বনজ্যোৎস্না লাহিড়ী

দিল্লির জাহাঙ্গিরপুরী এলাকায় সরকারি জমি থেকে বেআইনি দখলদার উচ্ছেদ করার অজুহাতে যা চলছে, তা আসলে দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় মদতে চলতে থাকা মুসলিম বিরোধিতার অঙ্গ। বুলডোজার চালিয়ে মুসলিম নাগরিকদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট গুঁড়িয়ে দেওয়া, মাথার ছাদ এবং পেটের ভাত কেড়ে নেওয়া নরেন্দ্র মোদীর সরকারের কেন্দ্রীয় এজেন্ডার মধ্যে পড়ে। এই ধরনের সুসংগঠিত ‘অপারেশন’-এর কয়েকটা নির্দিষ্ট ছক রয়েছে। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, দিল্লি – সর্বত্র সেই ছকেই মুসলিমদের উচ্ছেদ করা হয়। জাহাঙ্গীরপুরীতেও তা-ই হচ্ছে।

ধরনটা সহজ এবং সাদামাটা। প্রথমে রামনবমী বা হনুমান জয়ন্তীর মতো কোনো ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র মিছিল সংগঠিত করা। সেই মিছিলকে পরিকল্পিতভাবে মুসলিম মহল্লার দিকে নিয়ে যাওয়া, মসজিদ আক্রমণের চেষ্টা করা। প্ররোচনামূলক স্লোগান এবং ডিজে বাজিয়ে পরিবেশ উত্তপ্ত করে তোলা। টানা কয়েকবার এরকম চলার পর স্থানীয় মুসলমানরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে তাঁদের বিরুদ্ধে হিংসা ছড়ানোর অভিযোগ আনা। তারপর সরকারি জমিতে অবৈধ বসতি উচ্ছেদের দাবি তোলা, আদালতে বিষয়টা উত্থাপন করা। সবশেষে বুলডোজারের রাজনীতি।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

জাহাঙ্গিরপুরীর ওই এলাকায় মুসলিম বসতি প্রায় চার দশকের পুরনো, বাসিন্দাদের বড় অংশ বাঙালি মুসলমান। তাঁরা কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ করেন, কেউ মাছ বিক্রি করেন, কেউ গাড়ি চালান। কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকার মতই জাহাঙ্গিরপুরীর এই বসতিও ঠিক ‘আইন মেনে’ গড়ে ওঠেনি। পেটের দায়ে ভিনরাজ্য থেকে কাজ করতে আসা মানুষ কোনোমতে নিজেদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছেন। মালদহ, মুর্শিদাবাদ, মেদিনীপুরসহ বাংলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা এই মানুষগুলোকে নিয়ে হিন্দুত্ববাদী শিবিরের ক্ষোভ দ্বিবিধ – প্রথমত, তাঁরা ইসলাম ধর্মাবলম্বী। দ্বিতীয়ত, তাঁরা বাঙালি। গত কয়েক বছরে দফায় দফায় ওই এলাকায় সাম্প্রদায়িক হামলা চালানোর চেষ্টা হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য অবশ্যই উচ্ছেদ।

এবারের ঘটনার সূচনা হয় হনুমান জয়ন্তীর দিন। সশস্ত্র হিন্দুত্ববাদী মিছিল উত্তেজনা ছড়াতে ঢুকে পড়ে মুসলিম মহল্লায়। প্রবল জোরে গান বাজতে থাকে, সঙ্গে প্ররোচনামূলক স্লোগান, পাকিস্তানে পাঠানোর হুমকি এবং তরোয়াল, বর্শা, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আস্ফালন। প্রথম দফায় উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা তেমন কার্যকর হয়নি। দ্বিতীয় দফায় মসজিদে গেরুয়া নিশান বাঁধার চেষ্টা হয়। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির খুব অবনতি হয়নি। তৃতীয় দফায় মরিয়া হিন্দুত্ববাদীরা মসজিদ আক্রমণের চেষ্টা করে। এবার বাধ্য হয়ে স্থানীয় মানুষ প্রতিরোধ করেন। একজনকে রিভলভার তাক করতে দেখা যায়। ব্যাস, আক্রমণকারীদের উদ্দেশ্য সফল।

