১৯৯২ সালে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ দিনের আলোয় ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সাংবাদিক হিসাবে আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম ঘটনার তিনদিন আগে। তখন অবশ্য কল্পনাও করতে পারিনি এমন কিছু ঘটতে পারে। আমরা থাকতাম অযোধ্যা থেকে আট কিলোমিটার দূরে ফৈজাবাদের (এখন নাম বদলে দেওয়া হয়েছে) হোটেলে। পাঁচ তারিখ, অর্থাৎ বাবরি ধ্বংসের আগের দিন, রাত আটটা নাগাদ আমরা কয়েকজন সাংবাদিক হেঁটে হেঁটে অযোধ্যা গিয়েছিলাম। অযোধ্যা প্রবেশের ঠিক আগে এক মুসলমান আইনজীবীর সঙ্গে কথা হয়েছিল। যখন তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছে, তার মধ্যেই তাঁর বৃদ্ধা মা জানলা দিয়ে আমাদের বললেন “খুব চিন্তায় আছি, কী হবে বুঝতে পারছি না। আপনারা ভগবানের কাছে আমাদের হয়ে একটু প্রার্থনা করবেন, যেন সব কিছু ঠিক থাকে।” ৬ ডিসেম্বর বাবরি ধ্বংসের পর, ৭ তারিখ আমরা ফৈজাবাদ থেকে পুলিশের বাধায় অযোধ্যা ঢুকতে পারিনি। আট তারিখ আবার যখন ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, দেখলাম ওই এলাকায় এখানে ওখানে পোড়া বাড়ি, তখনো সব আগুন নেভেনি। সেই উকিলের বাড়ি ফাঁকা। কেউ নেই। চারিদিক জনশূন্য। কোথাও কোনো ফায়ার ব্রিগেডও চোখে পড়ল না।
৬ ডিসেম্বর সকাল আটটা নাগাদ আমরা সাংবাদিকরা অযোধ্যা পৌঁছে গিয়েছিলাম। বিরাট এলাকা জুড়ে জমায়েত। মঞ্চে লালকৃষ্ণ আদবানি সহ বিজেপি নেতারা। বক্তৃতা চলছে। অনেকটা দূরে পুজোর আয়োজন চলছে। সরযূ নদীর জল আর বালি দিয়ে পুজো হওয়ার কথা। আমি বক্তৃতার এলাকা ছেড়ে এসে পুজোর জায়গায় দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখছি। এমন সময় একদল যুবক, সংখ্যায় প্রথমে তারা ১০-১২ জন ছিল, পাথর ছুড়তে শুরু করল বাবরি মসজিদ ঘিরে রাখা কাঁটাতারের বেড়ার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তা কর্মীদের লক্ষ করে। নিরাপত্তারক্ষীরা ওই যুবকদের বাধা না দিয়ে সরে গেলেন। যুবকরা প্লায়ার্স দিয়ে তার কেটে ছুটতে ছুটতে গিয়ে বাবরি মসজিদের মাথায় উঠে গেরুয়া পতাকা তুলে দিল। এরপর কিছুক্ষণের মধ্যে শত শত মানুষ (করসেবক) গিয়ে বাবরি মসজিদ ঘিরে ফেলল। শুরু হল শাবল, গাঁইতি দিয়ে মসজিদ ভাঙা। একদম শুরুতে আদবানির মঞ্চ থেকে মাইকে বলা হচ্ছিল “আপনারা পতাকা তুলেছেন, এবারে নেমে আসুন, ফিরে আসুন।” সেকথায় অবশ্য কেউ কান দেয়নি। কিছুক্ষণ বাদে ঘটনাস্থল থেকে বাইরে এসে দেখলাম, বিভিন্ন গলিতে দাঁড়িয়ে কিছু যুবক বাঁশি (পুলিসের হাতে যে ধরনের বাঁশি থাকে) বাজাচ্ছে। সেই ডাক শুনে ছুটে ছুটে আরও যুবকরা আসছে। তাঁদের সবাইকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে মসজিদ ভাঙার কাজে। এটা দেখেই আমার সেদিন মনে হয়েছিল, একটা পরিকল্পনা ছিল।