ভবতারণ কুমার

শাল পলাশ আর মহুয়ার বনে বাদাড়ে নাগড়ার ধুমৈল, পাখোয়াজের বোলে, ঝুমরিয়া যখন পাহাড়ি হাঁকে গেয়ে ওঠে
সিন্দুর বরন অঙ্গ মুসিক বাহন
সর্বকাজে সিদ্ধিদাতা গৈরীর নন্দন

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বা

শঙ্খ বাজে ঘন্টা বাজে বাজে করতাল
সখীগণ মাঝে নাচে গৌরীর দুলাল
নাচ নাচ নাচ রে বিঘ্ন বিনাশন গণপতি লাল।
(ধেনে ধাগে তেটে ধেনে ধা)

তখন আসরে প্রবেশ করে বিশাল মুখোশ পরিহিত গণেশ। রাত যত গভীর হয়, নাচ তত এগিয়ে চলে, শুরু হয় দুর্গা-মহিষাসুরের ভীষণ যুদ্ধ। বাজনা বাজে

টেতা কেটে      কেড়েন তাউর
ডেগ তা কেটে        কেড়েন তাউর
ডেগ তা কেটে     তেটে তাউর
তা কেন কেন তা কেন কেন তা কেন কেন
কেড়েন কেড়েন কেড়েন।

খোলা আকাশের নিচে দর্শকবেষ্টিত আসরে একদিকে ধুলো ওড়ে, অন্যদিকে সমানে চলতে থাকে দর্শকদের কুলকুলি, সৃষ্টি হতে থাকে একটা পর একটা রোমাঞ্চকর মুহূর্ত। পুরুলিয়ায় প্রচিলত কথা আছে ‘নাচে কাদা করে দিল’ অর্থাৎ নাচিয়েদের আসুরিক কসরতে পাথুরে লাল মাটি ধুলো হয়, ঘামে ভিজে কাদা হয়। এটা অতিকথন মনে হতে পারে, কিন্তু নাচিয়েদের আগলি, পেছলি, ফিরকি, হাঠুপটকা, বুক পটকা ও আধুনিক বিভিন্ন ধরনের ডিগবাজি নামি দামি সার্কাসের ডিগবাজিকেও হার মানাবে। ছৌ শিল্পীদের কসরত আর পরিশ্রম না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

ছৌ নাচ লোকনৃত্য। লোকজীবনের সুখদুঃখ, ব্যথাবেদনা, হাসিকান্না বাঙ্ময় হয় কলাকুশলীদের নাচে, ঝুমরিয়ার ঝুমুরে, বাজিয়েদের বাজনায়। দর্শকরা নিজেদের জীবনের উপাদান খুঁজে পায় ছৌ নাচে।

আমি পাথর কাটি উ ডুংরি পাহাড়ে
তাও হামার ভাত নাই আজ ঘরে
ও ছেলা কাঁদে, কাঁদে, ভখের জ্বালায় ছেলা কাঁদে।

শুধু কি ছেলে কাঁদে? সাথে কাঁদে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করা দর্শক, কাঁদে বাজিয়ের দল। তারা জানে, তাদের কপালে সকালে জুটবে কত। দুশো বা আড়াইশো টাকা, যা দিয়ে আজকের এই অগ্নিমূল্যের বাজারে সংসার চলে না। ঝুমরিয়ার কণ্ঠ তখন রুদ্ধ হয়ে যেতে চায়। হয়ত তাকে কলেজের পরীক্ষার ফি জোগাড় করতে আরও কয়েকটা আসরে গলা ফাটাতে হবে। মুখোশ পরা নাচিয়ের দল, যাদের চোখের জল বা দীর্ঘশ্বাস – কিছুই বোঝার উপায় নেই। পা, পিঠ, কোমর ব্যথার ওষুধ কেনার পর কতটুকুই বা বাঁচবে? মেয়ের বিয়ে, মায়ের চিকিৎসার জন্য ভিনরাজ্যে কি ভিনদেশে তাকে যেতেই হবে।

লোকজীবনের সঙ্গে লোকনাচ মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়ে তৈরি করে অমূল্য শৈল্পিক সম্পদ। ছৌ মূলত কৃষিজীবী মানুষের নাচ। ছৌয়ের তালে তালে বৃষ্টির আরাধনা করা হত – এই দিয়ে শুরু। শিবের গাজন তার অঙ্কুরোদ্গম। তারপর এক্যাড়া-মেল-পালা।

এক্যাড়া নাচ অর্থাৎ একা একা নাচ। একা গণেশ, কার্তিক, শিব, দুর্গা, পরশুরাম, কৃষ্ণ নাচ হত। পরে এল মেল ছৌ। মানে প্রথমে দুজন, তারপর চারজন, ক্রমে ৬-৮-১০-১২ জনের একসাথে নাচ। একসাথে পা পড়বে, একসাথে হাত উঠবে, একসাথে মাথা নড়বে, একসাথে ফিরকি, একসাথে ডিগবাজি। অনেকটা প্যারেডের মত।

এরপর এল পালা ছৌ।

বাঘমুণ্ডির রাজপরিবার ছৌ নাচের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। বংশপরম্পরায় পৃষ্ঠপোষকতা চলেছিল। রাজা মদনমোহনের সময়ে পালা ছৌ শুরু হয়। তাঁর ব্যবস্থাপনায় চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে বসত ছৌ নাচের আসর। আদেশ ছিল প্রতিবছর নতুন নতুন পালা তৈরি করতে হবে। আদেশ, উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা তৈরি হতে থাকে একটার পর একটা পালা।