গণমাধ্যমে, সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রচার। বলা হয়, হিন্দুরা নিজেদের উৎসবে মিছিল করতেও পারছেন না। হনুমান জয়ন্তীর শোভাযাত্রায় পাথর ছোড়া হচ্ছে। ‘দিল্লি রায়ট ২.০’ বলে আগ্রাসী প্রচার চলতে থাকে। অত্যন্ত দুঃখজনক এবং হতাশাজনক, যে হনুমান জয়ন্তীর সশস্ত্র মিছিল থেকেই যে গোলমাল শুরু হয়েছিল, তা অধিকাংশ মিডিয়া গোপন করে। অথচ সকলের হাতেই ছিল সেই অশান্তির ফুটেজ।

এরপর শুরু হয় ষড়যন্ত্রের দ্বিতীয় পর্যায়। দিল্লি বিজেপির পক্ষ থেকে সরকারি জমিতে অবৈধ দখলদারি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। দাবি ওঠে দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে। সংঘর্ষের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সরকার ও দিল্লি পুলিশ ‘তদন্ত’ শুরু করে। একঝাঁক লোককে গ্রেফতার করা হয়।আশ্চর্যজনকভাবে ধৃতরা প্রত্যেকেই মুসলমান। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বাঙালি।

বিজেপিশাসিত দিল্লি পুরনিগম সিদ্ধান্ত নেয়, বুলডোজার চালিয়ে হাজার হাজার মানুষের বসতি ভেঙে দেওয়া হবে। জমিয়ত উলেমা-এ-হিন্দের পক্ষ থেকে শীর্ষ আদালতে উচ্ছেদ বন্ধ করার আবেদন করা হয়। সকাল থেকেই উত্তর দিল্লি পুরনিগম বসতি, দোকানপাটের উপর বুলডোজার চালাতে শুরু করে। একটি মসজিদের সামনের বসার জায়গা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। অথচ কাছেই একটি মন্দিরকে দেখতে পায়নি বুলডোজার।

সিনিয়র আইনজীবী কপিল সিব্বাল এবং দুষ্মন্ত দাভে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ইতিমধ্যে বৃন্দা কারাট, রবি রাই প্রমুখ সিপিএম এবং সিপিআইএমএল লিবারেশনের কর্মীরা জাহাঙ্গিরপুরীতে পৌঁছে যান। সকাল পৌনে এগারোটায় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ উচ্ছেদের উপর স্থগিতাদেশ দেয়। কিন্তু তারপরেও প্রায় দেড় ঘন্টা বুলডোজার চলে। এরপর বৃন্দা, রবি সহ বামকর্মীরা আদালতের নির্দেশের প্রতিলিপি হাতে বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন। প্রশাসন বাধ্য হয় উচ্ছেদ স্থগিত রাখতে।

দিল্লির ক্ষমতায় থাকা আম আদমি পার্টি কার্যত হিন্দুত্ববাদীদের সুরেই কথা বলছে। বিজেপি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং আপ – সব পক্ষই জাহাঙ্গীরপুরীতে রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশিদের ভূত দেখছে। কেবলমাত্র বামপন্থী কর্মীরাই আক্রান্ত মানুষের পাশে থেকে সীমিত শক্তি নিয়েই প্রতিরোধ করছেন।

জাহাঙ্গিরপুরী কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নরেন্দ্র মোদীর ভারতে মুসলমানদের আক্রমণ করা এবং তাঁদের উচ্ছেদ করার যে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা রয়েছে, জাহাঙ্গিরপুরীতে তা-ই প্রয়োগ করা হচ্ছিল। মানবতা, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে থাকা প্রতিটি শক্তিকে তাই দ্বিধাহীনভাবে এই রাষ্ট্রীয় বুলডোজারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। নাহলে আগামীকাল এই বুলডোজার ঢুকে পড়বে আমাদের নিজেদের ঘরেও।

নিবন্ধকার গণআন্দোলনের কর্মী। তথ্যের দায় নিজের, মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

হলোকস্ট অনুসারী কার্টুন দেখে বিরোধীরা কিছু বুঝছেন না?

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.