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আদবানি যখন দেখলেন মঞ্চ থেকে বলা সত্ত্বেও মসজিদ ভাঙা আটকানো গেল না, তিনি মঞ্চ ছেড়ে চলে গেলেন। চলে গিয়েছিলেন মুরলি মনোহর যোশীও। তারপর আমরা সাংবাদিকরা সেদিন আর তাঁদের পাইনি। কিন্তু উমা ভারতী সহ অন্য বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা-নেত্রী, অন্তত একজন বিজেপি সাংসদ, থেকে গিয়েছিলেন। আমরা দেখলাম, মসজিদের একটা একটা করে গম্বুজ ভেঙে পড়ছে আর বিজেপির নেতা নেত্রীরা পরস্পরকে আনন্দে জড়িয়ে ধরছেন। সন্ধ্যার পর ফেরার সময় আমি আমাদের গাড়ি খুঁজে পেলাম না। ফলে আট কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে অযোধ্যা থেকে ফৈজাবাদের হোটেলে ফিরেছিলাম। ফেরার সময়ে দেখলাম, রাস্তার মোড়ে মোড়ে বহু জায়গায় মিষ্টি হাতে দাঁড়িয়ে যুবকরা। আনন্দে মিষ্টি বিলি করা হচ্ছে। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গান্ধীহত্যার পর এই ভাবে মিষ্টি বিলি করেছিল আরএসএস সমর্থকরা, যেকথা জওহরলাল নেহরুকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন বল্লভভাই প্যাটেল। যেকথা সেই সময়কার মুর্শিদাবাদের জেলাশাসক অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর যুক্ত বঙ্গের স্মৃতি বইয়েও লিখে গিয়েছেন।

আমার পরে অনেকবার একটা কথা মনে হয়েছে। আদবানি অত বড় মাপের নেতা, তিনি নিজে হেঁটে মসজিদের কাছে গিয়ে ওই যুবকদের নিরস্ত করলেন না কেন? কেন মাইকে বারকয়েক অনুরোধ জানিয়েই থেমে গেলেন? তাঁর যে ধরনের ব্যক্তিত্ব, তিনি একবার চেষ্টা তো করে দেখতে পারতেন! তিনি কিন্তু তা করেননি। এর ফলে দেশে যে দাঙ্গা হয়েছিল, তাতে বহু নির্দোষ মানুষের মৃত্যু হয়। এর দায় কি আদবানির মত একজন প্রবীণ নেতা সম্পূর্ণ এড়িয়ে যেতে পারেন? আদবানি গোটা বিষয়টা থেকে হাত ধুয়ে ফেলে, তাঁর আত্মজীবনী মাই কান্ট্রি মাই লাইফ-এ লিখেছেন, ওই দিনটি তাঁর জীবনের সবথেকে দুঃখের দিন হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। অবশ্য এখন তিনি আর ওই কথা বলবেন বলে মনে হয় না।
আরো পড়ুন দ্বিজাতিতত্ত্ব ও ভারত ভাগ: চেপে রাখা ইতিহাস
১৯৯২ সালে কর্মরত উত্তরপ্রদেশের ডিজি প্রকাশ সিং ২০২২ সালে দ্য স্ট্রাগল ফর পুলিস রিফর্মস ইন ইন্ডিয়া নামে একটি বই প্রকাশ করেন। রাজনীতি কীভাবে পুলিসকে চালায় তার প্রমাণ হিসাবে প্রকাশ লিখেছেন, তিনিও চেয়েছিলেন অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরি হোক, কিন্তু ১৯৯২ সালে যখন উত্তরপ্রদেশ সরকার সুপ্রিম কোর্টে প্রতিশ্রুতি দিল, তারা বাবরি মসজিদ রক্ষা করবে, প্রকাশ লিখছেন “তখন রাজ্যের ডিজিপি হিসাবে আমার সর্বোচ্চ ধর্ম ছিল ওই সৌধ রক্ষা করা।” কল্যাণ সিং এবং আরও কয়েকজন মন্ত্রীর উপস্থিতিতে দুটি বৈঠকে বাবরি মসজিদের নিরাপত্তা কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেন প্রকাশ। মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব এল, একটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে বিশেষ ধরনের কাঁটাতার (কনসার্টিনা কয়েল) সরিয়ে ফেলার। বাধা দিলেন প্রকাশ। ফল হল, তাঁকে বদলি করে দেওয়া হল। তার পর কী কী ঘটেছিল সবই এখন জানা।
