১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি। গান্ধীর সহকর্মী ও‌ চিকিৎসক সুশীলা নায়ার সেদিন পশ্চিম পাকিস্তানের মুলতানে ছিলেন উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের কাজে। বিকেল চারটের সময় সেখানকার ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে দেখা হলে তাঁর স্ত্রী সুশীলাকে জিজ্ঞেস করেন, গান্ধীজি কবে আমাদের কাছে আসবেন? সুশীলা খুব খুশি হয়েছিলেন একদা মুসলিম লিগের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত গান্ধীর প্রতি এই বন্ধুভাব দেখে এবং ভাবছিলেন – বাপু একথা শুনে কত খুশি হবেন। দু ঘন্টা পরে ডেপুটি কমিশনারের স্ত্রীই সুশীলাকে দৌড়ে এসে খবর দিলেন – মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা হয়েছে। সুশীলা সারারাত ধরে চলে লাহোরে পৌঁছে পরদিন ভোরে দিল্লির বিমান ধরেন। সেই বিমানে ছিলেন মিঞা ইফতিকারুদ্দিন, যিনি সারাজীবন কংগ্রেসে থেকে দেশভাগের কিছু আগে মুসলিম লিগে যুক্ত হন। ‌সুশীলাকে দেখে তিনি সজল কণ্ঠে বলে ওঠেন, “আমরা প্রত্যেকে গান্ধীজির মৃত্যুর জন্য দায়ী।”

চার দশক পরে ১৯৯০ সালে রাম জন্মভূমি আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন সুশীলা অযোধ্যায় গিয়েছিলেন। তিনি বিতর্কিত এলাকার বাইরে গান্ধীর ভাবানুসারী প্রার্থনা সভায় বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ ও স্তোত্র পাঠ করছিলেন। বেশকিছু মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছিলেন।‌ এই প্রার্থনার মধ্যে সেই বিখ্যাত গানটি আছে ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’। এই গানটির ‘ঈশ্বর আল্লাহ তেরো নাম’ অংশটি গাওয়া হল, চারদিক থেকে নানারকম আওয়াজ উঠতে লাগল। সুশীলা যারা আপত্তি করছিল তাদের ডাকলেন এবং বললেন, আমরা গান্ধীজির তরফ থেকে এসেছি তাঁর স্মৃতি নিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল “আমরা গডসের তরফ থেকে এসেছি।” মজার কথা, এই নাথুরামের আসল নাম রামচন্দ্র।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৩ এপ্রিল ১৯১৯। জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনা ঘটার চারদিন আগে ৯ এপ্রিল ছিল রামনবমী। বরাবর হিন্দুরা এই দিনটা পালন করেন, কিন্তু সেবার অমৃতসরে বিপুল সংখ্যক মুসলমান রামনবমীর উৎসবে যোগ দেন। স্লোগান ওঠে ‘মহাত্মা গান্ধী কি জয়’ এবং ‘হিন্দু-মুসলমান কি জয়’। এক অর্থে গান্ধী রামকে সকলের রাম করে তুলেছিলেন। কবীর দাসের দোঁহা স্মরণীয়: “কস্তুরী কুণ্ডল বসৈ/মৃগ ঢুঁড়ে বন মাহী/অ্যায়সে ঘট ঘট রাম হ্যায়/দুনিয়া খোঁজত নাহি।” মৃগ যেমন নিজের দেহের কস্তুরী খুঁজে বেড়ায় বনে বনে, তেমনই সকল ঘটেই রাম আছেন, দুনিয়া খুঁজে পায় না।

