‘সে মন্দিরে দেব নাই’ কহে সাধু।
রাজা কহে রোষে,
‘দেব নাই! হে সন্ন্যাসী, নাস্তিকের মতো কথা কহ।
রত্নসিংহাসন – ’পরে দীপিতেছে রতনবিগ্রহ —
শূন্য তাহা?’
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
‘শূন্য নয়, রাজদম্ভে পূর্ণ’ সাধু কহে,
‘আপনায় স্থাপিয়াছ, জগতের দেবতারে নহে।’
ভোটের বছরের শুরুতেই রাম-রাজনীতি তুঙ্গে উঠল। ইতিমধ্যেই বিজেপির ভক্তকুল দলে দলে অযোধ্যায় যেতে শুরু করেছে। সাধুসন্তরা আসছেন। রামমন্দির নিয়ে উন্মাদনার পারদ যত বাড়ানোর চেষ্টা চলছে তত কিছু কিছু সাধারণ মানুষও অযোধ্যামুখী। অনেক আগে থেকেই ট্রেনে বা প্লেনে টিকিট কেটে হোটেল বুকিং সারা। নরেন্দ্র মোদী বলে দিয়েছেন, যাঁরা অযোধ্যায় যেতে পারবেন না তাঁরা বাড়িতে বসেই প্রদীপ জ্বালুন। সমান পুণ্য অর্জিত হবে। রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি কর্মসূচি নিয়েছে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে তারা মানুষকে প্রদীপ জ্বালাতে বলছে, রামমন্দিরের ছবি বিলি করছে, আরও কী কী সব! মোটের উপর রামমন্দির এবং হিন্দু ভাবাবেগকে সামনে রেখে যাকে বলে বুথে বুথে পন্নাপ্রমুখদের (ভোটার লিস্টের একেকটি পাতার দায়িত্বে যাঁরা থাকেন) নেতৃত্বে জনসংযোগ অভিযান চলছে। অন্যদিকে বিরোধী শিবির কৌশল নিয়ে সম্পূর্ণ দিশাহারা। সিপিএমই বোধহয় সবচেয়ে দ্বিধাহীনভাবে রামমন্দির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যাবে না বলে ঘোষণা করেছিল। কংগ্রেস বহু দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠে কোনোক্রমে ঘোষণা করেছে – যাবে না। মমতা ব্যানার্জি মুখে বলেননি, কিন্তু সেদিন পালটা কর্মসূচি নিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন যাবেন না। শরদ পাওয়ার যাচ্ছেন না, অরবিন্দ কেজরিওয়ালও নয়। তবে তাঁরা পরে যাবেন বলে জানিয়েছেন – এমনই সব অবস্থা। এদিকে শংকরাচার্য চতুষ্টয় মন্দির উদ্বোধন তথা বিগ্রহে প্রাণপ্রতিষ্ঠা নিয়ে বিরূপ হয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য হল, মন্দিরের কাজ শেষ না হতেই প্রধানমন্ত্রী এবং উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যা শুরু করেছেন তা পাগলামির লক্ষণ। এভাবে মন্দির অসমাপ্ত রেখে, অর্থাৎ দেবতার শরীর তৈরি অসম্পূর্ণ রেখে আবার প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয় নাকি? তাঁদের সুরে সুর মিলিয়েছে নির্মোহী আখড়াও। সব মিলিয়ে দেশ এখন রাম নিয়ে সরগরম।
মজার ব্যাপার হল, সবাই কিন্তু জানে যে এটা বিজেপির নির্বাচনী চমক ছাড়া আর কিছুই নয়। এমনকি যে হিন্দু জনগণের ভাবাবেগে আঘাত দিয়ে ফেলার ভয়ে বিরোধীরাও খোলাখুলি এই পাগলামির বিরোধিতা করতে পারছে না, সেই জনগণও খুব ভালো করে জানে, এটা বিজেপির ভোট কুড়োবার প্রচেষ্টা। অন্য কিচ্ছু নয়। কিন্তু বিরোধী দলগুলির সমস্যাই হল, এরা জনগণকে এতটাই কচি ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে কিছুতেই তারা জনগণের উপর ভরসা রাখতে পারে না। কিন্তু তাহলে কি লোকে অযোধ্যায় যাচ্ছে না? যারা যাচ্ছে না তারা বাড়িতে প্রদীপ জ্বালবে না? মন্দির নিয়ে একটা উন্মাদনা তৈরি হচ্ছে না? এই ব্যাপারটা নিয়ে প্রথমেই দু-এক কথা বলতে হবে। তারপর অন্য বিষয়ে যাওয়া যাবে।