মাদলার গোকুল মুখার্জি গণেশ-পরশুরামে যুদ্ধ পালাবদ্ধ করেন। ভিখা লায়া কার্তিক ছৌ, হরি সিং বাবু, যুগল সিং বাবু তরণীসেন বধ, ঘোড়াবান্ধা সিন্দীরর লাল মাহাতো রক্তবীজ, পাটা হেঁসেলের বুকা সিং অকাসুর বকাসুর বধ, মোহন তাঁতি ত্রিবিদ বা নর, সিরুমের মরু মাঝি চাঁদ সদাগর আর মনসা, ভিখা লায়া কামদেব বধ, হরিবাবু শুম্ভ নিশুম্ভ বধ।

এরপর গড়ে ওঠে গ্রামে গ্রামে ছৌয়ের দল, তৈরি হতে থাকে বিভিন্ন ধরনের পালা। মূলত পৌরাণিক কাহিনীকে ভিত্তি করে পালা তৈরি হত। এখন বহু ঐতিহাসিক, সামাজিক পালাও তৈরি হয়ে গেছে। যেমন সাঁওতাল বিদ্রোহ, কার্গিল যুদ্ধ, গরিবের রাজা বারীন হুড ইত্যাদি। মেয়েরা উল্লেখযোগ্যভাবে নাচে অংশগ্রহণ করছে। ছৌ নাচ মূলত বীররসের ব্যাপার হলেও করুণরস ও হাস্যরসের অনেকগুলো প্রশংসনীয় পালা আছে। এই নাচে বিভিন্ন ধরনের চাল দেখা যায়। যেমন জমিদার, রাজা, দেবতা, অসুর, যক্ষ, কিন্নর, বাঘ, বানর, সাপ ইত্যাদি। পুরনো দিনের ওস্তাদরা প্রায় সকলেই স্বশিক্ষিত মানুষ ছিলেন। যেমন গম্ভীর সিং মুড়া বলতেন ‘আমি গরু চরানোর সময়ে দেখতাম বানর কেমন হাঁটে, বাঘ কেমন শিকার করে, কেমন দৌড়ায়। এইসব দেখে দেখে রপ্ত করার চেষ্টা করেছি।’ ক্রমে চুয়াড় বিদ্রোহখ্যাত পুরুলিয়া ছৌ ভূমি হিসাবে পরিচিত হতে শুরু করে। এখন কথায় কথায় মানুষ বলে ‘পা ফেললেই ছৌ আর হাঁ করলেই ঝুমুর।’

ছৌ নাচের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল মুখোশ আর বাজনা। মুখোশ তৈরি করা সময়সাপেক্ষ এবং কষ্টসাধ্য। মুখোশ কীভাবে হয় তা আরেকদিন বলা যাবে। এবার আসি বাজনার কথায়।

নাগড়া (ধামসা) ঢোল, সিন্থেসাইজার, সানাই, ঝুনঝুনি সহ আধুনিক বিভিন্ন ধরনের বাজনার ব্যবহারও হচ্ছে। ছৌ নাচের বাজিয়েরা নাচিয়েদের নাচায়। নাচে তাল কেটে গেলে বা ভুল বাজনা বাজলে নাচের গণ্ডগোল তো হবেই। নাচিয়ের হাত-পা ভেঙে যেতে পারে। তাল ও সুর নাচে ভাব সৃষ্টি করে, তালে হাত-পা-মাথা-কাঁধ সঞ্চালিত হয়।

পুরুলিয়া লিটারারি মিটে ছৌ নাচের আসর। ছবি আয়োজকদের সৌজন্যে

আজ ছৌ নাচ বিশ্বের দরবারে সমাদৃত। দেশে বিদেশে ছৌ নাচের আয়োজন চলছে, রোমাঞ্চিত হচ্ছে আসর, পুলকিত হচ্ছে দর্শক। মিলছে বহু পুরস্কার, সম্মান। ছৌয়ের মুখোশে সাজছে অ্যাপার্টমেন্ট থেকে অফিস। দেশের প্রজাতন্ত্র দিবসে ছৌয়ের মহড়া দিল্লি আর কলকাতার বুকে শিহরণ জাগাচ্ছে। কিন্তু এই নাচ, এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর জীবন কেমন জানতে ইচ্ছে করে না?

আরো পড়ুন কেউ মনে রাখেনি জীব-তারা খসে যাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদের

মুখোশের আড়ালে থাকা মুখগুলো দেখতে সকলের ইচ্ছে করে। কিন্তু আসরের বাইরে আবছায়া আলো আঁধারে যখন তারা মুখোশ খোলে, তখন মুখ আর দেখা যায় না। নাচ শেষ হলে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত প্রায় অসাড় দেহগুলো গাড়ির উপরের কাঠের পাটাতনে কোনোরকমে শুয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেয়। তার পর কে কার খবর রাখে? দর্শক, আয়োজক, সরকার – কেউ না। কেউ খবর রাখে না, আলো এসে পড়ে না তাদের জীবনে। পেটের ভাত জোগাড় করতে আজ হিমশিম খেতে হয়, নাভিশ্বাস ওঠে চিকিৎসা করাতে। মেয়ের বিয়ে, ছেলের লেখাপড়ার কথায় কপালে ভাঁজ পড়ে। কোথা থেকে আসবে এত টাকা? যখন ছৌ নাচের এত আলো চারিদিকে, তখন নাচিয়ে বাজিয়েদের ঘরে নিকষ কালো অন্ধকার। উঠতি প্রতিভাদের ভবিষ্যৎ কি প্রবাসী শ্রমিক হওয়া?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.