দেবাদিত্য রায়চৌধুরী
যাঁরা নয়া উদারবাদ, আধিপত্যবাদ, সংখ্যাগুরুবাদের বিকল্প রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন তাঁদের কাছে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল এক স্বস্তিদায়ক চমক হয়ে এসেছিল। ২০২৩ সালের শীতকাল থেকে ২০২৪ সালের বসন্ত পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ – বিজেপির রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্তিশগড়ে বিজয়, রামমন্দিরের উদ্বোধন এবং প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিপূজায় মূলধারার সংবাদমাধ্যমের উন্মত্ততা – ইঙ্গিত করছিল যে সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে চলেছে। কিন্তু বাস্তবে বিজেপির চার শতাধিক আসন পাওয়ার আশা বড় ধাক্কা খায়। তারা লোকসভায় ২৪০ আসনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং এনডিএ-র মোট আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯৩। বিজেপি প্রথমবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে সরকার গঠনের জন্য চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলুগু দেশম (টিডিপি) ও নীতীশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেডের (জেডিইউ) সাহায্য নিতে বাধ্য হয়।
সেটি ছিল বিরোধী দল, নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা মানুষজন এবং সাধারণ নাগরিকদের জন্য রাজনৈতিক স্বস্তির মুহূর্ত। একটি আধিপত্যবাদী সংখ্যাগুরুবাদী দলের সরকারের রাশ আলগা হয়ে যায়। বিজেপি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, ধান্দার পুঁজিবাদ এবং দল ভাঙানোর মত কৌশল ব্যবহার করে যে সাম্রাজ্য কায়েম করেছে তার শক্তিক্ষয় অনেককেই আশান্বিত করে এবং স্বস্তি দেয়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কিন্তু যা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল, তা হল তাদের প্রচেষ্টা বা নাগরিকদের মধ্যে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ওই অপ্রত্যাশিত ফলাফলের কারণ ছিল না। বরং ওই ফলের কারণ ছিল ভারতের সাধারণ মানুষের একত্রে দাঁড়ানো; সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি, আধিপত্যবাদী শাসন এবং নির্বাচিত স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। জনগণ মূল্যবৃদ্ধি, করের উচ্চ হারের বোঝা, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং স্থবির বেতন নিয়ে চরম অসন্তোষে ভুগছিল। তাছাড়া বিজেপির ‘৪০০ পার’ স্লোগানের কারণে দলিত ও পশ্চাৎপদ জাতিগুলো আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। কারণ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সরকার সংবিধান বদলে ফেলার মাধ্যমে সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাতিল করার সুযোগ পেতে পারত।
তবে জুন ২০২৪ থেকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। কংগ্রেস এবং অধিকাংশ বিরোধী দলগুলির মধ্যে আত্মতুষ্টি, ভ্রান্ত গর্ব এবং একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা দেখা দিয়েছে। তারা ভোটারদের আস্থা ও বিশ্বাসকে সহজলভ্য ধরে নেওয়ার ফাঁদে পা দিয়েছে। ২০২৩ সালে গঠিত ইন্ডিয়া জোট লোকসভা নির্বাচনের ফল তাদের যে সুযোগ দিয়েছিল তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। স্বার্থপরতা, অহং, সংকীর্ণ স্বার্থ এবং আসন ভাগাভাগি নিয়ে বিবাদ জাতীয় স্বার্থকে পিছনে ঠেলে দিয়েছে।