২০১৪ থেকে দু-দুটো লোকসভা নির্বাচন আর অসংখ্য রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন পেরিয়ে এসে বর্তমানে দেশের জনগণের মধ্যে বিজেপি এবং বিজেপিবিরোধী মেরুকরণ মোটের উপর সম্পন্ন হয়ে গেছে। যাঁরা বিজেপির দিকে যাবার তাঁরা মোটের উপর চলে গেছেন। যাঁরা বিরোধিতা করার তাঁরা বিরোধী হয়ে গেছেন। গত দশবছর ধরে তীব্র মাত্রার ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক ও উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রচারের এটা পরিণতি। এই দশ বছরে দেশের আর্থিক হাল সাম্প্রতিক ইতিহাসে বোধহয় সবথেকে খারাপ হয়েছে। বেকারি রেকর্ড পরিমাণ, কর্পোরেটের ব্যাঙ্ক ঋণ ছাড় অতীতের সমস্ত রেকর্ড ধুয়ে মুছে দিয়েছে। ছোট ব্যবসার হাল অত্যন্ত খারাপ। কৃষির অবস্থা তো ঐতিহাসিক কৃষক সংগ্রাম সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছে। গত দশ বছরের উগ্র হিঁদুয়ানি সাধারণ হিন্দুদের অবস্থা এতটুকু ভাল করতে পারেনি। উলটে তাঁদের অবস্থা শোচনীয় হয়েছে। রামনাম জপে উগ্র জাতীয়তাবাদের একবগ্গা অভিযানে একমাত্র লাভ হয়েছে একটি রাজনৈতিক দল আর গোটা চারেক শিল্পপতি গোষ্ঠীর। এটা যাঁদের বোঝার তাঁরা বুঝে নিয়েছেন। মোটের উপর মেরুকরণ সম্পন্ন।
আরো পড়ুন রামমন্দির হল খিদের পাহাড়ের উপর হিন্দুত্ব-কর্পোরেট সৌধ
সুতরাং অযোধ্যা নিয়ে জনগণের কোন অংশ মাতামাতি করছেন? করছেন তাঁরাই যাঁরা ইতিমধ্যেই বিজেপির দিকে চলে গিয়েছেন, নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে বিশ্বগুরুর মুখচ্ছবি দেখতে পাচ্ছেন, তাঁরাই। একশো চল্লিশ কোটি দেশের ৩০% যদি এঁরা হন, তাহলেও সংখ্যাটা কিন্তু বিরাট। এঁরাই নানাভাবে দৃশ্যমান হচ্ছেন আর মনে হচ্ছে, বুঝিবা বিজেপির দিকে জনসমর্থনের ঢল নেমেছে, যা বিরোধীদের কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। কংগ্রেস দোটানায় ভুগছে। কেন্দ্রীয়ভাবে রামমন্দিরে যাওয়া হবে না ঠিক করেও উত্তরপ্রদেশের নেতারা সরযূ নদীতে স্নান করে আগেভাগেই রামপূজো সেরে নিচ্ছেন। এমনকি যে সিপিএম সবচেয়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে রামমন্দির উদ্বোধনে সামিল না হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের নেতাও আত্মা-পরমাত্মার নাম করে পার্টির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছেন।
আর জনগণের যে অংশ বিজেপিবিরোধী অবস্থানে আছেন তাঁরা কী করছেন? তাঁরা কি খোলাখুলি বিজেপির বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন? বাড়িতে বিজেপির লোকেরা রামমন্দিরের ছবি বিলি করতে গেলে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিচ্ছেন? পাড়া বা গ্রাম বা অঞ্চলে যাঁরা বিজেপি করেন তাঁদের সাথে হেসে কথা বলছেন না? না, তা নয়। একটা খুব ছোট অংশকে বাদ দিলে সাধারণ বিজেপিবিরোধী মানুষ এর কোনোটাই করছেন না, করেন না সাধারণত। এর নানা কারণ আছে, মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে। ভারত