অগ্নিবেশ

সম্প্রতি বেআইনি নির্মাণ সংক্রান্ত একটি মামলায় বিচার চলাকালীন কলকাতা পৌরসভার কৌঁসুলির উদ্দেশে বিচারপতি অভিজিৎ গাঙ্গুলি মন্তব্য করেন “দরকার পড়লে যোগী আদিত্যনাথের থেকে কিছু বুলডোজ়ার ভাড়া করুন।” বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন বিচারক ও আইনজীবীদের মধ্যে কিঞ্চিৎ লঘু মন্তব্য বিনিময়, কখনো বা বিচার্য বিষয়ের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট নয় এমন প্রসঙ্গেরও অবতারণা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সমস্যা হল বিচারপতি গাঙ্গুলি কিঞ্চিৎ অবাঞ্ছিতভাবেই যে প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন, তার সঙ্গে ন্যায়বিচারের কোনো সম্পর্কই নেই। আদিত্যনাথের বুলডোজার ন্যায়বিচারের বাহন নয়, আক্ষরিক অর্থেই তা ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের যে সাংবিধানিক ধারণা তার উপরই নির্মম ‘বুলডোজিং’।

এই ‘বুলডোজার জাস্টিস’ কী? যে কোনো অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই বুলডোজারের শিকার সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। ২০১৭ সালে নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়ে ভারতীয় জনতা পার্টির তরফে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসেই আদিত্যনাথ এই বুলডোজার জাস্টিস শুরু করেন। নূপুর শর্মার বিতর্কিত মন্তব্য-পরবর্তী অশান্তিতে যুক্ত থাকার ‘অপরাধে’ এলাহাবাদে ওয়েলফেয়ার পার্টির নেতা ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত আহমেদ জাভেদের (তিনি ও তাঁর কন্যা আফরীন ফতিমা আদিত্যনাথ সরকারের নীতির সমালোচকও বটে) বাড়ির একাংশ বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ওই ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হলেও আদিত্যনাথের এই ‘ইনস্ট্যান্স জাস্টিস’ চালানোর ওটাই প্রথম ঘটনা নয়, শেষ ঘটনাও নয়। অভিযুক্তদের শায়েস্তা করার এই ‘নিদান’ দ্রুত বিজেপিশাসিত অন্য রাজ্যগুলো – মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, আসাম, এমনকি বিজেপিনিয়ন্ত্রিত দিল্লি পুর নিগমও – ব্যবহার করতে থাকে। উদ্দেশ্য একটাই – মুসলমান জনগোষ্ঠীর মানুষকে সন্ত্রস্ত করা।

কিন্তু ভারতের সাংবিধানিক তথা ফৌজদারি আইন কি আদৌ এমন শাস্তিবিধানকে স্বীকৃতি দেয়? দ্ব্যর্থহীন উত্তর – না। যে কোনো সভ্য, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী সাব্যস্ত করে শাস্তি দিতে হলে তদন্ত-অনুসন্ধান, প্রমাণ এবং বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতেই হয়। তারপর আসে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া। কোনো অবস্থাতেই অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে অভিযুক্তকে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। উল্লেখ্য, ভারতের ফৌজদারি আইনে এমনকি অপরাধী সাব্যস্ত ব্যক্তির বাড়িও ভেঙে দেওয়ার শাস্তি নেই।

তাহলে এই বুলডোজার জাস্টিসের আইনি ভিত্তি কী? আইনি ভিত্তি বললে ভুল বলা হবে, ওটা আসলে আইনি অজুহাত। সেটা হল, বেআইনি নির্মাণ বা অনুমোদনহীন নকশা অনুযায়ী নির্মাণ। সব রাজ্যের পৌরসংস্থাগুলোকেই নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার বা প্রস্তাবিত বাড়ির নকশা অনুমোদন করার জন্য মোটামুটি একই ধরনের ক্ষমতা দেওয়া আছে। এটাও রূঢ় বাস্তব যে অনেক ক্ষেত্রেই অনুমোদিত নকশা ছাড়াই বাড়ি বানানো হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশার পরিসরের বাইরেও বাড়ির অংশবিশেষ নির্মাণ করা হয়। সেক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট পৌরসংস্থা দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তবেই অনুমোদনহীন নির্মাণ ভেঙে ফেলার মত চরম পদক্ষেপ নিতে পারে। সেই প্রক্রিয়ার শুরুতেই সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিককে নোটিস পাঠানো এবং নোটিসের জবাব দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া বাধ্যতামূলক। নোটিস না পাঠিয়েই বা নামমাত্র নোটিস সেঁটে দিয়ে তৎক্ষণাৎ বাড়ি ভেঙে দেওয়া শুধুই প্রক্রিয়াগত ত্রুটি নয়, নাগরিকের মৌলিক অধিকারে আঘাতও।