ইন্ডিয়া জোটের দলগুলির কোনো সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচি, যৌথ সমাবেশ বা গণপ্রতিরোধ আন্দোলন ছিল না। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, করের উচ্চ হার, আদানির প্রভাবশালী পুঁজিবাদ, দুর্নীতি, ওয়াকফ বিল, এক দেশ এক নির্বাচন বিল, অভিন্ন দেওয়ানি বিধির মত জাতীয় ইস্যুগুলি নিয়ে রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি করার কোনো সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা ছিল না। এদিকে বিজেপি দেশের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে সম্পদশালী দল। তারা নিজেদের সংগঠিত করতে এবং শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম হয়েছে।
হরিয়ানায় ভরাডুবি এবং কাশ্মীরে মুখরক্ষা
২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে হরিয়ানা এবং জম্মু-কাশ্মীরে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। হরিয়ানা এমন একটি রাজ্য (পাঞ্জাব বাদে), যা গত কয়েক বছরে কৃষক আন্দোলনের কারণে সবচেয়ে বেশি বিজেপিবিরোধী আন্দোলন ও অসন্তোষ দেখেছে। লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস এবং আপের জোট ওই রাজ্যের দশটির মধ্যে পাঁচটি আসনে জয়ী হয়েছিল। সেইসময়ের রাজনৈতিক পরিবেশ হরিয়ানায় কংগ্রেসের সহজ এবং বিশাল জয়ের দিকে ইঙ্গিত করছিল। কিন্তু কংগ্রেস পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূল রাখতে ব্যর্থ হয়। জাঠদের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা হরিয়ানা অন্য জাতগুলিকে দূরে সরিয়ে দেয়। কুমারী শৈলজার মত দলিত নেতাদের উপেক্ষা করা এবং রাহুল গান্ধীর ইচ্ছা সত্ত্বেও আম আদমি পার্টির (আপ) সঙ্গে জোট গড়তে ব্যর্থ হওয়া কংগ্রেসের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। ফলে বিজেপি তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় ফিরে আসে। বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে ভোটের তফাত ছিল মাত্র ০.৮৫%, আর আপ ভোট পেয়েছিল ১.৭৯%।
অন্যদিকে জম্মু-কাশ্মীরে ইন্ডিয়া জোটের ন্যাশনাল কনফারেন্স কাশ্মীর উপত্যকায় চমৎকার ফল করে (৪২)। ফলে জোটের ফলও সব মিলিয়ে ভাল হয়। তবে বিজেপি জম্মু অঞ্চলে তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, কংগ্রেস তেমন ভাল না করলেও (৬) ন্যাশনাল কনফারেন্স, কংগ্রেস ও বামেদের জোট বিজেপিকে (২৯) পরাস্ত করতে সক্ষম হয়।
মহারাষ্ট্রে বিপর্যয় এবং ঝাড়খণ্ডে প্রতিরোধ
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে মহারাষ্ট্র ও ঝাড়খণ্ডে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মহারাষ্ট্র গত পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক অস্থিরতার সাক্ষী ছিল। বিজেপি শুধুমাত্র ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি ও শিবসেনা – এই দুটি আঞ্চলিক দল ভাঙেনি, এক বিশৃঙ্খল, নীতিহীন এবং জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল।
মহা বিকাশ আঘাড়ি জোটে ছিল কংগ্রেস, এনসিপি-শরদ পওয়ার গোষ্ঠী এবং শিবসেনা-উদ্ধব ঠাকরে গোষ্ঠী। অন্যদিকে মহায়ুতি জোটে ছিল বিজেপি, এনসিপি-অজিত পওয়ার গোষ্ঠী এবং শিবসেনা-শিন্ডে গোষ্ঠী। লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট অসাধারণ ফলাফল করে ৪৮টির মধ্যে ৩০টি আসনে জয়ী হয়, কংগ্রেস রাজ্যের একক বৃহত্তম দল হয়ে ওঠে। কৃষক আত্মহত্যা, সয়াবিন ও আখ চাষের সমস্যা, মারাঠা সংরক্ষণ আন্দোলন এবং দল বিভাজনের প্রতি মানুষের বিরূপ মনোভাব বিজেপির ক্ষতি করে।