এমন একটা দেশ যেখানে লোকে সাধারণত মুখের উপর “না” বলে না। চাকরি না দেওয়ার হলে ইন্টারভিউ নেওয়া অফিসকর্তা চমৎকার হাসিমুখে “আপনাকে আমরা খবর দেব” বলে বিদায় করবে। দোকানির কাছ থেকে মাল না কেনার হলে ক্রেতা “আচ্ছা ঘুরে আসছি” বলে সরে পড়বে। ছুটির দিনে দুপুরবেলা আড্ডা মারার জন্য বন্ধুরা ফোন করে ডাকাডাকি করলে সারা সপ্তাহের কর্মক্লান্ত অনিচ্ছুক মানুষ “খুব চেষ্টা করছি” বলে ফোন নীরব করে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। সরাসরি না বলা ভারতীয়দের ধাতে নেই। এটা গ্রাম, শহর নির্বিশেষে সব ধরনের মানুষের মধ্যেই লক্ষ করা যায়। কারণ আরও আছে। তা অনেক বেশি গুরুতর। সমাজের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন, অসংগঠিত। অসংগঠিত মানুষ সাধারণত মুখের উপর কোনো সংগঠিত শক্তিকেই চটাতে চান না। আর বিজেপির মত উগ্র রাজনৈতিক শক্তিকে তো নয়ই। তাই এঁরা দৃশ্যমান নন। কিন্তু এঁরা আছেন। বিজেপি সমর্থকদের থেকে বেশি মাত্রাতেই আছেন।
তাহলে এখন নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে কিছু কি বাকি থাকল? থাকল। যা বাকি থাকল সেটাই সমস্ত নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণ করে। সেটা হল নির্বাচনের আগের তিন-চার মাসের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে বিপক্ষের ৫%-৭% ভোট নিজের দিকে টেনে নেওয়া। এটা যে করতে পারে সে-ই সাধারণত নির্বাচনে জিতে থাকে। এই ৫%-৭% পরিবর্তনই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মানতেই হবে যে, এই লড়াইয়ে বিজেপির তুলনায় বিরোধীরা বেশ কিছুটা পিছিয়ে আছে। বিজেপির রামমন্দির নিয়ে উন্মাদনা সৃষ্টি করার প্রচেষ্টায় ভয় না পেয়ে এই জায়গাটা মেরামত করা দরকার ছিল। এই প্রবন্ধের মূল আলোচ্য এটাই। এবার এই নিয়ে কয়েকটা কথা বলা যাক।
বিজেপিবিরোধী জনতা প্রথমেই যেটা দেখতে চেয়েছিল তা হল বিরোধীদের মধ্যে ঐক্য। বিরোধী রাজনীতির কর্তাব্যক্তিরাও বুঝেছিলেন, বিজেপি যে বারবার নির্বাচনে জিতে যাচ্ছে তা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নয়। বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বিজেপির বিরোধী। কিন্তু বিরোধী ভোটাররা ভাগাভাগি হয়ে রয়েছেন বিভিন্ন যুযুধান দলের মধ্যে। এখানে একটা ঐক্য দরকার। সেই মত ইন্ডিয়া জোট তৈরিও হয়েছিল। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সেই জোট যে খুব একটা দানা বাঁধেনি তা তাদের কর্মকাণ্ড থেকেই পরিষ্কার। অনেকগুলো রাজ্যে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী লড়াই হবেই না, এমনই পরিস্থিতি। একটা দল অন্য দলের কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে না। দেশব্যাপী ঐক্যবদ্ধ কোনো কর্মসূচি নেই। এই সমস্ত বিষয় বিজেপিবিরোধী ভোটারদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে, যা কিনা নির্বাচনে বিজেপির পক্ষে কাঙ্ক্ষিত ঢেউ তৈরি করার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
