অবসান ঘটাতে কেরালা, তামিলনাড়ুতেও এই ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ছাত্রছাত্রী, অভিভাবকদের মধ্যে সাড়াও ফেলেছে এই ব্যবস্থা। শিক্ষাবিদ থেকে মনোবিদ – অনেকেই এমন উদ্যোগের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

এই ভাবনায় সুফল পাওয়া যাবে কি? মনোবিদ সুনিপা রায়ের মতে ‘এমন একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছনো খুব দরকার ছিল। তার কারণ ফার্স্ট বেঞ্চে যারা বসে তারাই বাকিদের তুলনায় ভাল ছাত্রছাত্রী – এই ধারণার কোনো সারবত্তা নেই। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ফার্স্ট বেঞ্চের তুলনায় লাস্ট বেঞ্চের ছাত্রছাত্রীরা অনেক বেশি সফল।’ তিনি আরও বলেন ‘এতদিন আমরা জানতাম ফার্স্ট বেঞ্চে বসা ছাত্রছাত্রীরাই ক্লাসে ভাল ফল করে, কিন্তু এই ফার্স্ট বেঞ্চ এবং লাস্ট বেঞ্চের ধারণাটা না থাকলে এটাই প্রমাণ হয়, নম্বরটাই জীবনে উন্নতির একমাত্র মাপকাঠি নয়। কারণ এমন বহু ছাত্রছাত্রী আছে যারা পড়াশোনা ছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রে নজরকাড়া ফলাফল করেছে।’

আর এক মনোবিদ তিয়াসা ভট্টাচার্যও এই খবরে খুশি। তিনি বললেন ‘স্কুল থেকে ফার্স্ট বেঞ্চ এবং লাস্ট বেঞ্চের কনসেপ্ট বাতিল হয়ে গেলে ইঁদুর দৌড় কিছুটা হলেও কমবে। আগেকার দিনে শিশুদের মেলামেশার পরিসরটা অনেক বড় ছিল। অথচ এখন যত দিন যাচ্ছে, নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির কনসেপ্ট তত বাড়ছে। ফলে সেই অর্থে তাদের কোনো বন্ধু নেই। এসবের পরে কোনো শিশু যদি দেখে পড়াশোনায় কিছু খামতির জন্য তার জায়গা স্কুলের লাস্ট বেঞ্চে, তাহলে সে হীনমন্যতায় ভুগতে বাধ্য। পরবর্তী জীবনে তার মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। তাই যে সমস্ত স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষিকা শিশুমনের এই দিকটি নিয়ে ভেবেছেন, তাঁদের সাধুবাদ জানাতেই হবে।’

কিন্তু এর সঙ্গে বেশকিছু প্রশ্নও উঠে আসছে। বেশিরভাগটাই পরিকাঠামো সংক্রান্ত। বহু স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষিকার বক্তব্য – পরিকাঠামোগত সমস্যার কারণেই তাঁরা এমন পদক্ষেপ নিতে পারছেন না। কী সেই সমস্যা? কিছু পরিসংখ্যানের দিকে চোখ রাখলেই বোঝা যায়, এ রাজ্যের শিক্ষা ঢাল নেই তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দার। ২০১৯ সালের নীতি আয়োগের রিপোর্ট অনুযায়ী, স্কুলশিক্ষার মানের সূচকে গোটা দেশে অনেক এগিয়ে কেরালা। তারা আগেই প্রথম বেঞ্চ-শেষ বেঞ্চ ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। অথচ নীতি আয়োগের সেই রিপোর্টে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না বাংলার নাম। কারণ বাংলা নিজেদের তথ্য পাঠায়নি। কিন্তু তথ্য কেন পাঠানো হয়নি, সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না কোথাও। তাহলে কি তথ্য পাঠালে রাজ্যে শিক্ষার বেহাল দশাটা আরও পরিষ্কার হয়ে যেত? বাংলায় বর্তমানে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকের অনুপাত ৭০:১, যা হওয়া উচিত ৩০:১। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে ২৬,০০০ চাকরি বাতিলের ঘটনাও, যার ফলে বহু ছাত্রছাত্রীকে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। কোনো কোনো স্কুলে একসঙ্গে একাধিক মাস্টারের চাকরি বাতিল হওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে পড়ুয়ারা।

