অর্কদীপ

নেলসন ম্যান্ডেলা একবার বলেছিলেন “যদি তুমি কারো সাথে তার বোধগম্য ভাষায় কথা বলো, তার কাছে যেতে পারবে; কিন্তু যদি তার নিজের ভাষায় কথা বলো, তার হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারবে।” অত্যন্ত দুঃখজনক যে বর্তমান ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, সাম্প্রতিক সংসদ অধিবেশনসহ একাধিকবার, ভারতের মূল ২২টি ভাষা এবং ১৬০০-র বেশি ভূমিজ ভাষার তোয়াক্কা না করে সরাসরি সুপারিশ করেছেন, ভারতের সমস্ত নাগরিক যেন নিজেদের মধ্যে হিন্দিতে কথা বলে।

মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব বা অর্থনৈতিক সংকট থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে বারংবার রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে উসকে দেওয়া নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার ৭৫ বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আজও বাংলা, পাঞ্জাবি বা তামিলে ছাত্রছাত্রীরা বিজ্ঞান, কারিগরি বা চিকিৎসাশাস্ত্র পড়তে বা গবেষণা করতে পারে না। সরকার এবং শিক্ষিত সম্প্রদায়ের উদাসীনতায় শুধুমাত্র বিদ্যালয়ের গণ্ডি, অর্থাৎ অপরিহার্য শিক্ষাটুকুর বাইরে যে কোনো উচ্চতর দক্ষতার কাজে আজও আমাদের দেশের একটি ভাষাও সাবলীল হয়ে উঠতে পারেনি। অথচ ভারতে ১০ কোটির বেশি মানুষ এবং বাংলাদেশ মিলিয়ে ১৭ কোটির কাছাকাছি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। ইংরেজি, চীনা, স্পেনীয় ও হিন্দির পরেই পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলা। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি কথিত ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলার স্থান সপ্তম। সংখ্যার বিচারে যে কোনো বিনোদনের মাধ্যমের জন্য বাংলা অন্যতম বড় বাজার, কিন্তু আমাদের আত্মাভিমানের অভাবে বাংলা ব্রাত্য থেকে যায়। উল্লেখ্য ইংরেজি, আরবি ও হিন্দি ক্রমানুসারে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠীর দ্বিতীয় ভাষা, যা ভীষণভাবে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক/অর্থনৈতিক ক্ষমতা, ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রসার এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ফলেই ঘটেছে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ভূমিজ ভাষাকে অসম্মান করে যা চালু করার চেষ্টা চলে, তা-ই সাম্রাজ্যবাদ। রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ধর্মীয় বিশ্বাস, ভাষা, লিপি – সর্বস্তরেই এই আধিপত্যবাদ কখনো সূক্ষ্ম, কখনো প্রবলভাবে দেখা যায়। স্বাধীন ভারতে মাত্র সাত দশকেই উত্তর ভারতের আওয়াধী, ব্রজবুলি, খরি বোলি, মাগধী, মৈথিলী, ভোজপুরি, মাড়োয়ারি, হরিয়ানভি, পাহাড়ি ভাষাসমূহ এবং ছত্তিশগড়-ঝাড়খণ্ডের অজস্র ভাষা হিন্দির কারণে আজ বিলুপ্তির পথে। বাংলা, তামিল, মারাঠি, পাঞ্জাবি, ওড়িয়া, কন্নড়, মালয়ালম, তেলুগু, অসমিয়া, গুজরাটিসহ বহু সমৃদ্ধ সাহিত্য ও ভাষার দেশ ভারতবর্ষের মত উদাহরণ হয়ত পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই।

অধুনালুপ্ত সোভিয়েত রাশিয়াতে ভাষাভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও সেখানে রুশ ভাষার আধিপত্য লক্ষ করা গিয়েছিল, যা সোভিয়েতের পতনের অন্যতম কারণ। তাই চলচ্চিত্র, সঙ্গীত বা অন্যান্য গণমাধ্যমের সাহায্যে একজন বাঙালি বা মারাঠি যদি দ্বিতীয় ভাষা শিখতে চায় তাহলে তা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় থাকুক, কিন্তু পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্তি বা সরকারিভাবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ভারতের বহুত্ববাদ ও সংহতির পক্ষে ক্ষতিকারক হবে। ভারতের প্রত্যেকটি ভাষার চর্চা এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ভাষা হিসাবে সেগুলোর বিকাশ নিশ্চিত করার দায় রাজ্য সরকারের থেকেও কেন্দ্রীয় সরকারের বেশি হওয়া উচিত। সরকারি কাজকর্ম যেখানে রাজ্য বা এলাকা নির্দিষ্ট, সেখানে বাধ্যতামূলক তর্জমার ব্যবস্থা থাকা দরকার। সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা যাতে মাতৃভাষাতেও করা সম্ভব হয়, তার জন্য কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ উদ্যোগ আশু প্রয়োজন।

জাপান, কোরিয়া, জার্মানিসহ পৃথিবীর বহু দেশ ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষার প্রতি নির্ভরতা কাটিয়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি সবই রপ্ত করেছে নিজ নিজ মাতৃভাষায়। মৌলিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষায় সাবলীল প্রজন্মের কাছে মাতৃভাষাই যথেষ্ট। প্রযুক্তির যুগে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমনে যে কোনো ব্যক্তি বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে একটা অ্যান্ড্রয়েড ফোনের সাহায্যেই অন্যের কাছে নিজের ভাব প্রকাশ করতে সক্ষম। তাই আগামীদিনে প্রযুক্তি বা ব্যবসায় ভাষা কোনোভাবেই অন্তরায় হবে না।

সৈয়দ মুজতবা আলী হয়ত এইজন্যই বলেছিলেন “এক দোর বন্ধ হলে দশ দোর খুলে যায়; বোবার এক মুখ বন্ধ হলে দশ আঙুল তার ভাষা তর্জমা করে দেয়।”

মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

বাংলা শব্দগুলো যথাসময়ে আমার মনের বাগানে ফুটে উঠেছে

Leave a Reply