দ্বিতীয়ত, বিরোধী দলগুলো এখনো পর্যন্ত জোট নিয়ে যত সময় ও শক্তি ব্যয় করেছে তার সিকিভাগও করেনি বিজেপিবিরোধী রাজনীতির স্বরূপ বা মর্মবস্তুর নির্মাণে। জনগণের যে অংশ বিজেপিবিরোধী, তাঁদের নিজস্ব অনেক বোঝাপড়া আছে যার ভিত্তিতে তাঁরা বিরোধিতা করেন। এর মধ্যে অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ইত্যাদি বিষয় আছে। এই জনতা বিরোধী রাজনীতিতে তার কোনো প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছে কি? উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, যিনি ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গা থেকে বিজেপির বিরোধী, তিনি বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা দেখতে পাচ্ছেন কি? পশ্চিমবঙ্গে মমতা তো একেবারে সরাসরি সরকারি টাকায় দীঘায় জগন্নাথ মন্দির তৈরি করছেন। শাসক দল সর্বত্র হনুমানপুজো, গণেশপুজো লাগিয়ে রেখেছে। ফলে লোকে আজকাল প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে কথা বলছে। অন্য রাজ্যের, বিশেষ করে উত্তর ভারতের, বিভিন্ন রাজ্যের বিরোধী দলগুলোর আচরণ ধর্মীয় দিক থেকে বিজেপির চেয়ে খুব আলাদা নয়। শুধু একটা মাত্রাভেদ রয়েছে। কিন্তু মর্মবস্তুতে ফারাক কী? মধ্যপ্রদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে কংগ্রেস তো প্রচার করেছিল যে রামমন্দিরের কৃতিত্ব বিজেপির প্রাপ্য নয়, রামমন্দির তৈরি হওয়ার পথ পরিষ্কার করেছিল কংগ্রেস। তা লোকের চোখে বিরোধী দলগুলোর বক্তব্যের সঙ্গে বিজেপির ফারাক থাকছে কি?
শ্রমিক, কৃষক, খেটে খাওয়া মানুষ, দোকানদার, ছোট ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত বিজেপির কর্পোরেট ঘেঁষা আর্থিক নীতিতে জেরবার। তাঁদের কাছে বিজেপিবিরোধী রাজনীতির কোনো বিকল্প অর্থনীতি হাজির হচ্ছে কি? পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা সবাই জানেন। সরকারের নেতা, মন্ত্রীরা দলে দলে চুরির দায়ে অভিযুক্ত হচ্ছেন, জেলে যাচ্ছেন। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর তাঁদের কারাবাস করতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছু খুদকুঁড়ো বিলি করা ছাড়া সরকারের আর কোনো মাথাব্যথা নেই, পরিকল্পনাও নেই। চাকরির পরীক্ষায় দুর্নীতি, নিয়োগে দুর্নীতি। সব মিলিয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার। দলে দলে ছেলেমেয়েকে চাকরির সন্ধানে, কাজের সন্ধানে অন্য রাজ্যে যেতে হচ্ছে। কৃষক আন্দোলনের সময়ে কৃষক সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে সরকারের কাছে ফসলের ন্যূনতম দাম নিয়ে আইন তৈরি করার জন্যে দরবার করেছিল। মজার ব্যাপার, যে দাবিগুলোর ভিত্তিতে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চলছিল, তার অন্যতম ছিল এটা। রাজ্যের তৃণমূল সরকার বিজেপিবিরোধী কৃষক আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে রাজ্যের ২০২১ সালের নির্বাচনে তার পুরো ফায়দা ঘরে তুললেও রাজ্যে ফসলের ন্যূনতম দামের আইন তৈরি করার দাবিকে একেবারেই পাত্তা দিল না। তা এরকম দলগুলোকে বিজেপিবিরোধী সংগ্রামের নেতা বলে মানবে কে? কেনই বা মানবে? যদি কেউ মনে করেন এই অবস্থা বুঝি শুধু পশ্চিমবঙ্গেই চলছে, তাহলেও ভুল হবে। দেশের অধিকাংশ রাজ্যেই মোটের উপর একই অবস্থা। বাম শাসনাধীন কেরালাও ব্যতিক্রম নয়।