অথচ মাত্র সাড়ে চার মাসের ব্যবধানে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট ২৮৮টির মধ্যে ২৩৫টি আসনে জয়লাভ করে এবং ৪৯.৩% ভোট পায়। মূলধারার সংবাদমাধ্যম এই অভাবনীয় ফলাফলের জন্য লাডকি বহেন যোজনা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে কৃতিত্ব দেয়। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচনের মাঝের পাঁচ মাসে মহারাষ্ট্রে প্রায় ৪০ লক্ষ নতুন ভোটারের নাম নথিভুক্ত হয়েছে, যেখানে আগের পাঁচ বছরে ৪৪ লক্ষ নতুন ভোটার যোগ হয়েছিল। ভোট শতাংশেও বিস্তর অসঙ্গতি রয়েছে বলে বিরোধীরা অভিযোগ করছে। এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি এবং সংবিধানিক দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে হবে। কিন্তু একথাও অনস্বীকার্য যে কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রচার ছিল অত্যন্ত শিথিল। আসন ভাগাভাগি নিয়ে বিবাদ মনোনয়ন জমা দেওয়ার দিন পর্যন্ত চলেছে। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোটের অংশীদারদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং একমত হতে না পারার বিষয়টি স্পষ্ট ছিল, যা ভোটারদের আস্থায় চিড় ধরায়।
আরো পড়ুন রিসর্ট রাজনীতি থেকে ভারত দর্শন রাজনীতি: মহারাষ্ট্র যা দেখাল
অন্যদিকে ঝাড়খণ্ডে জনপ্রিয় আদিবাসী মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকে লোকসভা নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলি গ্রেপ্তার করে। তবুও জনপ্রিয় সামাজিক কল্যাণ প্রকল্প এবং দরিদ্রবান্ধব শাসনের উপর ভর করে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা আর কংগ্রেস মিলে বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোটকে হারিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসে।
ওই জয়ের পিছনে হেমন্ত সোরেনের স্ত্রী কল্পনা সোরেনের ভূমিকাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কঠিন সময়ে তাঁর স্বামীর গ্রেফতারের পরেও তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে দলের মনোবল ভাঙতে দেননি। ঝাড়খণ্ড জয় বিজেপির জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ সেখানে জিতলে তারা খনিজ ত্রিভুজ – ওড়িশা, ছত্তিশগড় এবং ঝাড়খণ্ড – বাস্তবায়নে কর্পোরেটপন্থী নীতি নিতে পারত। কিন্তু ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী কার্যকর জোট, যাদের বড় শক্তি আদিবাসী নাগরিকরা, তারা জনগণের আশীর্বাদ পেয়েছে।
দিল্লিতে নির্বাচনী সংকট ও আদর্শহীনতার পরাজয়
গত তিন বছরে দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তাঁর উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়া এবং ওই দলের অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে সিবিআই ও ইডি তদন্ত চালিয়েছে এবং তাঁরা গ্রেফতার হয়েছেন। যদিও একটি অভিযোগও আজ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি। শেষ দশ বছর সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে তীব্র অসহযোগ থেকে শুরু করে দিল্লি সরকারের ক্ষমতা হ্রাস – আপকে সবরকমভাবে কোণঠাসা করেছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আপ কংগ্রেসের সঙ্গে ইন্ডিয়া জোটের অংশ হিসাবে একত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। তবুও ২০১৪ এবং ২০১৯ সালের মত ২০২৪ নির্বাচনেও বিজেপি লোকসভা নির্বাচনে রাজধানীর সাতটি আসনের সবকটিতেই জয়লাভ করে।
