দিল্লির হৃদয় পরিবর্তন হল, ক্ষমতাচ্যুত হল আম আদমি পার্টি। দলের মুখ, সর্বেসর্বা অরবিন্দ কেজরিওয়াল নিজে পরাজিত নিউ দিল্লি বিধানসভা আসনে। অন্যান্য আসনে পরাজিত তাঁর দলের আরও রথী, মহারথীরা। যেমন মনীশ সিসোদিয়া, সোমনাথ ভারতী, সৌরভ ভরদ্বাজ প্রমুখ। কোনোভাবে মান বাঁচালেন মুখ্যমন্ত্রী আতিশী, গোপাল রাই প্রমুখ। কেজরিওয়ালের রাজনীতির আকাশে আবির্ভাব হয়েছিল ধূমকেতুর মত। এখন রাজধানীতে প্রশ্ন – শেষটাও কি তেমনই হবে?
দিল্লির মসনদে ২০১৩ সাল থেকে শুরু করে তিনবার বসেছে আপ সরকার। ২০১১ সালে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশাল অভিযানের সময়ে আন্না হাজারের হাত ধরে উঠে আসেন কেজরিওয়াল। দিল্লিতে তখন শিলা দীক্ষিতের নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার। কিন্তু ২০১৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দিল্লির ভোটাররা সেই কংগ্রেসকে বাতিল করে কাকে সরকারে বসাবেন, তা ঠিক করে উঠতে পারেননি। ফলে বিধানসভায় বিজেপি একক বৃহত্তম দল হলেও পেয়েছিল ৩১টা আসন। বিধানসভায় মোট আসন ৭০, অর্থাৎ সরকার গঠন করতে চাই ৩৬টা আসন। মাত্র ২৮টা আসনে জিতেও কংগ্রেসের আটজন বিধায়কের সমর্থনে সেবার গঠিত হয় প্রথম কেজরিওয়াল সরকার।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এর প্রায় দেড়মাস পর বোঝা গেল যে আইআইটি থেকে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পর আয়কর কমিশনার হয়ে ওঠা এই কেজরিওয়াল কত বিচক্ষণ রাজনীতিবিদে পরিণত হয়েছেন। ২০১৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বিধানসভায় দিল্লির জন লোকপাল বিল উত্থাপনে ব্যর্থ হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। এরপর দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়। তারপর ২০১৫ সালের গোড়ার দিকে আবার নির্বাচন হলে ৬৭টা আসন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসে আপ। আর ফিরে তাকাতে হয়নি কেজরিওয়ালকে। ২০২০ বিধানসভা নির্বাচনেও ৬২ আসনে জয়ী হয় তাঁর দল।
এবারে বাদ সাধল আবগারি কাণ্ডের মামলা। যাঁর রাজনীতিতে পদার্পণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে, তাঁকে হাজতবাস করতে হল এই মামলায়। তবে কি দুর্নীতির অভিযোগেই এই পতন?