বাবরি মসজিদ যখন ভাঙা হয় তখন কল্যাণ সরকারের সবে একবছর হয়েছে। তিনি থাকতেন মুখ্যমন্ত্রীর জন্য নির্দিষ্ট সরকারি ভবনে। কংগ্রেস নেতা এবং নরসিমা রাও মন্ত্রিসভার সদস্য মাখনলাল ফোতেদার তাঁর দ্য চিনার লিভস বইয়ে লিখেছেন, ওই সময় উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নারায়ণ দত্ত তিওয়ারি তাঁকে খবর দিয়েছিলেন, কল্যাণ বেশ কিছু মিস্ত্রি লাগিয়ে নিজের পুরনো বাড়ি মেরামত করছেন। মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটতে চলেছে। ঘটেওছিল। ৬ ডিসেম্বর নরসিমা সরকার ৩৫৬ ধারায় কল্যাণ সরকারকে বরখাস্ত করার পর কল্যাণ তাঁর সেই মেরামত করা পুরনো বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন।
২৩ নভেম্বর ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন কাউন্সিলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরসিমাকে সর্বসম্মতভাবে বিতর্কিত সৌধ রক্ষায় সমস্ত ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯২ সালের ২৮ নভেম্বর নরসিমার নেতৃত্বে বসল ক্যাবিনেট কমিটি অন পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্সের বৈঠক। সেখানে সিদ্ধান্ত হল, উত্তরপ্রদেশ সরকারকে বরখাস্ত করা হবে। ৬ ডিসেম্বর শান্তিতে কেটে গেলে সেই নির্দেশ প্রত্যাহার করা হবে, কল্যাণ সিং সরকার ফের ক্ষমতায় ফিরবে। কিন্তু কোনো অজানা কারণে নরসিমা সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করেননি।

১৯৯২ সালের ৪ ডিসেম্বর সংসদ ভবনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক বসে। কংগ্রেস নেতা ফোতেদারের দাবি, তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ফের অনুরোধ করেন, দ্রুত ব্যবস্থা নিন, পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। নরসিমা বলেন, তিনি পরিস্থিতির উপর নজর রেখেছেন। ফোতেদার লিখছেন, ৬ ডিসেম্বর যখন সৌধ ধ্বংস করা হচ্ছে, তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস বি চবন, স্বরাষ্ট্রসচিব, ক্যাবিনেট সচিব – সবাইকে ফোন করেছিলেন। ফোন বেজে গিয়েছে, কেউ ফোন ধরেননি।
পরে প্রধানমন্ত্রী নরসিমা সাংবাদিক করণ থাপারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি কল্যাণ সরকারের প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করেছিলেন। ওরা বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। রাজ্য সরকারকে বিশ্বাস করা ছাড়া তাঁর কাছে অন্য পথ ছিল না। তিনি ১৯২ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠিয়েছিলেন, রাজ্য সরকার তাদের বসিয়ে রেখেছিল, কোনো কাজ করতে দেয়নি।
এগুলো এখন প্রকাশিত তথ্য। সিদ্ধান্ত পাঠকের।
~ মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