১৯৩০ সালের ২০ মার্চ নবজীবন পত্রিকায় গান্ধী লিখছেন “স্বরাজের যে অর্থই করা হোক আমার কাছে একটিই অর্থ সেটি হল রামরাজ্য। যদি এই শব্দ কারোর খারাপ লাগে তাকে বলব ধর্মরাজ্য। এখানে রাজা এবং কাঙালের একই অধিকার থাকবে।” গান্ধীর ভাবনায় বরাবরই পথ অথবা উপায় এবং অন্তিম লক্ষ্যের মধ্যে কোনো ভেদ করা হয় না। দুটিকেই সৎ হতে হবে। তাঁর রামরাজ্যে হিন্দুর কোনো বিশেষ ক্ষমতা নেই, রামরাজ্য ঈশ্বরের রাজ্য।‌ তিনি বলেছেন “আমার জন্য রাম ও রহিম এক।” সেখানে সবাই সমান। বেঙ্গালুরুতে সম্প্রতি কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন মহাত্মা গান্ধীর রামে, বিজেপির রামে নয়। গান্ধীর কাছে রাম পতিতপাবন, ঈশ্বর এবং আল্লাহ দুইই তাঁর নাম। রামলালার প্রাণপ্রতিষ্ঠার দিন ছুটি দেননি বলে সিদ্দারামাইয়াকে হিন্দুবিরোধী বলা হচ্ছে। এই রামমন্দির ও প্রাণপ্রতিষ্ঠার সঙ্গে হিন্দুত্বকে সমার্থক করার পিছনে ভাবনা একটাই – রাম মানে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের রাম – নাথুরাম।

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গান্ধীর রামরাজ্যের প্রসঙ্গ এনেছিলেন। আসলে বরাবরই রামকে নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের চরম বিবাদ গান্ধীর সঙ্গে। ইতিহাস ও বিজ্ঞানমনস্কতাকে এরা গুরুত্ব দেয় না। সেই রথযাত্রার সময়েই রাম ঐতিহাসিক চরিত্র কিনা সে প্রসঙ্গ হেলায় উড়িয়ে দিয়ে লালকৃষ্ণ আদবানি বলেছিলেন ‘ইয়ে আস্থা কা সওয়াল হ্যায়।’ এক অর্থে আদবানি সেই সময়েই উত্তরসত্য যুগের কথা বলছিলেন, যেখানে কোনো কিছু সত্য হোক বা না হোক, বহুজনের বিশ্বাস হলেই হবে। আজ ভার্চুয়াল দুনিয়ায় প্রায় সেটাই ঘটছে। রাম কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাস – এখানে যেন সন্দেহের অবকাশ না থাকে। যেকোনো ধর্মীয় রাষ্ট্রে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হিন্দুত্ববাদীদের গান্ধীর বিরুদ্ধে লড়তে হয়, যেহেতু তিনি কোটি কোটি মানুষের মনের রামকে এক অন্য রূপে তুলে এনেছিলেন।

 

গান্ধী বলছেন, এই রাম অযোধ্যার রাজা দশরথের ছেলে নন, ইনি অজাত। এই রাম কোনো একক গোষ্ঠীর নন, এই রাম সবার। ঈশ্বর, আল্লাহ এ সমস্তই তাঁরই নাম। গান্ধী বলেছেন শূদ্র হত্যাকারী রামকে না মানার কথা।

 

১৯৪৬ সালে হরিজন পত্রিকায় গান্ধী যে রামের কথা বলেছিলেন, তার কিছু বিশ্লেষণ এবার রামলালার প্রাণপ্রতিষ্ঠার পর প্রধানমন্ত্রীর মুখে শোনা যাচ্ছিল। অর্থাৎ তিনি চিরন্তন, তিনি অদ্বিতীয় ইত্যাদি। কিন্তু মৌলিক ফারাক অন্যত্র। গান্ধী বলছেন, এই রাম অযোধ্যার রাজা দশরথের ছেলে নন, ইনি অজাত। এই রাম কোনো একক গোষ্ঠীর নন, এই রাম সবার। ঈশ্বর, আল্লাহ এ সমস্তই তাঁরই নাম। গান্ধী বলেছেন শূদ্র হত্যাকারী রামকে না মানার কথা। ধর্মের যে অংশ বিভাজনের, বিদ্বেষের, হিংসার – সেই অংশকে গান্ধী গ্রাহ্য করবেন না। সাভারকর, গোলওয়ালকর উভয়েই গান্ধীর অহিংসার কঠোর সমালোচক ছিলেন। গোলওয়ালকর বলেছেন, সব হিন্দু দেবতার কাছেই অস্ত্র আছে।‌ অতএব রামনবমী অস্ত্র আস্ফালনের দিন। সাভারকর ধর্মের চেয়ে রাজনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। অতএব শান্তি নয়, রাজনৈতিক পৌরুষ হল সহিংস। ভূমিপূজনের সময় মোদী রামের ভয়ঙ্কর রূপ দেখালেন, “ভয়ে বিন হোয়ে না নীতি।”