‘একথাও ভাবতে হবে যে ওরা আমাদের কাজ করতে দেয় না বলে কি বারবার ভোট চাওয়া যায়?’ উক্তিটা আম আদমি পার্টির এক স্বেচ্ছাসেবকের। তাঁর বক্তব্য, কেজরিওয়াল দিল্লিবাসীকে প্রতিবার নানা প্রতিশ্রুতি দেন, যার অনেকটাই পূরণ হয় না। তার দোষ চাপান কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদীর সরকারের উপর বা এই কেন্দ্রশাসিত রাজ্যের উপরাজ্যপালের উপর। এখন মানুষ প্রশ্ন তুলছেন, দিল্লির মসনদে বসার সময়ে মনে ছিল না যে অনেক ক্ষেত্রেই দিল্লি সরকারের ক্ষমতা উপরাজ্যপালের ছাড়পত্রের উপর নির্ভর করে? তাঁরা তো এমন সরকারই চাইবেন যে নির্ঝঞ্ঝাটে তাঁদের কাজ করে দিতে পারে।
এই অভিযোগ এবার পার্টির বিভিন্ন মহলে শোনা যাচ্ছিল, তবে তা ছিল চাপা। সেই অভিযোগে ধুয়ো দিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেস তুলে আনে জনসমক্ষে। তেমন আপ একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়েছে – এই খবরও ছড়িয়ে পড়ে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তৈরি হয়েছিল ইন্ডিয়া এগেনস্ট করাপশন (আইএসি)। সেই সংগঠনের সঙ্গীরা অনেকেই কেজরিওয়ালের হাত ছেড়ে দূরে সরে গেছেন। এদিকে সম্প্রতি আপের রাজ্যসভার সাংসদ স্বাতী মালিওয়াল এক গুরুতর অভিযোগ করে বসেন। কেজরিওয়াল মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর বাসভবনে নাকি স্বাতীকে মুখ্যমন্ত্রীর আপ্ত সহায়ক মারধোর করেছিলেন। দল বা দলের জাতীয় আহ্বায়ক সেই লোকটার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নাকি নেয়নি। এছাড়াও খবর ছড়ায় যে রাজ্যসভায় পাঠানোর কিছুদিন পরেই নাকি স্বাতীকে পদত্যাগ করতে অনুরোধ করা হয়, যাতে অন্য একজনকে ওই পদ দেওয়া যায়। যদিও এই অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঠিক বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে স্বাতী ফের মুখ খোলেন। বলেন যে আপ দিল্লির সরকার আর পৌরসভা –দুটোই জেতা সত্ত্বেও যমুনার জল পরিষ্কার করতে ব্যর্থ। তাছাড়া নয়াদিল্লিতে রাস্তাঘাটের অবস্থাও ভয়ঙ্কর। দিল্লিবাসী বেসরকারি কোম্পানির এক কর্মীর কথায় ‘রাস্তায় এত গর্ত যে গাড়ি চালানোর সময়ে লম্ফঝম্পে মাঝেমধ্যেই মাথা গাড়ির ছাদে ঠুকে যায়। আরও আছে। প্রতি বর্ষায় দিল্লির রাস্তায় থাকে জল জমে, ফলে বীভৎস ট্র্যাফিক জ্যাম হয়। তবে কি এই সমস্ত অভিযোগ, কথিত একনায়কতন্ত্র, অহংকার – এসবের জন্যেই হার হল?
না, আরও আছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে হাত মিলিয়ে লড়ার পর এবার বিধানসভায় কংগ্রেসের হাত ছাড়েন কেজরিওয়াল। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব কেজরিওয়ালকে সমর্থন জানিয়ে বিজেপিবিরোধী ইন্ডিয়া জোটের আরেক শরিক কংগ্রেসকে একঘরে করে দেন। আসলে এই তিন নেতা প্রাদেশিক রাজনীতির খাতিরে ইন্ডিয়া জোটে কংগ্রেসকে কোণঠাসা করে রাখতে ইচ্ছুক। ফলাফলে কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এবার দিল্লি বিধানসভার ৭০টা আসনের প্রায় ১৩টা আসনে বিজেপি-আপের ভোট ব্যবধানের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে কংগ্রেস। একটায় আবার কংগ্রেস প্রার্থী বিজেপির পর দ্বিতীয় স্থানে শেষ করেছেন, আপ তৃতীয় স্থানে। অর্থাৎ কংগ্রেস প্রার্থী না থাকলে হয়ত ওই কেন্দ্রগুলোতে সমস্ত বিরোধী ভোট যেত আপের পকেটে। সেক্ষেত্রে বিজেপির হারার সুযোগ থাকত।