তবে প্রকৃত লড়াই দেখা গেল এমাসের বিধানসভা নির্বাচনে। একদিকে পুনরুজ্জীবিত বিজেপি, অন্যদিকে দশ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া অসন্তোষ ও দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত আপ। এই দুইয়ের মধ্যেও সাধারণ ধারণা ছিল যে আপ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে সক্ষম হবে। কিন্তু আপ ও কংগ্রেসের মধ্যে জোট গঠনের প্রচেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। বরং দুই দলের মধ্যে গভীর শত্রুতা জনসমক্ষে আসে। সোশাল মিডিয়ায় কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতারা, টিভির পর্দায় উপস্থিত মুখপাত্ররা বারবার মুখর হয়েছেন আপের পরাজয় চেয়ে। তাতে বিজেপির জয় এলেও তাঁদের বিশেষ সমস্যা নেই বলে মনে হয়েছে। ইন্ডিয়া জোটের অবশিষ্ট প্রাণটুকুও গেল দূষিত যমুনার জলে। ফলে দিল্লিতে ২৭ বছর পর বিজেপি জিতল। বিজেপি এবং আপের মধ্যে ভোট শতাংশের পার্থক্য মাত্র ২%, যেখানে কংগ্রেস ভোট পেয়েছে প্রায় ৬.৫%। এমন দাবি করলে ভুল হবে যে দুই দলের ভোট যোগ করলেই নির্বাচনী জোটের রসায়ন তৈরি হয়ে যেত। তবে অভিন্ন লক্ষ্য এবং কর্মসূচির উপর ভিত্তি করে একটি কার্যকরী এবং দীর্ঘস্থায়ী জোট নিশ্চিতভাবেই বিজেপিবিরোধী ভোটকে একত্রিত করতে পারত।
তবে এখানেও মনে রাখা জরুরি যে মহারাষ্ট্রের মত দিল্লিতেও ভোটার অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে মাত্র সাত মাসে। লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের মাঝের সাত মাসে দিল্লিতে প্রায় চার লক্ষ নতুন ভোটার নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের পাঁচ বছরে ছিল মাত্র ৪.১৬ লক্ষ।
ভোটার তালিকায় অসঙ্গতির প্রশ্ন নির্বাচনের আগেই আপ তুলেছিল। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আসনে ভোটার সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যেমন কেজরিওয়ালের নিজের নিউ দিল্লি আসনে অস্বাভাবিকভাবে ভোটার কমে গেছে, আবার মুন্ডকার মতন আসনে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হয়েছে। কিরারি, বদরপুর, করাবল নগর, বিকাশপুরী, বাবনা, বদলি, শাহাদারা, নাংলই থেকে ভোটার তালিকায় অসঙ্গতির দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে দ্য কুইন্ট। এইসব অসঙ্গতি সাধারণ নাগরিকের মনে নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্পর্কে শঙ্কা তৈরি করে। এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছ ও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা কাঙ্খিত।
দিল্লির নির্বাচন থেকে আপ এবং অনুরূপ মানসিকতার দলগুলির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়ার আছে। বিজেপির রাজনীতির মোকাবিলায় আদর্শহীন রাজনীতি কিছুদিনের জন্য ফলপ্রসূ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পর্যুদস্ত হবেই। বিজেপি একটি প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শভিত্তিক দল, যার শক্তি একদিকে সংঘবদ্ধ ধর্মের (সংঘবদ্ধ ধর্ম এবং আধ্যাত্মিক ধর্ম আলাদা) উপর ভিত্তি করে গড়া হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি, অন্যদিকে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি। একথা বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সফল প্রতিরোধ কেবল গান্ধীবাদী, সমাজবাদী, আম্বেদকরবাদী এবং কমিউনিস্ট মতাদর্শের দ্বারাই করা সম্ভব। বিজেপির মোকাবিলায় মতাদর্শভিত্তিক রাজনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইন্ডিয়া জোটের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
লোকসভা নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত সমস্ত বিধানসভা নির্বাচনে একথা স্পষ্ট হয়েছে যে বিজেপি তাদের সংগঠন এবং সম্পদের শক্তিতে অপ্রতিরোধ্য। ইন্ডিয়া জোটের শরিক দলগুলি যদি পৃথকভাবে বা দুর্বল মনোভাব নিয়ে লড়াই করে, তাহলে বিজেপিকে পরাজিত করা অসম্ভব। শুধুমাত্র প্রতীকী নির্বাচনী জোট গঠন করেও এই সংগঠিত এবং শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করা সম্ভব নয়। এর উদাহরণ হিসাবে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের অকেজো জোটের ধারাবাহিক ব্যর্থতা উল্লেখযোগ্য।