রামরথের সময় থেকেই রামের পাশে সীতা নেই। মর্যাদা পুরুষোত্তম এক ধরনের সুপারহিরো। মুখ তার ক্রোধদীপ্ত, যেন চলেছেন দিগ্বিজয়ে। গান্ধীর প্রিয় ভজনে তিনি রঘুপতি রাঘব হলেও পতিতপাবন সীতারাম। রামলালার কোনো মূর্ত সত্তা গান্ধীর কাছে নেই। তাঁর কোনো আশ্রমে কোনো দেবদেবীর মূর্তি কখনো ছিল না, যদিও দুবেলা প্রার্থনা হয়। “মন্দির বা মসজিদ বা গির্জা…ঈশ্বরের নিবাস হিসাবে এদের মধ্যে কোনো পার্থক্য আমি করি না। …..এগুলি হল অদৃশ্য যিনি, তাঁর কাছে পৌঁছনোর জন্য তৃষাতুর মানুষের আর্তি।”

গান্ধীর রাম সামাজিক ঐক্য, আর্থিক ন্যায় ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীক হতে পারেন। তিনি সকলের কল্যাণকারী, যাঁর কাছে পৌঁছতে কারোর কোনো বাধা নেই। এই রামের ভক্ত গান্ধী বলেন, “কোরান আমার কাছে এক ঈশ্বর-আদিষ্ট ধর্মগ্রন্থ এবং মহম্মদ আমার কাছে পয়গম্বর।” দেশভাগের পর এই গান্ধীই বলেন, রাজনৈতিকভাবে দুটি পৃথক দেশ হলেও তাদের আত্মা এক। গান্ধীর কথা ভাববাদী শোনায়, কিন্তু গভীরে গেলেই তার সত্যতা উপলব্ধি হয়।

আরো পড়ুন মহাত্মা গান্ধীকে কায়েমি স্বার্থের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া দরকার

আমাদের একটি চলতি প্রবাদ আছে, ‘কবে রাম রাজা হবে/ তবে সীতা বনে যাবে।’ ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিয়ে এই প্রবাদ অযোধ্যার রামলালা প্রতিষ্ঠায় নিশ্চিত হল। পাঁচশো বছর পর যে রাম ফিরলেন, তাঁর সঙ্গে সীতা নেই। রামের প্রত্যাবর্তন মানেই তো সীতার বনবাস। এই রামের রাজত্বে বিলকিস বানোর নির্যাতনকারীরা সামাজিক প্রতিষ্ঠা পায়, শিশুঘাতী বাবু বজরঙ্গি বেকসুর খালাস হয়, প্রতিনিয়ত দলিত ও জনজাতি গোষ্ঠীর অধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়।

গান্ধীর রামরাজ্য সম্পূর্ণ এর বিপরীতে অবস্থিত। কতকগুলি মূল্যবোধের উপর দাঁড়িয়ে এই রাজ্য শেষতম মানুষটির কল্যাণকামী, অন্তোদয় তার মূলমন্ত্র। ১৯৪৭ সালে তিনি লিখছেন “আমার হিন্দুধর্ম আমাকে সব ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে শেখায়। রামরাজ্যের মূল সেখানেই।” গান্ধী যেহেতু ধার্মিক, হয়ত সেজন্যই তিনি সাম্প্রদায়িক সংঘাতে জর্জরিত সময়ে ধর্মের মাধ্যমেই সহাবস্থানের কথা বলেছিলেন।‌ হয়ত এক অর্থে রাজনীতিতে হিন্দু-মুসলমানের যৌথ সাধনার তিনিই পথিকৃৎ। সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধার ভাবনা আমাদের সংবিধানেও আছে, ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি ঢোকানোর আগে থেকেই আছে। গান্ধী প্রচলিত সব ধর্মেই কিছু অসম্পূর্ণতা অনুভব করতেন, তাই বলতেন পৃথিবীতে একটি মাত্র ধর্ম থাকতে পারে না। কিন্তু মানুষ যেন ধর্মের কারণে অপরের প্রতি বিদ্বেষ না করে।