অল্প কিছুদিন আগেই কয়েকজন অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে কেন্দ্রীয় আইনসভায় ঢুকে পড়ে স্বাধীন দেশে যে অভূতপূর্ব বিক্ষোভ দেখাল তা যে এক ঝটকায় এই মুহূর্তের অতি তীব্র বেকার সমস্যাকে সামনে নিয়ে এল, তা কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দলের বক্তব্যেই উঠে এল না। সকলেই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আইনসভায় নিরাপত্তা নেই – এই অভিযোগে মোদীকে বিদ্ধ করতে। রাহুল গান্ধী বাদে আর কেউ তুলতেই পারলেন না বেকারির ইস্যুটা। এমনকি বামপন্থীরাও ওই একই সুরে কেন্দ্রের সরকারের বিরোধিতা করলেন। অসীম ঝুঁকি নিয়েও সেদিন যে তরুণ-তরুণীরা একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে বিরোধীদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তা হাতে তুলে নেওয়ার সাহসটুকু পর্যন্ত এঁরা দেখাতে পারলেন না। এমন অপদার্থ বিরোধী রাজনীতি কীভাবে ফ্যাসিবাদকে আটকাবে?
রামমন্দির নিয়ে এই যে উন্মাদনা তৈরি করা হচ্ছে তার পিছনে কোনো ধর্ম নেই, আছে একটা সোজাসাপটা রাজনীতি। ধর্ম যে নেই তা তো শংকরাচার্য বা নির্মোহী আখড়ার বিরোধিতা থেকেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। শংকরাচার্য চতুষ্টয় বা নির্মোহী আখড়াকে আমরা চিনি, জানি। এঁরা যে হিন্দুত্ববাদী শিবিরেরই অংশ তাও জানি। কিন্তু এঁদের যুক্তি থেকে বোঝা যাচ্ছে, বিজেপি যেভাবে হিন্দুধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চাইছে তাতে করে একটা বড় সমস্যায় পড়ে যাচ্ছে হিন্দুধর্ম নিজেই। সত্যিই তো। হিন্দুধর্ম বা তার শাস্ত্রানুযায়ী যদি এটা ভাবা হয় যে মন্দির হল দেবতার শরীরের প্রতীক, গম্বুজ হল দেবতার মাথা আর পতাকা হল চুলের প্রতীক ইত্যাদি, তাহলে দেহ অসম্পূর্ণ রেখে দেবতার প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা মানে তো বিকলাঙ্গ দেবতার জন্ম দেওয়া। কোন ধর্মপ্রাণ লোকই বা এ জিনিস সমর্থন করতে পারে? এদিকে বিজেপির পক্ষ থেকে প্রাণপণে বোঝানোর চেষ্টা চলছে, মন্দির উদ্বোধন তথা প্রাণপ্রতিষ্ঠার কাজ নির্বাচনের আগে না হলে মোদীজি নির্বাচনে হেরেও যেতে পারেন। অর্থাৎ তারাও জানে, মোদীর কৃতিত্ব বলতে ওই রামমন্দির ছাড়া আর কিছু নেই। বাকি সব জায়গায় স্কোরকার্ড খুব খারাপ। অপুষ্টিতে ভারত অগ্রগণ্য, দেশজুড়ে অভুক্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, বেকারি সর্বোচ্চ, ব্যবসার অবস্থা খারাপ, কর্পোরেটদের ঋণ মকুব সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে, মোট জাতীয় আয়ের তুলনায় বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বিপজ্জনক দিকে এগোচ্ছে। অতএব ওই রামমন্দির ভরসা। তাই দেবতা বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মালেও চলবে, কিন্তু বিজেপিকে জিততে হবে। অর্থাৎ রাজনৈতিক হিন্দুত্বের দাবিদাওয়া চাহিদায় হিন্দুধর্ম আজ সত্যিই ‘খতরে মে’!
