মমতা ব্যানার্জি নবান্নে আলোচনায় বসলেন দেউচা-পাঁচামির সংগ্রামরত জনতার একটি সংগঠন ‘বীরভূম জমি, জীবন ও প্রকৃতি বাঁচাও মহাসভা’, সংক্ষেপে মহাসভার প্রতিনিধিদের সঙ্গে। সেখানে তিনি বললেন সেই একই কথা – জোর করে জমি নেওয়া হবে না, মানুষের উপর জবরদস্তি করা হবে না ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটছে তা সম্পূর্ণ অন্য জিনিস। গ্রাউন্ড জিরোতে যা চলছে তার সবটাই জবরদস্তি। বীরভূম তৃণমূলের একটা বড় অংশ প্রকল্প ঘোষণা হতেই ঢাল তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে প্রকল্পের বিরোধীদের উপর। বাইক বাহিনী ঘুরছে, ঘরে ঘরে হুমকি দেওয়া চলছে। যাঁরা ট্যাঁ ফোঁ করছেন তাঁরা যাতে পাথর খাদানে কাজ করতে না পারেন তার সমস্ত ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিক্ষোভকারীদের উপর মামলা মোকদ্দমা চাপানো হচ্ছে। অর্থাৎ হাতে এবং ভাতে, উভয়ত মারার সবরকম চেষ্টা জারি আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নবান্নে ‘আলোচনা’ করার দুদিনের মধ্যেই জেলাশাসকের নেতৃত্বে সরকারি বাহিনী চেক বিলি করতে দেওয়ানগঞ্জে ঢোকে। সঙ্গে বাসে করে নিয়ে আসা তৃণমূল বাহিনী। স্বাভাবিকভাবেই উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। গ্রামবাসীদের তীব্র বিক্ষোভে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় সরকারি বাহিনী, সঙ্গে বাসে করে আসা বাহিনীও।

সুতরাং আলোচনা জিনিসটা সরকারপক্ষের কাছে একটা অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমের সম্মতি তৈরি করার বদলে আলোচনাকে কূটনীতি হিসাবে ব্যবহার করলে তা জনবিরোধী হতে বাধ্য। মমতা একদিকে বলছেন, “ওখানকার মানুষ না চাইলে কয়লাখনি হবে না”। আর সংগ্রামরত আদিবাসী মানুষ নবান্নে গিয়ে জানিয়ে আসছেন, লাগাতার ধর্না চালিয়ে, মিটিং মিছিল করে জানিয়ে দিচ্ছেন খনি তাঁরা চান না। অথচ বিশ্ববঙ্গ শিল্প সম্মেলন উপলক্ষে সরকার বড় বড় হোর্ডিং লাগাচ্ছে এই বলে, যে পশ্চিমবঙ্গ হল পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কয়লা প্রকল্পের জায়গা, এইখানে বিনিয়োগ করো। আশ্চর্য, তাই না? দ্বিচারিতা, তাই না?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

দেউচা-পাঁচামি কয়লাখনি প্রকল্পের বিরোধিতা এবং প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে একাধিক সংগঠন গড়ে ওঠে। এর মধ্যে অন্যতম হল মহাসভা। এই ধরণের মঞ্চধর্মী সংগঠনগুলো সাধারণত অনেক রকমের সংগঠন নিয়ে তৈরি হয়। মহাসভার মধ্যে যেমন সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের মত নকশালপন্থী সংগঠন রয়েছে তেমনি রয়েছে প্রসেনজিৎ বসুদের সংগঠন, স্বরাজ ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গ শাখাও। এই সংগঠনগুলোর পাশাপাশি একটা স্থানীয় এনজিও-ও রয়েছে। এই এনজিও এবং তার কর্ণধার শ্রী কুণাল দেবকে নিয়ে সংগ্রামরত বিভিন্ন শক্তির মধ্যে বিভিন্ন অভিযোগ, অস্বস্তি আছে। কিন্তু বৃহত্তর লড়াইয়ের জায়গা থেকে অনেকেরই অভিমত, লড়াইয়ের ময়দানে অত বাছবিচার না করাই উচিত। বর্তমানে সকলে মিলে একসাথে এই মারণ প্রকল্প ঠেকানো যাক। একথাও অনস্বীকার্য, যে প্রথম দিকের সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে লড়াই গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এবং মহাসভা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও উক্ত এনজিও সদর্থক ভূমিকা পালন করেছিল।

কিন্তু বিশ্ববঙ্গ শিল্প সম্মেলনের ঠিক আগে আচমকা পরিস্থিতি এক বিপজ্জনক বাঁক নেয়। হঠাৎ করে শোনা যায় মুখ্যমন্ত্রী নবান্নে মহাসভার সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন। প্রকল্পের উগ্র সমর্থক নয়া উদারবাদী মিডিয়া তারস্বরে প্রচার শুরু করে দেয়, দেউচা-পাঁচামিতে বরফ গলছে, সব মিটে যাচ্ছে ইত্যাদি। মহাসভাও জানায়, হ্যাঁ, মুখ্যমন্ত্রীর সাথে সদর্থক বৈঠক হয়েছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, মানুষ না চাইলে খনি হবে না। আর যেহেতু তাঁরা নবান্নে বসে জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁরা খনি চাইছেন না, তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে যে খনি হচ্ছে না। মহাসভা এই ঘটনাকে “আংশিক বিজয়” বলেও চিহ্নিত করে। শোনা যায় শ্রী দেবই মুখ্যমন্ত্রীর সাথে এই বৈঠক হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

এর পাশাপাশি প্রায় একমাস ধরে প্রকল্প এলাকায় যে লাগাতার অবস্থান চলছিল তাও প্রত্যাহার করে নেয় মহাসভা। আর তারপরেই অনতিবিলম্বে জেলাশাসকের চেক বিলি অভিযান এবং বিশ্ববঙ্গ সম্মেলনের হোর্ডিং সংগ্রামী মানুষকে ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ করে তোলে। ধর্না নতুন করে শুরু করা হয়, প্রশাসনের চেক বিলি অনুষ্ঠানকে প্রতিহত করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই উক্ত এনজিওর সঙ্গে লড়াইয়ের অন্যান্য শক্তিগুলোর সম্পর্ক জটিল হয়ে পড়ে। মমতার স্বভাবগত বিশ্বাসঘাতকতায় হতভম্ব মহাসভা ফের লড়াইয়ে ফিরে আসে।

আলোচনার নাম করে আসলে মুখ্যমন্ত্রী আন্দোলন ভাঙতে চাইছেন। সংগ্রামরত শক্তিগুলোর মধ্যে সংশয় ও অবিশ্বাস তৈরি করতে চাইছেন। আন্দোলনের মধ্যেকার দুর্বল শক্তিগুলোকে খুঁজে বের করে তাদের ট্রোজান ঘোড়ায় পরিণত করতে চাইছেন। কিন্তু তিনি সফল হবেন না। কারণ আন্দোলনে এমন অনেক শক্তি রয়েছে যারা পরিণত বুদ্ধিসম্পন্ন এবং কৌশলী। আলোচনা এবং আগ্রাসনের জোড়া ফলা তারা সরকারপক্ষের দিকেই ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তদুপরি দেউচা-পাঁচামির সংগ্রামী জনতাও বর্তমানে অনেক বেশি সংগঠিত, অনেক বেশি পরিণত এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তারা দেউচার লড়াই জিতবেই। এই আন্দোলন ভাঙার ক্ষমতা সরকারের নেই।

মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

রাজনৈতিক বিকল্প নেই বলেই দেউচা-পাঁচামি সিঙ্গুর হবে না

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.