অযোধ্যায় প্রাণপ্রতিষ্ঠার হিড়িকে দেখা গেল মন্দিরের যজমান বহু আচার অনুষ্ঠান করছেন যার মধ্যে একধরনের শারীরিক শুদ্ধিকরণ রয়েছে। কিন্তু গান্ধী বলেন “যদি তুমি ঈশ্বরকে রামরাজ্যে দেখতে চাও, তাহলে সবার আগে আত্মসমীক্ষা করতে হবে।‌ তোমার নিজের দোষগুলিকে হাজার গুণ বাড়িয়ে দেখতে হবে এবং তোমার প্রতিবেশীর দোষ দেখা চলবে না।‌”

আত্মসমীক্ষার এই রামরাজ্যে আপন-পর, উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ থাকতে পারে না। সেখানে রোহিত ভেমুলার প্রাণ অকালে যাবে না। বারবার উদ্বাস্তু হওয়ার ভয়ে পুরানো কাগজ ঘেঁটে মরতে হবে না। মিথ্যা গুজবের উত্তেজনায় গণপিটুনির শিকার হতে হবে না। কারো খাদ্যাভ্যাস বা পোশাক নিয়ে নিরন্তর প্রশ্নের সামনে পড়তে হবে না। রামের নাম শুনে হৃৎকম্প হবে না।

 

আপাতত হুজুগে মেতেছে দেশ, কিন্তু ‘রঘুপতি রাঘব’ গাইতে হলেই গান্ধীকে
মনে পড়ে যাচ্ছে। প্রাণপণ যুক্তি দিয়েও অস্বীকার করা যাচ্ছে না যে
শেষ মুহূর্তে রামের নাম তাঁর মুখে ছিল।

 

নাথুরাম তার ভাষণে বলেছিল, “গান্ধীবাদী রাজনীতি আত্মিক শক্তি, অন্তরের বাণী, অনশন, প্রার্থনা ও মনের পবিত্রতার মত সংস্কারের ভিত্তিতে পরিচালিত। আমি মনে করি, গান্ধীর অবর্তমানে ভারতীয় রাজনীতি বাস্তববাদী হবে। প্রতিশোধ গ্রহণে ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান হবে।” এই অবাস্তববাদী সংস্কারগুলিই রামলালার প্রাণপ্রতিষ্ঠায় উচ্চকিত করা হল। এই দ্বন্দ্বই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মেকি ধর্মবোধ, মিথ্যাশ্রয়ী স্বার্থপরতাকে বারবার সামনে আনে। রাম যে শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার উপায়, তাঁর সাথে আধ্যাত্মিকতা দূরে থাক, প্রকৃত ধর্মেরই কোনো যোগ নেই, সময় তা প্রতিষ্ঠা করবে। আপাতত হুজুগে মেতেছে দেশ, কিন্তু ‘রঘুপতি রাঘব’ গাইতে হলেই গান্ধীকে মনে পড়ে যাচ্ছে। প্রাণপণ যুক্তি দিয়েও অস্বীকার করা যাচ্ছে না যে শেষ মুহূর্তে রামের নাম তাঁর মুখে ছিল। বিদেশী পুঁজিপতি অভ্যাগত অথবা কূটনীতিবিদরা এলে যেতে হচ্ছে সেই রাজঘাটে, দাঁড়াতে হচ্ছে সেই পরম সত্যের সামনে, নাথুরামের গুলি আজও যাকে মারতে পারল না।

হে রাম।

এই গান্ধী দর্শন যদি টিকে থাকে, তাহলে হিন্দুত্বের রাজনীতি কখনো চূড়ান্ত বৈধতা পাবে না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.