বাবা লালদাসকে আজ হয়ত অনেকেই মনে রাখেননি। উনি অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের ভিতর যে রামলালা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল তার প্রধান পুরোহিত ছিলেন। মসজিদ ভেঙে রামমন্দির তৈরি করার যে উন্মাদনা তৈরি করেছিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, লালদাস ছিলেন তার কঠোর সমালোচক। রাম কে নাম তথ্যচিত্রে তিনি খোলাখুলি বলেছিলেন, এই যে করসেবকরা অযোধ্যায় এসে গন্ডগোল পাকাল, এরা কেউ একদিনের জন্যে মন্দিরে পুজো দিতে আসেনি। আসলে ধর্ম এদের উদ্দেশ্য নয়, ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলাই এদের উদ্দেশ্য।

এই ধর্মীয় উন্মাদনার ফলস্বরূপ উত্তরপ্রদেশে বিজেপির সরকার তৈরি হওয়ামাত্র লালদাসকে বরখাস্ত করা হয়। বাবরি মসজিদ ভাঙা নিয়ে যে মামলা হয়েছিল, তাতে তিনি ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে খুন হয়ে যান লালদাস। আজ এই টালমাটাল সময়ে একজন বিরোধী নেতাকেও তো দেখলাম না বাবা লালদাসের কথা বলতে। রাজনৈতিক হিন্দুত্ব আর হিন্দুধর্মের মধ্যে যে সুতীব্র দ্বন্দ্ব ফল্গুধারার মত বহমান, তার গুরুত্ব অনুভব করেন কি আমাদের নেতারা? বিজেপি-আরএসএসের মুখোশ খুলে দেওয়ার জন্যে এটা এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারত। কিন্তু তা ব্যবহৃতই হল না।
চতুর্থত, উগ্র রাজনৈতিক হিঁদুয়ানির আড়ালে বিজেপির রাজনীতির মূলটা কী? সেটা হল উগ্র মুসলমান বিদ্বেষ। একথা বোঝার জন্যে মহাকাশবিজ্ঞান লাগে না, যে যারা তীব্রভাবে মুসলমানবিদ্বেষী তারাই বিজেপির দিকে ঢলে পড়ছে। এ বিষয়ে লাগাতার প্রচার বিরোধীদের তরফ থেকে আসা উচিত ছিল। আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস জনবোধ্য আকারে সভায় সভায় আলোচনা হওয়া উচিত ছিল। সে সংগ্রামে আরএসএসের বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস নিয়েও বিস্তারিতভাবে আলোচনা হওয়া উচিত ছিল। দেখা যাবে, স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি যত ফিকে হয়েছে, সেই সংগ্রামে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ইতিহাস যত চাপা পড়েছে, অপাংক্তেয় হয়েছে – ততই বিজেপির এই মুসলমানবিরোধী রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়েছে। ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে ‘বিজেপি বিরোধী মঞ্চ’-এর ছাত্র, যুবদের “তোমার বুকে নাথুরাম, আমার বুকে ক্ষুদিরাম” স্লোগানটা যে বিজেপিকে যথেষ্ট নাজেহাল করেছিল তা তাদের নেতারাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বিরোধী নেতারা যদি কিছুই লক্ষ না করেন তাহলে কার কী করার আছে?
রামমন্দিরের উদ্বোধন হিন্দুরাষ্ট্রের পথে এক বিরাট পদক্ষেপ। ২২ তারিখের পর এই দেশকে কার্যত আর ধর্মনিরপেক্ষ বলা যাবে কিনা তা বিরাট প্রশ্নের সম্মুখীন। এখনো সময় আছে। বামপন্থী সমেত সমস্ত বিজেপিবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নতুনভাবে পথ চলার সাহস দেখাতে হবে। নইলে ভবিষ্যতে জনগণ তাদের ক্ষমা করবেন না।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