বাসস্থানের অধিকার যে অন্যতম মৌলিক অধিকার, তা সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত জীবনের অধিকারেরই প্রায়োগিক রূপ – সেকথা আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগেই সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করেছে। ওলগা টেলিস বনাম বোম্বে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (১৯৮৫) মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ শুধু বাসস্থানের অধিকারকে নাগরিকের মৌলিক অধিকারই বলেনি, একথাও বলেছে যে বাড়ি ভেঙে দেওয়ার মত পদক্ষেপ কেবলমাত্র অন্তিম উপায় হিসাবেই ব্যবহার করতে হবে। তার আগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য শুনতে হবে। ওলগা টেলিস মামলার এই ঐতিহাসিক রায়ের পর থেকে মানুষের বাসস্থানের অধিকার সংক্রান্ত যে বিধিতত্ত্ব (জুরিসপ্রুডেন্স), তা পরবর্তী একাধিক রায়ে আরও শক্তিশালী হয়েছে। বাসস্থানের অধিকারের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও রাষ্ট্রকে সুনিশ্চিত করতে হবে – একথা সাংবিধানিক আদালতে স্বীকৃতি পেয়েছে।

অতএব একথা স্পষ্ট যে বেআইনি নির্মাণের অজুহাত দিয়ে অভিযুক্তের বাড়ি তৎক্ষণাৎ ভেঙে দেওয়া, এমনকি পৌর আইনেও স্বীকৃত নয়। সবথেকে বড় কথা, তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তি সত্যিই অপরাধী, তাহলেও তার অপরাধের জন্য অন্য যারা ওই বাড়িতে বাস করেন, তাঁরা কেন শাস্তি পাবেন?

অর্থাৎ ‘বুলডোজার বাবা’ উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথই হোন বা ‘বুলডোজার মামা’ মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান – কেউই আইনের তোয়াক্কা করছেন না, তাঁরা পাতি গুন্ডামি করছেন। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গেও পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর এক ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট কর্মীর দোকান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। এই সমস্ত প্রয়াসের উদ্দেশ্য বিরোধীদের, সমালোচকদের, সংখ্যালঘুদের সন্ত্রস্ত করা। এমন হতেই পারে যে কয়েকজন প্রকৃত অপরাধীর বাড়িও বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাকেও আইনের শাসন বলে না। গণতন্ত্রের বুনিয়াদি শিক্ষা বলে, এমনকি নৃশংসতম অপরাধীরও বিচারের সুযোগ পাওয়া প্রাপ্য। পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্ব যথাযথ তদন্ত করে উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে আদালতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তির বন্দোবস্ত করা। অভিযুক্তের বাড়ি ভেঙে দেওয়া বা এনকাউন্টার করে মেরে ফেলা কোনো সভ্য গণতান্ত্রিক দেশের নিদর্শন নয়।

আরো পড়ুন অপারেশন জাহাঙ্গিরপুরী: রাষ্ট্রীয় মদতে মুসলিম উচ্ছেদের চেষ্টা

বুলডোজার জাস্টিস ন্যায়বিচার নয়, স্রেফ রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসা। দুর্ভাগ্য এই যে নাগরিকদের একাংশ এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বৃহদংশ এই রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের সমর্থক ও উৎসাহদাতা। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, বিগত উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনে বিজেপির নির্বাচনী প্রতীক পদ্মফুলের থেকেও বুলডোজারের ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি, বুলডোজারের ছবিসহ পতাকা, ফ্লেক্স, ব্যানার ইত্যাদি ছিল বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের বেশি প্রিয়। সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব আদিত্যনাথকে উদ্দেশ্য করে ব্যঙ্গার্থে ‘বুলডোজার বাবা’ শব্দবন্ধ প্রথম ব্যবহার করলেও অচিরেই তা আদিত্যনাথের মুকুট হয়ে ওঠে। সংখ্যালঘুবিদ্বেষী, সংখ্যাগুরুবাদী, বিষাক্ত পৌরুষ প্রদর্শনের যে ফ্যাসিস্ত রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব বিজেপি করে, তার সঙ্গে বুলডোজার অত্যন্ত মানানসই। স্বাভাবিকভাবেই তা যেমন উদারনৈতিক গণতন্ত্রের বিপ্রতীপে অবস্থান করে, তেমনই অন্য যে কোনো ফ্যাসিস্ত শাসকের মতই জনমানসের এক উল্লেখযোগ্য অংশের সক্রিয় সমর্থনেও সে পুষ্ট।

তাই বুলডোজার জাস্টিস এক বৃহৎ ফ্যাসিস্ত রাজনীতির প্রতীক, অসুস্থতার একটি উপসর্গ। কেবল সংবিধান এবং আইনি কাঠামোর মধ্যে দিয়ে এর মোকাবিলা করা অসম্ভব, যদি না জনপরিসরে মূল ফ্যাসিস্ত রাজনীতিটিকে পরাস্ত করা যায়।

নিবন্ধকার পেশায় আইনজীবী। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.