২০২৩ সালের জুলাই মাসে ইন্ডিয়া জোট গঠন করা হয়েছিল বিজেপির মোকাবিলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি দ্বারা নেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে এই জোট বিশেষত উত্তরপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্রে ভাল ফল করেছিল, যার ফলে বিজেপি এক দশকের মধ্যে প্রথমবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। তবে ওই নির্বাচনেও শরিক দলগুলির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল স্পষ্ট। জোটের কোনো ন্যূনতম সাধারণ কর্মসূচি ছিল না। সংবিধান বাঁচানোর আহ্বান ছাড়া কোনো অভিন্ন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক আখ্যান ছিল না, কোনো কার্যকরী সমন্বয় কমিটিও ছিল না, যারা রোজকার প্রচারের তদারকি করবে। কিন্তু এই দুর্বলতাগুলি থাকা সত্ত্বেও রক্ষকের ভূমিকা পালন করেছিল ভারতের জনগণ।
লোকসভা নির্বাচনের পরবর্তী মাসগুলিতে জোটের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন সংগঠিত করার জন্য কোনো সাধারণ পরিকল্পনা ছিল না, রাস্তায় বা সংসদের মধ্যে সরকারকে মোকাবিলার জন্য কোনো কৌশল ছিল না এবং নির্বাচনী কৌশল নিয়েও কোনো সমন্বয় ছিল না। শুধুমাত্র নির্বাচনের আগে জোট গঠন বা জোটের অভাব পরিণত ভারতীয় ভোটারের কাছে তেমন প্রাসঙ্গিক নয়। বিজেপির মোকাবিলায় অবিলম্বে সমস্ত শরিক দলগুলির মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক, ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল, দরিদ্রবান্ধব এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বপ্ন যদি টিকিয়ে রাখতে হয়, তাহলে এই দ্বন্দ্বমুখর দলগুলির দায়িত্ব সমন্বয় নিশ্চিত করা। এই সমন্বয়ের ভিত্তি হতে হবে এক দরিদ্রবান্ধব অর্থনীতি এবং শাসনব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি যা হবে দরিদ্র এবং মধ্যবিত্তের পক্ষে, শাসক বুর্জোয়া শ্রেণির উদারনৈতিক অর্থনীতির বিপরীতে, প্রগতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং গণতান্ত্রিক। একটি বৃহৎ এবং বৈচিত্র্যময় দেশে জোটের জন্য একক নেতা নির্বাচন করা অপরিহার্য নয়, কিন্তু একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক আখ্যান তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাতে সময় অল্প, তাই দলগুলির এখনই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। নইলে আমাদের সাধারণতন্ত্রকে ধনবান এবং প্রভাবশালীদের কবল থেকে পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন চিরতরে মুছে যাবে। ক্ষুদ্র স্বার্থ এবং অহঙ্কার আপাতত ভুলে যাওয়া উচিত।
বিজেপির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তি
বিজেপিকে কার্যকরভাবে প্রতিহত করতে হলে তাদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট বোঝাপড়া প্রয়োজন। বিজেপি স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে সুসংগঠিত এবং সুপরিকল্পিত নির্বাচনী সংগঠনসম্পন্ন দল। তাদের মতাদর্শগত ভিত্তি ও সাংগঠনিক সমর্থন আসে আরএসএস থেকে, যারা নির্বাচনের সময়ে পিছনে থেকে নিজেদের ভোটারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, কার্যকর স্থানীয় প্রচারাভিযান এবং সাম্প্রদায়িক মেরুকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিজেপি দেশের প্রতিটি বড় কর্পোরেট হাউস থেকে আর্থিক সহায়তা পায়, যার প্রমাণ নির্বাচনী বন্ড কেলেঙ্কারির মাধ্যমে সর্বসমক্ষে এসেছে। ধান্দার পুঁজিবাদী মডেল নিশ্চিত করে যে তাদের শিল্পপতি মিত্ররা বিপুল পরিমাণ নির্বাচনী অর্থসাহায্যের পরিবর্তে কর