অ্যানুয়াল স্ট্যাটাস অফ এডুকেশন রিপোর্ট ২০২৩ অনুযায়ী, দেশের গ্রামীণ এলাকায় ১৪-১৮ বছর বয়সী ছাত্রছাত্রীদের ২৫% মাতৃভাষায় লেখা বাক্য পড়তে পারছে না, ৫৪% শিক্ষার্থী তিন অঙ্কের সংখ্যাকে এক অঙ্কের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করতে পারছে না। মাতৃভাষায় লেখা পড়তে না পারার দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গের স্থান উপরের দিকেই। প্রথম নামে এক সংস্থা স্কুলপড়ুয়াদের সার্বিক উন্নতির বিষয়ে একটা সমীক্ষা করে। তার রিপোর্ট দেখলে চোখ কপালে উঠে যাবে। দেখা যাচ্ছে, ২০১৪ সালে অষ্টম শ্রেণির ৭৬.৩% ছাত্রছাত্রী অন্তত দ্বিতীয় শ্রেণির উপযুক্ত বই পড়তে পারত, ২০২১ সালে সেই সংখ্যা কমে হয়েছে ৬৮.৩%। ২০২২ সালে পশ্চিমবঙ্গে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা যে ২০২১ সালের তুলনায় চার লক্ষ কমে গিয়েছিল, সেকথা তো সকলের জানা। সংখ্যাটা কিন্তু মোটেই হেলাফেলা করার নয়। আবার কেন্দ্রের এক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ১৫-৪৯ বছরের মধ্যে পুরুষদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলা বহু পিছিয়ে। এও দেখা গেছে যে, বাংলার ৪২% মেয়ের বিয়ে হয়েছে তারা সাবালিকা হওয়ার আগেই এবং ১৫-১৯ বছরের মেয়েদের ১৬% সন্তানসম্ভবাও হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, নাবালিকা বিবাহের তালিকাতেও বাংলার স্থান উপরের দিকে। এই রিপোর্টকে কেউ পশ্চিমবঙ্গের বিরুদ্ধে চক্রান্ত বলে বাতিল করে দিলে বলতে হবে তিনি শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছেন।

আরো পড়ুন মলিন মাধ্যমিক পরীক্ষা মলিনতর হচ্ছে, প্রতিকার প্রয়োজন এখনই

অথচ প্রতিবছর ছাত্রছাত্রীদের কাছে সরকারের তরফে পৌঁছে যাচ্ছে ট্যাব কেনার টাকা। সেই ট্যাব ছাত্রছাত্রীদের উন্নতিতে কোনো সদর্থক ভূমিকা পালন করছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। রাজ্য সরকারের তরফে বহু নেতা, মন্ত্রী মাঝে মাঝেই কন্যাশ্রী নিয়ে গলার শিরা ফুলিয়ে ভাষণ দেন। তার পুরোটা না হলেও, অনেকটাই যে ফাঁকা আওয়াজ তা উপরের পরিসংখ্যান থেকেই প্রমাণিত। শাসক দলের নেতারা যে মাঝে মাঝেই রাস্তায় উন্নয়নকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পান, সে উন্নয়নের মধ্যে বোধহয় শিক্ষা পড়ে না।

২৮ আগস্ট ২০২৩। বেশকিছু সংবাদমাধ্যমে দেখানো হয়েছিল, বাংলায় প্রায় আট হাজার সরকারি এবং সরকারপোষিত স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা তলানিতে। একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে বাংলায় গত কয়েক বছরে বহু সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। ২০২০-২১ সালে কোচবিহার জেলায় পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৫০৮, এখন কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯৫। বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা যাবে কোথায়? সবার পক্ষে নিশ্চয়ই গাঁটের কড়ি খরচ করে বেসরকারি স্কুলে ভর্তি হওয়া সম্ভব নয়? আমরা অনেকেই স্বীকার করতে চাই না যে, স্কুলের তথাকথিত ‘ব্যাকবেঞ্চার’ ছেলেমেয়েরা অনেকেই আসলে আর্থিকভাবে দুর্বল বলেই লেখাপড়ায় ভাল হয়ে উঠতে পারে না। একটা সরকারি স্কুল বন্ধ হলে এমন কত ‘ব্যাকবেঞ্চার’-কে চিরতরে লেখাপড়া ছেড়ে দিতে হয় তার হিসাব করাও অসম্ভব। অথচ সরকারি স্কুল বন্ধ হওয়া রুখতে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা আমরা জানি না। এ তো পরোক্ষভাবে বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থার হাত শক্ত করা, যাতে শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা জমে ওঠে।

শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকারের মতে ‘ফার্স্ট বেঞ্চ এবং লাস্ট বেঞ্চের কনসেপ্ট তুলে দেওয়া নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য পদক্ষেপ। কিন্তু এর অনেকাংশ নির্ভর করবে পরিকাঠামোর উপরে। পরিকাঠামোগত উন্নয়ন না হলে এমন পদক্ষেপ কখনোই সার্বিকভাবে বাস্তবায়িত হবে না। এই গোটা বিষয়টির মধ্যে অনেক যদি এবং কিন্তু রয়ে গেছে। স্কুলগুলির উন্নতি, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির মত বিষয়গুলিকে মাথায় রেখে দেখতে হবে এমন পদক্ষেপ সম্ভব কিনা।’

প্রায় একই কথা বললেন পশ্চিম মেদিনীপুরের সোনাখালি গার্লস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সুতপা পাল। তাঁর কথায় ‘এমন পদক্ষেপের ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষক, শিক্ষিকাদের অনুপাত মাথায় রাখতে হবে। পরিকাঠামোগত অসুবিধার কারণে বহু ক্ষেত্রে ক্লাসগুলিকে বিভিন্ন সেকশনে ভাগ করার পরেও আমাদের একইসঙ্গে সকলকে নিয়ে ক্লাস করাতে হয়। সেখানে এমন পদক্ষেপ কতটা সম্ভব ভেবে দেখতে হবে।’

নিবন্ধকার পেশায় সাংবাদিক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.