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, আপের জন্মই হয়েছিল কংগ্রেস দুর্নীতিগ্রস্ত – এই অভিযোগ তুলে তীব্র আন্দোলন করে। তাই কংগ্রেস সমর্থকদের ভোট আপ প্রার্থী পেলেও, আপের ভোট কি কংগ্রেসের খাতায় যেত? পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু দেখা গেছে যে বামপন্থীরা আর কংগ্রেস জোট বাঁধলেও সব ভোট একদিকে যায়নি, কারণ দুই পক্ষের কয়েক দশকের অতি কঠোর বিরোধিতার ইতিহাস। তাই আপ-কংগ্রেস জোট হলেই এবার দিল্লির ফলাফল বদলে যেত – এমন ভাবলে হয়ত ঠিক হবে না। যেমন লোকসভা নির্বাচনে একসাথে লড়েও দিল্লির সাতটা আসনেই হেরে গিয়েছিল এই দুই দল।
এবারের নির্বাচনের আরেকটা দিক হল, আসাদউদ্দিন ওয়েসির অল ইন্ডিয়া মজলিশ-এ-ইত্তেহাদ-উল মুসলিমীন (এআইএমআইএম) দিল্লি বিধানসভার দুটো মুসলমানবহুল এলাকায় প্রার্থী দিয়েছিল। দুটোতেই তারা তৃতীয় স্থানে থাকলেও একটায় আপ জিতেছে, অন্যটায় বিজেপি। কাজেই কাটাকুটির খেলায় বিজেপিরই লাভ হয়েছে ওই আসনগুলোতে। বাকি যেসব আসনে মুসলমান ভোটারের সংখ্যা যথেষ্ট, সেগুলো কিন্তু আপ জিতেছে।
আরো পড়ুন আপ: ধর্মনিরপেক্ষতার ভান ছেড়ে হিন্দুত্ববাদের রাজপথে
এবারে বিজেপির প্রচারও ছিল খুব আক্রমণাত্মক। আপের প্রধান ভোট ব্যাংক, অর্থাৎ ‘ঝুগ্গি-ঝোপড়ি’ (বস্তিবাসী), পূর্বাঞ্চলি (বিহার, উত্তরপ্রদেশ থেকে দিল্লিতে যাওয়া মানুষ এবং সামগ্রিকভাবে হিন্দিভাষী প্রবাসী শ্রমিক), অটোচালক, মহিলা, মধ্যবিত্ত ইত্যাদিদের লক্ষ্য করে চলেছে বিজেপির প্রচার। সংঘ পরিবার ও বিজেপির কর্মীরা একদিকে বস্তিতে, অন্যদিকে মধ্যবিত্তদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কথা বলতে শুরু করে। সেখানে ভোট চাওয়া হয়নি, শুধু কুশল বিনিময় ও সুবিধা-অসুবিধার কথা জিজ্ঞেস করা হয়েছে। অর্থাৎ ইশারায় আসল কথাটা বুঝিয়ে দেওয়া, যে আপ তাঁদের পরিষেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
এর মাঝেই এল বাজেটে আয়কর নিয়মে পরিবর্তন। ইতিমধ্যে আপের নির্বাচনী ঘোষণাগুলোকে হরির লুট আখ্যা দিয়ে বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রায় একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দিল্লিবাসীদের। নির্বাচনের প্রাক্কালে সমস্ত ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ নিয়েও কেমন যেন পিছিয়ে পড়ল আপ। কিন্তু তখনো বোঝা যায়নি যে ফল এতটা ঘুরে যাবে। একথা ঠিক যে বোঝা যাচ্ছিল, এবার রাজধানীর বিধানসভার জন্য হবে হাড্ডাহাডি লড়াই। তাই তো ফল ঘোষণার একদিন আগে কেজরিওয়ালের ভাবনা ছিল – তাঁর বিধায়কদের কেনার চেষ্টা চলছে বা চেষ্টা করা হবে। অথচ চোখের সামনে দিয়েই যে বিজেপি জমি কেড়ে নিল তা আপের পরার্শদাতা আইপ্যাক সংস্থার চোখ হয়ত এড়িয়ে গিয়েছিল।
তাহলে দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের ফলের উপর প্রাথমিকভাবে চোখ বোলালে এতগুলো কারণ দেখা যাচ্ছে আপের ভরাডুবির। কোনো একটা কারণ নয়।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