ছাড়, শস্তায় জমি, সরকারি টেন্ডার পাবে। মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রায় পুরোটাই এখন বিজেপির প্রচারযন্ত্র হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনের মত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যার কাজ নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নিরপেক্ষ রাখা, সে সন্দেহজনক আচরণ করছে। বিজেপি সিবিআই এবং ইডিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছে বিরোধী দলগুলিকে ভেঙে দিতে। অভিযুক্ত নেতারা বিজেপিতে যোগদানের পরেই তদন্ত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আজকের ভারতীয় রাজনীতিতে বিজেপির শক্তির পরিধি এবং ব্যাপ্তি এতখানি। এর মোকাবিলায় সুপরিকল্পিত ও মতাদর্শভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।
বিজেপির এই সুসংগঠিত ও শক্তিশালী রাজনৈতিক যন্ত্রকে প্রতিহত করতে গেলে, বিরোধী দলগুলির অন্তত একটি সুসংহত কৌশল তৈরি করা জরুরি।
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনগুচ্ছ
আসন্ন বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু এবং আসামের বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধী দলগুলির ঐক্যবদ্ধ কৌশল অথবা তার অভাব বিজেপির রাজনৈতিক শক্তির মুখোমুখি হবে। বিহার ইন্ডিয়া জোটের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সেখানে বিজেপির লক্ষ্য হবে কেবল জয়লাভ নয়, বরং বৃদ্ধ ও অস্থির মনোভাবের নীতীশ কুমারকে সরিয়ে নিজেদের মুখ্যমন্ত্রীকে মসনদে বসানো। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটের আপাতত সমস্যায় না পড়ারই কথা। তবে তামিলনাড়ুর মানুষ সাধারণত একই দলকে টানা ক্ষমতায় রাখেন না। আসামে হিন্দুত্বের পোস্টার বয় হেমন্ত বিশ্বশর্মার নেতৃত্বাধীন বিজেপি এবং এক দশক ধরে রাজনৈতিক অন্ধকারে থাকা কংগ্রেসের মধ্যে লড়াই হবে, যেখানে বিজেপি আপাতদৃষ্টিতে এগিয়ে আছে।
পশ্চিমবঙ্গ আবার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সাক্ষী হবে। যেখানে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি, বাম দলগুলো এবং কংগ্রেস একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। একথা নিশ্চিত যে পশ্চিমবঙ্গে ইন্ডিয়া জোট বলে কিছু থাকবে না। দেড় দশকের শাসনে বিপুল দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তৃণমূল কংগ্রেস যথেষ্ট মজবুত অবস্থায় রয়েছে। তবে রাজ্যে আরজি কর মেডিকেল কলেজের মর্মান্তিক ঘটনা (যেখানে একজন তরুণী ডাক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়) বিরাট গণপ্রতিবাদের জন্ম দিয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই প্রতিবাদগুলি প্রধানত নাগরিক সমাজ, বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক শক্তির নেতৃত্বে হয়েছে। বিজেপি রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতি বিরুদ্ধ স্বর হিসাবে জনগণের আস্থা নেই। তাই পশ্চিমবঙ্গের সব প্রগতিশীল এবং গণতান্ত্রিক শক্তির প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বিজেপিকে তৃতীয় স্থানে নামিয়ে দেওয়ায় এবং নির্বাচনী লড়াই শাসক তৃণমূল আর বাম-কংগ্রেসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা।
এককথায়, দেশের বিরোধী দলগুলির মধ্যে মূল্যবোধ এবং অভিন্ন আদর্শের ভিত্তিতে ঐক্যই বিজেপির মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। বিরোধী দলগুলি পুরোপুরি বিশৃঙ্খল, ইন্ডিয়া জোটের অবস্থা দিল্লির দূষণের চেয়েও শোচনীয়।
নিবন্ধকার সমাজকর্মী এবং সরকারি কলেজের অধ্যাপক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








